নিসানের ওপ্পামা কারখানা বন্ধ: জাপানের উৎপাদনশিল্পের ঐতিহ্যে এক সন্ধিক্ষণ

পড়তে 8 মিনিট
নিসানের ওপ্পামা কারখানা বন্ধ: জাপানের উৎপাদনশিল্পের ঐতিহ্যে এক সন্ধিক্ষণ

এক যুগের অবসান: ২০২৮ সালের মধ্যে নিসানের ওপ্পামা কারখানা বন্ধ

জাপানের শিল্প-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে নিসান মোটর কোম্পানি নিশ্চিত করেছে, কানাগাওয়া প্রিফেকচারের ইয়োকোসুকায় তাদের ঐতিহ্যবাহী ওপ্পামা কারখানাটি ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হবে। একসময় জাপানের যুদ্ধোত্তর উৎপাদনসক্ষমতা ও উদ্ভাবনের প্রতীক ছিল এই কারখানা। ওপ্পামা কারখানা বন্ধ হওয়া নিছক করপোরেট পুনর্গঠন নয়; এটি বিশ্ব গাড়িশিল্প এবং সেখানে জাপানের অবস্থানকে নতুন করে গড়ে তোলা গভীর পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।

সূচিপত্র
  1. এক যুগের অবসান: ২০২৮ সালের মধ্যে নিসানের ওপ্পামা কারখানা বন্ধ
  2. নিসান কেন ওপ্পামা কারখানা বন্ধ করছে?
  3. ইয়োকোসুকা ও এর বাইরের অঞ্চলে মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
  4. যুদ্ধোত্তর বিস্ময় থেকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: ওপ্পামার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
  5. সম্প্রদায়ের কণ্ঠ: গর্ব ও অনিশ্চয়তা
  6. এরপর কী? উৎপাদন স্থানান্তর ও কারখানার ভবিষ্যৎ
  7. দায়িত্বশীল পুনর্গঠন ও সম্প্রদায়ের পাশে থাকা
  8. বৃহত্তর তাৎপর্য: জাপানের উৎপাদন খাতের পতন ও বৈশ্বিক গাড়িশিল্প
  9. সংক্ষেপে

১৯৬১ সালে চালু হওয়া ওপ্পামা ছিল নিসানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত সংযোজন কারখানা। অল্প সময়েই এটি কোম্পানির “মাদার প্ল্যান্ট” হিসেবে পরিচিতি পায়। ৬৪ বছরের ইতিহাসে এখানে ১ কোটি ৭৮ লাখেরও বেশি গাড়ি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিসানের বহুল সমাদৃত কয়েকটি মডেল, যেমন ব্লুবার্ড, মার্চ, কিউব এবং পথিকৃৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি লিফ। নিসানের ব্যাপক বৈশ্বিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কারখানাটি বন্ধ হচ্ছে। বছরের পর বছর বিক্রি কমা, ঋণের বোঝা বাড়া এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তীব্র প্রতিযোগিতার পর উৎপাদন সহজ করা, খরচ কমানো ও লাভজনকতা ফিরিয়ে আনাই এ পরিকল্পনার লক্ষ্য।

নিসান কেন ওপ্পামা কারখানা বন্ধ করছে?

অর্থনৈতিক চাপ, শিল্পখাতের পরিবর্তন এবং কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা—এই কয়েকটি বিষয় মিলেই ওপ্পামা বন্ধের সিদ্ধান্ত এসেছে। একসময় বৈশ্বিক গাড়িশিল্পের উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেওয়া নিসান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক ধাক্কার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিক্রি কমেছে। একই সঙ্গে ইভি প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং টেসলা ও চীনা গাড়ি নির্মাতাদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে কোম্পানিটি।

