উদ্বেগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফাঁড়ি
গুয়ামের ১ লাখ ৭০ হাজার বাসিন্দা ক্ষেপণাস্ত্র, টাইফুন এবং দূরের সংকট নিয়ে মাঝেমধ্যে জারি হওয়া সতর্কতার মধ্যেই জীবন কাটান। বেইজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে নতুন অস্ত্র এবং ‘গুয়াম কিলার’ নামে পরিচিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনের পর সেই পটভূমির গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে। রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের নেতাদের পাশে শি জিনপিংয়ের ছবি জোট আরও দৃঢ় হওয়ার অনুভূতি বাড়িয়েছে। এই প্রদর্শনীতে গুয়ামের ওপর সবার নজর পড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে; ছোট এই দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।
সূচিপত্র
- উদ্বেগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফাঁড়ি
- ‘গুয়াম কিলার’ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
- পাল্লা ও ওয়ারহেড
- পরিবর্তিত সংস্করণ ও লক্ষ্যবস্তু
- তাইওয়ান সংকটে গুয়াম
- গুয়ামে গড়ে উঠছে নতুন প্রতিরক্ষাবলয়
- সেন্সর ও অস্ত্রব্যবস্থার সমন্বয়
- ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও পুনরায় ভরা
- বেসামরিক মানুষ কতটা প্রস্তুত
- দ্বীপজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা
- বাসিন্দারা কীভাবে সামলাচ্ছেন
- জেনে রাখুন
যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঞ্চল এবং বোমারু বিমান, সাবমেরিন ও মেরিন সেনাদের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে দ্বীপটি তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে। কৌশলবিদদের সতর্কবার্তা, সংঘাতের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ ধীর করতে চীন গুয়ামের যোগাযোগব্যবস্থা অচল, স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এবং দ্বীপটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে পারে। বাসিন্দারা প্রায়ই এমন সতর্কতা শোনেন। তবে এ ধরনের ঘটনা নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ঝড়ের পর পুনর্গঠনই সাধারণত অগ্রাধিকার পায়।
এই উদ্বেগের সঙ্গে জড়িত ডিএফ-২৬, একটি মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে গুয়ামে আঘাত হানতে পারে। চীনা সংবাদমাধ্যম একে ‘গুয়াম কিলার’ বলেছে। ক্ষেপণাস্ত্রটিতে প্রচলিত বিস্ফোরক অথবা পারমাণবিক ওয়ারহেড—দুটির যেকোনোটি বহন করা যায়। এর বিভিন্ন সংস্করণ স্থলভাগের স্থির ঘাঁটি এবং সমুদ্রে চলমান জাহাজে আঘাত হানার জন্য তৈরি। এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলে এবং অল্প সতর্কবার্তায় পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চীন আরও ডিএফ-২৬ উৎক্ষেপণযান মোতায়েন করছে এবং প্রচলিত ও পারমাণবিক—দুই ধরনের বাহিনীই সম্প্রসারণ করছে। দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য নকশার কারণে সংকটের সময় বিভ্রান্তির ঝুঁকি বাড়ে, কারণ লক্ষ্যবস্তু বুঝতে পারে না কোন ধরনের ওয়ারহেড আসছে। পেন্টাগনের বিশ্লেষণেও আগামী দশকে চীনের মোট ওয়ারহেডের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার ইঙ্গিত রয়েছে। এতে দ্রুত স্থানান্তর ও আকস্মিক আঘাতের জন্য আগে থেকেই তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর শক্তি আরও বাড়বে।
গুয়ামের জন্য উন্নত সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কাজ করছে। স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নে এ উদ্যোগের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ কোটি থেকে ১৭০ কোটি ডলার, আর কয়েক বছর ধরে এটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে। নতুন উৎক্ষেপণযান, রাডার ও কমান্ড নেটওয়ার্ক ইতিমধ্যে আসছে। একই সঙ্গে অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বিকল্প বিমানঘাঁটি ও ছড়িয়ে থাকা সামরিক স্থাপনা নির্মাণ চলছে। প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হলে দ্বীপটি যেন প্রথম আঘাত সামলে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে এবং পাল্টা পদক্ষেপে সহায়তা করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন।
