বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ইন্দোনেশিয়া
বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা রপ্তানিকারক ইন্দোনেশিয়া, কয়লার বদলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের উচ্চঝুঁকির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই প্রতিযোগিতায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এর ফল শুধু ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থাকেই নয়, বরং অনেক উন্নয়নশীল দেশের অনুসরণ করার সম্ভাব্য নিয়ম ও সরবরাহকারীদেরও প্রভাবিত করবে। চীনা কোম্পানিগুলো ২০২৩ সালে পিএলএনের (রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে ৫৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি চুক্তি করেছে। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর বেইজিং সফরে আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসে। এসব অঙ্ক ২০২২ সালে ধনী দেশগুলোর একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে হওয়া ২০ বিলিয়ন ডলারের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপের চেয়ে অনেক বড়। এই অংশীদারত্বের অর্থছাড়ের গতি ধীর, আর মার্চে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এটি থেকে সরে দাঁড়ায়। প্রতিশ্রুত অর্থের মাত্র প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬ শতাংশ, ছাড় করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার হিসাব অনুযায়ী, পুরো জ্বালানি রূপান্তরে ৯৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি লাগবে। ইন্দোনেশিয়ার সামনে যে পছন্দ তুলে ধরা হয়েছে, তা স্পষ্ট। ওয়াশিংটন নির্ভরযোগ্য অন্তর্বর্তী জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহারের পক্ষে এবং চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। বেইজিং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম কারখানায় বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাব দিচ্ছে, যেখানে শ্রম ও পরিবেশসংক্রান্ত শর্ত তুলনামূলক কম। এই প্রতিযোগিতার ফল আগামী কয়েক দশকে ইন্দোনেশিয়ার বিদ্যুতের দাম, বায়ুর গুণমান ও শিল্পোন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
সূচিপত্র
- বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ইন্দোনেশিয়া
- ইন্দোনেশিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ
- দুটি পথ: গ্যাস, নাকি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক শিল্পায়ন
- যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব: গ্যাস ও ভূরাজনীতি
- চীনের প্রস্তাব: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গতি ও ব্যাপকতা
- জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপ এখনো যা করতে পারে
- উচ্চ প্রত্যাশা থেকে বাস্তব প্রকল্পে
- খনি থেকে গিগাফ্যাক্টরি পর্যন্ত চীনের উপস্থিতি
- কয়লা, নিকেল ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল্য
- এলএনজি চুক্তি, শুল্ক ও জ্বালানি নিরাপত্তা
- কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে বিনিয়োগ টানার ইন্দোনেশিয়ার কৌশল
- স্বল্পমেয়াদি অগ্রাধিকার
- আঞ্চলিক গতিপ্রকৃতি ও নতুন অংশীদার
- ২০৩০ সালের মধ্যে সাফল্য কেমন হতে পারে
- মূল কথা
ইন্দোনেশিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। কয়লা এখনো দেশটির অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ; মোট দেশজ উৎপাদনে এর অবদান আনুমানিক ৩.৬ শতাংশ। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌর ও বায়ুশক্তির অংশ এখনো খুবই সামান্য, মোট জ্বালানির প্রায় ০.২৪ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে: ফিলিপাইনে প্রায় ৩.৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ১৩ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরে ইন্দোনেশিয়ার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘদিন চালু থাকে এবং রাজনৈতিক চক্র পাঁচ বছরের। এখন নেওয়া সিদ্ধান্ত হয় আরও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো দীর্ঘদিনের জন্য স্থায়ী করবে, নয়তো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি সঞ্চয়ব্যবস্থার বিস্তার ত্বরান্বিত করবে।
দুটি পথ: গ্যাস, নাকি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক শিল্পায়ন
আলোচনায় রয়েছে দুটি মডেল। একটির কেন্দ্রে আছে গ্যাস আমদানি ও জ্বালানি নিরাপত্তার আরও প্রচলিত ধারণা। অন্যটির ভিত্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যান ও সৌর প্যানেল উৎপাদনের বিস্তৃত শিল্পভিত্তি। প্রতিটি পথেই ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি, পরিবেশ ও নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতার জন্য কিছু সুবিধা ও খরচ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব: গ্যাস ও ভূরাজনীতি
