ভিনগ্রুপের ক্রমবর্ধমান ঋণ: ভিয়েতনামের করপোরেট জায়ান্টের আড়ালে লুকানো সংকট
ভিয়েতনামের বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং দেশটির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক ভিনগ্রুপ নজিরবিহীন মাত্রার ঋণসংকটে পড়েছে। ভিয়েতনামের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ফাম ন্যাত ভুংয়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি আবাসন, খুচরা ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী খাত বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি)—এর মাধ্যমে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে রয়েছে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভিনফাস্ট। কিন্তু দ্রুত সম্প্রসারণ আর ঝলমলে শিরোনামের আড়ালে রয়েছে এমন এক আর্থিক বাস্তবতা, যা শুধু ভিনগ্রুপের ভবিষ্যৎ নয়, ভিয়েতনামের করপোরেট অঙ্গনের স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
সূচিপত্র
- ভিনগ্রুপের ক্রমবর্ধমান ঋণ: ভিয়েতনামের করপোরেট জায়ান্টের আড়ালে লুকানো সংকট
- ভিনগ্রুপের এত বিপুল ঋণ কীভাবে হলো?
- ভিনফাস্ট: যে উচ্চাভিলাষী বাজি সবকিছু বদলে দিল
- বিক্রির পরিসংখ্যান: সংখ্যাগুলো একটু খতিয়ে দেখা
- হিসাবের অনিয়ম এবং প্রতিষ্ঠাতার সম্পদের ওপর নির্ভরতা
- মুদ্রা ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক দায়
- নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও বাজারের অস্থিরতা
- কৌশলগত পরিবর্তন: পশ্চিমা বাজার থেকে সরে উদীয়মান বাজারে মনোযোগ
- বৃহত্তর প্রভাব: ব্যর্থ হওয়ার পক্ষে কি এটি খুব বড়?
- ২০২৬ সালের মধ্যে লাভ-লোকসান সমান হওয়া কি বাস্তবসম্মত?
- সংক্ষেপে
২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে ভিনগ্রুপের মোট দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ বিলিয়ন ডলারে, যা তাদের মোট সম্পদের ৮৬ শতাংশ। এই ঋণের জন্য প্রতিদিন ৩.২ মিলিয়ন ডলার সুদ দিতে হচ্ছে। ফলে গোষ্ঠীটি সম্পদ বিক্রি, মূলধন সংগ্রহ এবং আর্থিক কৌশল প্রয়োগের এক নিরবচ্ছিন্ন চক্রে আটকে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আর্থিক প্রতিবেদন ও স্বাধীন বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, টিকে থাকতে তাদের ব্যবসায়িক মডেল ক্রমেই স্বল্পমেয়াদি ঋণ, অস্বচ্ছ হিসাবপদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
ভিনগ্রুপের এত বিপুল ঋণ কীভাবে হলো?