নিসানের প্রধান নির্বাহী ইভান এস্পিনোসার ভাষায়, কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তটি “আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত”; তবে কোম্পানির টিকে থাকা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য এটি জরুরি। “রি:নিসান” পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার আওতায় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের বৈশ্বিক উৎপাদনক্ষমতা ৩৫ লাখ থেকে কমিয়ে ২৫ লাখ গাড়িতে নামাবে (চীন বাদে) এবং বিশ্বজুড়ে উৎপাদন কারখানার সংখ্যা ১৭ থেকে কমিয়ে ১০-এ আনবে। বার্ধক্যজনিত অবকাঠামো, উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং দক্ষতা ও লাভজনকতা বাড়ানোর প্রয়োজনের কারণে ওপ্পামা কারখানা এবং নিসানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিসান শাতাইয়ের শোনান কারখানাটি বন্ধের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ওপ্পামায় শুধু নোট ও নোট অরা মডেল তৈরি হয়। অথচ ২০১৯ সালেও এখানে পাঁচটি মডেল তৈরি করা হতো। কারখানাটির উৎপাদনক্ষমতার ব্যবহার নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। এর পেছনে রয়েছে দেশে দুর্বল চাহিদা এবং জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের উৎপাদন বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার বৃহত্তর প্রবণতা। জাপানে নিসানের বার্ষিক উৎপাদন ১৯৯০-এর দশকে ২০ লাখের বেশি গাড়ি থেকে কমে ২০২৪ সালে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এখন কোম্পানির বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র ২০ শতাংশ জাপানে তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

ইয়োকোসুকা ও এর বাইরের অঞ্চলে মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

ওপ্পামা কারখানা বন্ধ হলে ইয়োকোসুকা শহর ও আশপাশের অঞ্চলে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। নিসান শহরটির শীর্ষ নিয়োগদাতা এবং বৃহত্তম করদাতাদের একটি। কারখানাটিতে সরাসরি প্রায় ২,৪০০ জন কাজ করেন। সরবরাহকারী, উপঠিকাদার ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরও হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানে সহায়তা করে কোম্পানিটি। ধারণা করা হয়, ওপ্পামার ২৯,৭০০ বাসিন্দার প্রায় ১০ শতাংশই নিসানে কর্মরত।

স্থানীয় কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ধাক্কার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কানাগাওয়ার গভর্নর ইউজি কুরোইওয়া তাঁর প্রশাসনকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং প্রভাব কমাতে নিসানের সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। নিসানের ১৩ হাজার ব্যবসায়িক অংশীদারের মধ্যে ১,৭০০টিরও বেশি এ অঞ্চলে রয়েছে। এর প্রভাব পড়বে বেন্টো খাবারের দোকান ও বিপণিবিতান-সড়ক থেকে শুরু করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং সেবা খাতের ব্যবসা পর্যন্ত। এসব ব্যবসার অনেকগুলোই কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি; কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।

কর্মীদের জন্য এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের কোম্পানির ভেতরে বা অন্য কোথাও নতুন কাজ খুঁজে পেতে স্বেচ্ছায় বদলি, নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নিসান। বিশেষ করে প্রশাসনিক কর্মীদের জন্য আগাম অবসরের প্যাকেজ দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেকের জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া বা নিসানের অন্য কারখানায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করার সম্ভাবনা দুশ্চিন্তার। দীর্ঘদিনের এক কর্মী রয়টার্সকে বলেন, “যেসব কর্মীর পরিবার ও সন্তান আছে, যারা বাড়ি কিনেছেন এবং যাদের বন্ধকী ঋণ শোধ করতে হবে, তাদের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। উপঠিকাদারদেরও কঠিন সময় যাবে।”

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধোত্তর বিস্ময় থেকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: ওপ্পামার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ওপ্পামা কারখানার ইতিহাস জাপানের উৎপাদনশিল্পের পরাশক্তি হয়ে ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাবেক নৌবাহিনীর বিমানঘাঁটি ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরিত্যক্ত সরঞ্জাম রাখার জায়গার ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটি প্রতিকূলতাকে সুযোগে রূপান্তরের জাপানি সক্ষমতার সাক্ষ্য। এখানে একই সংযোজন লাইনে একাধিক মডেল তৈরির সুযোগ দিয়ে মিশ্র-প্রবাহ সংযোজন পদ্ধতির পথ দেখানো হয়েছিল, যা সে সময় ছিল বড় ধরনের উদ্ভাবন। কারখানাটিতে ছিল চার কিলোমিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক পথ, মাসে ৮০ হাজার গাড়ি জাহাজে তোলার উপযোগী জেটি এবং গবেষণা ও দুর্ঘটনা-পরীক্ষার উন্নত সুবিধা।

ওপ্পামাতেই জন্ম নিসান লিফের, বিশ্বের প্রথম গণহারে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক গাড়ির। ২০১০ সালে বাজারে আসার পর এটি টেসলার কাছে শীর্ষস্থান হারানোর আগে বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক বিক্রীত ইভিতে পরিণত হয়। কারখানাটির মোটরস্পোর্টস কর্মসূচি ৫১০ ব্লুবার্ড ও ২৪০জেডের মতো মডেলের মাধ্যমে নিসানের আন্তর্জাতিক র‍্যালি সাফল্যের পথ তৈরি করেছিল। কয়েক দশক ধরে কারখানাটি ইয়োকোসুকাবাসীর গর্বের উৎস ছিল। স্কুলের পাঠ্যবইয়েও এর উল্লেখ থাকত। শহরটির সামরিক অর্থনীতি থেকে বেসামরিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছে এটি।

তবে ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও গাড়িশিল্পে জাপানের প্রাধান্য কমার সঙ্গে সঙ্গে ওপ্পামার মতো কারখানার গুরুত্বও কমেছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, বিদেশে উৎপাদন এবং নতুন প্রতিযোগীদের উত্থান সেই সুবিধাগুলো ক্ষয় করেছে, যা একসময় জাপানের উৎপাদন খাতকে বিশ্বের ঈর্ষার কারণ করে তুলেছিল।

সম্প্রদায়ের কণ্ঠ: গর্ব ও অনিশ্চয়তা

ইয়োকোসুকার অনেক মানুষের কাছে কারখানা বন্ধের বিষয়টি ব্যক্তিগত। স্টেশনের কাছে পরিবারের ১৯২৫ সাল থেকে চালানো দাঁড়িয়ে পান করার বারের মালিক আকিও কামাতাকি কারখানাটির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন:

ওপ্পামা কারখানা স্থানীয়দের গর্বের উৎস। আমি এখনো নিসানের গাড়ি কিনি, আর গাড়িগুলো আমার পছন্দ। সম্প্রতি অন্য কোনো ব্র্যান্ড চালাইনি, তবে নিসানের ব্রেক আমার ভালো লাগে—যেভাবে সাড়া দেয়।

অন্যরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। স্থানীয় একটি পরিবহন কোম্পানির কর্মী কুনিতো ওয়াতানাবে বলেন,

এখানে যত দিন তারা গাড়ি তৈরি করবে, তত দিন আমরা ঠিক আছি। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ হলে আমার কোম্পানিও বন্ধ হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

এরপর কী? উৎপাদন স্থানান্তর ও কারখানার ভবিষ্যৎ

পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নিসান নোট ও নোট অরা মডেলের উৎপাদন ফুকুওকা প্রিফেকচারের আরও দক্ষ কিউশু কারখানায় সরিয়ে নেবে। ওপ্পামার উৎপাদনের বড় অংশ এই কারখানায় নেওয়ার কথা রয়েছে। এর লক্ষ্য, কারখানাটির সক্ষমতার ব্যবহার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা এবং জাপানে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমানো। সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ পাওয়া এবং পরীক্ষামূলক পথ থাকা তোচিগি কারখানাটি চালু থাকবে; সেখানে লিফসহ অন্যান্য মডেলের উৎপাদন চলবে।

ওপ্পামা এলাকার অন্যান্য স্থাপনা—যেমন নিসান গবেষণা কেন্দ্র, গ্র্যান্ড্রাইভ পরীক্ষামূলক পথ, দুর্ঘটনা-পরীক্ষা কেন্দ্র এবং ওপ্পামা জেটি—চালু থাকবে। প্রধান কারখানার জায়গাটি নতুন কাজে ব্যবহারের নানা বিকল্প খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে নিসান। এর মধ্যে বাইরের অংশীদারদের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতাও রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে কারখানাটি ব্যবহারের জন্য তাইওয়ানের ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট ফক্সকনের সঙ্গে আলোচনার খবর এসেছিল। এতে কারখানাটি বন্ধ হওয়া এড়াতে পারত। আলোচনা থেকে কোনো চুক্তি হয়নি। তবে ইভির যুগে খাপ খাইয়ে নিতে প্রচলিত গাড়ি নির্মাতাদের মধ্যে বিভিন্ন শিল্পখাতের অংশীদারত্ব বাড়ার প্রবণতা এতে স্পষ্ট হয়।