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ তেল ও গ্যাস উৎপাদক। শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে দেশটি ইন্দোনেশিয়াকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার। এ প্রস্তাবের সমর্থকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে গ্যাস কয়লার ব্যবহার কমাতে, স্থানীয় বায়ুদূষণ হ্রাস করতে এবং সূর্যের আলো না থাকলে বা বাতাস না বইলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইন ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে পাকাপোক্ত করতে পারে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আরও সস্তা ও দ্রুত স্থাপনযোগ্য হয়ে উঠলে ইন্দোনেশিয়ার এসব পুরোনো সম্পদে বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এর একটি শিল্পভিত্তিক দিকও আছে। উচ্চতর মান পূরণকারী অংশীদারদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তুলতে চাইছে ওয়াশিংটন। ইন্দোনেশিয়ার খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের কিছু অংশে চীনা কোম্পানির আধিপত্য থাকায় সহযোগিতা জটিল হতে পারে।
চীনের প্রস্তাব: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গতি ও ব্যাপকতা
চীনের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্প সরবরাহশৃঙ্খল। প্রস্তাবটি সরল: আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সৌর প্যানেল ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে কয়েক দশক ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। নিকেল ও অন্যান্য খনিজ থেকে ব্যাটারি ও গাড়ি তৈরির কারখানা গড়া। কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দ্রুত এগোনো। পাঁচ বছরের মেয়াদে দৃশ্যমান অগ্রগতি চান, এমন নেতাদের কাছে এ প্রস্তাব আকর্ষণীয়। তবে এর বিনিময়মূল্যও আছে। চীনা প্রকল্প সাধারণত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং বিপুল মূলধননির্ভর; কিন্তু শ্রমিকের অধিকার ও স্থানীয় পরিবেশ সুরক্ষায় প্রায়ই তুলনামূলক কম ব্যবস্থা থাকে। পাশাপাশি, গলনাগার শিল্পপার্কে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে নতুন করে কয়লার ওপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপ এখনো যা করতে পারে
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপের উদ্দেশ্য কখনোই ইন্দোনেশিয়ার সম্পূর্ণ ব্যয় মেটানো ছিল না। এটি অনুদান, সহজ শর্তের ঋণ ও গ্যারান্টি একত্র করে আরও বিনিয়োগ টানার একটি সূচনা মঞ্চ। অংশীদারত্বে ২০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় অর্ধেক ঋণ গ্যারান্টির মাধ্যমে এখনো পাওয়া যেতে পারে। এখন পর্যন্ত মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে, আর মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ায় রাজনৈতিক পর্যায়ে গতি কমেছে। তা সত্ত্বেও, কয়লার ব্যবহার কমানো, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিক করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরের নতুন অর্থদাতাদের যুক্ত করতে প্রকল্পগুলোর সমন্বয়ে অংশীদারত্বটি এখনো সহায়ক হতে পারে।
উচ্চ প্রত্যাশা থেকে বাস্তব প্রকল্পে
শুরুর দিকের আলোচনায় এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, যা পূরণ করা কঠিন। এখন বাস্তবায়নযোগ্য ও অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পের দিকে নতুন করে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি দূষণকারী কয়লাভিত্তিক ইউনিটগুলো আগেভাগে বন্ধ করা, আরও সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার উপযোগী করে সঞ্চালন লাইন উন্নত করা এবং ট্যারিফ ও ক্রয়প্রক্রিয়ার স্পষ্ট নিয়মসহ বৃহৎ ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত সম্প্রসারণ করা। উপসাগরীয় অঞ্চলের নতুন অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খুলে দিতেও এই অংশীদারত্ব সমন্বয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি, কম খরচের মূলধন পাওয়ার সম্ভাব্য পথের মধ্যে রয়েছে। অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জট দূর করতে এবং চুক্তির শর্ত উন্নত করতে ইন্দোনেশিয়া অংশীদারত্বটি কাজে লাগালে, এই একই মঞ্চ থেকে এখনো উল্লেখযোগ্য বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে।
খনি থেকে গিগাফ্যাক্টরি পর্যন্ত চীনের উপস্থিতি