‘গুয়াম কিলার’ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ডিএফ-২৬ সড়কপথে চলাচলযোগ্য, কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র, যা দ্রুত সরানো, লুকিয়ে রাখা এবং স্বল্প সময়ের নোটিশে নিক্ষেপ করা যায়। উন্মুক্ত সূত্রে এর পাল্লা প্রায় ২,০০০ মাইল থেকে ৩,০০০ মাইলেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে গুয়াম, জাপানের কিছু এলাকা এবং ফিলিপাইন সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত সক্রিয় মার্কিন নৌবাহিনীর অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব। প্রশান্ত মহাসাগরে এই পাল্লাকে কার্যকর লক্ষ্যভেদী সক্ষমতায় রূপ দিতে চীন দিকনির্দেশনা, লক্ষ্য অনুসরণ এবং যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করেছে।
পাল্লা ও ওয়ারহেড
এই ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের দুটি প্রধান ধরনের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। একটি সংস্করণে এমন দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা ও ওয়ারহেড আছে, যা রানওয়ে, বন্দর, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং আকাশ প্রতিরক্ষা কেন্দ্রের মতো স্থল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি। আরেকটি সংস্করণে রয়েছে সেন্সর ও চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকনির্দেশনা, যা বড় আকারের চলমান জাহাজে আঘাত হানার জন্য তৈরি। ব্যবস্থাটিতে বিভিন্ন ধরনের ওয়ারহেড ব্যবহার করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক বিকল্প এবং রানওয়েতে বড় গর্ত তৈরি বা শক্তিশালী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি নানা ধরনের প্রচলিত বিস্ফোরক।
পরিবর্তিত সংস্করণ ও লক্ষ্যবস্তু
বিশ্লেষকেরা ডিএফ-২৬ডি নামে পরিচিত উন্নত সংস্করণের কথা বলেন। উন্নত নেভিগেশন, জ্যামিং প্রতিরোধ এবং প্রতারক লক্ষ্যবস্তু ব্যবহারের মাধ্যমে এগুলোর নির্ভুলতা ও টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সমুদ্রে আঘাত হানতে হলে বিস্তৃত লক্ষ্য শনাক্ত ও আঘাত হানার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে। এর শুরু স্যাটেলাইট, দূরপাল্লার রাডার, টহল বিমান, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা তথ্য থেকে। এসব সেন্সর মার্কিন নৌবহরের অবস্থান শনাক্ত করে, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটে অনুসরণের তথ্য পাঠায় এবং উড্ডয়নের মাঝপথে লক্ষ্য নির্ধারণ আরও নিখুঁত করে। এর ফলে বিমানবাহী রণতরির বিমানবহর এবং স্থির ঘাঁটি—দুটিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
এই শ্রেণির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নেমে আসে। এতে প্রতিরক্ষাকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমে যায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়। চীন ডিএফ-১৭ ও ডিএফ-২৭-এর মতো হাইপারসনিক গ্লাইড যানও মোতায়েন করেছে, যেগুলো নিচু দিয়ে উড়ে এবং দিক পরিবর্তন করতে পারে। পাশাপাশি রয়েছে ওয়াইজে-২১-এর মতো জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এসব অস্ত্র একসঙ্গে দ্বিতীয় দ্বীপশৃঙ্খলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভিন্ন দিক ও গতির একাধিক হুমকি সামলাতে বাধ্য করে।
তাইওয়ান সংকটে গুয়াম
গুয়াম দ্বিতীয় দ্বীপশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে মার্কিন অভিযান পরিচালনার সংযোগস্থল। অ্যান্ডারসন বিমানঘাঁটিতে ভারী বোমারু বিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার এবং যুদ্ধবিমান রাখা যায়। গুয়াম নৌঘাঁটি সাবমেরিন ও রসদ সরবরাহে সহায়তা করে। মেরিন কোর সেখানে প্রায় ৫,০০০ মেরিনের জন্য একটি ঘাঁটি গড়ছে। তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে এসব সম্পদ আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহ, দূরপাল্লার হামলা এবং রসদ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। চীনা পরিকল্পনাকারীরা তা জানেন এবং দ্বীপটির অভিযান শুরু ও চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
যুদ্ধের মহড়া ও গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য হতে পারে রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়েতে বড় গর্ত তৈরি, জ্বালানি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যাহত করে যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের গতি কমিয়ে দেওয়া। রক্ষণশীল অনুমান ধরে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মডেল তৈরি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাপানে মার্কিন যুদ্ধবিমানের অভিযান প্রায় ১২ দিনের জন্য এবং গুয়ামে প্রায় দুই দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ট্যাংকারের মতো বড় বিমানের রানওয়ে জাপানে এক মাসেরও বেশি এবং গুয়ামে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় বন্ধ থাকতে পারে। বাহিনী ছড়িয়ে রাখা, দ্রুত রানওয়ে মেরামত কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা—কোনো একক সমাধানই পুরোপুরি এই চ্যালেঞ্জ দূর করতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের জবাবে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন ধারণারও সমন্বয় করা হয়েছে। ‘অ্যাজাইল কমব্যাট এমপ্লয়মেন্ট’ বা এসিই-এর লক্ষ্য, চীনের পক্ষে লক্ষ্য নির্ধারণ কঠিন করতে বিমানকে ছোট ছোট ঘাঁটিতে ছড়িয়ে রাখা এবং ঘন ঘন স্থানান্তর করা। সাইপানের কাছে টিনিয়ানে বিকল্প রানওয়ে তৈরিতে বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পালাউ নতুন বন্দর ও বিমানঘাঁটি নির্মাণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তাইওয়ানের দিকে মুখ করা ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলের স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার বাড়ানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়লেও রসদ সরবরাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়, কারণ অনেক স্থানে সুরক্ষিত জ্বালানি মজুত, আশ্রয়কেন্দ্র এবং সরঞ্জামের মজুত নেই। মহাকাশ ও আকাশ থেকে আধুনিক নজরদারির মাধ্যমে খোলা জায়গায় রাখা বিমান এখনো শনাক্ত করে আঘাত হানা সম্ভব।
গুয়ামে গড়ে উঠছে নতুন প্রতিরক্ষাবলয়
পেন্টাগন গুয়ামকে ৩৬০ ডিগ্রি সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। এই প্রতিরক্ষাবলয়ের কিছু অংশ ইতিমধ্যে দ্বীপে রয়েছে। পরিকল্পনায় রয়েছে স্থলভিত্তিক এজিস কমব্যাট সিস্টেম, টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড), প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, সেনাবাহিনীর ইনডাইরেক্ট ফায়ার প্রোটেকশন ক্যাপাবিলিটি (আইএফপিসি) এবং নৌবাহিনীর স্ট্যান্ডার্ড মিসাইলের বিভিন্ন সংস্করণ। এমকে ৪১ নামে পরিচিত উৎক্ষেপণযান বসানো হচ্ছে। এগুলো দিয়ে এমন প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হবে, যা মহাকাশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে এবং নিচু উচ্চতার হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারে। উন্নয়নাধীন ভবিষ্যৎ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হাইপারসনিক অস্ত্রকে গ্লাইড পর্যায়ে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে।
সেন্সর ও অস্ত্রব্যবস্থার সমন্বয়
এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি যুদ্ধ নেটওয়ার্ক, যা রাডার, ইনফ্রারেড সেন্সর ও উৎক্ষেপণযানকে সংযুক্ত করবে, যাতে যেকোনো সেন্সরের তথ্য যেকোনো অস্ত্রব্যবস্থাকে লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে। সেনাবাহিনীর ইন্টিগ্রেটেড ব্যাটল কমান্ড সিস্টেম বা আইবিসিএস সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সেন্সর থেকে তথ্য নিয়ে কমান্ডারদের সামনে একটি সমন্বিত চিত্র তুলে ধরার জন্য তৈরি। লক্ষ্য হলো, উঁচু দিয়ে উড়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে পারে এমন ঝাঁকবদ্ধ ড্রোন শনাক্ত ও মোকাবিলা করা। স্যাটেলাইটে হামলা, যোগাযোগে জ্যামিং এবং সাইবার অনুপ্রবেশের মধ্যেও নেটওয়ার্কটিকে সচল থাকতে হবে।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও পুনরায় ভরা
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আক্রমণকারী একই সময়ে বিভিন্ন দিক ও উচ্চতা থেকে অনেক অস্ত্র ছুড়তে পারে। বড় দফার হামলা সামলানোর জন্য প্রতিরক্ষাকারীদের হাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুত ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে হবে এবং চাপে থেকেও দ্রুত সেগুলো পুনরায় মজুত করতে হবে। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট মোকাবিলায় গুয়ামে আরও প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র দিতে এবং পুরোনো ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত পুনরায় মজুতের সুযোগ তৈরি করতে আইএফপিসি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুতগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার ফাঁক পূরণ করতে স্থলভিত্তিক উৎক্ষেপণযানে এআইএম-১২০ আকাশ-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর বিষয়টিও বিভিন্ন বাহিনী বিবেচনা করছে। গুয়ামে নিয়মিত সরাসরি গোলাবর্ষণের পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছর এজিস দিয়ে পরীক্ষা শুরু হবে এবং এ দশকজুড়ে বছরে সর্বোচ্চ দুটি পরীক্ষা চলবে।
স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গুয়াম হাওয়াই থেকে অনেক দূরে, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সদর দপ্তর। এদিকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছাতে পারে। দ্বীপের ক্রুরা যেন এই অল্প সময়ের মধ্যে শনাক্ত, সিদ্ধান্ত এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে, সে জন্য নতুন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। চীনের সামরিক মতবাদে তথ্য নেটওয়ার্কও লক্ষ্যবস্তু। গুয়াম যেন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে, সে জন্য মার্কিন পরিকল্পনাকারীরা কেবল, রেডিও ও বিকল্প ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের নেতৃত্বে থাকা অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।
গুয়ামকে রক্ষা করাই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নিখুঁতভাবে সব আঘাত ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেয় না। এর কাজ হলো হামলার তীব্রতা কমানো, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখা এবং পাল্টা আঘাত হানতে আক্রমণকারী বাহিনীকে সময় দেওয়া। আংশিক সুরক্ষাও প্রতিপক্ষের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে এবং শুরুর কয়েক ঘণ্টায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমাতে পারে।
বেসামরিক মানুষ কতটা প্রস্তুত
গুয়ামের বেসামরিক কর্তৃপক্ষও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক এক টেবিলটপ মহড়ায় কর্মকর্তারা এমন একটি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র আসার সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য হাতে ছিল মাত্র ছয় মিনিটের মতো সময়। ওই পরিস্থিতিতে সামরিক প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষের স্থাপনা, অ্যান্ডারসন বিমানঘাঁটি ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত লাগে। আহত বাসিন্দাদের ঢল সামলাতে হয় হাসপাতালগুলোকে। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জরুরি কলের সংখ্যা বেড়ে যায়। মহড়ায় সমন্বয়, জনসতর্কতা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, রসদ সরবরাহ এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেওয়া হয়। আয়োজকেরা ৯০ দিনের মধ্যে মহড়া-পরবর্তী পর্যালোচনা এবং ১২০ দিনের মধ্যে জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের আশা করছেন।
গভর্নর লু লিওন গুয়েরেরো যুদ্ধকালীন যেকোনো সংকট, তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকিসহ, মোকাবিলায় পরিবার, স্কুল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাজে লাগবে এমন একটি সমন্বিত নির্দেশিকায় পরিকল্পনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। উপদেষ্টারা বলছেন, গুয়ামের হুমকির মাত্রা বদলায়নি। তবে অন্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পাল্টাপাল্টিকে তারা পরিকল্পনার গুরুত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রথমত বাহিনীকে রক্ষার জন্য তৈরি। স্থানীয় নেতারা বলছেন, জনগণকে অবগত রাখা, প্রয়োজনে আশ্রয় দেওয়া এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রতিরক্ষায় আরও বিনিয়োগ দরকার।
দ্বীপজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা
গুয়ামকে ঘিরে মনোযোগ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে বৃহত্তর অস্ত্র প্রতিযোগিতারই অংশ। প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল পেরিয়ে দ্বিতীয় দ্বীপশৃঙ্খল পর্যন্ত বিমানবাহী রণতরির বহর পরিচালনা করে চীন গভীর সমুদ্রে তার উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এক দফা মহড়ায় চীনা জাহাজ ও বিমান জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার নিবিড় নজরদারিতে থাকা এলাকা দিয়ে উড়ে ও চলাচল করে। বেইজিংয়ের এই অবস্থানের সঙ্গে মিত্রদের তৎপরতাও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ‘টাইফন’ নামে একটি নতুন মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা জাপানে এনেছে। ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলে দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। ফিলিপাইন থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বড় পরিসরের মহড়ায় মিত্র নৌবাহিনীগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।
এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য, চীনের পক্ষে বাহিনী এক জায়গায় জড়ো করা কঠিন করে তোলা এবং অংশীদারদের আশ্বস্ত করা। তবে এতে সীমিত এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও সেন্সরের সংখ্যাও বেড়ে যায়। ডিএফ-১৭ ও ডিএফ-২৭-এর মতো চীনা হাইপারসনিক ব্যবস্থা শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে চলে এবং উড্ডয়নের সময় দিক পরিবর্তন করতে পারে। এতে জাহাজ ও ঘাঁটির সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় কমে যায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়। কিছু বিশেষজ্ঞ কয়েক মিনিটে বিমানবাহী রণতরি ডুবিয়ে দেওয়ার দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইতিহাসও দেখায়, আধুনিক বিমানবাহী রণতরি বেশ শক্তপোক্ত জাহাজ। ঝুঁকির জায়গা হলো উড্ডয়ন ডেক এবং তার ওপর নির্ভরশীল বিমান। নিরাপদ থাকতে কোনো বিমানবাহী রণতরিকে লড়াই থেকে অনেক দূরে থাকতে হলে দ্রুত এগিয়ে চলা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাতে তার বিমানগুলোকে হিমশিম খেতে হবে।
বাসিন্দারা কীভাবে সামলাচ্ছেন
গুয়ামে দৈনন্দিন জীবন চলছে। বাসিন্দারা নিত্যপণ্যের দাম, আবাসন এবং টাইফুন মৌসুম নিয়ে উদ্বিগ্ন। বেইজিংয়ের কোনো প্রদর্শনী বা নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা যুদ্ধের আশঙ্কাকে কিছু সময়ের জন্য মনের সামনে নিয়ে আসে, পরে তা আবার পেছনে চলে যায়। অনেক দ্বীপবাসী দ্বীপ রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থা রাখেন। অন্যরা চীনের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের গতি এবং চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের লক্ষণ দেখে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়ে উঠতে দেখেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা শান্ত থাকার এবং পরিবারে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি থেকে শুরু করে সরকারি সতর্কবার্তা অনুসরণ করার মতো বাস্তব পদক্ষেপে ধারাবাহিক মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জেনে রাখুন
- চীন ডিএফ-২৬ প্রদর্শন করেছে, যাকে প্রায়ই ‘গুয়াম কিলার’ বলা হয়। এটি একটি মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে গুয়ামে আঘাত হানতে পারে।
- মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্য, চীন ডিএফ-২৬ উৎক্ষেপণযানের সংখ্যা বাড়াচ্ছে এবং প্রচলিত ও পারমাণবিক—দুই ধরনের বাহিনী সম্প্রসারণ করছে, যা সংকটের সময় ঝুঁকি বাড়ায়।
- ওয়াশিংটন গুয়ামে সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ছে, যাতে এজিস, থাড, প্যাট্রিয়ট, আইএফপিসি ও নতুন উৎক্ষেপণযান যুক্ত থাকবে। নিয়মিত পরীক্ষা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
- ক্ষেপণাস্ত্রের একের পর এক হামলায় রানওয়েতে বড় গর্ত তৈরি হলে কয়েক দিনের জন্য যুদ্ধবিমানের অভিযান বন্ধ এবং বড় বিমানের রানওয়ে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে; দ্রুত মেরামত করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
- স্থানীয় সংস্থাগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার মহড়া চালিয়েছে, যেখানে ধরে নেওয়া হয়েছিল সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য হাতে আছে মাত্র ছয় মিনিট। বন্দর, বিমানঘাঁটি ও বিমানবন্দরে আঘাত লেগেছিল।
- এসিই কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং টিনিয়ানে বিকল্প বিমানঘাঁটিতে বিনিয়োগ করছে। পালাউয়ে আরও স্থাপনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ফিলিপাইনে প্রবেশাধিকার বাড়ানো হয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্র জাপানে টাইফন ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন করেছে এবং ফিলিপাইনে দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রেখেছে।
- চীনের বিমানবাহী রণতরির বহর দ্বিতীয় দ্বীপশৃঙ্খল পেরিয়ে অভিযান চালাচ্ছে। অন্যদিকে হাইপারসনিক ব্যবস্থা সতর্কবার্তার সময় কমিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
- অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো বলেছেন, গুয়ামকে রক্ষা করাই তাঁর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় দ্বীপটির কেন্দ্রীয় ভূমিকার বিষয়টি এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
- বাসিন্দারা দৈনন্দিন উদ্বেগের পাশাপাশি বাড়তে থাকা কৌশলগত আশঙ্কাও সামলাচ্ছেন। কর্মকর্তারা বাস্তব প্রস্তুতি এবং নির্ভরযোগ্য জনতথ্যের ওপর জোর দিচ্ছেন।






