কাঠমান্ডুর অস্থিরতার ঢেউ ভারতের সীমান্তেও আছড়ে পড়ছে
কাঠমান্ডুতে কয়েক দিনের সংঘর্ষে সরকার পতনের পর নেপাল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে গভীর সংকটে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার পর শুরু হওয়া বিক্ষোভে ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। বিক্ষোভকারীরা এই পদক্ষেপকে ভিন্নমত দমনের ভোঁতা হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। জনতা সংসদ ভবন চত্বরে হামলা চালিয়ে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। কারফিউ এখনো জারি রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে পুলিশের সহায়তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এই দৃশ্য ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা মনে করিয়ে দেয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নেপালের সংকট ভারতের দীর্ঘ ও উন্মুক্ত সীমান্তের ঠিক পাশে।
সূচিপত্র
- কাঠমান্ডুর অস্থিরতার ঢেউ ভারতের সীমান্তেও আছড়ে পড়ছে
- সংকটের সূত্রপাত কীভাবে এবং কারা এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে
- গভীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো এক বিস্ফোরণবিন্দু
- নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া
- ভারতের কাছে নেপাল কেন গুরুত্বপূর্ণ
- নিরাপত্তা নির্ধারণে ভূগোলের ভূমিকা
- ঝুঁকিতে বাণিজ্যের প্রাণরেখা
- জলবিদ্যুৎ এক বিরল আশার দিক
- চীন ইস্যু ও প্রভাব বিস্তারে তৎপর বহিঃশক্তি
- প্রতিক্রিয়া না উসকে বন্ধুত্বের ভারসাম্য
- ভারত-নেপাল সম্পর্কের অতীত সংকট থেকে শিক্ষা
- সীমান্তের মানচিত্র ও রাজনৈতিক প্রতীক
- কাঠমান্ডুতে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি
- পক্ষ না নিয়ে ভারত যা করতে পারে
- মূল বিষয়গুলো
নয়াদিল্লির জন্য ঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বেশি। পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে নেপালের ১,৭৫০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে; দুই দেশের মানুষের মধ্যে গভীর যোগাযোগ, বিস্তৃত বাণিজ্য ও ধর্মীয় বন্ধন রয়েছে। সীমান্তের দুই পাশের দৈনন্দিন জীবনে এই সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। ১৯৫০ সালের একটি চুক্তির আওতায় নেপালিরা কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই ভারতে কাজ করতে পারেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নেপালের প্রায় ৩২ হাজার গুর্খা সেনা সদস্য রয়েছেন। নেপালের লাখ লাখ নাগরিক ভারতে বসবাস বা কাজ করেন; প্রবাসী নেপালিদের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ বলে ধারণা করা হয়। জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ ও যন্ত্রপাতিসহ নানা পণ্যের জন্য কাঠমান্ডু ভারতের আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রতি বছর হাজার হাজার ভারতীয় তীর্থযাত্রী নেপালের পবিত্র স্থানগুলোও পরিদর্শন করেন।
সংকট বাড়তে থাকায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয় নয়াদিল্লি। তরুণদের প্রাণহানিতে শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শান্ত থাকার আহ্বান জানান। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় তিনি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। নেপালে থাকা ভারতীয় নাগরিকদেরও সতর্ক থাকতে এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে ভারতীয় কর্মকর্তারা। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এত দ্রুত ঘুরে যাবে বলে দিল্লি ভাবেনি, বিশেষ করে অলি কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। এই প্রতিবেশী দেশে অস্থিরতা ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থান—সবকিছুকে একসঙ্গে প্রভাবিত করে।
সংকটের সূত্রপাত কীভাবে এবং কারা এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে
সরকারের ২০টির বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ বন্ধের সিদ্ধান্তই ছিল তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ। এগুলোর মধ্যে ছিল ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব ও এক্স। কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন নিয়ম মানছিল না। ক্ষোভে রাস্তায় নামেন তরুণ নেপালিরা। তারা সরকারের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার অভিযোগ তোলেন। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং অলি পদত্যাগ করেন। তবু দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কাজের অভাব ও ব্যাপক অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ বিক্ষোভকে উসকে দিতে থাকায় আন্দোলন চলতে থাকে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক বলে তুলে ধরেছে। অলি চীন সফর শেষে সদ্য ফিরেছিলেন এবং তাঁর ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। এই ধারাবাহিকতা নেপালের পররাষ্ট্রনীতির ঝোঁক নিয়ে বিতর্ক নতুন করে উসকে দেয়। ভাষ্যকাররা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পগুলো ঘিরে টানাপোড়েনের কথাও উল্লেখ করেন, পাশাপাশি মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টিও উঠে আসে। তবে বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে ভূরাজনীতির অতিরিক্ত ব্যাখ্যা না করতে সতর্ক করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, এই প্রতিবাদ মূলত তরুণ নাগরিকদের নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের বহিঃপ্রকাশ। সরকার বদলের চক্র আর সুযোগের অভাবে হতাশ তরুণেরাই এর চালিকাশক্তি।
গভীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো এক বিস্ফোরণবিন্দু
বিক্ষোভকারীরা নানা ধরনের দাবি তুলেছেন। কেউ কেউ সংসদ ভেঙে দিয়ে এক বছরের মধ্যে নতুন নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্বাচন, মেয়াদের সীমা নির্ধারণ এবং সংসদের মেয়াদ কমানোর দাবি জানিয়েছেন। কাঠমান্ডুর স্পষ্টভাষী মেয়র বালেন্দ্র বালেন শাহের উত্থান—তিনি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পরিচিতি গড়েছেন—জনমতের প্রজন্মগত পরিবর্তনকে তুলে ধরে। তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকায় নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নামও এসেছে। তবে এসব ধারণা এখনো অনুমাননির্ভর এবং নেপালের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে বিতর্কিত।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে দুই তরুণ নেপালি বিক্ষোভকারীদের অনেকের মনোভাব তুলে ধরেছেন। ভারতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা করা নেপালি শিক্ষার্থী অচ্যুত পৌডেল বলেন, এই আন্দোলনের উৎস অভিজাতদের ষড়যন্ত্র নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের হতাশা।
২০১৫ সালের সংবিধানের মাধ্যমে ব্যবস্থা হয়তো বদলেছে, কিন্তু তরুণদের পরিস্থিতি একই রয়ে গেছে। বেকারত্ব, মেধাপাচার, দুর্নীতি ও দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার মতো সমস্যা নেপালকে এখনো ভোগাচ্ছে। অলির পদত্যাগ কেবল ওপর ওপর পরিবর্তন; গভীর সংকট রয়েই গেছে।
আরেক শিক্ষার্থী প্রাঞ্জলি স্বর বর্ণনা করেন, ডিজিটাল যুগে মর্যাদা ও মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে এই প্রতিবাদ এক লড়াই।
আমি নিজেও জেন জি প্রজন্মের। আমার কাছে এই আন্দোলন দুর্নীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের বিরুদ্ধে লড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে কণ্ঠরোধের সরকারি চেষ্টা আমাদের আরও দৃঢ় করেছে। লক্ষ্য হলো স্বজনপ্রীতিমুক্ত, পরিচ্ছন্ন একটি নতুন সরকার।
নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া
সতর্কতাকেই মূলনীতি হিসেবে নিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। নেপালে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের ঘরে থাকতে এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জনতার চলাচল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারে সম্ভাব্য বিঘ্ন—উন্মুক্ত সীমান্তে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিগুলো খতিয়ে দেখছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। দিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলেও জরুরি বাণিজ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, অথচ হস্তক্ষেপের ধারণা তৈরি না হয়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ভারসাম্যটি সূক্ষ্ম, কারণ নয়াদিল্লি পক্ষ নিচ্ছে বলে মনে হলে দেশটিতে ভারতবিরোধী মনোভাব দ্রুত জোরালো হতে পারে।
ভারতের জননীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দ্য তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের অমিত কুমার বলেন, সরকার পুরোনো ভুল এড়াতে চায়, তবে আহ্বান জানানো হলে সহায়তার প্রস্তুতিও রাখছে।
সহিংসতা নিয়ে ভারত সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শান্তির আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু কোনো পক্ষ নেয়নি। অতীত অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনায় নিয়ে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় হস্তক্ষেপ করছে বলে প্রতীয়মান হতে চায় না নয়াদিল্লি।
সরাসরি জড়িয়ে পড়া রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভারত হস্তক্ষেপ করলে ভারতবিরোধী মনোভাব খুব দ্রুত বাড়তে পারে। তাই সরকারের সংযত অবস্থানই সঠিক পন্থা। অনুরোধ জানানো হলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ভারতের সহায়তা দেওয়া উচিত, তবে কেবল তখনই।
ভারতের কাছে নেপাল কেন গুরুত্বপূর্ণ
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-নেপাল সম্পর্কের গভীরতা ব্যতিক্রমী। উন্মুক্ত সীমান্তে কাজ, পড়াশোনা, বাণিজ্য ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে অবাধে চলাচল করা যায়। প্রায় ৩৫ লাখ নেপালি ভারতে বসবাস বা কাজ করেন; একই সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে নেপালের বাজার ও সেবার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি ধর্মীয় পর্যটনও দুই সমাজকে যুক্ত করে রেখেছে। এই বন্ধুত্বের কঠিন নিরাপত্তাগত দিকও রয়েছে। হিমালয় থেকে নেমে আসা পথগুলোর মাঝখানে নেপালের অবস্থান; এই পথগুলো ভারতের অর্থনীতি ও জনসংখ্যার কেন্দ্রস্থল ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে গিয়ে মিশেছে। দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলায় হঠাৎ জনস্রোত তৈরি হতে পারে, কিংবা সীমান্তের কাছে শত্রুভাবাপন্ন নেটওয়ার্কগুলো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে—এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।
নিরাপত্তা নির্ধারণে ভূগোলের ভূমিকা
দিল্লির কৌশলবিদেরা নেপালের বিপরীতে চীনের অবস্থানের দিকেও নজর রাখেন। ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত দেখভাল করা চীনের ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড উঁচু পাহাড়ের ওপারে অবস্থিত। নেপালের সঙ্গে চীনের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর হলে, কিংবা পরিবহন অবকাঠামোতে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এলে, ভারত তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখবে। নেপালের সংকট যেন দেশটির রাজনীতি বা নিরাপত্তায় অনাহূত তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা নেওয়ার পথ না হয়ে ওঠে, তা চায় ভারত। এ ঝুঁকির কারণেই ভারতীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে জোরালো অবস্থান না নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
ঝুঁকিতে বাণিজ্যের প্রাণরেখা
দুই দেশের জন্য বাণিজ্যই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। গত অর্থবছরে ভারত নেপালে প্রায় ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং সেখান থেকে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। জ্বালানি, যানবাহন, যন্ত্রপাতি, ওষুধ, সার ও খাদ্যশস্য উত্তর দিকে যায়। নেপালের ভারতমুখী রপ্তানির মধ্যে রয়েছে পরিশোধিত ভোজ্যতেল, কার্পেট, এলাচ, পলিয়েস্টার সুতা এবং ক্রমবর্ধমান পরিমাণ বিদ্যুৎ। এসব পণ্যের বেশির ভাগই সড়কপথে যায়। অস্থিরতা বা ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারের পথ আটকে যেতে পারে, শুল্ক কার্যক্রম ধীর হতে পারে; এর দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে সরবরাহব্যবস্থা ও দামে।
বাণিজ্যের সিংহভাগ পণ্য কয়েকটি পরিবহন করিডর দিয়ে যায়। রক্সৌল-বীরগঞ্জ পথটি সবচেয়ে ব্যস্ত। সুনৌলি-ভৈরহাওয়া, জোগবনি-বিরাটনগর এবং নেপালগঞ্জ-রুপাইডিহাও গুরুত্বপূর্ণ। রেল ও আকাশপথের যোগাযোগ থাকলেও এগুলো দিয়ে পণ্য যায় সামান্যই। নেপালের বাণিজ্যের জন্য কলকাতা বন্দরই বিশ্বের সঙ্গে প্রধান সংযোগপথ। নেপালের ভেতরে পণ্য বিতরণ বন্ধ থাকলে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকলেই দোকান ও হাসপাতালে পণ্য পৌঁছানো নিশ্চিত হয় না। পচনশীল পণ্য এবং ওষুধের চালান নিয়ে ভারতের রপ্তানিকারকেরা উদ্বিগ্ন; এসব পণ্য দীর্ঘ সময় গুদামে রাখা যায় না। কারফিউ ও সড়ক বন্ধ অব্যাহত থাকলে ক্ষতি বাড়বে বলে সতর্ক করেছে নেপালের পণ্য পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলো।
জলবিদ্যুৎ এক বিরল আশার দিক
কঠিন বছরের মধ্যেও একটি খাতে অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে। বহু বছরের ক্রয়চুক্তির আওতায় বর্ষা মৌসুমে ভারতে উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ বিক্রি বাড়িয়েছে নেপাল। এই আয় নেপালের আমদানি ব্যয় সামলাতে সহায়তা করে, আর চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে ভারত পায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। ভারত থেকে কেনা পেট্রোলিয়াম পণ্যের তুলনায় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের পরিমাণ এখনো সামান্য। তবে এই বাণিজ্য বাড়ছে এবং নতুন সঞ্চালন লাইন ও নিয়ন্ত্রক বিধি স্পষ্ট হলে তা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, নিয়মিত অর্থায়ন এবং কার্যকর আন্তসীমান্ত যোগাযোগব্যবস্থা।
চীন ইস্যু ও প্রভাব বিস্তারে তৎপর বহিঃশক্তি
ভারত ও চীনের মাঝখানে নেপালের অবস্থানের কারণে দেশটির প্রতিটি রাজনৈতিক ধাক্কা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট পায়। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হয়েছে কাঠমান্ডু, যদিও পরিকল্পিত কিছু প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর। মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অলি চীন থেকে ফেরার পর এবং তাঁর পরিকল্পিত ভারত সফরের আগে অস্থিরতা শুরু হওয়ায় বাইরের প্রভাব নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। নেপাল নিয়ে কাজ করা গবেষক ও কূটনীতিকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাইরের শক্তিগুলো সুবিধা খুঁজতে নজর রাখলেও বিক্ষোভের শিকড় দেশের ভেতরের হতাশায়। বিদেশি পক্ষগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সীমা যাচাই করবে। তবে মূল চালিকাশক্তি রয়েছে নেপালের নিজস্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থায়।
প্রতিক্রিয়া না উসকে বন্ধুত্বের ভারসাম্য
কাঠমান্ডুতে প্রভাব বিস্তার করতে চায় ভারত ও চীন—দুই দেশই। নেপালে জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে পারে এমন প্রকাশ্য অবস্থান নিতে সতর্ক ভারতীয় নেতারা। চীনা কর্মকর্তারা স্থিতিশীলতার আশা প্রকাশ করেছেন। পরে তারা আরও বড় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যেমনটি অঞ্চলটির অন্য অংশে করেছেন। নেপালের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকা, অথচ বিজয়ী বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে না হওয়া—এটাই দিল্লির চ্যালেঞ্জ। সার্কের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতার মঞ্চগুলো মূলত নিষ্ক্রিয় থাকায় বাণিজ্য, জ্বালানি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রায়ই নীরবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে কাজ করতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে।
ভারত-নেপাল সম্পর্কের অতীত সংকট থেকে শিক্ষা
২০১৫-২০১৬ সালের সীমান্ত অবরোধের স্মৃতি নেপালে এখনো তাজা। ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর মাধেশের সমতল এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। একই সময়ে সীমান্ত পারাপারের পথগুলোয় বাধা তৈরি হওয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি, ওষুধ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে পড়ে নেপাল। দেশটির নেতারা অবরোধে ভারতের মদদ ছিল বলে অভিযোগ করেন। ভারত বলেছিল, নেপালের ভেতরের অসন্তোষ, বিশেষ করে মাধেশি সম্প্রদায়ের অসন্তোষই ছিল মূল কারণ; সরবরাহ আটকে দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করে তারা। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও এর মানবিক মূল্য এবং রাজনৈতিক ক্ষত বাস্তব। ভৌগোলিক কারণে নেপালের অর্থনীতির কেন্দ্রে ভারত থাকলেও, বাণিজ্য ও পরিবহনের আরও বৈচিত্র্য আনার পক্ষে যুক্তি দিতে অনেক নেপালি নাগরিক এখনো ওই ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
সীমান্তের মানচিত্র ও রাজনৈতিক প্রতীক
ভূখণ্ডের দাবি জনমনে উত্তেজনা বাড়ায়। ২০১৯ ও ২০২০ সালে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র ও বক্তব্যে কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরার মতো এলাকা নিয়ে বিরোধ আবার মাথাচাড়া দেয়। আলোচনা করে এসব মতবিরোধ সামাল দেওয়া হলেও তা জনমতকে প্রভাবিত করে। বাণিজ্য, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা চুক্তির ছোট পদক্ষেপও বড় প্রতীকী গুরুত্ব পেতে পারে। কাঠমান্ডুর রাস্তায় উত্তেজনা তুঙ্গে থাকলে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হয় বলে স্বীকার করেন ভারতীয় কর্মকর্তারা।
কাঠমান্ডুতে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি
অলির বিদায়ের পর কঠিন এক সময়ের মুখে নেপাল। বর্তমান সংসদের ভেতর থেকেই সরকার গঠনের পথ দেখিয়েছে সংবিধান। দলগুলো দ্রুত স্থায়ী জোট গড়তে না পারলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাও হতে পারে। তরুণ নেপালিদের বড় অংশের প্রতিনিধিত্বকারী বিক্ষোভের নেতারা নির্বাচনী নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনসহ আরও গভীর সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন। সেনাবাহিনী কঠোর কারফিউয়ের মধ্যে সরকারি ভবনগুলো সুরক্ষিত রাখছে, আর রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। স্বল্প সময়ের জন্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে পারেন—এমন নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে জল্পনা চলছে। মেয়র বালেন শাহের মতো নাগরিক প্রতিনিধির উত্থান জনমতের প্রতিফলন হতে পারে, তবে দলীয় কাঠামো ও সংবিধানের মধ্যে চলার নতুন প্রশ্নও তুলবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় রাজতন্ত্রপন্থীদের কণ্ঠ জোরালো হয়েছে, কিন্তু বর্তমান অস্থিরতা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন—এমন ইঙ্গিত খুব কম।
পক্ষ না নিয়ে ভারত যা করতে পারে
যোগাযোগ বজায় রাখা, কিন্তু সীমা না ছাড়ানো—এমন কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপের কথা বলেছেন ভারতীয় কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা। প্রথমত, কারফিউ চলাকালেও ওষুধ, জ্বালানি ও খাদ্য চলাচল নিশ্চিত করতে কনস্যুলার যোগাযোগ ও সীমান্ত সমন্বয় জোরদার রাখা। দ্বিতীয়ত, ফলাফল নির্ধারণের চেষ্টা না করে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে নেপালের সব বড় দলের সঙ্গে বিদ্যমান যোগাযোগের পথ ব্যবহার করা। তৃতীয়ত, প্রকৃত চাহিদা পূরণে নেপালি তরুণদের জন্য আরও বৃত্তি, ভারতে চাকরির সঙ্গে সম্পর্কিত স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ গড়ে তোলে এমন ফেলোশিপের ব্যবস্থা করা। চতুর্থত, অতিরিক্ত সঞ্চালন সক্ষমতা এবং সমন্বিত চেকপোস্টে দ্রুত কাজের মতো তাৎক্ষণিক সুফল দিতে পারে এমন বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও যোগাযোগ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা। সবশেষে, নেপাল অনুরোধ জানালে মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকা—কাঠমান্ডুর শর্তে সহায়তার নীতি মেনে।
মূল বিষয়গুলো
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার সূত্রে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এর জেরে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন এবং দেশজুড়ে কারফিউ জারি হয়।
- ভারত শান্তির আহ্বান জানায়, জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। তবে হস্তক্ষেপ বলে মনে হতে পারে, এমন কোনো প্রকাশ্য পদক্ষেপ এড়িয়ে চলে।
- ভারত ও নেপালের মধ্যে ১,৭৫০ কিলোমিটার উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। ভারতে নেপালি প্রবাসীর সংখ্যা ৩৫ লাখ। দুই দেশের মধ্যে সামরিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক সম্পর্কও বিস্তৃত।
- দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। জ্বালানি, খাদ্য ও যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে এগিয়ে ভারত। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারের পথগুলোর মধ্যে রয়েছে রক্সৌল-বীরগঞ্জ, সুনৌলি-ভৈরহাওয়া, জোগবনি-বিরাটনগর এবং নেপালগঞ্জ-রুপাইডিহা।
- নেপালে পরিবহনব্যবস্থায় জট তৈরি হলে পচনশীল পণ্য ও ওষুধের সরবরাহ দ্রুত ব্যাহত হতে পারে; নেপালমুখী পণ্য পরিবহনের জন্য কলকাতা বন্দর খোলা থাকলেও।
- ভারতে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়ছে এবং তা আয়ের উৎস জোগাচ্ছে, তবে পেট্রোলিয়াম আমদানির তুলনায় এর পরিমাণ এখনো কম।
- চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ভূরাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিক্ষোভের মূল চালিকাশক্তি দেশের ভেতরের হতাশা।
- ২০১৫-২০১৬ সালের সীমান্ত অবরোধ এবং সাম্প্রতিক মানচিত্র-বিতর্কের স্মৃতি জনমনে থাকায় বক্তব্য ও অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে দিল্লি বিশেষ সতর্ক।
- সম্ভাব্য পরিণতির মধ্যে রয়েছে সংসদ থেকে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আগাম নির্বাচন বা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। এদিকে নেতারা আলোচনার সময় সেনাবাহিনী কারফিউ কার্যকর করছে।
- বিশ্লেষকদের পরামর্শ, ভারত সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুক, জরুরি বাণিজ্য সুরক্ষিত করুক, তরুণদের লক্ষ্য করে বিনিময় কর্মসূচিতে সহায়তা করুক এবং নেপাল অনুরোধ জানালে পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকুক।






