স্বর্ণ বাণিজ্যে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ভিয়েতনামে: স্বর্ণবাজারে নতুন যুগ

পড়তে 8 মিনিট
স্বর্ণ বাণিজ্যে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ভিয়েতনামে: স্বর্ণবাজারে নতুন যুগ

ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজারে বিপ্লব: রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান, প্রতিযোগিতার সূচনা

এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ আমদানিকারক ভিয়েতনাম স্বর্ণ বাণিজ্য ও স্বর্ণবার উৎপাদনে ১৩ বছরের রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ডিক্রি ২৩২/২০২৫/এনডি-সিপি-এর মাধ্যমে কার্যকর হওয়া এই ব্যাপক সংস্কার দেশটির আর্থিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এর ফলে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্তির পথ খুলছে। স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি, ভিয়েতনামের মুদ্রা ডংয়ের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার চাপের মধ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা, বিনিয়োগকারী ও বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর এর প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূচিপত্র
  1. ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজারে বিপ্লব: রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান, প্রতিযোগিতার সূচনা
  2. ভিয়েতনাম কেন স্বর্ণের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাল?
  3. সরকারের যুক্তি
  4. নতুন ডিক্রিতে কী পরিবর্তন আসছে?
  5. তাৎক্ষণিক প্রভাব: দামের অস্থিরতা ও বাজারের প্রতিক্রিয়া
  6. বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিভঙ্গি: কৌশলগত সুরক্ষা হিসেবে স্বর্ণ
  7. নতুন ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে?
  8. ভোক্তার সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
  9. বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
  10. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
  11. নিয়ন্ত্রক সুরক্ষা ও সামনের পথ
  12. সংক্ষেপে

ভিয়েতনাম কেন স্বর্ণের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটাল?

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্টেট ব্যাংক অব ভিয়েতনাম (এসবিভি) এবং সাইগন জুয়েলারি কোম্পানি (এসজেসি) স্বর্ণবার উৎপাদন ও বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার ধরে রেখেছিল। ২০১২ সালে চালু হওয়া এই একচেটিয়া ব্যবস্থা বাজার স্থিতিশীল করা ও জল্পনা-কল্পনা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। তবে এর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি দেখা দেয়:

  • দামের বিকৃতি: আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ধারাবাহিকভাবে অনেক বেশি ছিল—কখনো কখনো ৩০ শতাংশেরও বেশি।
  • কালোবাজারি তৎপরতা: দামের ব্যবধান চোরাচালান ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছে, যা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করেছে।
  • ভোক্তার সীমিত পছন্দ: এসজেসি একমাত্র বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ায় প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

২০২৪ সালে ভিয়েতনাম ৫৫ টন স্বর্ণ আমদানি করে। চীনের ৮৫৭ টন ও ভারতের ৮০৩ টনের তুলনায় এই পরিমাণ অনেক কম হলেও স্থানীয় বাজারের অদক্ষতা ছিল স্পষ্ট। ভিয়েতনামের ডংয়ের অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক উৎসব ও বিয়ের সময় স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে স্বর্ণকে সম্পদ সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।

সরকারের যুক্তি

প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন ও আর্থিক নিয়ন্ত্রকেরা স্বীকার করেছেন যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের মডেলটি টেকসই নয়। নতুন ডিক্রির লক্ষ্য:

  • স্বর্ণবাজারকে স্বাভাবিক করা এবং দামের অতিরিক্ত ব্যবধান কমানো
  • স্বচ্ছতা ও তদারকি বাড়ানো
  • ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা
  • ডংয়ের ওপর জল্পনামূলক চাপ কমিয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করা

নতুন ডিক্রিতে কী পরিবর্তন আসছে?

একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান মানে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার নয়। বরং ভিয়েতনাম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতামূলক বাজারের দিকে এগোচ্ছে। প্রধান পরিবর্তনগুলো হলো:

  • লাইসেন্স ব্যবস্থা: বাণিজ্যিক ব্যাংক ও যোগ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন কাঁচা স্বর্ণ আমদানি, স্বর্ণবার উৎপাদন এবং স্বর্ণবার বাণিজ্যের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম ১ ট্রিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং এবং ব্যাংকের জন্য ৫০ ট্রিলিয়ন ডং মূলধনের মতো কঠোর মূলধন ও কারিগরি শর্ত পূরণ করলেই কেবল অনুমোদন মিলবে।
  • আমদানি কোটা: সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রানীতি ও বাজারের প্রবণতার ভিত্তিতে স্বর্ণ আমদানির কোটা নির্ধারণের ক্ষমতা এসবিভির হাতে থাকবে। এতে স্বর্ণের প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে না।
  • স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল ব্যবস্থা: প্রতিদিন জনপ্রতি ২০ মিলিয়ন ডং (প্রায় ৭৬০ ডলার)-এর বেশি মূল্যের সব স্বর্ণ লেনদেন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে করতে হবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইলেকট্রনিক চালান দিতে হবে এবং লেনদেনের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে। এতে নগদনির্ভর বাণিজ্য কমবে এবং লেনদেনের অনুসরণযোগ্যতা বাড়বে।
  • মান ও প্রমিতকরণ: উৎপাদকদের স্বর্ণবারের ওজন, বিশুদ্ধতা ও জালিয়াতি প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যসহ পণ্যের বিবরণ প্রকাশ করতে হবে। প্রতিটি বারে থাকবে স্বতন্ত্র সিরিয়াল নম্বর ও প্রমিত মোড়ক; পাশাপাশি স্বাধীন পরীক্ষাকেন্দ্র নিয়মিত নিরীক্ষা করবে।
  • একাধিক ব্র্যান্ড: বাজারে আর এসজেসির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না। কঠোর মান ও স্বচ্ছতার শর্ত পূরণ করলে বড় ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নতুন ব্র্যান্ড বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিযোগিতা বাড়ানো, ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং বাজারকে আরও সুশৃঙ্খল করাই এসব সংস্কারের লক্ষ্য। অর্থনীতিবিদ নগুয়েন কুয়াং হুই বলেন,

ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজারের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। কে স্বর্ণ উৎপাদন করছে, সেটি মূল বিষয় নয়; পণ্যটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ কি না, সেটিই আসল।

বিজ্ঞাপন

তাৎক্ষণিক প্রভাব: দামের অস্থিরতা ও বাজারের প্রতিক্রিয়া

ডিক্রি ঘোষণার পর স্বর্ণের দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। এসজেসিতে স্বর্ণবারের বিক্রয়মূল্য রেকর্ড ১২৮ মিলিয়ন ডংয়ে (প্রায় ৪,৮৬৫ ডলার) পৌঁছায়; ক্রেতারা দিচ্ছিলেন ১২৬ মিলিয়ন ডং। বাজারে জমে থাকা চাহিদা এবং নতুন নিয়মের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময়কার অনিশ্চয়তা—দুইয়েরই প্রতিফলন ছিল এই মূল্যবৃদ্ধি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগকারী ও ভোক্তারা নিজেদের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করায় দামের অস্থিরতা থাকতে পারে। কম দামের ব্যবধানের আশায় কেউ কেউ কেনাকাটা পিছিয়ে দিতে পারেন, আবার অন্যরা মুনাফা নিশ্চিত করতে স্বর্ণ বিক্রি করতে পারেন। দেশের বাজার ও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ব্যবধান প্রতি তােলে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডং থেকে কমে ১৪–১৫ মিলিয়ন ডং হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ৫–৭ মিলিয়ন ডং ব্যবধানকে যুক্তিসংগত বলে মনে করা হচ্ছে।

এসএসআই সিকিউরিটিজ করপোরেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফাম লু হুং এই পদক্ষেপকে “গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এর ফলে ভিয়েতনাম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন মডেল থেকে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে রূপান্তরিত হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা বাড়লে ধীরে ধীরে দেশের বাজারের দাম আন্তর্জাতিক দামের কাছাকাছি আসবে।

বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিভঙ্গি: কৌশলগত সুরক্ষা হিসেবে স্বর্ণ

মুদ্রার অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা খোঁজা বিনিয়োগকারীদের কাছে ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজার দীর্ঘদিনের আশ্রয়স্থল। গত এক বছরে ডংয়ের অবমূল্যায়ন হয়েছে ৪.৩৭ শতাংশ, অন্যদিকে স্থানীয় মুদ্রায় স্বর্ণের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা—উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর জন্য স্বর্ণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

বাজার উদারীকরণের ফলে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে:

