যুগান্তকারী পরীক্ষা, যার আঞ্চলিক তাৎপর্য রয়েছে
সমুদ্রে কার্যকর রেলগান মোতায়েনের পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে জাপান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিগ্রহণ, প্রযুক্তি ও সরবরাহ সংস্থা (এটিএলএ) নিশ্চিত করেছে, জুন থেকে জুলাইয়ের শুরুর দিক পর্যন্ত সমুদ্র পরীক্ষার সময় পরীক্ষামূলক তড়িৎচৌম্বকীয় রেলগান থেকে পরীক্ষামূলক জাহাজ জেএস আসুকায় অবস্থান করে একটি লক্ষ্যবস্তু জাহাজের দিকে গোলা ছোড়েন প্রকৌশলীরা। সংস্থাটি পরীক্ষার চারটি ছবি প্রকাশ করে জানায়, জাহাজে স্থাপিত রেলগান থেকে সত্যিকারের জাহাজে গোলা ছোড়ার ঘটনা এটাই প্রথম। জাপান মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সহায়তায় এ কাজ পরিচালিত হয়। তাদের পরীক্ষামূলক জাহাজ আসুকা নতুন ব্যবস্থার ভাসমান পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করে।
সূচিপত্র
- যুগান্তকারী পরীক্ষা, যার আঞ্চলিক তাৎপর্য রয়েছে
- সমুদ্রে ঠিক কী পরীক্ষা করা হয়েছে?
- রেলগান কীভাবে কাজ করে?
- বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ
- ব্যারেলের স্থায়িত্ব ও উপকরণ
- এ পর্যন্ত জাপান কী অর্জন করেছে?
- যুদ্ধে এই অস্ত্র কী করতে পারে?
- অন্যান্য দেশের প্রচেষ্টার সঙ্গে এ কর্মসূচির তুলনা কেমন?
- জাপানের রেলগানের পরবর্তী ধাপ কী?
- ঝুঁকি, সীমাবদ্ধতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
- একনজরে
রেলগান রাসায়নিক প্রপেল্যান্টের বদলে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ছোট ধাতব গোলাকে ত্বরান্বিত করে। দুটি বিদ্যুৎ পরিবাহী রেল ও একটি চলমান আর্মেচার শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা গোলাকে নলের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত বেশি গতিতে বাইরে ঠেলে দেয়। এ ধারণায় নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় প্রতি গোলায় অনেক কম খরচে দীর্ঘপাল্লার, উচ্চগতির নিক্ষেপের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রেলগানে বিস্ফোরক ওয়ারহেডের প্রয়োজন হয় না। এটি নির্ভর করে কেবল গতিশক্তির ওপর, ফলে সংরক্ষণের ঝুঁকি কমে এবং ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ কোষের তুলনায় জাহাজে বেশি গোলা রাখা সম্ভব হতে পারে।
জুন ও জুলাইয়ের এই পরীক্ষা এমন সময়ে হয়েছে, যখন এ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের বিরুদ্ধে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে জাপান। টোকিওর কর্মকর্তারা স্তরভিত্তিক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেলগান, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ ব্যবস্থা এবং লেজারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটিএলএ জানিয়েছে, সমুদ্র পরীক্ষার আরও কারিগরি তথ্য নভেম্বরে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিবিষয়ক এক সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপন করা হবে। চলতি বাজেট চক্রে ভবিষ্যতের রেলগান নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছে সরকার। লক্ষ্য হলো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ গান ব্যবস্থা তৈরি করা, যা ধারাবাহিকভাবে একাধিক গোলা ছুড়তে, ফায়ার কন্ট্রোল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে এবং উড্ডয়নের সময় গোলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে।
সমুদ্রে ঠিক কী পরীক্ষা করা হয়েছে?
১৯৯৫ সালে কমিশন করা ১৫১ মিটার দীর্ঘ গবেষণা ও উন্নয়ন জাহাজ আসুকার পেছনের ডেকে পরীক্ষামূলক রেলগানটি বসানো হয়েছে। পরীক্ষার ছবিতে দেখা যায়, ছোট আকারের একটি গানহাউস, মাউন্টের কাছে সেন্সরের জন্য দৃশ্যমান একটি সহায়ক মাস্তুল এবং মুখবেগ মাপার রাডার অ্যান্টেনা। উৎক্ষেপণের মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ ও গোলা ছোড়ার পর বিশ্লেষণে সহায়তার জন্য এটিএলএ ব্যারেলের নিচে একটি ক্যামেরাসহ আরও কয়েকটি ক্যামেরা বসিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুটি একটি ছোট ইয়ার্ড টাগে স্থাপন করা হয়েছিল। টাগটি চলমান জলযান হিসেবে চলাচল করছিল, আর ছবিতে লক্ষ্যবস্তু বোর্ডগুলোও দেখা গেছে।
এটিএলএ জানিয়েছে, পরীক্ষায় দূরপাল্লার নিক্ষেপ এবং লক্ষ্যবস্তু জাহাজে গোলা ছোড়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঘটনায় গোলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার দৃশ্য সংস্থাটি প্রকাশ করেনি। গোলা নিক্ষেপের তথ্য, সেন্সরের সংকেত এবং ভিডিও—সবই একটি বৃহত্তর পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে কাজে লাগানো হবে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে স্থলভিত্তিক পরীক্ষার পর এ কর্মসূচি সমুদ্রে গড়ায়। সামুদ্রিক বাহিনীর ফ্লিট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমান্ড এ কাজে সহায়তা করেছে। পরীক্ষার জন্য জাহাজটি ইয়োকোসুকা ছাড়ার আগে বসন্তে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আসুকায় গিয়ে স্থাপনাটি পর্যবেক্ষণ করেন।
রেলগান কীভাবে কাজ করে?
গোলাকে ত্বরান্বিত করতে রেলগান লরেঞ্জ বল ব্যবহার করে। গোলার পেছনে থাকা আর্মেচারের মধ্য দিয়ে এক রেল থেকে অন্য রেলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে চৌম্বক ক্ষেত্র ও বিদ্যুৎ প্রবাহের পারস্পরিক ক্রিয়ায় রেল বরাবর বল সৃষ্টি হয়। বড় ক্যাপাসিটর ব্যাংক বা অন্যান্য পালস-পাওয়ার মডিউলে শক্তি জমা রাখা হয়, তারপর মিলিসেকেন্ডের মধ্যে তা ছেড়ে দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ত্বরণ ও বিদ্যুৎ প্রবাহ অত্যন্ত বেশি, যা নানা প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ
জাহাজে স্থাপনের বিষয়টি নির্ভর করে এমন বিদ্যুতের ওপর, যা ছোট পরিসরে নিরাপদে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা যায়। একটানা গোলা ছুড়তে দ্রুত পুনরায় চার্জ করা এবং তাপ অপসারণও দরকার। তাপ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ বিদ্যুৎ প্রবাহে রেল ও আর্মেচারের সংযোগপথ গরম হয়ে যায়। গুরুতর কর্মক্ষমতা হ্রাস ছাড়াই একাধিকবার গোলা ছোড়া নিশ্চিত করতে প্রকৌশলীদের পাওয়ার ইলেকট্রনিকস, তারের সংযোগ এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থা যথাযথ মাপে নকশা করতে হবে। এ কারণেই পরীক্ষার সরঞ্জাম ও বড় জেনারেটর রাখার জায়গা আছে এমন আসুকাকে প্রাথমিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ছোট যুদ্ধজাহাজে অনেক বেশি কম্প্যাক্ট বিদ্যুৎ সমাধান দরকার হবে।
ব্যারেলের স্থায়িত্ব ও উপকরণ
গ্যাসচালিত কামানের মতো বিস্ফোরণের চাপে রেলগানের ক্ষয় হয় না, তবে বিদ্যুৎ প্রবাহ, তাপ ও ঘর্ষণে রেল এবং সংযোগস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটিএলএ জানিয়েছে, শুরুর দিকের ব্যারেলে তামার রেল ব্যবহার করা হয়েছিল, পরে রেলের উপকরণ বদলানো হয়েছে। স্থিতিশীল মুখবেগ বজায় রেখে ব্যারেলের স্থায়িত্ব ১২০ রাউন্ডে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। এ কাজের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বহনকারী আর্মেচারের উন্নতি, রেলের ওপর প্রলেপ এবং উচ্চগতিতে ঘন বায়ু ভেদ করার সময় স্থিতিশীল থাকে এমন গোলা তৈরি।
এ পর্যন্ত জাপান কী অর্জন করেছে?
২০১৬ সালে তড়িৎচৌম্বকীয় ত্বরণ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নকাজ শুরু করে এটিএলএ। স্থলভিত্তিক পরীক্ষায় ধাপে ধাপে বিভিন্ন মাইলফলক অর্জিত হয় এবং ২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রথমবার জাহাজ থেকে গোলা ছোড়া হয়। এ বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত ছবিতে সমুদ্র পরীক্ষা শুরুর আগে আসুকায় সম্পূর্ণ স্থাপিত কামানটি দেখা যায়। বর্তমান পরীক্ষামূলক কামানের ব্যারেল প্রায় ছয় মিটার লম্বা, আর এর বোরের ব্যাস প্রায় ৪০ মিলিমিটার। আগের পরীক্ষায় দলটি মুখবেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৪০০ মিটারের বেশি বলে জানিয়েছিল। উচ্চতায় এই গতি প্রায় ম্যাক ৭-এর কাছাকাছি, যদিও সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রকৃত উড্ডয়ন গতি বায়ুর ঘনত্ব ও গোলার আকৃতির ওপর নির্ভর করে।
আগের প্রদর্শনীতে পাঁচ মেগাজুল শক্তির নিক্ষেপ দেখিয়েছে এটিএলএ। ভবিষ্যৎ সংস্করণের জন্য সঞ্চিত শক্তি ২০ মেগাজুলের দিকে বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। কর্মসূচিটি একক নিক্ষেপের পরীক্ষা থেকে ধারাবাহিক গোলা ছোড়ার দিকে এগোচ্ছে। এ পর্যায়ে পুনরায় চার্জ, তাপ জমা হওয়া এবং স্থিতিশীলতা প্রধান প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। সমুদ্রে আসুকার মাউন্টের পাশে একটি বিশেষ ফায়ার কন্ট্রোল কনসোল ছিল, যা কামানকে জাহাজের সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং মাপা মুখবেগ ও গোলা ছাড়ার কোণের মতো নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে। সাম্প্রতিক ঘোষণার সঙ্গে প্রকাশিত ছবিতে এটি দেখা যায়।
নির্মাণ ও পরীক্ষার কর্মসূচিতে জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত রয়েছে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজে জাপান স্টিল ওয়ার্কসের মতো প্রতিষ্ঠান যুক্ত, আর নকশা ও পরীক্ষার নেতৃত্ব দিচ্ছে এটিএলএ। তথ্য ও পদ্ধতি বিনিময়ের জন্য ফ্রেঞ্চ-জার্মান রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব সেইন্ট লুইয়ের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টিও কর্মসূচিতে খতিয়ে দেখা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য এমন একটি পূর্ণাঙ্গ গান ব্যবস্থা তৈরি করা, যা বাস্তব প্ল্যাটফর্মে উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যাবে।
যুদ্ধে এই অস্ত্র কী করতে পারে?
পরিণত রেলগান দিয়ে নানা ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হতে পারে। সমুদ্রে জাহাজের নাবিকেরা ছোট নৌকা ও দূরনিয়ন্ত্রিত জলযানে গোলা ছুড়তে পারবেন, যেগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা ব্যয়বহুল। উপযুক্ত গোলা ব্যবহার করলে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এমন টুকরো নিক্ষেপ করা সম্ভব। উচ্চগতিতে ও বেশি উচ্চতায় উড়ে আসা ব্যালিস্টিক বা হাইপারসনিক হুমকির বিরুদ্ধে স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে রেলগান সম্ভবত ক্ষেপণাস্ত্র ও সেন্সরের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবে। এর সুবিধা হলো বিপুল সংখ্যায় গোলা ছোড়ার সক্ষমতা। একটি জাহাজে শত শত গতিশক্তিনির্ভর গোলা রাখা এবং অল্প সময়ে অনেকবার নিক্ষেপ করা সম্ভব হতে পারে, যা দলবদ্ধভাবে আসা হুমকি মোকাবিলায় কাজে লাগবে।
এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে গোলাবারুদের মজুত ও খরচ। আধুনিক যুদ্ধজাহাজে নির্দিষ্টসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র কোষ থাকে এবং সমুদ্রে থাকাকালে সেগুলো পুনরায় ভর্তি করা যায় না। কম খরচের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে উচ্চমূল্যের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে প্রতিবারই একটি জাহাজকে লাখ লাখ ডলার খরচ করতে হয় এবং এমন একটি কোষ হারাতে হয়, যা দীর্ঘ টহলের সময় সহজে প্রতিস্থাপন করা যায় না। রেলগানের গোলা ছোট, সংরক্ষণ সহজ এবং প্রতিবার নিক্ষেপে অনেক সস্তা। দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন এবং লোহিত সাগরে দেখা যাওয়া বারবার হামলার মতো পরিস্থিতিতে এ কারণে রেলগান আকর্ষণীয়, যেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে জাহাজগুলো বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
স্থলভাগে রেলগান দিয়ে পাল্টা কামান হামলা, উপকূলীয় গোলন্দাজ হামলা বা প্রচলিত নলযুক্ত কামানের পাল্লার বাইরের স্থির লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হতে পারে। দ্রুত ধেয়ে আসা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়াতে চূড়ান্ত পর্যায়ে একাধিক টাংস্টেনের উপ-গোলা ছড়িয়ে দিতে পারে, এমন গোলা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। মধ্যপথে গতিপথ সংশোধনের জন্য সাধারণ জিপিএস রিসিভারের মতো দিকনির্দেশনা সহায়ক ব্যবস্থাও নকশাকারীরা পরীক্ষা করছেন। তবে উৎক্ষেপণের সময় অত্যন্ত বেশি ত্বরণ সহ্য করতে পারে এমন গোলায় ইলেকট্রনিকস যুক্ত করা সহজ কাজ নয়।
অন্যান্য দেশের প্রচেষ্টার সঙ্গে এ কর্মসূচির তুলনা কেমন?
কার্যকর ব্যবস্থা মোতায়েন না করেই শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী রেলগান কর্মসূচি স্থগিত করে। রেলের ক্ষয়, প্রচণ্ড তাপ, বিদ্যুতের চাহিদা এবং উৎক্ষেপণ সহ্য করেও নির্ভুলভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া যায় এমন গোলা তৈরির অসুবিধা ছিল প্রধান বাধা। চীন নদীতে চলাচলকারী বার্জে বড় রেলগানের পরীক্ষামূলক সংস্করণ পরীক্ষা করেছে এবং দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে অগ্রগতির দাবি করেছে, যদিও কার্যকর নৌব্যবস্থার কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক এবং ইউরোপের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জাহাজে স্থাপিত রেলগানের বাস্তব সমুদ্র পরীক্ষায় জাপান এগিয়ে রয়েছে। নৌবহরের সহায়তায় পরিচালিত পরীক্ষায় লক্ষ্যবস্তু জাহাজের দিকে গোলা ছুড়ে এটিএলএ পরীক্ষাগারের প্রদর্শনী থেকে এমন সামুদ্রিক পরিস্থিতিতে এগিয়েছে, যা বাস্তব অভিযানের অনেক কাছাকাছি। বিপুল বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা এবং নির্ভুল ট্র্যাকিং ও গোলা নিক্ষেপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সেন্সর সমন্বয়ের সুবিধাসম্পন্ন নতুন বড় যুদ্ধজাহাজসহ আরও বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এ কাজকে এগিয়ে নিচ্ছে দেশটি।
জাপানের রেলগানের পরবর্তী ধাপ কী?
এটিএলএ জানিয়েছে, জুন ও জুলাইয়ের নিক্ষেপ পরীক্ষার আরও তথ্য নভেম্বরে একটি কারিগরি সিম্পোজিয়ামে প্রকাশ করা হবে। কর্মকর্তারা এরই মধ্যে ২০২৬ অর্থবছর পর্যন্ত চলা একটি গবেষণা কর্মসূচির রূপরেখা দিয়েছেন, যার লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গ গান ব্যবস্থা তৈরি করা। ২০২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আকাশপথের হুমকি ঠেকাতে পারে এমন ভবিষ্যতের রেলগান নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। পরবর্তী পরিকল্পনায় নতুন কোনো বাজেট খাত না থাকার কারণ সম্ভবত একাধিক বছরের বরাদ্দে চলমান কাজের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকা।
নিকট ভবিষ্যতের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে গোলার উড্ডয়ন স্থিতিশীলতা বাড়ানো, বহুবার গোলা ছোড়ার পরও মুখবেগ বজায় রাখতে রেল ও সংযোগস্থলকে আরও মজবুত করা এবং ফায়ার কন্ট্রোল ব্যবস্থা উন্নত করা। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ছোট করাও দলের কাজের অন্যতম লক্ষ্য, কারণ ডেস্ট্রয়ার এবং ভবিষ্যতে বড় আকারের এজিস-সজ্জিত জাহাজে স্থাপনের জন্য কম্প্যাক্ট জেনারেটর ও শক্তি সঞ্চয় মডিউল অপরিহার্য। আসুকায় জাহাজে স্থাপন, নিরাপত্তা যাচাই ও কৌশল উন্নয়নের কাজ চলার পাশাপাশি স্থলভিত্তিক পরীক্ষাকেন্দ্রে উন্নয়নাধীন গোলা ছোড়া অব্যাহত থাকবে।
অগ্রগতি পরিকল্পনামতো চললে পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক শক্তিসম্পন্ন বড় জাহাজে প্রথম উৎপাদন-উপযোগী ব্যবস্থা দেখা যেতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো উপকূলীয় প্রতিরক্ষা অভিযানে ব্যবহারের জন্য স্থলভিত্তিক ব্যাটারি। যে পথই নেওয়া হোক, দ্রুতগতিতে নির্দিষ্ট দিক বরাবর অনেকগুলো নির্ভুল গোলা ছোড়ার সক্ষমতা জাপানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নতুন একটি স্তর যোগ করবে।
ঝুঁকি, সীমাবদ্ধতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
পাল্লা ও প্রাণঘাতী সক্ষমতার দাবি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সমুদ্রে প্রমাণ করতে হবে, যেগুলো কৌশল পরিবর্তন করে এবং দলবদ্ধভাবে এগিয়ে আসে। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বা ব্যালিস্টিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে নির্ভরযোগ্য ট্র্যাকিং, উড্ডয়ন সময়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব এবং উৎক্ষেপণ সহ্য করে সঠিক সময়ে দিক পরিবর্তন ও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এমন গোলা দরকার। তাপ, গোলার চারপাশে প্লাজমা তৈরি হওয়া এবং বায়ুমণ্ডলীয় বাধা বিষয়টিকে জটিল করে তোলে। সাম্প্রতিক ছবিতে মুখবেগ মাপার রাডার ও উচ্চগতির ক্যামেরা দিয়ে তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেখা গেছে, তবে কঠিন পরিস্থিতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা এখনো কর্মসূচিটিকে প্রমাণ করতে হবে।
একটানা গোলা ছোড়া কেবল বিদ্যুতের সমস্যা নয়। ধাক্কা ও তাপ রেলগুলোর যান্ত্রিক সারিবদ্ধতা এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ বদলে দিতে পারে। সামান্য পরিবর্তনেও মুখবেগ কমে যেতে পারে বা গোলার স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। উচ্চ বিদ্যুৎ প্রবাহের নিক্ষেপে যেন অন্য সংবেদনশীল ব্যবস্থা ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে জাহাজে তড়িৎচৌম্বকীয় সামঞ্জস্যও বজায় রাখতে হবে। নাবিকসহ জাহাজে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাও বিবেচ্য বিষয়। এসব প্রকৌশলগত সমস্যার সমাধান সম্ভব, তবে এতে সময় ও ধারাবাহিক পরীক্ষা লাগবে।
ব্যয় ও শিল্পভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রেলগানে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে সস্তা গোলা ব্যবহার করা যায়, তবে এতে সরবরাহব্যবস্থার প্রয়োজন শেষ হয় না। নৌবহরকে এখনো বিপুলসংখ্যক গোলা তৈরি, পরীক্ষা, পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হবে। বিরল উপাদানের ওপর নির্ভর না করে বড় পরিমাণে উৎপাদন করা যায় এমন উপকরণ নির্মাতাদের খুঁজে বের করতে হবে। গোলা অপচয় এড়াতে এবং জটিল পরিস্থিতিতে কামান কী করতে পারে সে বিষয়ে অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি না দিতে রেলগান ও ক্ষেপণাস্ত্র কখন ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রশিক্ষণ, রণকৌশল এবং বিধিবিধানও উন্নত করতে হবে।
একনজরে
- জুন থেকে জুলাইয়ের শুরুর দিক পর্যন্ত সমুদ্র পরীক্ষায় এটিএলএ জেএস আসুকা থেকে পরীক্ষামূলক রেলগান ছুড়ে একটি লক্ষ্যবস্তু জাহাজে আঘাত হানে
- সংস্থাটি জানিয়েছে, জাহাজে স্থাপিত রেলগান থেকে সত্যিকারের জাহাজে গোলা ছোড়ার ঘটনা এটাই প্রথম
- ছবিতে ছোট আকারের টারেট, মুখবেগ মাপার রাডার এবং তথ্য সংগ্রহের ক্যামেরা দেখা গেছে
- লক্ষ্যবস্তু বোর্ড লাগানো চলমান ইয়ার্ড টাগে লক্ষ্যবস্তু স্থাপন করা হয়েছিল
- প্রাথমিক পরীক্ষায় মুখবেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৪০০ মিটারের বেশি ছিল
- এটিএলএ পাঁচ মেগাজুল শক্তির নিক্ষেপ দেখিয়েছে এবং তা বাড়িয়ে ২০ মেগাজুলের কাছাকাছি নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে
- কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিক গোলা নিক্ষেপ, ব্যারেলের স্থায়িত্ব ১২০ রাউন্ডে নেওয়া এবং বিশেষ ফায়ার কন্ট্রোল ব্যবস্থা তৈরি
- জাপান ২০২৪ অর্থবছরে ভবিষ্যতের রেলগান গবেষণায় আনুমানিক ১৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে
- নভেম্বরে প্রযুক্তিবিষয়ক সিম্পোজিয়ামে আরও কারিগরি তথ্য প্রকাশের কথা রয়েছে
- যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে রেলগান কর্মসূচি বন্ধ করলেও জাপান সক্রিয়ভাবে সমুদ্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে
- সম্ভাব্য অভিযানের মধ্যে রয়েছে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ, জলপৃষ্ঠের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং উপকূলীয় গোলন্দাজ ভূমিকা