ভিনগ্রুপের ঋণসংকটের সূত্রপাত তাদের আগ্রাসী সম্প্রসারণ কৌশলে, বিশেষ করে বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে প্রবেশের সিদ্ধান্তে। ২০১৭ সালে ভিনফাস্ট চালুর পর থেকে ইভি তৈরি, কারখানা নির্মাণ এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ভিনগ্রুপ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলেছে। এই উচ্চঝুঁকির, উচ্চপ্রতিদানের কৌশলের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতের যাতায়াতব্যবস্থার অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে ভিয়েতনামকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। কিন্তু এর বদলে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমবর্ধমান লোকসান ও বাড়তে থাকা আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ভিনগ্রুপের ঋণ বেড়েছে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার। স্বল্পমেয়াদি দায়—যেসব ঋণ এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়—এখন মোট ঋণের ৬৩ শতাংশ, অর্থাৎ ১৯.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এসব ঋণের পরিশোধের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে, ফলে নতুন নগদ অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। ভিনগ্রুপের জবাব ছিল সহযোগী প্রতিষ্ঠানে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করা—যেমন ভিনকম রিটেইলের শেয়ার ১.৬ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি—এবং ডয়েচে ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়া।
তবে এসব পদক্ষেপে কেবল কিছুটা সময় কেনা গেছে। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে হবে; এর মধ্যে রয়েছে ৮৬০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং ১.১৪ বিলিয়ন ডলারের বন্ডের সুদ। হাতে মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি নগদ থাকায়, এসব দায় মেটানোর সক্ষমতা ভিনগ্রুপের আছে কি না তা নিশ্চিত নয়।
ভিনফাস্ট: যে উচ্চাভিলাষী বাজি সবকিছু বদলে দিল
ভিনগ্রুপের আর্থিক দুরবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ভিনফাস্ট, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি—যাকে গোষ্ঠীর মুকুটের রত্ন হওয়ার কথা ছিল। তার বদলে ভিনফাস্ট বিপুল নগদ অর্থের অপচয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কখনো মুনাফা করতে পারেনি। শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ভিনফাস্টের গাড়ি ব্যবসায় ৩৭ ট্রিলিয়ন ডংয়ের বেশি (প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার) লোকসান হয়েছে। গত তিন বছরে তাদের ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫.৭ বিলিয়ন ডলারে; ২০২৩ সালে নিট লোকসান ছিল ২.৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার।
ভিনফাস্টের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যয়বহুল হয়েছে এবং একের পর এক বাধার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল বেশ ঘটা করে—৯৯৯টি ভিএফ৮ গাড়ি পাঠানো এবং নর্থ ক্যারোলাইনায় ২ বিলিয়ন ডলারের কারখানা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু আমেরিকান স্বপ্ন দ্রুতই ফিকে হয়ে যায়। নিরাপত্তা মান পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রথম চালানের গাড়িগুলো ফেরত পাঠানো হয়, শোরুম বন্ধ হয়ে যায় এবং কারখানার প্রকল্প অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে, ২০২৩ সালের আগস্টে নাসডাকে তালিকাভুক্তির পর ভিনফাস্টের শেয়ারবাজারমূল্য সাময়িকভাবে ২৩ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও দুই মাসের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮.৩৫ বিলিয়ন ডলারে।
বিক্রির পরিসংখ্যান: সংখ্যাগুলো একটু খতিয়ে দেখা
“জোরালো ইভি বিক্রি”র দাবি সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, বিশেষ করে ভিয়েতনামের বাইরে খুচরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ভিনফাস্ট হিমশিম খেয়েছে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৩৫ হাজার ইভি বিক্রি করে—তাদের ৫০ হাজারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম এবং ৩ লাখ গাড়ি উৎপাদন সক্ষমতার সামান্য অংশ। এসব গাড়ির বেশির ভাগই সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি হয়নি; কিনেছিল ভুংয়ের মালিকানাধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, যেমন রাইড-হেইলিং সেবা জ়ান এসএম (গ্রিন এসএম), যা ওই বছর ভিনফাস্টের ৮২ শতাংশ গাড়ি কিনেছিল। ভিনগ্রুপের অন্য ব্যবসার সঙ্গে ছাড় ও পারস্পরিক প্রচারণার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা এই অভ্যন্তরীণ বিক্রয়চক্র ভিনফাস্টের পণ্যের প্রকৃত বাজারচাহিদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
উদাহরণস্বরূপ, বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি ও স্কুটার ভাড়া দেওয়া জ়ান এসএম ২০২৩ সালে ভিনফাস্টের গাড়ি কিনতে ৮৩৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং আরও ইভি কেনার জন্য ৪১৯ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। ভিনগ্রুপের ব্যবসায়িক বলয়ের অংশ ভিনহোমস ও ভিনবাসের কাছেও আরও গাড়ি বিক্রি করা হয়। বিশ্লেষকেরা এই কৌশলকে অটেকসই বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, এতে খুচরা ক্রেতাদের দুর্বল চাহিদা আড়াল হয় এবং উৎপাদন অলাভজনকই থেকে যায়।
হিসাবের অনিয়ম এবং প্রতিষ্ঠাতার সম্পদের ওপর নির্ভরতা
ভিনগ্রুপের আর্থিক বিবৃতি অনিয়ম এবং “অন্যান্য আয়” খাতের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে নজরদারির মুখে পড়েছে। এই আয়ের উৎস হিসেবে প্রায়ই “স্পনসরশিপ তহবিল” বা ভুংয়ের নিজের সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি কর-পরবর্তী ২.২৬৫ ট্রিলিয়ন ডং (৮৫.৫ মিলিয়ন ডলার) মুনাফার কথা জানায়। তবে এই মুনাফা পুরোপুরিই এসেছে ব্যাখ্যা না করা ১৮.৫১৬ ট্রিলিয়ন ডংয়ের “অন্যান্য আয়” খাত থেকে। এটি বাদ দিলে ভিনগ্রুপের মূল ব্যবসায় ১৩.৯ ট্রিলিয়ন ডংয়েরও বেশি লোকসান হতো।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালে ভুংয়ের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডং নগদ অর্থ দেওয়ায় ভিনগ্রুপ মুনাফা দেখাতে পেরেছিল। বছরের পর বছর ভুং বারবার প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়নে সহায়তা করেছেন; ২০১৭ সাল থেকে তাঁর মূলধন জোগানের পরিমাণ ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৪ সালে ভিনগ্রুপ ও ভুং ভিনফাস্টের জন্য আরও ৩.৪ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে ভুংয়ের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ১.৯৭ বিলিয়ন ডলার এবং ঋণ, লভ্যাংশ ও সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ভিনগ্রুপ থেকে সর্বোচ্চ ১.৩৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা ছিল।
ভিনগ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর এমন নির্ভরতা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং তাদের ব্যবসায়িক মডেলের টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। আর্থিক বিশ্লেষকেরা প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্চঝুঁকির বলে চিহ্নিত করেছেন। আলফা স্প্রেডের মতো প্ল্যাটফর্মের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভিনগ্রুপের ব্যবসায়িক মুনাফা দিয়ে তাদের সুদ ব্যয়ের মাত্র ৪০ শতাংশ মেটানো যায়। বড় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভিনগ্রুপের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন, এতে বাজারের আস্থা আরও কমেছে।
মুদ্রা ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক দায়
উল্লেখযোগ্য মুদ্রা ঝুঁকির কারণে ভিনগ্রুপের ঋণসংকট আরও জটিল হয়েছে। তাদের মোট ঋণের সুদের প্রায় ৪১ শতাংশ মার্কিন ডলারে ধার্য, অথচ ভিনফাস্টের ৯২ শতাংশ আয় আসে ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে, যেখানে ডংয়ের মান কমছে। এই অমিল প্রতিষ্ঠানটিকে বাড়তি আর্থিক চাপে ফেলেছে: স্থানীয় মুদ্রার মান দুর্বল হওয়ায় আয় দিয়ে ডলারে ধার্য ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিপুল ঋণ পেতে ভুং সম্পদের বিশাল পোর্টফোলিও জামানত রেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে হাইফংয়ের উৎপাদন লাইন, হা তিংয়ের ভিনইএস ব্যাটারি কারখানা এবং এমনকি নর্থ ক্যারোলাইনায় নির্মাণাধীন ইভি কারখানাও। ভিনফাস্টের ২.৫৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণের জামিনদারও ভিনগ্রুপ; এর মধ্যে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ২০২৫ সালেই পরিশোধের সময় হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও বাজারের অস্থিরতা
ভিনগ্রুপ ও ভিনফাস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান নজরদারির মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) একটি নথিতে আয় বাড়িয়ে দেখানোর জন্য ভিনফাস্টকে তিরস্কার করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি “হিসাবের ভুলের” কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়; ভুলটির কারণে বিক্রি ৩৩.৯ মিলিয়ন ডলার বেশি দেখানো হয়েছিল। এ ঘটনা এবং সম্ভাবনা অতিরঞ্জিত করার অভিযোগে শেয়ারহোল্ডারদের করা একটি সমন্বিত মামলা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ভিনগ্রুপের স্থিতিশীলতা নিয়ে বাজারের ধারণা অত্যন্ত সংবেদনশীল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভুংকে ভিয়েতনাম ছাড়তে নিষেধ করা হয়েছে—এমন গুজবের জেরে শেয়ারবাজারে ধস নামে। মাত্র ছয় ঘণ্টায় তাঁর সম্পদের মূল্য ৪৯০ মিলিয়ন ডলার কমে যায়। ভিয়েতনাম সরকার মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পদ্ধতিগত গুরুত্বেরই ইঙ্গিত দেয়। ভিনগ্রুপে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন এবং ভিয়েতনামের জিডিপিতে প্রতিষ্ঠানটির অবদান প্রায় ২ শতাংশ; ফলে এর আর্থিক স্বাস্থ্য জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।
কৌশলগত পরিবর্তন: পশ্চিমা বাজার থেকে সরে উদীয়মান বাজারে মনোযোগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে প্রবেশের ব্যয়বহুল ব্যর্থতার পর ভিনফাস্ট এখন কৌশল বদলাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান বাজারে মনোযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এসব বাজারে সাশ্রয়ী ইভির চাহিদা বাড়ছে এবং প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম তীব্র। ভিনফাস্টের নতুন ভিএফ৩ ছোট ইভির দাম ৯,২০০ ডলার; এসব বাজারে ব্যাপক ক্রেতার কথা মাথায় রেখে এটি তৈরি করা হয়েছে, বিশেষ করে মোটরসাইকেল থেকে গাড়িতে যেতে আগ্রহী ক্রেতাদের লক্ষ্য করে।
এই পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করছে যে তাদের আগের উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো সময়ের আগেই নেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক এক শেয়ারহোল্ডার সভায় ফাম ন্যাত ভুং বলেন,
বড় লোকসান হয়েছে। তাই তাড়াহুড়োর দরকার নেই।উদীয়মান বাজারে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে ভবিষ্যতে আবার বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আশা করছে ভিনফাস্ট। প্রাথমিক লক্ষণ আশাব্যঞ্জক: অর্ডার নেওয়া শুরুর পর প্রথম তিন দিনেই ২৭ হাজারের বেশি মানুষ ভিএফ৩ কেনার আবেদন করেন। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে এখনও বিওয়াইডির মতো চীনা ইভি নির্মাতাদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন, চার্জিং অবকাঠামো এবং ভোক্তাদের আস্থার চ্যালেঞ্জও কাটিয়ে উঠতে হবে।
বৃহত্তর প্রভাব: ব্যর্থ হওয়ার পক্ষে কি এটি খুব বড়?
ভিনগ্রুপের ঋণসংকট ভিয়েতনামের অর্থনীতি ও করপোরেট পরিচালনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে গোষ্ঠীটির আধিপত্য এবং সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে কিছু পর্যবেক্ষক একে “ব্যর্থ হওয়ার পক্ষে খুব বড়” বলে বর্ণনা করেছেন। নৈতিক ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে—অর্থাৎ ভিনগ্রুপের আর্থিক দুরবস্থা বৃহত্তর অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেললে সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে উদ্ধার করতে বাধ্য বোধ করতে পারে।
শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ঋণ, অস্বচ্ছ হিসাবপদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর ভিনগ্রুপের নির্ভরতা টেকসই নয়। প্রতিষ্ঠানটির আবাসন শাখা ভিনহোমস ঐতিহ্যগতভাবে তাদের মুনাফার প্রধান উৎস হলেও, কঠোর বিধিনিষেধ, উচ্চ ঋণ এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ভিয়েতনামের আবাসন খাত এখন সংকটে। ভিনগ্রুপ শপিং মল ও আবাসন সম্পদসহ বিভিন্ন সম্পদ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির আলোচনা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এসব পদক্ষেপ ভিনফাস্টের চলমান লোকসান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জ পুষিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
রয়টার্সকে এক বিশ্লেষক বলেন,
ভিনফাস্টের দ্রুত প্রবৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রির ওপর নির্ভর করেছে। বৈশ্বিক ইভির চাহিদা কমে আসার মধ্যে খুচরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রতিষ্ঠানটি হিমশিম খাওয়ায় এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।অভ্যন্তরীণ বিক্রি এবং ভিনগ্রুপ ও ভুংয়ের আর্থিক সহায়তার ওপর এই নির্ভরতা ব্যবসাটির প্রকৃত টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৬ সালের মধ্যে লাভ-লোকসান সমান হওয়া কি বাস্তবসম্মত?
ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ফাম ন্যাত ভুং প্রকাশ্যে ভিনফাস্টের সাফল্যে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “ভিনফাস্টকে কখনো ছেড়ে দেবেন না”; ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতিষ্ঠানটিকে লাভ-লোকসান সমান অবস্থায় নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। এই লক্ষ্য অর্জনে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগ তুলে আনতে হবে এবং ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে—বর্তমান পরিস্থিতিতে যা দুরূহ কাজ।
ভিনফাস্টের লাভজনক হওয়ার পথ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে:
- উদীয়মান বাজারে ভিএফ৩-এর মতো সাশ্রয়ী মডেলের বিক্রি সফলভাবে বাড়ানো
- অভ্যন্তরীণ বিক্রি ও ছাড়ের ওপর নির্ভরতা কমানো
- স্বাধীন মূলধন ও কৌশলগত বিনিয়োগকারী নিশ্চিত করা
- পণ্যের মান ও ব্র্যান্ড পরিচিতি উন্নত করা
- মুদ্রা ঝুঁকি ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দেওয়া
চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় বাজারের উপযোগী পণ্য তৈরিতে কিছু অগ্রগতি হলেও আর্থিক চ্যালেঞ্জের ব্যাপ্তি এখনও বিশাল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভিনফাস্টের লোকসান বাড়তেই রয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রে ভিনফাস্টের তালিকাভুক্তির পর থেকে ভিনগ্রুপের নিট মুনাফার হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সংক্ষেপে
- ভিয়েতনামের বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ভিনগ্রুপ ঋণসংকটে রয়েছে। তাদের মোট দায় ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা সম্পদের ৮৬ শতাংশ; প্রতিদিন সুদ দিতে হয় ৩.২ মিলিয়ন ডলার।
- ভিনফাস্টের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতে আগ্রাসী সম্প্রসারণের ফলে বিপুল লোকসান হয়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি কখনো মুনাফা করতে পারেনি এবং শুধু ২০২৪ সালেই ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি লোকসান করেছে।
- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভিনফাস্টের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কৌশল বদলে উদীয়মান এশীয় বাজার ও সাশ্রয়ী ইভির দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
- ভিনগ্রুপের আর্থিক বিবৃতিতে অনিয়ম এবং লোকসান পুষিয়ে নিতে ও ঋণ পরিশোধে প্রতিষ্ঠাতা ফাম ন্যাত ভুংয়ের ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর ব্যাপক নির্ভরতার চিত্র উঠে এসেছে।
- মুদ্রা ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও বাজারের অস্থিরতা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভিয়েতনামের অর্থনীতিতে এর টেকসইতা ও পদ্ধতিগত গুরুত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
- চলমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভুং ভিনফাস্টের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে লাভ-লোকসান সমান করার লক্ষ্য নিয়েছেন। তবে বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষক লক্ষ্যটিকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে করেন।






