বেইজিংয়ের সামরিক কুচকাওয়াজ এবং সেমিকন্ডাক্টরে নীরব পরিবর্তন
বেইজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজের জমকালো আয়োজন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সাঁজোয়া যানবাহনের দিকে সবার দৃষ্টি টানতে পারে। তবে এ বছর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি কুচকাওয়াজের মাঠে ছিল না। ছিল চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্সের একটি প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, চীন গ্যালিয়াম নাইট্রাইড সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিকে পরিণত পর্যায়ে নিয়ে গেছে এবং সামরিক ব্যবস্থায় তা এমন গতিতে ব্যবহার করছে, যার সঙ্গে পাল্লা দিতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিবেদনে চীনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে শিরোনাম কেড়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং প্রতিযোগীদের আটকে রেখে দেশের ভেতরে চীনা কর্মসূচিগুলোকে সম্প্রসারিত করার ধীরগতির চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সূচিপত্র
- বেইজিংয়ের সামরিক কুচকাওয়াজ এবং সেমিকন্ডাক্টরে নীরব পরিবর্তন
- গ্যালিয়াম নাইট্রাইড কেন রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রে পরিবর্তন আনে
- সিলিকন থেকে গ্যালিয়াম নাইট্রাইড
- লাইসেন্স থেকে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা
- সামরিক ইলেকট্রনিকসে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান
- ওয়াশিংটন ও মিত্রদের অভিযোজনের চেষ্টা
- সরবরাহ শৃঙ্খলের তথ্য আসলে কী দেখায়
- বেইজিং ও ওয়াশিংটনের বার্তা
- মূল বিষয়গুলো
গ্যালিয়াম নাইট্রাইড, সংক্ষেপে GaN, নতুন প্রজন্মের সামরিক ইলেকট্রনিকসের মূল উপাদান। GaN ডিভাইস তৈরিতে ব্যবহৃত প্রাথমিক গ্যালিয়ামের প্রায় সবটাই চীন উৎপাদন করে। দেশটি গ্যালিয়াম ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত মৌল জার্মেনিয়ামের রপ্তানি নিয়মও কঠোর করেছে। বিশ্লেষকেরা এর প্রভাবকে নীরব নিষেধাজ্ঞা বলে বর্ণনা করছেন। কারণ এতে নির্দিষ্ট মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু তাদের জন্য জরুরি উপকরণ পাওয়া সীমিত হয়েছে। চীনা গবেষকদের মতে, এর ফলে ফেজড-অ্যারে রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জামে নতুন প্রজন্মগত ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
সদ্য প্রকাশিত মূল্যায়নে ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স দেখিয়েছে, উপকরণ নীতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
ইনস্টিটিউটটি লিখেছে, সাম্প্রতিক অগ্রগতির পেছনে সেমিকন্ডাক্টর উন্নয়নের একটি অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে। তারা আরও বলেছে, চীনের GaN-ভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই পরিণত প্রযুক্তি সরাসরি আরও দূরপাল্লার রাডার, আরও শক্তিশালী জ্যামার, আরও ছোট আকারের গাইডেন্স সিকার এবং যুদ্ধব্যবস্থায় উন্নত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় রূপ নিতে পারে। এটি প্রভাব খাটানোর হাতিয়ারও হয়ে ওঠে। কোনো উপকরণের প্রধান সরবরাহকারী যখন সরবরাহের প্রবাহে লাগাম টানে, তখন ওই উপকরণের ওপর নির্ভরশীল কর্মসূচির গতি কমে যায় বা ব্যয় বেড়ে যায়।
গ্যালিয়াম নাইট্রাইড কেন রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রে পরিবর্তন আনে
GaN হলো ওয়াইড-ব্যান্ডগ্যাপ সেমিকন্ডাক্টর নামে পরিচিত এক শ্রেণির উপাদান। প্রচলিত সিলিকনের তুলনায় GaN বেশি ভোল্টেজ ও তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে, প্রতি একক ক্ষেত্রফলে অনেক বেশি বিদ্যুৎ সামলাতে পারে এবং দ্রুত সুইচ করতে পারে। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাম্প্লিফায়ার ও পাওয়ার ইলেকট্রনিকসের জন্য আদর্শ। রাডারে GaN প্রতিটি ট্রান্সমিট ও রিসিভ মডিউলকে অতিরিক্ত গরম না হয়ে আরও শক্তিশালী সংকেত পাঠাতে এবং পরে দ্রুত ক্ষীণ প্রতিফলিত সংকেত শুনতে সাহায্য করে। গাইডেন্স সিকারে এটি ছোট নোজ কনের ভেতরে জায়গা করে নিয়েও জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যক্ষমতা বজায় রাখে।
সিলিকন থেকে গ্যালিয়াম নাইট্রাইড
