গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা বাড়ায় সতর্কবার্তা ফিলিপাইনের
ফিলিপাইনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশটিতে চীনের গুপ্তচরবৃত্তি, প্রভাব বিস্তারের প্রচারাভিযান ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযান দ্রুত বাড়ছে; সমুদ্রে সংঘাতের গতির সঙ্গে এর মিল রয়েছে। এ সতর্কবার্তার পর আইনপ্রণেতা ও নিরাপত্তা খাত থেকে এমন আইন আধুনিকায়নের দাবি উঠেছে, যেগুলো লেখা হয়েছিল ড্রোন, সাইবার অনুপ্রবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারসাজি রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ হয়ে ওঠার অনেক আগে। একই সময়ে একের পর এক গ্রেপ্তারের ঘটনায় গোপন নজরদারি, স্থানীয় লোকজনকে নিয়োগ এবং তথ্য অভিযান—এমন নানা তৎপরতার ইঙ্গিত মিলছে। সমালোচকদের মতে, এসবের লক্ষ্য জনমত ও নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করা।
সূচিপত্র
- গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা বাড়ায় সতর্কবার্তা ফিলিপাইনের
- গ্রেপ্তার ও অভিযানে যা বেরিয়ে এসেছে
- ড্রোন, ফোন ও গুপ্তচরবৃত্তির সরঞ্জামভর্তি ভ্যান
- নজরদারির হটস্পট হয়ে উঠছে সুবিক বে
- প্রভাব বিস্তারের কৌশল ও স্থানীয় সহযোগীরা
- প্রভাব বিস্তারের তৎপরতায় পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম কেন জটিল হয়
- প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে পরিস্থিতি
- ম্যালওয়্যার থেকে সামুদ্রিক সেন্সর
- আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির মুখে সেকেলে আইন
- সংস্কারে যা থাকতে পারে
- দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনায় বাড়ছে ঝুঁকি
- বেইজিং অস্বীকার করে, ফিলিপাইনের কথিত গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তোলে
- উত্তেজনা না বাড়িয়ে ঝুঁকি সামলানো
- মূল বিষয়গুলো
ফিলিপাইনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সহকারী মহাপরিচালক কর্নেলিও ভ্যালেন্সিয়া বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনই কেবল এসব তৎপরতার ব্যাপ্তি বুঝতে পারছে। তিনি এর বৃদ্ধির সঙ্গে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চলমান বিরোধের যোগসূত্র টেনেছেন। সেখানে চীনের কোস্টগার্ড ও সামুদ্রিক মিলিশিয়া ফিলিপাইনের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর চীনের বিস্তৃত দাবির পক্ষে চাপ সৃষ্টি করছে।
ভ্যালেন্সিয়ার বক্তব্য তুলে ধরে সরকারি গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, গোপন তৎপরতার ব্যাপ্তি এখন আর সামান্য নয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে সামুদ্রিক চাপের পাশাপাশি এর ব্যবহার হচ্ছে:
চীনারা বেশ কিছুদিন ধরে ফিলিপাইনে তৎপর রয়েছে, আর এখন আমরা তাদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি বুঝতে পারছি।
তিনি আরও বলেন, পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে জাহাজ মোতায়েন ও চলাচলের সঙ্গে “প্রায় সমান তালে” চলছে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারের তৎপরতা।
বেইজিং অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এসব ঘটনা অপপ্রচারমূলক অভিযান। ফিলিপাইনের পক্ষের বক্তব্য, স্থল, সমুদ্র ও অনলাইন তৎপরতায় যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, গুপ্তচরবৃত্তি ও হস্তক্ষেপকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, চলমান হুমকি হিসেবে দেখতে হবে।
গ্রেপ্তার ও অভিযানে যা বেরিয়ে এসেছে
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে সন্দেহভাজন গুপ্তচরদের চলাচল, তথ্য সংগ্রহ এবং দৈনন্দিন জীবনে মিশে যাওয়ার একটি চিত্র পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, চীনা নাগরিক ও তাঁদের ফিলিপিনো সহযোগীরা ম্যানিলা, পালাওয়ান ও সুবিক বে-তে সামরিক স্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেছেন। পৃথক ঘটনায় সন্দেহভাজনদের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস চত্বর, ক্যাম্প আগুইনালদো, ভিলামর বিমানঘাঁটি ও উপকূলীয় ফাঁড়ির কাছে দেখা গেছে; তাঁদের সঙ্গে প্রায়ই ক্যামেরা, ড্রোন বা বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ছিল।