ইন্দোনেশিয়ার পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্থনীতিতে চীনের উপস্থিতি খনিজ আহরণ থেকে চূড়ান্ত পণ্য সংযোজন পর্যন্ত বিস্তৃত। ব্যাটারি নির্মাতা শীর্ষ প্রতিষ্ঠান সিএটিএলের ৬ বিলিয়ন ডলারের একটি সরবরাহশৃঙ্খল উদ্যোগের লক্ষ্য খনি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যাটারি উৎপাদনকে একীভূত করা। বিওয়াইডি বছরে ১ লাখ ৫০ হাজার গাড়ি উৎপাদনের পরিকল্পিত সক্ষমতা এবং আনুমানিক ১৮ হাজার কর্মসংস্থানসহ ১ বিলিয়ন ডলারের বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা নির্মাণ করছে। বিটিআর নিউ ম্যাটেরিয়াল গ্রুপ ব্যাটারির উপকরণে ৪৭৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। সৌরশক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান লংজি বছরে প্রায় ১.৬ গিগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার একটি কারখানা স্থাপন করছে। বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন বিক্রির একটি বড় দিক। ২০২৪ সালে চীনা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন থেকে চালু হওয়া পর্যন্ত প্রায় সাত মাস সময় নিয়েছিল। এই গতি ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক সময়সীমার সঙ্গে খাপ খায়, যদিও অনেক পশ্চিমা বিনিয়োগকারী শ্রম ও পরিবেশ সুরক্ষায় আরও জোরালো ব্যবস্থা দেয়।
উৎপাদন ও সরঞ্জাম সংগ্রহে চীনের ব্যাপক সক্ষমতার কারণে প্রায়ই দাম কম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ছোট হয়। ইন্দোনেশিয়ার জন্য স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের নিয়ম এ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় সরবরাহশৃঙ্খল ও দক্ষতা গড়ে তুলতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, কতটা স্থানীয় মূল্য সংযোজন হচ্ছে এবং শিল্পপার্কের ভেতরে পরিবেশগত মান জাতীয় আইন মেনে চলছে কি না। ইন্দোনেশীয় সরবরাহকারীদের জন্য স্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং দূষণের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা দ্রুত উৎপাদনকে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের সুফলে রূপ দিতে পারে।
কয়লা, নিকেল ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল্য
ইন্দোনেশিয়ার অধিকাংশ নিকেল খনি ও গলনাগার নিজস্ব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চলে, যেগুলো মূল বিদ্যুৎ মিটারের বাইরে স্থাপিত। জ্বালানিনির্ভর প্রক্রিয়াজাতকরণে এসব নিজস্ব কেন্দ্র নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ দেয়, তবে এর ফলে নির্গমন ও স্থানীয় দূষণ দীর্ঘস্থায়ী হয়। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, গলনাগার ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির ক্ষতি হবে প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালে বেড়ে ৩.৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এ দূষণের কারণে হাজারো মানুষের অকালমৃত্যুও হতে পারে। কোম্পানির আর্থিক হিসাবে যে বহিরাগত ব্যয়গুলো দেখা যায় না, সেগুলোর ভার বহন করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জনস্বাস্থ্য খাতের বাজেট।
বিশ্বে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান এখনো তৃতীয় সর্বোচ্চ, আর নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সাম্প্রতিক সংযোজনের প্রায় ১.৯ গিগাওয়াট সক্ষমতার বড় অংশই গলনাগার কমপ্লেক্সের জন্য তৈরি হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের নিজস্ব চাহিদা মেটায়। শিল্পপার্কের জন্য হলেও আরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, কারণ কার্বন নিঃসরণের মাত্রা নিয়ে ঋণদাতা ও ক্রেতারা কঠোর নিয়ম করছে। সরকার যদি গলনাগার উন্নয়নের সঙ্গে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি ও জ্বালানি সঞ্চয়ব্যবস্থা যুক্ত করে, তাহলে উৎপাদন না কমিয়েই এসব শিল্পগুচ্ছকে কয়লার বদলে অন্য জ্বালানিতে চালানোর কাজ শুরু করা সম্ভব।
এলএনজি চুক্তি, শুল্ক ও জ্বালানি নিরাপত্তা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানি বাড়ানোর ইন্দোনেশিয়ার পরিকল্পনা বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ। কয়লার তুলনায় এলএনজি গ্রিড স্থিতিশীল করতে এবং স্থানীয় দূষণকারী পদার্থ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এটি গ্রিনহাউস গ্যাসও নিঃসরণ করে এবং এর জন্য ব্যয়বহুল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি দরকার। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে, অথবা সৌর, বায়ু ও সঞ্চয়ব্যবস্থার দাম গ্যাসের চেয়ে কমে গেলে, ইন্দোনেশিয়াকে উচ্চ ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হতে পারে। ঝুঁকিটি হলো, প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারানোর পরও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক সম্পদের ওপর নির্ভরতা থেকে যাওয়া।