  • ঝুঁকি সুরক্ষার কৌশল: বিনিয়োগকারীরা এসজেসি-সনদপ্রাপ্ত স্বর্ণবার ধরে রেখে, ডিজিটাল স্বর্ণ লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম বিবেচনা করে এবং স্বর্ণের সঙ্গে মার্কিন ডলারভিত্তিক সম্পদ মিলিয়ে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে পারেন।
  • আর্থিক উদ্ভাবন: তারল্য ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার ২০২৬ সালের মাঝামাঝি হো চি মিন সিটিতে জাতীয় স্বর্ণ বিনিময়কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি স্বর্ণের ফিউচারস ও সনদ চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে।
  • ঝুঁকি: ডংয়ের সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার, নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা এবং ভৌত স্বর্ণবাজারে তারল্যের সীমাবদ্ধতা এখনো উদ্বেগের বিষয়।

এআইইনভেস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,

দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থিক পরিমণ্ডলে সুরক্ষা ও প্রবৃদ্ধি—দুই-ই খুঁজছেন এমন বিনিয়োগকারীদের জন্য ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজার উদারীকরণ কৌশলগত সুযোগ তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে?

নতুন কাঠামোয় স্বর্ণবার উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পর্যাপ্ত মূলধন ও কারিগরি সক্ষমতাসম্পন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই কেবল অংশ নিতে পারবে। এসবিভি প্রক্রিয়াটির তদারকি করবে, আমদানি কোটা দেবে এবং নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করবে।

ব্যবস্থাটির প্রধান কার্যকরী বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • ইলেকট্রনিক লেনদেন: গুরুত্বপূর্ণ সব স্বর্ণ কেনাবেচা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে করতে হবে এবং প্রতিটি লেনদেনের জন্য ইলেকট্রনিক চালান দিতে হবে।
  • তথ্য সংযুক্তি: লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের তথ্যব্যবস্থা এসবিভির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এর ফলে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা করা সম্ভব হবে।
  • মান নিশ্চিতকরণ: স্বর্ণবারের বিশুদ্ধতা, ওজন ও জালিয়াতি প্রতিরোধী ব্যবস্থা কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। স্বাধীন পরীক্ষাকেন্দ্র নিয়ম মেনে চলা যাচাই করবে এবং সিরিয়াল নম্বর ও ডিজিটাল নথির মাধ্যমে প্রতিটি বার অনুসরণ করা যাবে।
  • বাজার তদারকি: বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এসবিভি নিয়মিত পরিদর্শন করবে, নিয়ম মানা নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি কোটা সমন্বয় করবে।

দ্রুত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার ফলে যে বাড়াবাড়ি ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে, তা ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে এই ব্যবস্থায় বাজার উদারীকরণের সঙ্গে কঠোর তদারকির ভারসাম্য রাখা হয়েছে।

ভোক্তার সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ

ভিয়েতনামের ভোক্তাদের জন্য একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসানে বেশ কিছু সুবিধার সম্ভাবনা রয়েছে:

  • বেশি পছন্দ: একাধিক ব্র্যান্ড ও উৎপাদক গুণমান ও দামের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করবে, ফলে ভোক্তাদের বিকল্প বাড়বে।
  • কম দামের ব্যবধান: সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দামের ব্যবধান কমবে এবং স্বর্ণ কেনা আরও সাশ্রয়ী হবে।
  • স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা: ইলেকট্রনিক লেনদেন ও প্রমিত পণ্য ক্রেতাদের জালিয়াতি ও নকল পণ্য থেকে সুরক্ষা দেবে।

তবে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। অনেক ছোট গয়নার ব্যবসার আমদানি লাইসেন্স পাওয়ার মতো মূলধন নেই। বহু ব্র্যান্ডের বাজারে ভোক্তাদের নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে সময় লাগায় এই রূপান্তরও ধীর হতে পারে। স্বল্প মেয়াদে এসজেসির পরিচিতি ও আস্থার অবস্থান বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে উচ্চমানের বিকল্পগুলো ধীরে ধীরে বাজারের অংশ বাড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

ভিয়েতনামের সংস্কৃতিতে স্বর্ণের বিশেষ স্থান রয়েছে। সম্পদ সঞ্চয়ের ঐতিহ্যগত মাধ্যম হিসেবে এবং বিয়ে ও চন্দ্র নববর্ষের মতো উদ্‌যাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বর্ণের ব্যবহার হয়। জানা গেছে, এসব উদ্দেশ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবারের কাছে স্বর্ণ রয়েছে। বাজার আধুনিকায়নের পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখাই সংস্কারগুলোর লক্ষ্য।