কয়েক দশক ধরে অনেক সামরিক রাডার গ্যালিয়াম আর্সেনাইড বা উচ্চমানের সিলিকন ডিভাইসের ওপর নির্ভর করেছে। এই উপকরণগুলো নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে, কিন্তু GaN সেই সক্ষমতাকে আরও বাড়ায়। প্রকৌশলীরা একই জায়গায় আরও বেশি উপাদানসহ অ্যারে তৈরি করে সেগুলোকে আরও উচ্চ ক্ষমতায় চালাতে পারেন। এতে শনাক্তকরণের পাল্লা বাড়ে, হস্তক্ষেপ প্রতিরোধের ক্ষমতা উন্নত হয় এবং একসঙ্গে একাধিক মোডে কাজ করা যায়। জাহাজ ও বিমানের বিদ্যুৎ রূপান্তরেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেশি দক্ষতায় তাপ ও ওজন কমে, আর যুদ্ধযানের ক্ষেত্রে দুটোই অত্যন্ত মূল্যবান।
মার্কিন বাহিনীর কাছে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য GaN-ভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নৌবাহিনীর AN/SPY 6 এবং মেরিন কর্পসের AN/TPS 80 G/ATOR। চীনা গবেষক ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, চীন আকাশে আগাম সতর্কতাদানকারী বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি এবং যুদ্ধবিমানের রাডারে ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে GaN ব্যবহার করছে। এ দাবি সঠিক হলে তা শুধু ডিভাইস নকশায় অগ্রগতির ইঙ্গিত নয়, এসব ডিভাইস তৈরিতে প্রয়োজনীয় গ্যালিয়ামের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ারও ইঙ্গিত দেয়।
লাইসেন্স থেকে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা
বেইজিংয়ের প্রথম পদক্ষেপ আসে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। সে সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের রপ্তানিতে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করে। আনুষ্ঠানিকভাবে এর কারণ ছিল জাতীয় নিরাপত্তা। এর আগে চীনে যাওয়া উন্নত চিপ ও চিপ তৈরির সরঞ্জামে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম ও অ্যান্টিমনির রপ্তানি নিষিদ্ধ করে এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর যাচাই আরও কঠোর করে। এই খনিজগুলো সেমিকন্ডাক্টর, ইনফ্রারেড সেন্সর, ফাইবার অপটিকস, সৌরকোষ, ব্যাটারি ও গোলাবারুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্য ও দামের তথ্য থেকে এর প্রভাব দেখা যায়। ২০২৩ সালের নিয়ম চালুর পর চীনের গ্যালিয়াম সরবরাহ কমে যায়। সরবরাহ নিশ্চিত করতে ক্রেতারা হুড়োহুড়ি করায় এক বছরে ইউরোপে এর দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়। জার্মেনিয়ামের সরবরাহও সীমিত হয়ে পড়ে। অ্যান্টিমনির দাম লাফিয়ে বাড়ে। একই সময়ে চীন প্রাথমিক গ্যালিয়ামের প্রধান সরবরাহকারীই থেকে যায়। তৃতীয় দেশের মাধ্যমে কিনলেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্রেতারা চীনা কাঁচামালের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বাস্তবে সরবরাহ রাতারাতি বন্ধ হয়নি। ২০২৪ সালের বাণিজ্য তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জার্মেনিয়াম ও গ্যালিয়াম আমদানিতে চীনা উৎসের উপকরণ ছিল, যা সম্ভবত তৃতীয় দেশের মাধ্যমে এসেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, জার্মেনিয়ামের পুনঃরপ্তানির বড় কেন্দ্র বেলজিয়াম। কানাডা ও জার্মানির মতো জায়গায় গৌণ গ্যালিয়াম উৎপাদন বেড়েছে, আর জাপান ধাক্কা সামলাতে পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের ওপর নির্ভর করেছে। চিত্রটি পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে কড়াকড়ি বাড়ার। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলজুড়ে ব্যয় বাড়ছে এবং সরবরাহ পেতে সময় লাগছে বেশি।
সামরিক ইলেকট্রনিকসে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান
চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রতিবেদনটি, যা চীনা গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে, বলছে উপকরণের ওপর এই প্রভাব পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) বিভিন্ন বাহিনীতে GaN-ভিত্তিক রাডার, সিকার ও জ্যামার দ্রুত যুক্ত করতে সাহায্য করেছে। প্রতিবেদনে KJ 500A-এর মতো আকাশে আগাম সতর্কতাদানকারী প্ল্যাটফর্মের ফেজড-অ্যারে রাডার এবং J 20 কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত উন্নত রাডারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রে GaN সিকার এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এর বিস্তৃত ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য সীমিত। তবে চীনের শিল্পভিত্তির কথা বিবেচনায় নিলে GaN-এর ব্যাপকতর ব্যবহারের প্রবণতাটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
GaN যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিচিত নয়। AN/SPY 6 পরিবারটি ডেস্ট্রয়ারগুলোর নতুন রাডার স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দু। মেরিনদের G/ATOR অভিযাত্রী ইউনিটে GaN-এর সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীর কর্মসূচিগুলো ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় GaN ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। চীনা সূত্রের মতে, পার্থক্য হলো সব বাহিনীতে এটি মোতায়েনের গতি এবং গ্যালিয়াম সংকটের কারণে তৈরি হওয়া ব্যয়ের চাপ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি গবেষণায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিকসে গ্যালিয়ামের ব্যাপক ব্যবহার তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নত মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গ্যালিয়াম যৌগ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। উদাহরণ হিসেবে নৌবাহিনীর AN/SPY 6 রাডার ও মেরিন কর্পসের AN/TPS 80 G/ATOR রাডারের কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, উন্নত মাইক্রোইলেকট্রনিকসে এসব উপকরণের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই এ উপকরণের ওপর নির্ভরশীল নয়। অনেক মিত্র দেশের ব্যবস্থাতেও একই ধরনের চাহিদা রয়েছে। চীন যদি দেশের ভেতরে GaN কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত গ্যালিয়াম নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে, তবে মোতায়েনের গতির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। প্রজন্মগত ব্যবধানের দাবির মূল কথা এটাই। এখানে একটি ব্যতিক্রমী ডিভাইসের চেয়ে প্রতি বছর কতগুলো অ্যারে, সিকার ও পাওয়ার মডিউল বাহিনীর হাতে পৌঁছায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াশিংটন ও মিত্রদের অভিযোজনের চেষ্টা
মার্কিন কর্মকর্তারা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নেতারা সমান্তরালভাবে একাধিক পথে এগোচ্ছেন। একটি পথ হলো খনি, পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে চীনের বাইরে গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের আরও উৎস নিশ্চিত করা। অন্যটি হলো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে GaN-এর সমান বা তার চেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে, এমন পরবর্তী প্রজন্মের উপকরণে বিনিয়োগ করে নির্ভরতা কমানো।
উপকরণ নিয়ে কাজের অংশ হিসেবে পেন্টাগন ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সির একটি উদ্যোগের মাধ্যমে রেথিয়নকে উচ্চ ক্ষমতা ও উচ্চ কম্পাঙ্কের ইলেকট্রনিকসের জন্য কৃত্রিম হীরা ও অ্যালুমিনিয়াম নাইট্রাইডের ডিভাইস তৈরি করতে নিযুক্ত করেছে। এসব উপকরণের ব্যান্ডগ্যাপ GaN-এর চেয়ে বেশি। উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ সামাল দিয়ে বড় ওয়েফারে উৎপাদন বাড়ানো গেলে এগুলো আরও উচ্চ কার্যক্ষমতা দিতে পারে।
রেথিয়নের অ্যাডভান্সড টেকনোলজির প্রধান কলিন হুইলান বলেন, এই কাজ সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তিনি আরও বলেন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অনুরূপ উপকরণ নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলটি ভবিষ্যতের সেন্সর ও যোগাযোগব্যবস্থায় হীরা ও অ্যালুমিনিয়াম নাইট্রাইড ব্যবহারের পথ তৈরি করছে।
মিত্ররাও এগিয়ে আসছে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কোয়াড এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্কের মতো জোটে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সমন্বয় করছে। চীনা নিয়ন্ত্রণমুক্ত বিদেশি খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়তে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অর্থায়ন-ব্যবস্থা চালু করেছে। পরিশোধন, পুনর্ব্যবহার এবং জিঙ্ক প্রক্রিয়াজাতকরণ-সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক উৎপাদনের মাধ্যমে জাপানের গ্যালিয়াম পাওয়ার একাধিক পথ রয়েছে, যা দেশটিকে তুলনামূলকভাবে ধাক্কা সামলাতে সক্ষম করে। জার্মানি প্রাথমিক গ্যালিয়াম উৎপাদন আবার শুরু করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছে। কানাডাসহ অন্য দেশগুলোও গৌণ উৎপাদন বাড়িয়েছে।
তবু শুরুটা কঠিন। CSIS-এর সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রাথমিক গ্যালিয়াম সরবরাহের বিপুল অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদকদের প্রয়োজন এমন নির্দিষ্ট নিষ্কাশন প্রযুক্তির রপ্তানিও চীন সীমিত করেছে। এর মানে শুধু বাজারদর বাড়লেই দ্রুত নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গলনাগারে পুনর্ব্যবহার ও পুনরুদ্ধার বাড়ানোর সময় ব্যবধান পূরণে মজুত গড়া, যৌথ ক্রয় ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের বিষয়টি ওয়াশিংটন ও অংশীদার দেশগুলোর নীতিনির্ধারকেরা বিবেচনা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেছে। তাদের হিসাব বলছে, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলে গ্যালিয়ামের দাম তীব্রভাবে বাড়তে পারে এবং জার্মেনিয়াম নিষেধাজ্ঞার প্রভাবসহ যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গ্যালিয়ামের কোনো মজুত নেই। চীন যদি লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পুনঃরপ্তানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বিকল্প উৎস উৎপাদন বাড়ানো পর্যন্ত সরবরাহে বিঘ্ন আরও গুরুতর হতে পারে।
সরবরাহ শৃঙ্খলের তথ্য আসলে কী দেখায়
২০২৪ সাল পর্যন্ত বাণিজ্য তথ্য থেকে একটি সূক্ষ্ম চিত্র পাওয়া যায়। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, লাইসেন্স ব্যবস্থা চালুর পর যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যায়। লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার পর সরাসরি চালান শূন্যে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যেও চীনা উৎসের পণ্য আমদানির হিসাব রয়েছে। জার্মেনিয়ামের ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের মতো দেশের মাধ্যমে পুনঃরপ্তানি এবং গ্যালিয়ামের ক্ষেত্রে জার্মানি ও কানাডার মতো জায়গায় চীনা কাঁচামাল থেকে গৌণ উৎপাদন ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ ব্যবধানের সবচেয়ে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। জার্মানি বহু বছর ধরে প্রাথমিক গ্যালিয়াম উৎপাদন করেনি, তবু যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে সেখান থেকে। এটিও পুনঃরপ্তানির ইঙ্গিত দেয়।
দামের ওঠানামা সরবরাহে কড়াকড়ির বিষয়টি নিশ্চিত করে। ইউরোপের ক্রেতারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণের এক বছরের মধ্যে গ্যালিয়ামের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জার্মেনিয়ামের সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথা জানায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পদক্ষেপের পর অ্যান্টিমনির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এসব পরিবর্তনে রাডার মডিউল, ইনফ্রারেড সেন্সর ও নির্ভুল উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। সরবরাহ দলগুলো উপকরণ সংগ্রহে হিমশিম খাওয়ায় প্রকল্পের কাজও পিছিয়ে যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, পুনঃরপ্তানি এবং নিষ্কাশনের রেজিন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কিটের মতো আনুষঙ্গিক পণ্যের ওপর চীন কতটা কঠোরভাবে নিয়ম কার্যকর করে। দ্বিতীয়ত, মিত্র উৎপাদকেরা কত দ্রুত শোধনাগারকে উপযোগী করে, গলনাগারে পুনরুদ্ধারের নতুন লাইন চালু করে এবং পুনর্ব্যবহার বাড়াতে পারে। কাগজে-কলমে প্রকল্প রয়েছে এবং কিছু কাজ শুরুও হয়েছে, কিন্তু এগুলো চালু হতে একাধিক বাজেট চক্র পেরিয়ে যায়। এসব কেন্দ্র চালু না হওয়া পর্যন্ত চীনের লাইসেন্স ব্যবস্থায় সামান্য পরিবর্তনেও দাম ও সময়সূচি বদলে যেতে পারে।
বেইজিং ও ওয়াশিংটনের বার্তা
বেইজিং রাষ্ট্রনীতি পরিচালনার হাতিয়ার হিসেবে বাণিজ্য নিয়ম ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিক করে তুলেছে। দেশটি আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার কাঠামো চালু করেছে, কৌশলগত খনিজ খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা দাবি করেছে এবং নির্দিষ্ট বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির রপ্তানি সীমিত করেছে। এর আগে নেওয়া অনানুষ্ঠানিক পদক্ষেপগুলোর পর এসব উদ্যোগ এসেছে। যেসব ক্ষেত্রে চীনের সুবিধা আছে, সেখানে বৈশ্বিক সরবরাহকে প্রভাবিত করতে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ব্যবহারের ইচ্ছারও ইঙ্গিত দেয় এগুলো।
উন্নত চিপ ও সরঞ্জামে চীনের প্রবেশাধিকার আরও কঠোরভাবে সীমিত করে, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও প্রতিষ্ঠান যুক্ত করে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বহুমুখী করার উদ্যোগ নিয়ে ওয়াশিংটন পাল্টা জবাব দিয়েছে। মিত্ররা খনিজ সরবরাহে বিঘ্নের আগাম সতর্কতা নেটওয়ার্ক গড়েছে এবং সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহ সচল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার পরিকল্পনাগুলো সমন্বিত করেছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিবিদেরা বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে এসবের গুরুত্ব অনেক। আধুনিক যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী রাডার, যোগাযোগব্যবস্থা ও পাওয়ার ইলেকট্রনিকসের কেন্দ্রে রয়েছে GaN ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ।
র্যান্ডের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ড. ফ্যাবিয়ান ভিল্লালোবোস সহজ করে বলেছেন: এগুলো অত্যাবশ্যক।
এই বক্তব্য দুই পক্ষের তাড়াহুড়োর কারণ বুঝতে সাহায্য করে। চীন উপকরণে আধিপত্যকে বাস্তবে মোতায়েন করা ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারেরা সরবরাহের উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি এমন ডিভাইস দিয়ে প্ল্যাটফর্ম উন্নত করতে চাইছে, যেগুলো কম বিদ্যুৎ খরচ করে, তাপ সহ্য করে এবং নিখুঁতভাবে রেডিও তরঙ্গ পরিচালনা করে। প্রতিযোগিতার মাপকাঠি একটি ঘোষণার চেয়ে সরবরাহের সময়সূচি, ইউনিটের সংখ্যা এবং পুরোনো মডিউলের বদলে রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীরা কত ঘন ঘন GaN যন্ত্রাংশ বসাচ্ছেন, তার ওপর বেশি নির্ভর করছে।
মূল বিষয়গুলো
- চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের GaN প্রযুক্তি পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বিভিন্ন সামরিক প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত হচ্ছে।
- ২০২৩ সালে লাইসেন্সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ থেকে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রগামী গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম ও অ্যান্টিমনির রপ্তানি নিষেধাজ্ঞায় গেছে বেইজিং।
- প্রাথমিক গ্যালিয়াম সরবরাহে চীনের আধিপত্য রয়েছে। জার্মেনিয়াম উৎপাদনও কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত, ফলে দাম বেড়েছে এবং ক্রেতাদের সরবরাহ পেতে বেশি সময় লাগছে।
- AN/SPY 6 ও G/ATOR-এর মতো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে GaN ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে চীনা সূত্রের দাবি, পিএলএর বিভিন্ন বাহিনীতে এটি আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে মোতায়েন হচ্ছে।
- বাণিজ্য তথ্য বলছে, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পুনঃরপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। এতে তাৎক্ষণিক ধাক্কা কিছুটা কমলেও ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
- গ্যালিয়ামের ওপর নির্ভরতা কমাতে DARPA হীরা ও অ্যালুমিনিয়াম নাইট্রাইডের ডিভাইস তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে রেথিয়নকে। অন্যদিকে মিত্ররা চীনের বাইরে সরবরাহের উৎসে বিনিয়োগ করছে।
- USGS-এর হিসাবে, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে। দেশটির গ্যালিয়ামের কোনো মজুত নেই।
- পরবর্তী পর্যায় নির্ভর করবে পুনঃরপ্তানির বিরুদ্ধে চীনের প্রয়োগমূলক ব্যবস্থার কঠোরতা এবং পরিশোধন, পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার বাড়াতে মিত্রদের প্রকল্প কত দ্রুত এগোয় তার ওপর।