ড্রোন, ফোন ও গুপ্তচরবৃত্তির সরঞ্জামভর্তি ভ্যান
জানুয়ারিতে উন্নত নজরদারি সরঞ্জামযুক্ত একটি গাড়ি মেট্রো ম্যানিলার স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাওয়ার পর সফটওয়্যার প্রকৌশলী দেং ইউয়ানছিং ও দুই ফিলিপিনোকে আটক করেন কর্মকর্তারা। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মানচিত্র তৈরি করেছিলেন; আদালতে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কয়েক দিন পর পালাওয়ানে পাঁচ চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, তাঁরা ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড ঘাঁটির দিকে মুখ করা একটি রিসোর্টে ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দেওয়া মামলার সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, তদন্তকারীরা যেসব সংরক্ষণযন্ত্র জব্দ করেন, তাতে নৌবাহিনীর নৌযান ও টহল জাহাজের ছবি ছিল; এর মধ্যে ছিল বিআরপি রামন আলকারাজ, বিআরপি তেরেসা মাগবানুয়া ও বিআরপি গ্যাব্রিয়েলা সিলাং। আরেকটি ঘটনায় তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই চীনা নাগরিকের কাছে ছিল আন্তর্জাতিক মোবাইল গ্রাহক পরিচয় শনাক্তকারী (আইএমএসআই) ক্যাচার—এমন একটি যন্ত্র, যা মোবাইল টাওয়ারের অনুকরণ করে বড় এলাকাজুড়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
নজরদারির হটস্পট হয়ে উঠছে সুবিক বে
মার্চ নাগাদ মনোযোগ সরে যায় সুবিক বে ও কাছের গ্র্যান্ডে আইল্যান্ডে। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ দ্বীপ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় মার্কিন নৌঘাঁটির প্রবেশপথ পাহারা দিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবসর সময়ে মাছ ধরতে আসা লোকের ছদ্মবেশে গভীর রাত পর্যন্ত ঘাটে অবস্থান এবং ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগে জাতীয় তদন্ত ব্যুরো (এনবিআই) ছয় চীনা নাগরিক ও এক ফিলিপিনোকে গ্রেপ্তার করে। এনবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, ফোন থেকে উদ্ধার করা ছবিতে ওই এলাকার যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের নৌযান ছিল। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা ছবিতে লিটোরাল কমব্যাট শিপ ইউএসএস সাভানাহ ও হেনরি জে. কাইজার শ্রেণির একটি তেলবাহী জাহাজ শনাক্ত করেছেন। নিবন্ধনহীন আগ্নেয়াস্ত্র বহনের দায়ে ফিলিপিনো সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, দলটির অবস্থান থেকে টহল বা যৌথ মহড়ার সময় সুবিক বে-তে নৌসম্পদ প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যেত। বন্দরে ঘন ঘন মার্কিন জাহাজ আসা এবং নতুন রসদ সরবরাহ কার্যক্রম চলার সময়ে এটি ছিল মূল্যবান তথ্যের উৎস।
প্রভাব বিস্তারের কৌশল ও স্থানীয় সহযোগীরা
তদন্তকারী ও গবেষকদের মতে, গুপ্তচরবৃত্তি এ তৎপরতার একটি অংশমাত্র। আরেকটি দিক হলো প্রভাব বিস্তার। জানুয়ারিতে অভিযুক্ত চার চীনা নাগরিক চীনের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত নাগরিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিতেন। তাঁরা তারলাক শহরকে নগদ অর্থ এবং তারলাক ও ম্যানিলার পুলিশ বাহিনীকে মোটরবাইক দান করেছিলেন। ছবি ও অনুষ্ঠানের কর্মসূচি থেকে দেখা যায়, ২০২৪ সালজুড়ে ম্যানিলায় চীনের সামরিক অ্যাটাশের সঙ্গে তাঁদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এসব স্বশাসিত সংগঠন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা নয়। অনুদান গ্রহণকারী শহর কর্মকর্তারা বলেছেন, উপহারগুলো আইনসম্মত ছিল। সমালোচকদের সতর্কবার্তা, বিদেশি সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়মিত অনুদান দরজা খুলে দিতে পারে এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করতে পারে, এমনকি ঘুষবিরোধী আইন লঙ্ঘন না হলেও।
প্রভাব বিস্তারের তৎপরতায় পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম কেন জটিল হয়