দায়িত্বশীল পুনর্গঠন ও সম্প্রদায়ের পাশে থাকা

পরিবর্তনের সময় দায়িত্বশীল পুনর্গঠন ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অঙ্গীকারের ওপর জোর দিয়েছে নিসান। কর্মীদের ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করতে এবং ইয়োকোসুকা ও আশপাশের এলাকায় অর্থনৈতিক প্রভাব কমাতে কোম্পানিটি শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রধান নির্বাহী ইভান এস্পিনোসা কর্মী, স্থানীয় সম্প্রদায় ও অংশীদারদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পরিবর্তনের এই সময়ে নিসান ওপ্পামা এলাকায় উপস্থিতি বজায় রাখবে এবং সম্প্রদায়কে সহায়তা করবে।

বিজ্ঞাপন

বৃহত্তর তাৎপর্য: জাপানের উৎপাদন খাতের পতন ও বৈশ্বিক গাড়িশিল্প

ওপ্পামা কারখানা বন্ধ হওয়া জাপানের উৎপাদন খাত ও বৈশ্বিক গাড়িশিল্পে চলমান বৃহত্তর প্রবণতারই প্রতীক। একসময় চিপ, টিভি ও গাড়িসহ নানা পণ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ ছিল জাপান। এখন বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল ইভি বাজারে বিদেশি প্রতিযোগীদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দেশটি। নতুন প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ, ক্রেতাদের বদলে যাওয়া পছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং শুল্ক ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নের মতো ভূরাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার প্রয়োজন নিয়ে জাপানের গাড়ি নির্মাতারা হিমশিম খাচ্ছেন।

বছরের পর বছর ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা, ব্যর্থ অংশীদারত্ব এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার পর প্রাসঙ্গিকতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা হিসেবে পুনর্গঠনে নেমেছে নিসান। দেশে কর্মী ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধে কোম্পানির সম্মতি জাপানের প্রচলিত আজীবন চাকরির মডেল এবং দেশটির যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক বিস্ময়ের ভিত্তি গড়ে দেওয়া সামাজিক চুক্তি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।

শিল্পখাতের বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন একীভূত করা এবং আরও মিতব্যয়ী ও দক্ষ উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া নিসানের লাভজনকতা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের ভালোভাবে প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে এই পরিবর্তন সহজ হবে না; ইয়োকোসুকার মতো সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে।

সংক্ষেপে

  • বৈশ্বিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কানাগাওয়া প্রিফেকচারের ইয়োকোসুকায় নিসানের ঐতিহ্যবাহী ওপ্পামা কারখানা ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে বন্ধ হবে।
  • কারখানা বন্ধ হলে সরাসরি প্রায় ২,৪০০ কর্মী এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। উৎপাদন কিউশু কারখানায় সরিয়ে নেওয়া হবে।
  • ১৯৬১ সাল থেকে ওপ্পামায় ১ কোটি ৭৮ লাখের বেশি গাড়ি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রথম গণহারে উৎপাদিত ইভি নিসান লিফেরও জন্ম এখানে।
  • দেশীয় চাহিদা কমা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়াসহ জাপানের উৎপাদন খাতের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জগুলো এই সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে।
  • ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সহায়তা এবং কারখানার জায়গার ভবিষ্যৎ ব্যবহার খতিয়ে দেখতে নিসান স্থানীয় কর্মকর্তা ও শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করছে। এদিকে এলাকার অন্যান্য গবেষণা ও পরীক্ষা কেন্দ্র চালু থাকবে।
  • এই বন্ধের মধ্য দিয়ে নিসান ও জাপানের শিল্প-ঐতিহ্য—উভয়ের জন্যই এক সন্ধিক্ষণ এসেছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও এতে স্পষ্ট।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে