শি জিনপিংয়ের তিব্বত সফর: শক্তি প্রদর্শন ও বিশ্বকে বার্তা
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট তিব্বতের রাজধানী লাসায় এক বিরল ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সফর করেন। তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এই আয়োজন করা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য, স্কুলশিক্ষার্থী ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা তিব্বতিসহ ২০ হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। সবার ওপরে ছিল শির বিশাল প্রতিকৃতি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি ছিল তিব্বতে শির মাত্র দ্বিতীয় সফর, যা এই সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বেইজিংয়ের পাঠানো বার্তার তাৎপর্য তুলে ধরে।
সূচিপত্র
- শি জিনপিংয়ের তিব্বত সফর: শক্তি প্রদর্শন ও বিশ্বকে বার্তা
- তিব্বত কেন গুরুত্বপূর্ণ: ইতিহাস, পরিচয় ও ভূরাজনীতি
- শি জিনপিংয়ের বার্তা: ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের “চীনায়ন”
- ধর্মের চীনায়ন: এর অর্থ কী?
- দালাই লামার উত্তরসূরি: আসন্ন সংঘাত
- উত্তরসূরি নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- উন্নয়ন, অবকাঠামো ও পরিবেশগত উদ্বেগ
- সীমান্ত উত্তেজনা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
- মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও নিয়ন্ত্রণের সীমা
- সংক্ষেপে
তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ এবং বর্তমানে ৯০ বছর বয়সী, ভারতে নির্বাসিত ১৪তম দালাই লামার উত্তরসূরি কে হবেন—এই প্রশ্ন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার সময়ে শির সফর হলো। উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে চীনা সরকারের অনড় অবস্থান তিব্বতি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তিব্বতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই সফরের সময়েই ওই অঞ্চলে বড় অবকাঠামো প্রকল্পও চলছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ, যা চীনের কাছে তিব্বতের কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
তিব্বত কেন গুরুত্বপূর্ণ: ইতিহাস, পরিচয় ও ভূরাজনীতি
চীনের পশ্চিম সীমান্তের বিস্তীর্ণ, উচ্চভূমির অঞ্চল তিব্বত দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। বেইজিংয়ের দাবি, শত শত বছর ধরে তিব্বত চীনের অংশ। তবে অনেক তিব্বতির মতে, ওই সময়ের অধিকাংশ সময় তারা কার্যত স্বাধীন ছিলেন এবং দালাই লামাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৌদ্ধ ধর্মতন্ত্রের অধীনে শাসিত হতেন।
১৯৫১ সালে কমিউনিস্ট বাহিনী তিব্বত দখল করে। ১৯৫৯ সালে এক ব্যর্থ বিদ্রোহের পর দালাই লামা ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানে নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৫ সালে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে, জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তবে বাস্তবে এর পর কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ ও অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে। অঞ্চলটি এখনো বিদেশি সাংবাদিক ও দর্শনার্থীদের জন্য অনেকাংশে বন্ধ, আর ভারতের সঙ্গে এর সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
বেইজিংয়ের কাছে তিব্বত শুধু ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার বিষয় নয়, কৌশলগত সম্পদও। এই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত রয়েছে, এখানে প্রাকৃতিক সম্পদের বিপুল ভান্ডার আছে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবাহিত গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর উৎসও এখানে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিব্বতে হান চীনাদের ব্যাপক অভিবাসন, সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং ইয়ারলুং সাংপো নদীতে মোটুও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পের সূচনা দেখা গেছে। এসব পদক্ষেপে প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে, পানির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শি জিনপিংয়ের বার্তা: ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের “চীনায়ন”
সফরকালে শি জিনপিং তিব্বতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। এতে তিনি অঞ্চলটির জন্য চারটি অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, জাতিগত ঐক্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতি। তিনি “বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সংগ্রাম”-এর জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রশংসা করেন—যা চীনা শাসনের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের তিব্বতি প্রতিরোধের প্রতি ইঙ্গিত—এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মকে সমাজতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
কমিউনিস্ট পার্টির অগ্রগতি ও ঐক্যের বয়ান জোরদার করতে শির বক্তব্য সতর্কভাবে সাজানো হয়েছিল। তিনি “ঐক্যবদ্ধ, সমৃদ্ধ, সভ্য, সম্প্রীতিপূর্ণ ও সুন্দর একটি আধুনিক সমাজতান্ত্রিক তিব্বত” গড়ার আহ্বান জানান এবং ম্যান্ডারিন চীনা ভাষার প্রসার ও তিব্বতকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে একীভূত করার তাগিদ দেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি দালাই লামার নাম উল্লেখ করেননি। তবে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর মন্তব্যকে নির্বাসিত এই আধ্যাত্মিক নেতা ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ধর্মের চীনায়ন: এর অর্থ কী?
ক্ষমতায় আসার পর থেকে শি চীনের সব ধর্মের “চীনায়ন” এগিয়ে নিয়েছেন। এর অর্থ, ধর্মীয় অনুশীলন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমিউনিস্ট পার্টির মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তিব্বতে এর ফলে মঠগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর হয়েছে, ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের ওপর নজরদারি বেড়েছে এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মকে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা চলছে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে তিব্বতি শিশুদের রাষ্ট্র পরিচালিত আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো, যেখানে শিক্ষার প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন, এবং রাষ্ট্রের অনুমোদন না থাকা ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সীমিত করা।
মানবাধিকার সংগঠন ও নির্বাসিত তিব্বতিদের মতে, এসব পদক্ষেপ তিব্বতি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় ক্ষয় করছে। উদাহরণস্বরূপ, সিচুয়ান প্রদেশের ভিক্ষুরা চলমান নিপীড়ন ও নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের দাবি, তাদের নীতির ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং চীনের অন্যতম দরিদ্র অঞ্চলে স্থিতিশীলতা এসেছে।
দালাই লামার উত্তরসূরি: আসন্ন সংঘাত
দালাই লামার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রশ্ন বেইজিং ও তিব্বতি সম্প্রদায়ের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে। তিব্বতি বৌদ্ধদের বিশ্বাস, দালাই লামার মৃত্যুর পর তিনি নতুন দেহে পুনর্জন্ম নেন। ঐতিহ্যগতভাবে জ্যেষ্ঠ ভিক্ষু ও দালাই লামার নিজস্ব দপ্তর এই প্রক্রিয়া তদারক করে। তবে চীনের আনুষ্ঠানিকভাবে নাস্তিক কমিউনিস্ট পার্টির দাবি, পরবর্তী দালাই লামাকে অনুমোদনের একমাত্র কর্তৃত্ব তাদেরই। এর ফলে তিব্বতি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নির্বাচিত একজন দালাই লামা এবং বেইজিংয়ের নিয়োগ করা আরেকজন দালাই লামার মধ্যে বিভক্তি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শির সফরের মাত্র দুই মাস আগে দালাই লামা আবারও বলেন, তাঁর উত্তরসূরি চীন নয়, তাঁর দপ্তরই নির্বাচন করবে এবং প্রক্রিয়াটি চীনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হবে। এ বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত স্মৃতিকথায় তিনি বলেন, তাঁর পুনর্জন্ম হবে “চীনের বাইরে মুক্ত বিশ্বে” এবং বেইজিংয়ের নির্বাচিত যেকোনো প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করতে অনুসারীদের আহ্বান জানান। এই ঘোষণায় দুই পক্ষের জন্যই ঝুঁকি বেড়েছে; তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দালাই লামার সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
উত্তরসূরি নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দালাই লামার উত্তরসূরি নির্বাচন শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়—তিব্বতের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের প্রতীকী লড়াইও। লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের তিব্বতবিষয়ক গবেষক রবার্ট বার্নেটের ভাষায়, “দালাই লামার উত্তরসূরি নির্বাচন একটি প্রতীকী রণক্ষেত্র এবং পার্টির জন্য তিব্বত কে শাসন করে, সে বিষয়ে মৌলিক দাবি জানানোর প্রতীকী সুযোগ।” বেইজিংয়ের কাছে উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা তার শাসনকে বৈধতা দেওয়ার এবং নির্বাসিত তিব্বতি সম্প্রদায়ের প্রভাব খর্ব করার উপায়। তিব্বতিদের কাছে এটি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আত্মীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সক্ষমতার পরীক্ষা।
তিব্বতি প্রতিনিধি ও কর্মীরা বেইজিংয়ের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের কাছে তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী চীনের “ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব”-এর স্মারক। তিব্বত অ্যাকশন ইনস্টিটিউটের এশিয়া প্রোগ্রাম ম্যানেজার এবং তিব্বতের নির্বাসিত পার্লামেন্টের সদস্য দর্জি সেতেন বলেন,
তিব্বতিদের কাছে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী উদ্যাপনের কোনো উপলক্ষ নয়; বরং এটি চীনের ঔপনিবেশিক দখলদারত্বের এক বেদনাদায়ক স্মারক। তিব্বত চীনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে, আর দালাই লামার জন্য বেইজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া উত্তরসূরি পরিকল্পনা তিব্বতিরা কখনো মেনে নেবেন না।
উন্নয়ন, অবকাঠামো ও পরিবেশগত উদ্বেগ
শির সফরে তিব্বতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বেইজিংয়ের মনোযোগও স্পষ্ট হয়েছে। ইয়ারলুং সাংপো নদীতে মোটুও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ওই অঞ্চলে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রধান প্রকল্প। কাজ শেষ হলে এটি হবে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ, যা থ্রি গর্জেস বাঁধকেও ছাড়িয়ে যাবে, এবং এর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা হবে তার তিন গুণ। বেইজিংয়ের দাবি, এই প্রকল্প স্থানীয় সমৃদ্ধি বাড়াবে এবং চীনের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে। তবে নদীর ভাটির প্রবাহের ওপর পানি ও কৃষির জন্য নির্ভরশীল ভারত ও বাংলাদেশে এটি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাঁধের পাশাপাশি চীন তিব্বতের সঙ্গে আরেক অস্থির অঞ্চল শিনজিয়াংয়ের রেল সংযোগ গড়ার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেছে। শিনজিয়াংয়ে বড় জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রয়েছে। এসব প্রকল্প তিব্বতকে চীনের বাকি অংশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করা, সম্পদ আহরণ সহজ করা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তবে সমালোচকদের যুক্তি, এ ধরনের উন্নয়ন প্রায়ই স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ক্ষতির বিনিময়ে হয় এবং তিব্বতিদের প্রয়োজন মেটানোর বদলে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে।
সীমান্ত উত্তেজনা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ভারতের সীমান্তে তিব্বতের কৌশলগত অবস্থান অঞ্চলটিকে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধপূর্ণ সীমান্তে চীন ও ভারতের সেনাদের সংঘর্ষ হয়েছে এবং উভয় পক্ষই ওই অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন জোরদার করেছে। শির সফরের সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ২০২০ সালের প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আলোচনার জন্য ভারতে ছিলেন। দুই সফরের সময়সূচি বেইজিংয়ের কাছে পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত করা ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার গুরুত্ব তুলে ধরে।
মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও নিয়ন্ত্রণের সীমা
অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে বেইজিংয়ের দাবির পরও তিব্বত চীনের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর একটি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মাচরণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধের তথ্য নথিবদ্ধ করেছে। তিব্বতে হান চীনাদের অভিবাসন, তিব্বতি শিশুদের ম্যান্ডারিন ভাষার আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এমন কর্মকাণ্ড দমন—সবকিছুই তিব্বতিদের মধ্যে সাংস্কৃতিক পরিচয় ক্ষয়ের অনুভূতি তৈরি করেছে।
২০০৮ সালের বিক্ষোভ ও পরবর্তী দমন-পীড়নের পর তিব্বতে নিপীড়ন আরও পদ্ধতিগত হয়েছে; বেড়েছে নজরদারি ও পুলিশি তৎপরতা, আর জাতিগত সংখ্যালঘুদের আত্মীকরণের প্রচেষ্টাও জোরদার হয়েছে। চীনা সরকারের যুক্তি, বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকানো ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব পদক্ষেপ জরুরি। তবে সমালোচকদের মতে, এগুলো তিব্বতি জনগণের “হৃদয় ও মন জয়” করতে বেইজিংয়ের ব্যর্থতারই প্রমাণ। নির্বাসনে থাকা দালাই লামার দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন,
চীন এখন রক্ষণাত্মক অবস্থানে পড়েছে। ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে নির্বাচিত উত্তরসূরি থাকবেন বলে দালাই লামার দৃঢ় অবস্থানের পর, তিব্বতে নিজেদের দখলদারত্ব বৈধতা দেওয়ার আরেকটি চেষ্টা হলো শির সফর।
সংক্ষেপে
- প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিরল তিব্বত সফরে তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল অঞ্চলটির ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা।
- দালাই লামার উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সফরটি হয়। পরবর্তী আধ্যাত্মিক নেতা নির্বাচনের অধিকার বেইজিং ও নির্বাসিত তিব্বতি সম্প্রদায়—দুই পক্ষই দাবি করছে।
- শি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতিগত ঐক্য ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের “চীনায়ন”-এর ওপর জোর দিয়ে ধর্মীয় অনুশীলনকে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানান।
- বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প চীনের কাছে তিব্বতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে, তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে উদ্বেগও তৈরি করেছে।
- মানবাধিকার সংগঠন ও তিব্বতি কর্মীরা এই সফরকে চীনের শাসন বৈধতা দেওয়া এবং তিব্বতি সংস্কৃতি ও পরিচয় দমনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
- তিব্বত ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূরাজনীতির দিক থেকে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অঞ্চল। বেইজিংয়ের কর্তৃত্ব এবং স্বায়ত্তশাসন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য তিব্বতিদের আকাঙ্ক্ষার চলমান সংঘাতই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।