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, বেইজিংয়ের কৌশলে প্রায়ই যোগাযোগ, আনুকূল্য ও অর্থের বিনিময়ে স্থানীয়দের নিজেদের পক্ষে টানা হয়। এতে বিদেশি এজেন্ট ও সহায়তাকারী বন্ধুর মধ্যকার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়, যা আইন প্রয়োগের কাজ ধীর করতে পারে। ফিলিপাইন এখনো বিদেশি হস্তক্ষেপবিষয়ক আলাদা আইন পাস করেনি। ফলে প্রসিকিউটররা এখনো ১৯৪১ সালের গুপ্তচরবৃত্তি আইন এবং ১৯৩২ সালের সংশোধিত দণ্ডবিধির ওপর নির্ভর করছেন। এসব আইনে আধুনিক তথ্য অভিযান, জনসাধারণের অনুষ্ঠানে গোপন অর্থায়ন বা ক্যাম্পাস ও নাগরিক সংগঠনে প্রভাব বিস্তারের বিষয় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত নেই। বিশ্লেষকদের যুক্তি, একজন তৎপরতাকারী ধরা পড়লে পেছনে আরও অনেকে কাজ করতে পারেন। এ কারণেই প্রচলিত গুপ্তচরবৃত্তির কৌশলের বাইরেও কার্যকর আইনি সরঞ্জাম এখন ম্যানিলার অগ্রাধিকার।
প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে পুরোনো ও নতুন—দুই ধরনের সরঞ্জামের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। বেড়া না পেরিয়েই ঘাঁটি ও বন্দরের ওপর নজর রাখতে সন্দেহভাজনদের সহায়তা করেছে ড্রোন। আইএমএসআই ক্যাচার মূলত ভুয়া মোবাইল টাওয়ার। এটি ফোনকে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত হতে প্রলুব্ধ করে, তারপর পরিচিতি-সংক্রান্ত তথ্য এবং কখনো কখনো বার্তার বিষয়বস্তু সংগ্রহ করতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনী সমুদ্র থেকে চীনা উৎসের চালকবিহীন পানির নিচে চলাচলকারী যানও উদ্ধার করেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, প্রবালপ্রাচীর ও টহল রুট ঘিরে আরও বিস্তৃত সামুদ্রিক নজরদারি কর্মসূচির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ম্যালওয়্যার থেকে সামুদ্রিক সেন্সর
সাইবার অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, ফিলিপাইনের একটি প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘এগস্ট্রিম’ নামে গোপনীয় একটি টুলকিটের হামলার শিকার হয়েছে। এটি কম্পিউটারের মেমোরিতে কাজ করে, উইন্ডোজের বিশ্বাসযোগ্য প্রসেসের মধ্যে নিজের কার্যক্রম আড়াল করে এবং নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়া, কীস্ট্রোক ধারণ ও তথ্য চুরি করতে কয়েক ডজন কমান্ড চালাতে পারে। গবেষকেরা এ অভিযানকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত তৎপরতাকারীদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের বর্ণনায়, এ কৌশলে হার্ড ড্রাইভে ফাইল না রাখায় প্রচলিত অ্যান্টিভাইরাসকে ফাঁকি দেওয়া যায়। গবেষকদের মতে, বিরোধপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলের কাছাকাছি কাজ করা সংস্থাগুলোর ব্যবহৃত ব্যবস্থায় নীরবে প্রবেশ করাই এর লক্ষ্য। এ ধরনের তৎপরতা দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আনতে ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সাইবার সহযোগিতা বাড়িয়েছেন।
আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির মুখে সেকেলে আইন
ম্যানিলার আইনি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল ভিন্ন এক যুগের জন্য। গুপ্তচরবৃত্তি আইনটি ১৯৪১ সালের। সংশোধিত দণ্ডবিধির গুপ্তচরবৃত্তিসংক্রান্ত ধারাগুলো ১৯৩২ সালের। ফিলিপাইনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এদুয়ার্দো আনো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো কংগ্রেসকে আইন সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সরকার আধুনিক পদ্ধতিতে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে পারে এবং শান্তিকালীন অপরাধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তি দিতে পারে। প্রসিকিউটররাও চান, আইনে অহিংস তথ্য অভিযান, সরকারি কর্মকর্তা বা ইউনিটকে লক্ষ্য করে গোপন অর্থায়ন এবং সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও সাইবার সরঞ্জামের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
সংস্কারে যা থাকতে পারে
আইনপ্রণেতা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিদেশি হস্তক্ষেপবিষয়ক আলাদা আইন, ডিজিটাল ও ভৌত পরিসরে গুপ্তচরবৃত্তির আরও স্পষ্ট সংজ্ঞা, ইউনিফর্মধারী বাহিনীকে দেওয়া অনুদানের ওপর কঠোর বিধি এবং বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের জন্য তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাঁরা সাইবার প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন; যেমন সরকারি চুক্তিতে থাকা সরবরাহকারীদের জন্য নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা বাধ্যতামূলকভাবে জানানোর বিধান, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের উন্নত সুরক্ষা এবং অনলাইন নজরদারি ও অর্থের প্রবাহ তদন্তে এনবিআই ও ফিলিপাইনের সশস্ত্র বাহিনীর (এএফপি) জন্য আরও সম্পদ। সংস্থাগুলোর যুক্তি, আইনি সংজ্ঞা হালনাগাদ হলে তৎপরতাকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং বিংশ শতাব্দীর পুরোনো কাঠামোয় খাপ খায় না—এমন মামলাগুলো মোকাবিলায় আদালত আরও দৃঢ় ভিত্তি পাবে।
দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনায় বাড়ছে ঝুঁকি
নিরাপত্তা পরিস্থিতির পটভূমিতে রয়েছে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগর। ২০২৩ সালের শুরু থেকে সেখানে চীনের কোস্টগার্ড ও সামুদ্রিক মিলিশিয়ার জাহাজগুলো ফিলিপাইনের নৌযানে ধাক্কা দিয়েছে এবং উচ্চচাপে পানির কামান ব্যবহার করেছে। ম্যানিলার বক্তব্য, এসব পদক্ষেপ ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক রায় লঙ্ঘন করে। ওই রায়ে চীনের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। ফিলিপাইনের মতে, এ ধারাবাহিকতা দেশটির একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলকে (ইইজেড) হুমকির মুখে ফেলছে। বেইজিং বলছে, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব কার্যকর করছে। এ বিরোধে ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে।
সুবিক বে আবারও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে। আগাম সরঞ্জাম মজুতের জন্য সেখানে গুদাম ভাড়া নিয়েছে মার্কিন মেরিন কোর। মহড়া ও টহলের জন্য ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলো পালাক্রমে বন্দরে আসে। এ কারণেই তদন্তকারীরা বলছেন, মিত্রদের চলাচল নজরে রাখতে চাইলে গ্র্যান্ডে আইল্যান্ড ছিল মূল্যবান পর্যবেক্ষণস্থল। একই সময়ে তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ বেইজিংয়ের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। এটি মনে করিয়ে দেয়, গোপনে তথ্য সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের এ মিশ্র হুমকির মুখে শুধু ফিলিপাইনই নেই।
বেইজিং অস্বীকার করে, ফিলিপাইনের কথিত গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তোলে
চীন সরকার বলেছে, ফিলিপাইনে গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে চীনে তিন ফিলিপিনোকে আটক করা হয়েছে। তাদের দাবি, ফিলিপাইনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ করে সামরিক স্থাপনার ছবি তুলতে পাঠানো হয়েছিল। চীনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, সন্দেহভাজনরা অপরাধ স্বীকার করেছেন। ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা এ ধরনের টেলিভিশনে প্রচারিত স্বীকারোক্তিকে অবিশ্বাস্য এবং সম্ভবত জোর করে আদায় করা বলে বর্ণনা করেছেন। উভয় সরকার যোগাযোগ চালু রাখতে চাইলেও এসব ঘটনা পারস্পরিক সন্দেহ বাড়াচ্ছে এবং পাল্টাপাল্টি আটকের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ম্যানিলায় চীনা দূতাবাস ফিলিপাইনকে চীনা নাগরিকদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। ফিলিপাইনের সংস্থাগুলো বলছে, তারা আইন প্রয়োগ করছে এবং চলমান মামলাগুলোর প্রমাণের মধ্যে রয়েছে গ্রেপ্তারের সময় উদ্ধার করা ছবি, মানচিত্র, ড্রোনের ফুটেজ ও বিশেষায়িত সরঞ্জাম।
উত্তেজনা না বাড়িয়ে ঝুঁকি সামলানো
ফিলিপাইনের চীনা সম্প্রদায় অতিরঞ্জন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও নাগরিক নেতারা বলছেন, জাতিগত পরিচয় বা জাতীয়তার ভিত্তিতে ঢালাও সন্দেহ নয়, বরং সতর্কতার সঙ্গে আইন প্রয়োগের বিষয়টিকে আলাদা রাখতে হবে। কঠোর আইন ও আরও ব্যাপক পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রমের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিক স্বাধীনতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এ ভারসাম্যই ম্যানিলার পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, বন্দর ও বিমানঘাঁটিতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ জোরদার, ঘাঁটিতে ঠিকাদারদের আরও কঠোর যাচাই, জনসম্পৃক্ততা এবং ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারে পুলিশের উন্নত প্রশিক্ষণ—সব মিলিয়েই একটি সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারীরা সরবরাহকারীদের প্রবেশাধিকার ও তথ্য ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করছেন। আইনসম্মত আড়িপাতা ও নেটওয়ার্ক ফরেনসিকের বিষয়ে টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের ব্যবস্থা চায় বিচার বিভাগ ও এনবিআই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এন্ডপয়েন্ট শনাক্তকরণ সরঞ্জাম চালু এবং সাইবার ঘটনা মোকাবিলার মহড়া দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো, প্রকাশ্যে বা আড়ালে কাজ করতে চাওয়া বিদেশি তৎপরতাকারীদের খরচ ও ঝুঁকি বাড়ানো।
মূল বিষয়গুলো
- ফিলিপাইনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, দেশটিতে চীনের গুপ্তচরবৃত্তি, অপতথ্য প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযান দ্রুতগতিতে চলছে।
- জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা কর্নেলিও ভ্যালেন্সিয়া বলেছেন, পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে সামুদ্রিক চাপের সঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারের তৎপরতা প্রায় সমান তালে চলছে।
- গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে কর্তৃপক্ষ ম্যানিলা, পালাওয়ান ও সুবিক বে-তে একাধিক চীনা নাগরিক ও তাঁদের ফিলিপিনো সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে।
- সুবিক বে-র কাছে গ্র্যান্ডে আইল্যান্ডে ছয় চীনা ও এক ফিলিপিনোকে আটক করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, ড্রোন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের নৌযানের ছবি তোলা হয়েছিল।
- অন্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মেট্রো ম্যানিলায় নজরদারি সরঞ্জামযুক্ত একটি গাড়ি এবং পালাওয়ানে কোস্টগার্ড ঘাঁটির কাছে ক্যামেরা বসাতে দেখা সন্দেহভাজনরা।
- তদন্তকারীদের মতে, কয়েকজন সন্দেহভাজন আইএমএসআই ক্যাচার ব্যবহার করেছেন, যা মোবাইল টাওয়ারের অনুকরণ করে ফোনের তথ্য সংগ্রহ করে।
- চীনের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত নাগরিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন চার চীনা সন্দেহভাজন; তাঁরা স্থানীয় সরকার ও পুলিশ বাহিনীকে নগদ অর্থ ও যানবাহন দান করেছেন।
- ফিলিপাইনের গুপ্তচরবৃত্তিসংক্রান্ত আইন ১৯৩২ ও ১৯৪১ সালের। এ কারণে আইন হালনাগাদ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপবিষয়ক আলাদা আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে।
- সাইবার অভিযানও এর অংশ। গবেষকেরা ফিলিপাইনের একটি প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সঙ্গে ‘এগস্ট্রিম’ নামে গোপন টুলকিটের যোগসূত্র দেখেছেন।
- চীন অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দেশটির ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তিন ফিলিপিনোকে আটক করার কথা জানিয়েছে; ম্যানিলা এ দাবি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করছে।
- সুবিক বে-তে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেড়েছে; দুই পক্ষ গোয়েন্দা তথ্য ও সাইবার সমন্বয়ও জোরদার করছে।
- কর্মকর্তারা বলছেন, বৈষম্য এড়িয়ে ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করে প্রতিরক্ষা জোরদার এবং আইন আধুনিক করাই মূল চ্যালেঞ্জ।