অর্থনৈতিক দিক থেকে সরকার আশা করছে, আরও দক্ষ স্বর্ণবাজার:

  • ডংয়ের ওপর জল্পনামূলক চাপ কমাবে
  • আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জোরদার করবে
  • গয়না উৎপাদকদের কাঁচামালের খরচ কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে সহায়তা করবে

খাতটিকে আরও সহায়তা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয় স্বর্ণালংকারের রপ্তানি শুল্ক ১ শতাংশ থেকে শূন্যে নামানোর প্রস্তাব করেছে। এর লক্ষ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। তবে কাঁচা স্বর্ণের সীমিত সরবরাহ ও উচ্চ দামের কারণে দেশীয় উৎপাদকেরা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে; এতে রপ্তানি আয় কমেছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

ভিয়েতনামের সংস্কারের ফলে দেশটির স্বর্ণবাজার আন্তর্জাতিক রীতিনীতির কাছাকাছি আসছে, যেখানে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক তদারকি স্বাভাবিক বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দামের ব্যবধান কমিয়ে এবং বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত হয়ে ভিয়েতনাম বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছে।

ব্লুমবার্গ এই পদক্ষেপকে “গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন” বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এর ফলে সরবরাহ ও দক্ষতা বাড়তে পারে এবং চোরাচালান ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের সুযোগ কমতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নিয়ন্ত্রক সুরক্ষা ও সামনের পথ

বাজার উদারীকরণ সত্ত্বেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এসবিভি কঠোর তদারকি বজায় রাখবে। প্রধান সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো হলো:

  • আমদানি কোটা: মুদ্রা বা বৈদেশিক রিজার্ভে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে—এমন অতিরিক্ত স্বর্ণ আমদানি ঠেকাতে।
  • প্রমিতকরণ: সব স্বর্ণবারের ওজন, বিশুদ্ধতা, নকশা ও জালিয়াতি প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যসংক্রান্ত বিধি।
  • অনুসরণযোগ্যতা: প্রতিটি বারের ডিজিটাল নথি ও সিরিয়াল নম্বর এবং স্বাধীন কেন্দ্রের নিয়মিত নিরীক্ষা।
  • বাজার পর্যবেক্ষণ: জালিয়াতি বা কারসাজি শনাক্ত ও প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক তথ্য সংযুক্তি এবং পরিদর্শন।

অর্থনীতিবিদ নগুয়েন হু হুয়ান এসব ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন,

বাজারকে নিরাপদ ও টেকসইভাবে পরিচালনার জন্য এসবিভিকে স্বর্ণবারের মান প্রমিত করতে হবে এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আরও বাড়াতে সরকার একটি জাতীয় স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রও গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যেখানে প্রমিত ও উচ্চমানের পণ্য একত্র করা হবে।

সংক্ষেপে

  • স্বর্ণ বাণিজ্য ও স্বর্ণবার উৎপাদনে ১৩ বছরের রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়েছে ভিয়েতনাম। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাজার খুলে দেওয়া হয়েছে।
  • কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকি বজায় রেখে দামের অতিরিক্ত ব্যবধান কমানো, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার লক্ষ্য রয়েছে সংস্কারগুলোর।
  • তাৎক্ষণিক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে দামের অস্থিরতা এবং দেশের বাজার ও আন্তর্জাতিক বাজারের স্বর্ণের দামের ব্যবধান কমে আসা।
  • ভোক্তারা বেশি বিকল্প, দামের কম ব্যবধান ও উন্নত নিরাপত্তার সুবিধা পাবেন, যদিও স্বল্প মেয়াদে এসজেসির ব্র্যান্ড আধিপত্য বজায় থাকতে পারে।
  • মুদ্রার অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে স্বর্ণ ভিয়েতনামের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেই থাকবে।
  • বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এসবিভি আমদানি কোটার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে এবং কঠোর মান ও স্বচ্ছতার নিয়ম কার্যকর করবে।
  • দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থিক পরিমণ্ডলে সুরক্ষা ও সুযোগ খুঁজছেন এমন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজার উদারীকরণ প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে