উদয়পুরে চমকে দেওয়া রায়
রাজস্থানের উদয়পুরের একটি জেলা আদালত গায়ের রং কালো বলে স্ত্রীকে বারবার অপমান করার পর জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার দায়ে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এ ঘটনা গায়ের রং নিয়ে বৈষম্য—যেখানে ফর্সা ত্বককে প্রাধান্য দেওয়া হয়—এবং পারিবারিক সহিংসতার নৃশংস বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিচারক রাহুল চৌধুরী হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, এটি মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ মানদণ্ড পূরণ করে। এখন দণ্ডাদেশটি অনুমোদনের জন্য রাজস্থান হাইকোর্টে পাঠানো হবে। দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল করার অধিকার রাখেন।
সূচিপত্র
নিহত নারীকে লক্ষ্মী নামে শনাক্ত করা হয়েছে (আদালতের কিছু নথিতে নামটি লক্ষ্মী—Laxmi—লেখা হয়েছে)। ২০১৬ সালে তাঁর বিয়ে হয়। মৃত্যুর আগে তিনি কর্তৃপক্ষকে জানান, তাঁর স্বামী কিশানদাস নামে পরিচিত এবং কিশানলাল নামেও উল্লেখিত, বিয়ের পর থেকেই তাঁর গায়ের রং নিয়ে ঠাট্টা করতেন এবং প্রায়ই কালো গায়ের রং বোঝায়—এমন অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করতেন। পুলিশ, চিকিৎসক ও একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিপিবদ্ধ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ২৪ জুন রাতে স্বামী বাদামি রঙের তরলভর্তি একটি বোতল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তাঁর দাবি ছিল, তরলটি ব্যবহার করলে লক্ষ্মীর গায়ের রং ফর্সা হবে। তিনি তা লক্ষ্মীর গায়ে লাগান। লক্ষ্মী তীব্র অ্যাসিডের মতো গন্ধের কথা বললে তিনি ধূপকাঠি জ্বালিয়ে লক্ষ্মীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় আরও তরল ঢেলে দেন। স্বামীর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান, সেখানে আঘাতের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রধান কৌঁসুলি দীনেশ পালিওয়াল রায়টিকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রমাণে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের কটূক্তি ও নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতা চরম সহিংসতায় গিয়ে শেষ হয়েছে। আদালত লক্ষ্মীর একাধিক জবানবন্দিকে নির্ভরযোগ্য মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিচারক বাধ্যতামূলক পর্যালোচনার জন্য দণ্ডাদেশটি হাইকোর্টে পাঠিয়েছেন। প্রতিরক্ষা দলের আপিল করার জন্য ৩০ দিন সময় রয়েছে। প্রতিরক্ষা আইনজীবী সুরেন্দ্র কুমার মেনারিয়া জোর দিয়ে বলেছেন, মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত এবং তাঁর মক্কেলকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
আদালতে রায় ঘোষণা করার সময় জেলা বিচারক রাহুল চৌধুরী নথিতে বর্ণিত নৃশংসতা নিয়ে বিস্ময় ও ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটানো ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, নিষ্ঠুরতা এবং আস্থার বিশ্বাসঘাতকতা ভারতীয় আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি রাখে।
আদালতের অভিমত, হৃদয়বিদারক এই নৃশংস অপরাধ শুধু লক্ষ্মীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও অপরাধ। এটি সুস্থ ও সভ্য সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়।
সরকারি কৌঁসুলি দীনেশ পালিওয়াল বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে চরম সহিংসতার ক্ষেত্রে জবাবদিহির বার্তা বহন করছে এই রায়। তিনি নিহত নারীর অল্প বয়স এবং তাঁর পরিবার ও সমাজের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন।
বিশের কোঠার শুরুর দিকের এক তরুণীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা যদি আমাদের মেয়েদের রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আর কে পারবে?
প্রতিরক্ষা আইনজীবী সুরেন্দ্র কুমার মেনারিয়া সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আপিল করবেন। তাঁর দাবি, বিচারিক আদালত ভুল করেছে।
মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত ছিল এবং আমার মক্কেলকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটে
আদালতের নথি ও রায়ে ২০১৭ সালের হত্যাকাণ্ডের দিকে গড়ানো ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ রয়েছে। ২০১৬ সালে লক্ষ্মী ও কিশানদাসের বিয়ে হয়। লক্ষ্মী জানান, বিয়ের পর স্বামী তাঁর চেহারা নিয়ে ঠাট্টা করতেন, গায়ের রং নিয়ে অবমাননাকর নামে ডাকতেন এবং গায়ের রং ফর্সা করার জন্য চাপ দিতেন। ২০১৭ সালের ২৪ জুন তিনি বাদামি তরলভর্তি একটি প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তিনি লক্ষ্মীকে বলেন, এতে তাঁর গায়ের রং ভালো হবে এবং তরলটি তাঁর শরীরে লাগান। অ্যাসিডের মতো গন্ধ বলে লক্ষ্মী আপত্তি জানালে তিনি ধূপকাঠি জ্বালিয়ে লক্ষ্মীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন, এরপর তিনি পুড়তে থাকলে আরও তরল ঢেলে দেন। তিনি পালিয়ে যান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্মীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিগুলো ভারতে ‘মৃত্যুকালীন জবানবন্দি’ নামে পরিচিত। এগুলো পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করেন। এসব জবানবন্দির ক্রম ও সেগুলোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যের কথা রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় আইনে এ ধরনের জবানবন্দি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য, কারণ জবানবন্দিদাতা বিচার চলাকালে সাক্ষ্য দিতে পারেন না। জবানবন্দি স্বেচ্ছায় ও সুসংগতভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মেলে কি না—আদালত সাধারণত তা বিবেচনা করে। এ মামলায় বিচারক বলেছেন, জবানবন্দিগুলো বিশ্বাসযোগ্য এবং চিকিৎসা-প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আদালতকক্ষে
উদয়পুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালত আট বছর ধরে সংগৃহীত সাক্ষ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ সমর্থনে ১৪ জন সাক্ষী ও ৩৬টি নথি উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানায় রাষ্ট্রপক্ষ। কৌঁসুলিদের যুক্তি, অভিযুক্ত গায়ের রং নিয়ে লক্ষ্মীকে হয়রানি করতেন, ফর্সা করার অজুহাতে ভুয়া প্রতিকারের ব্যবস্থা করেন এবং তাঁকে হত্যার জন্য ক্ষয়কারী পদার্থ ও আগুন ব্যবহার করেন। প্রতিরক্ষা পক্ষ হত্যার উদ্দেশ্যের কথা অস্বীকার করে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করে। আদালত সেই দাবি নাকচ করেন।
ভারতে মৃত্যুদণ্ড শুধু ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ মামলার জন্য সংরক্ষিত। ১৯৮০-এর দশক থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে এই মানদণ্ড গড়ে উঠেছে। বিচারকদের অপরাধকে গুরুতর করে তোলে এমন পরিস্থিতির বিপরীতে প্রশমিতকারী কারণগুলো বিবেচনা করতে হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ধারণ করতে হয়। উদয়পুরের আদালতের সিদ্ধান্ত, হামলার সময়ের নিষ্ঠুরতা, দাম্পত্য জীবনের আস্থার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং গায়ের রং নিয়ে পক্ষপাত থেকে উদ্ভূত উদ্দেশ্য—সব মিলিয়ে অপরাধটিকে নৃশংসতার দিক থেকে অসাধারণ করে তুলেছে।
ভারতে বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন। দণ্ডিত ব্যক্তি হাইকোর্টে এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে রায় চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার পরও দণ্ডিত ব্যক্তি রাজ্যপাল ও ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। আপিলে অনেক মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন বা পরবর্তী পর্যালোচনায় কমিয়ে দেওয়া হয়। তাই আগামী কয়েক মাস এই দণ্ডের পরিণতির জন্য নির্ধারক হবে।
ভারতে গায়ের রং নিয়ে বৈষম্য
এই ঘটনা গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের প্রতি নতুন করে মনোযোগ এনেছে। একই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ফর্সা গায়ের রংকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অপেক্ষাকৃত কালো গায়ের রংকে প্রান্তিক করে রাখাই এই পক্ষপাতের বৈশিষ্ট্য। ভারতে দৈনন্দিন কথাবার্তা, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, বিয়ের বাজার ও বিজ্ঞাপনে এর প্রকাশ দেখা যায়। বিয়ের বিজ্ঞাপনে প্রায়ই কনের গায়ের রং উল্লেখ করা হয়। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে দীর্ঘদিন ধরে ফর্সা নারীদের প্রধান চরিত্রে নেওয়া হয়েছে এবং কালো গায়ের রংকে ঘিরে গৎবাঁধা ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম এখনো বড় বাজার। কর্মীরা বহু বছর ধরে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। ফর্সা গায়ের রং মানেই সাফল্য—এমন সরাসরি দাবি এড়াতে কিছু ব্র্যান্ড পণ্যের নাম ও প্রচারণার ভাষা বদলেছে। তবে প্রকাশ্যে ও সূক্ষ্মভাবে এই পক্ষপাত এখনো টিকে আছে।
গবেষকেরা এই প্রবণতার পেছনে ঔপনিবেশিক ইতিহাস, জাতিভিত্তিক মর্যাদা এবং শ্রেণিগত সুবিধার মিশ্র প্রভাবের কথা বলেন। ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস সাদা বা ফর্সা গায়ের রঙের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক বিশেষাধিকারকে আরও জোরদার করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার পুরোনো সামাজিক স্তরবিন্যাসেও ফর্সা গায়ের রংকে প্রায়ই উচ্চ মর্যাদার গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করা হতো। এর ফলে তৈরি হয়েছে বহুস্তরীয় উত্তরাধিকার, যা এখনো সৌন্দর্যের আদর্শ, আত্মমর্যাদাবোধ এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে প্রভাবিত করে। সমালোচকেরা বলেন, ফর্সাকারী পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের মূল্য বহু হাজার কোটি ডলার, অনিরাপত্তাবোধকে কাজে লাগিয়ে আগ্রাসী বিপণন করা হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত উপাদানে তৈরি পণ্য স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করে।
গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের মানসিক মূল্যও রয়েছে। মানুষ হয়রানি, বর্জন এবং চেহারা বদলানোর চাপের কথা জানান। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মডেল ও সাবেক মিস পুদুচেরি সান রেচাল গান্ধীর আত্মহত্যায় মৃত্যু—যিনি প্রকাশ্যে গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন—এর ক্ষতিকর প্রভাবের দিকে জাতীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিজের কাজে তিনি কালো গায়ের রঙের সৌন্দর্য উদ্যাপন করেছেন এবং গায়ের রং নিয়ে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাঁর ঘটনা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনা শুরু হয়: দীর্ঘদিনের পক্ষপাত কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ ও অনলাইন হয়রানির সঙ্গে মিলে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গবেষণায় কী বলা হয়েছে
ভারতে গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যবিষয়ক একাডেমিক গবেষণা বাড়ছে, যদিও প্রেক্ষাপটভেদে ফলাফল ভিন্ন। বেঙ্গালুরুর একটি বিজনেস স্কুলের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে করা এক পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা হয়, সিভি একই হলে গায়ের রং নিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে কি না। গবেষকেরা ওই মূল্যায়নে ফর্সা গায়ের রঙের পক্ষে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রবণতা পাননি। এই ফল অভিজাত পরিসরে কালো গায়ের রং সব সময় চাকরির সম্ভাবনা কমায়—এমন প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, কিছু পরিবেশে শ্রেণি ও জাতিভিত্তিক অবস্থান গায়ের রঙের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে; আর বিয়ের বাজার, গণমাধ্যমে উপস্থাপন বা দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগে গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের প্রভাব আরও প্রবল হতে পারে। গবেষণাটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের ওয়েবসাইটে একটি উন্মুক্ত গবেষণা-সংগ্রহশালার মাধ্যমে পাওয়া যায় এবং প্রমাণ সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এটি কার্যকর সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। পাঠকেরা এই লিংকে গবেষণাটি দেখতে পারেন।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও আইন
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, লক্ষ্মীর মতো ঘটনা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও সামাজিক পক্ষপাতের সংযোগস্থলে রয়েছে। ভারতে জরিপগুলোতে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে সহিংসতার উল্লেখযোগ্য মাত্রা ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। অ্যাসিড হামলা, গুরুতর আঘাত ও হত্যার মতো অপরাধের বিচার করতে ভারতীয় আইনে একাধিক বিধান রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগে সমতা নেই এবং অভিযোগ তুলে নিতে ভুক্তভোগীরা চাপের মুখে পড়তে পারেন। জনরোষের পর প্রায়ই কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে। তবে মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে আদালত এখনো কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করেন।
এ মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধবিষয়ক বিচারকের ভাষা নৃশংসতার নৈতিক নিন্দা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে এই শব্দবন্ধের একটি নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। তবে ভারতীয় বিচারিক আদালত কখনো কখনো কোনো কাজের বিরুদ্ধে সামষ্টিক ক্ষোভ এবং মৌলিক মূল্যবোধে আঘাতের অনুভূতি তুলে ধরতে শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন। উদয়পুরের আদালত দণ্ডাদেশের সঙ্গে ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ মানদণ্ডের যোগসূত্র টেনেছে। আদালতের বক্তব্য, একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে এবং নিহত নারীর শেষ জবানবন্দিতে বর্ণিত নিষ্ঠুরতার স্বীকৃতি দিতে কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।
ভারতের বিচারে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি কেন গুরুত্বপূর্ণ
মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হলো এমন কোনো ব্যক্তির দেওয়া বক্তব্য, যিনি মনে করেন তাঁর মৃত্যু আসন্ন। ভারতীয় সাক্ষ্য আইনে এটি বিচার চলাকালে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে, যদিও এটি পরোক্ষ সাক্ষ্য। বিচারকেরা বক্তব্যটি স্বেচ্ছায় ও সুসংগতভাবে দেওয়া হয়েছে কি না এবং যোগ্য কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখেন। পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী ও একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেওয়া লক্ষ্মীর একাধিক জবানবন্দি তাঁর বর্ণনাকে আদালতের কাছে আরও ওজনদার করেছে। এসব বক্তব্যের সঙ্গে চিকিৎসা-পরীক্ষার ফলের সামঞ্জস্যও আদালত বিবেচনা করেছে।
প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
কঠোর শাস্তি সহিংসতা ঠেকায় কি না এবং গায়ের রং নিয়ে বৈষম্য প্রতিদিনের সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে—এই রায়ের পর তা নিয়ে জাতীয় আলোচনা শুরু হয়েছে। রায়ের সমর্থকদের যুক্তি, এতে নিহত নারীর সাক্ষ্যকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং পক্ষপাত থেকে উদ্ভূত নিষ্ঠুরতার জন্য কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে—এমন জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, শাস্তির মেয়াদের মতো ধারাবাহিকভাবে মামলার বিচার করাও গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুদণ্ডের সমালোচকেরা সতর্ক করে বলেন, মৃত্যুদণ্ড অপরিবর্তনীয় এবং আইনি ব্যবস্থাকে ভুলের ঝুঁকি থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তাঁদের মতে, প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং ক্ষতিকর সৌন্দর্য-আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করে জনসচেতনতা তৈরির দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত।
অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রচারের কথা উল্লেখ করে, যেখানে গণমাধ্যম ও ব্র্যান্ডগুলোকে সাফল্য বা গুণের চিহ্ন হিসেবে ফর্সা গায়ের রং তুলে ধরা বন্ধ করতে বলা হচ্ছে। অ্যাডভার্টাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার নিয়মে কালো গায়ের রংকে হীন হিসেবে তুলে ধরে এমন বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। কিছু বহুজাতিক কোম্পানি পণ্যের নাম ও দাবি সংশোধন করেছে। কর্মীদের মতে, পরিবার ও সমাজের ভেতরের পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ পরিবারের চাপ ও দৈনন্দিন পক্ষপাত মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ব্যবহার বা নির্যাতনমূলক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করতে পারে। চেহারা বা গায়ের রং নিয়ে আত্মীয়দের কটূক্তি বা হুমকির বিষয়টি নজরে এলে শিক্ষা, পরামর্শসেবা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আগাম হস্তক্ষেপ ক্ষতি কমাতে পারে।
মামলায় এরপর কী
বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ড রাজস্থান হাইকোর্টে স্বয়ংক্রিয় পর্যালোচনার মুখে পড়বে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় ও দণ্ডাদেশকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিরক্ষা পক্ষ বিস্তারিত আপিল করতে পারে। হাইকোর্ট দণ্ডাদেশ বহাল রাখলে প্রতিরক্ষা পক্ষ আপিলের মাধ্যমে এবং পরে পর্যালোচনা ও কিউরেটিভ পিটিশনের মাধ্যমে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে প্রতিকার চাইতে পারে। বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ফল যা-ই হোক, দণ্ডিত ব্যক্তি রাজ্যপাল ও ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করতে পারেন। এসব আইনি সুরক্ষাব্যবস্থার কারণে মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হতে প্রায়ই কয়েক বছর লাগে।
প্রশমিতকারী কারণ, প্রক্রিয়াগত ত্রুটি বা আইন প্রয়োগে অসামঞ্জস্যের ঝুঁকি থাকলে আদালত কখনো কখনো মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। প্রতিরক্ষা পক্ষ ইতিমধ্যে আপিলের কথা জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত এবং প্রমাণ যথেষ্ট ছিল না। কৌঁসুলিদের বক্তব্য, নিষ্ঠুরতা এবং গায়ের রং নিয়ে পক্ষপাত থেকে উদ্ভূত উদ্দেশ্যের কারণে মামলাটি ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ শ্রেণিতে পড়ে। হাইকোর্ট নথিপত্রের ভিত্তিতে এসব দাবি যাচাই করবেন।
মনোভাব কীভাবে বদলাচ্ছে
এক দশক আগের তুলনায় এখন গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক প্রচার বেশি দৃশ্যমান। তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সাররা গায়ের রং নিয়ে পক্ষপাতের বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলছেন। অলাভজনক সংস্থাগুলো স্কুল-কলেজে হয়রানি মোকাবিলা এবং নিজের শরীর-চেহারা নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে কাজ করছে। কিছু কোম্পানি বিপণনের ভাষা বদলে গায়ের রং নিয়ে অনিরাপত্তাবোধ বাড়ায় এমন দাবি এড়িয়ে চলছে। দর্শকেরা এখন আরও সোচ্চার। এর ফলে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজকেরা অভিনয়ে বৈচিত্র্য বাড়াচ্ছেন এবং গায়ের রং নিয়ে ঠাট্টা বা গালিগালাজনির্ভর চিত্রনাট্যের অংশ কমাচ্ছেন। বিয়ের বিজ্ঞাপনে কঠোরভাবে গায়ের রং নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, যদিও এখনো অনেক বিজ্ঞাপনে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয়।
অগ্রগতি এখনো অসম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ইতিবাচক বার্তা ছড়াতে পারে, তেমনি হয়রানিও বাড়াতে পারে। সৌন্দর্য সম্পর্কে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ধারণা পরিবারে এখনো বহাল। নির্যাতন বাড়ার আগেই হুমকি ও কটূক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ ও আদালত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। চেহারা নিয়ে ভয় দেখানো বা অবমাননাকর ভাষার লক্ষণ দেখতে পাওয়া শিক্ষক, স্থানীয় কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবারগুলোকে পরামর্শসেবা বা আইনি সহায়তার জন্য পাঠাতে পারেন। এ ধরনের পদক্ষেপ সামাজিক মনোভাব দীর্ঘমেয়াদে বদলাতে সাহায্য করে, যা শেষ পর্যন্ত চেহারা নিয়ে পক্ষপাতকে নিষ্ঠুরতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি কমায়।
মূল কথা
- গায়ের রং কালো বলে স্ত্রী লক্ষ্মীকে কটূক্তি করার পর তাঁকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে কিশানদাস নামে শনাক্ত এক স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন উদয়পুরের আদালত।
- বিচারক হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলেছেন এবং জানিয়েছেন, এটি মৃত্যুদণ্ডের ‘বিরলতমের মধ্যে বিরল’ মানদণ্ড পূরণ করে।
- লক্ষ্মীর মৃত্যুকালীন জবানবন্দি অনুযায়ী, স্বামী গায়ের রং ফর্সা করবে বলে দাবি করা একটি ক্ষয়কারী তরল তাঁর গায়ে লাগান, ধূপকাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন এবং তিনি পুড়তে থাকলে আরও তরল ঢেলে দেন।
- রাষ্ট্রপক্ষ ১৪ জন সাক্ষী ও ৩৬টি নথির কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিরক্ষা পক্ষের দাবি, মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত এবং তারা আপিল করার পরিকল্পনা করছে।
- দণ্ডাদেশের জন্য রাজস্থান হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তা চ্যালেঞ্জ করা যাবে এবং ক্ষমার আবেদন করার সুযোগও রয়েছে।
- ভারতে গায়ের রং নিয়ে বৈষম্য সম্পর্কে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন ও বিয়ের বাজারে প্রায়ই ফর্সা গায়ের রংকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
- কর্মীরা বলছেন, গায়ের রং নিয়ে পক্ষপাতের ক্ষতি কমাতে শিক্ষা, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অপরিহার্য।