বাণিজ্য নিয়ে রাজনীতি এসব জ্বালানি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বৈদ্যুতিক গাড়ির করছাড়সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মে মিত্র দেশগুলোর সরবরাহ করা উপকরণ এবং উচ্চতর পরিবেশ ও শ্রমমান পূরণকারী উপকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ার নিকেল পরিশোধন সক্ষমতার বড় অংশ চীনা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে; এর পরিমাণ আনুমানিক তিন-চতুর্থাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রণোদনা পেতে সরবরাহশৃঙ্খলে প্রবেশাধিকারের ওপর এর প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বেগ জানিয়েছে। আলোচনাধীন একটি পথ হলো, কঠোর মান ও মালিকানার কাঠামো পূরণকারী বিশেষ বিনিয়োগ অঞ্চল গড়ে তোলা। নতুন মার্কিন শুল্ক থেকে অব্যাহতি চাইছে ইন্দোনেশিয়া। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের আমদানি বাড়ানোসহ পারস্পরিক ছাড়ের পথ খুঁজছে। এই ভারসাম্য রক্ষা কঠিন, তবে এর ফলে ভালো অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাজারে প্রবেশাধিকারের জন্য দুই পক্ষের ওপর চাপ দেওয়ার সুযোগ জাকার্তার রয়েছে।
কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রেখে বিনিয়োগ টানার ইন্দোনেশিয়ার কৌশল
দীর্ঘদিনের নীতি অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া কোনো একটি শক্তির সঙ্গে এককভাবে জোটবদ্ধ না হয়ে বিনিয়োগের নানা পথ খোলা রাখে। ‘হাজার বন্ধু, শূন্য শত্রু’ নীতি হিসেবে পরিচিত এই অবস্থান এখন জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। কাঁচা নিকেল আকরিক রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করেছে সরকার। শিল্পের স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের নিয়ম সম্প্রসারণ করছে এবং বৃহত্তম বাজারগুলোতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে এমন বাণিজ্যচুক্তি খুঁজছে। লক্ষ্য হলো মূল্যশৃঙ্খলে আরও ওপরে ওঠা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিতে কার্বন নিঃসরণ কমানো।
স্বল্পমেয়াদি অগ্রাধিকার
কয়েকটি পদক্ষেপ ইন্দোনেশিয়ার দর-কষাকষির ক্ষমতা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সুফল বাড়াতে পারে। প্রথমত, বিশেষ করে যেসব এলাকায় সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেখানে গ্রিড উন্নয়নের কাজ দ্রুত করতে হবে এবং সঞ্চালন প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্পষ্ট ট্যারিফ, মানসম্মত চুক্তি ও পূর্বানুমেয় অনুমোদনপ্রক্রিয়াসহ বৃহৎ সৌর, বায়ু ও সঞ্চয়ব্যবস্থার জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করতে হবে। তৃতীয়ত, গলনাগারগুলোর নিজস্ব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে সঞ্চয়ব্যবস্থা ও নমনীয় গ্রিডসেবার সমর্থনসহ নির্দিষ্ট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি চালু করতে হবে। চতুর্থত, শিল্পপার্কে দূষণ নিয়ন্ত্রণের কঠোর মান কার্যকর এবং ধারাবাহিক পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। পঞ্চমত, কয়লা উৎপাদনকারী অঞ্চলে শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ নতুন শিল্পের চাকরিতে যুক্ত করতে রূপান্তর কর্মসূচি নিতে হবে। ষষ্ঠত, জেইটিপি ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তহবিলসহ সরকারি অর্থায়নকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগেভাগে বন্ধ করা, গ্রিড আধুনিক করা এবং দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
অর্থের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হবে নীতির নিশ্চয়তা। চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা এবং পিএলএন ক্রয়চুক্তির শর্ত পূরণ করতে পারবে কি না, বিনিয়োগকারীরা তা দেখেন। জমি, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের স্পষ্ট নিয়ম প্রকল্পে বিলম্ব কমাবে। গ্রিডে সংযোগের অপেক্ষমাণ প্রকল্পের তালিকা, সম্পদের গুণমান ও উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার তথ্য এবং সময়সীমা প্রকাশ করলে উন্নয়নকারীরা ঝুঁকির মূল্য নির্ধারণ করতে পারবেন। দেশীয়ভাবে সৌর মডিউল, ব্যাটারি ও গ্রিড সরঞ্জাম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও সরকার নির্ধারণ করতে পারে; তবে ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি এড়াতে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের জন্যও দরজা খোলা রাখা জরুরি।
আঞ্চলিক গতিপ্রকৃতি ও নতুন অংশীদার
ইন্দোনেশিয়া একা এই পথ পাড়ি দিচ্ছে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল জ্বালানি বাজারগুলোর একটি, আর এ অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্রিড খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ সরানোর আন্তঃসংযোগসহ বড় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে চীন। এই অঞ্চলে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ রপ্তানির প্রকল্পে সহায়তা করছে অস্ট্রেলিয়া; এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরে সৌরবিদ্যুৎ পাঠানোর একটি প্রস্তাবিত সংযোগও রয়েছে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও উন্নত গ্রিড পরিকল্পনার সঙ্গে এসব উদ্যোগ যুক্ত হলে ব্যয় কমানো এবং সরবরাহের ওঠানামা সামলানো সম্ভব।
বাণিজ্য ও অর্থায়নেও বৈচিত্র্য আনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে ইন্দোনেশিয়া। ব্রিকস গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ায় নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তহবিল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে; কিছু প্রচলিত ঋণদাতার চেয়ে নমনীয় শর্তে এ ব্যাংক সবুজ অবকাঠামোতে সহায়তা করতে পারে। নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও ডিজিটাল বাণিজ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণই রয়েছে। একই সময়ে, বেইজিংয়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক সামলানোর পাশাপাশি সমুদ্রে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার অঙ্গীকার জানিয়ে যাচ্ছে জাকার্তা। নানা অংশীদার থাকায় কোনো একটি মূলধন বা প্রযুক্তির উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে।
২০৩০ সালের মধ্যে সাফল্য কেমন হতে পারে
২০৩০ সালের মধ্যে সাফল্যের চিত্র হবে এমন একটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যা আরও পরিচ্ছন্ন, পরিচালনায় সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সামান্য অংশ জুড়ে থাকা সৌর, বায়ু ও সঞ্চয়ব্যবস্থার অবদান কয়েক শতাংশে পৌঁছাবে এবং বর্তমান ভিত্তি থেকে বহুগুণ বাড়বে। সবচেয়ে বেশি দূষণকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আগেভাগে বন্ধ হবে অথবা কম চালানো হবে। শিল্পপার্কে নতুন নিজস্ব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি চালু হবে। উচ্চমানের সৌর ও বায়ুশক্তির এলাকাগুলোকে কাজে লাগাতে গ্রিডে নতুন সঞ্চালন লাইন যুক্ত হবে এবং সংযোগের নিয়ম স্পষ্ট হবে। ইন্দোনেশিয়ায় অন্তত কয়েকটি বড় ব্যাটারি কারখানা এবং এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলবে; পাশাপাশি দেশে তৈরি যন্ত্রাংশের অংশও বাড়বে। গলনাগার ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যব্যয় কমবে, কারণ ধারাবাহিক পরিবীক্ষণ ও কঠোর মান কার্যকর হবে। সবশেষে, জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজকে পুরস্কৃত করার পাশাপাশি শ্রমিক ও জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেয়, এমন পূর্বানুমেয় নীতিপরিবেশ বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করবে।
মূল কথা
- ইন্দোনেশিয়ায় চীনের জ্বালানি ও উৎপাদন খাতের বিনিয়োগ পশ্চিমা প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বড় এবং দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।
- জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপ প্রতিশ্রুত অর্থের সামান্য অংশই ছাড় করেছে, তবে বাস্তব প্রকল্পের জন্য এখনো একটি মঞ্চ দিতে পারে।
- বিদ্যুৎ খাতকে পরিচ্ছন্ন পথে নিতে ইন্দোনেশিয়ার ৯৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন বলে দেশটির হিসাব।
- যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে এলএনজি এবং উচ্চতর পরিবেশ ও শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরবরাহশৃঙ্খলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
- বৃহত্তর বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা ইন্দোনেশিয়ার।
- নিকেল থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি পর্যন্ত সরবরাহশৃঙ্খলের নানা স্তরে চীনা কোম্পানির উপস্থিতি রয়েছে; ইন্দোনেশিয়ার পরিশোধন সক্ষমতার বড় অংশও তাদের নিয়ন্ত্রণে।
- গলনাগার চালানো নিজস্ব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ব্যয় বাড়ছে। পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের দাম কমলে এগুলো বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
- চীন-সমর্থিত বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সিএটিএল, বিওয়াইডি, বিটিআর নিউ ম্যাটেরিয়াল গ্রুপ এবং লংজির সৌর কারখানায় বিনিয়োগ।
- এখনকার বিদ্যুৎ খাতের সিদ্ধান্ত কয়েক দশক ধরে জ্বালানির দাম, বায়ুর গুণমান ও শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে।
- স্পষ্ট নিয়ম, দ্রুত গ্রিড উন্নয়ন, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া ও জোরালো সুরক্ষাব্যবস্থা সব অংশীদারের কাছ থেকে বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।






