চীনের শেয়ারবাজারের পুনরুত্থান: ২০২৫ সালের উত্থানের পেছনে কী?
বছরের পর বছর অস্থিরতা ও দুর্বল পারফরম্যান্সের পর ২০২৫ সালে চীনের শেয়ারবাজার উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বেঞ্চমার্ক সিএসআই ৩০০ সূচক এপ্রিলে সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে, আর সাংহাই কম্পোজিট চার বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বড় কোনো নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থা বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত বাণিজ্যচুক্তি ছাড়াই এই উত্থান ঘটছে। এর বদলে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ তারল্য, পরিবারের বিনিয়োগের ধরনে পরিবর্তন এবং লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত সহায়তা চীন ও বিদেশের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করছে।
সূচিপত্র
- চীনের শেয়ারবাজারের পুনরুত্থান: ২০২৫ সালের উত্থানের পেছনে কী?
- এখন চীনা শেয়ারের দাম বাড়ছে কেন?
- সরকারি নীতি কীভাবে বাজারকে প্রভাবিত করছে?
- হংকংয়ের ভূমিকা ও দ্বৈত তালিকাভুক্তি
- কোন খাতগুলো এই উত্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে?
- এই উত্থানে কি ঝুঁকি রয়েছে?
- বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এর অর্থ কী?
- বৃহত্তর অর্থনীতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?
- বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: এই উত্থান কি টেকসই?
- সংক্ষেপে
২০২৫ সালের শুরুর দিকে চীনের শেয়ারবাজারের বাজারমূলধন ১১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী শেয়ারবাজারগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। এই পুনরুত্থানের দিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী, নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকেরা গভীরভাবে নজর রাখছেন, কারণ এটি চীনের আর্থিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় বৃহত্তর উন্নতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
এখন চীনা শেয়ারের দাম বাড়ছে কেন?
চীনা শেয়ারের বর্তমান উত্থানটি ধীরগতির, কিন্তু ধারাবাহিক। আগের অনেক ঊর্ধ্বমুখী বাজারের মতো নয়, যেগুলো প্রায়ই সরকারের জোরালো প্রণোদনা বা জল্পনামূলক উন্মাদনায় চালিত হয়েছে; এই পুনরুত্থানের ভিত্তি কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন:
- পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ তারল্য: চীনা পরিবারগুলোর কাছে রেকর্ড পরিমাণ সঞ্চয় রয়েছে, যা বছরের পর বছর সতর্ক ব্যয় এবং মহামারিকালীন অনিশ্চয়তার উত্তরাধিকার। সুদের হার কমছে এবং প্রচলিত সঞ্চয়ী পণ্য থেকে সামান্য মুনাফা আসছে বলে অনেকেই ভালো মুনাফার আশায় শেয়ারবাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
- মার্জিন ঋণের উল্লম্ফন: শেয়ার কেনার জন্য ধার করা অর্থ, অর্থাৎ মার্জিন ঋণের পরিমাণ ২০১৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি খুচরা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। চীনের বাজারে দৈনিক লেনদেনে তাঁদেরই আধিপত্য।
- লেনদেনের পরিমাণ ও খুচরা বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি: মূল ভূখণ্ডের এক্সচেঞ্জগুলোতে মাসিক গড় লেনদেন বাড়ছে, আর ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের পছন্দের স্মল-ক্যাপ সূচকগুলো বহু বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আশাবাদ এবং অর্থ সরবরাহের জোরালো প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে খুচরা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলে আশা করছে সিন্ডা সিকিউরিটিজ।
- অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা ও মূল্যযুদ্ধ ঠেকাতে নীতিগত পদক্ষেপ: গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে অতিরিক্ত মূল্য প্রতিযোগিতা ও অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা কমাতে বেইজিং পদক্ষেপ নিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা একে মূল্যহ্রাসের চাপ কমানো ও কোম্পানিগুলোর আয় বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
- যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে উন্নত মনোভাব: পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যচুক্তি এখনো অধরা থাকলেও শুল্ক বৃদ্ধির পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে বিরতি এবং সম্পর্ক উন্নতির ইঙ্গিত ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
সাংহাই চেংঝৌ ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ফু ঝিফেং বলেন,
কম সুদের হার, ভালো বিনিয়োগের সুযোগের অভাব এবং অতিরিক্ত তারল্যের প্রেক্ষাপটে উচ্চ ঝুঁকি নিতে আগ্রহী তহবিলগুলো ধীরে ধীরে শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। প্রবণতাটি কেবল গতি পেতে শুরু করেছে, এবং শিগগিরই এটি উল্টে যাওয়ার কোনো সংকেত আমি দেখছি না।
সরকারি নীতি কীভাবে বাজারকে প্রভাবিত করছে?
বেইজিং বিপুল অঙ্কের নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা না করলেও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত সহায়তা বাজারের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডসহ বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন (সিএসআরসি) এখন বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা কোম্পানিগুলোকে নতুন পলিসি প্রিমিয়ামের ৩০ শতাংশ চীনে তালিকাভুক্ত শেয়ারে বিনিয়োগ করতে বলেছে। আর মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে তিন বছর ধরে প্রতিবছর শেয়ার ধারণ ১০ শতাংশ বাড়াতে হবে। এসব ব্যবস্থার ফলে প্রতিবছর অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান অভ্যন্তরীণ শেয়ারে বিনিয়োগ হতে পারে, যা চাহিদার ধারাবাহিক উৎস জোগাবে।
এ ছাড়া সরকারের “ভোগ বাড়ানোর কর্মপরিকল্পনা”র লক্ষ্য হলো পরিবারের আয় বাড়ানো, ব্যয়ক্ষমতা রক্ষা করা এবং প্রযুক্তি, ভোগ্যপণ্য ও সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সহায়তা করা। গাড়ি ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির মতো বড় কেনাকাটায় ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণের মাধ্যমে চাহিদা বাড়ানো ও সম্পদ বৃদ্ধির এমন প্রভাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভোগ ও বিনিয়োগ—দুটোকেই সহায়তা করবে।
নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে, নাসডাকের আদলে গড়ে তোলা চীনের স্টার মার্কেট পুনরুজ্জীবিত বিধির আওতায় প্রথম লোকসানি আইপিও অনুমোদন করেছে। এতে উদ্ভাবনী হলেও লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নতুন করে সমর্থনের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন উৎসাহিত করা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতগুলোতে পুঁজি আকৃষ্ট করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।
হংকংয়ের ভূমিকা ও দ্বৈত তালিকাভুক্তি
চীনের শেয়ারবাজারের পুনরুত্থান থেকে হংকংয়ের পুঁজিবাজারও উপকৃত হচ্ছে। মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নীতিগত প্রণোদনায় হংকংয়ে দ্বৈত তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী এ-শেয়ার তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতে। হংকং এক্সচেঞ্জেস অ্যান্ড ক্লিয়ারিং (এইচকেএক্স) যোগ্য কোম্পানিগুলোর জন্য দ্রুত পর্যালোচনার ব্যবস্থা চালু করেছে। শহরটি উন্নত প্রযুক্তি ও বায়োটেক আইপিওর বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। ২০২৫ সালের বিশ্বের বৃহত্তম আইপিও—সিএটিএলের বাজারে প্রবেশ—অর্থ সংগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের নতুন প্রাণশক্তি তুলে ধরেছে।
কোন খাতগুলো এই উত্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে?
২০২৫ সালে চীনের বাজারে প্রবৃদ্ধির অগ্রভাগে রয়েছে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার। প্রযুক্তিনির্ভর স্টার ৫০ সূচক এবং সেমিকন্ডাক্টর শেয়ার অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে, যা উদ্ভাবন ও ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের প্রতিফলন। আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো বড় চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। শক্তিশালী আয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অগ্রগতির সুবাদে বছরের শুরু থেকে আলিবাবার শেয়ার ৭০ শতাংশ বেড়েছে, আর টেনসেন্টের বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
এফটিএসই চায়না ৫০ সূচক অনুসরণকারী আইশেয়ার্স চায়না লার্জ-ক্যাপ ইটিএফ (এফএক্সআই) বছরের শুরু থেকে ২৬ শতাংশের বেশি মুনাফা দিয়েছে, যা এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর মতো মার্কিন বেঞ্চমার্ক সূচকগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এই পারফরম্যান্সে কিছু বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী প্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা ও টেলিযোগাযোগের মতো গতিশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পেতে মার্কিন শেয়ারের বরাদ্দ কমিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকেছেন।
সরকারি প্রণোদনা ও পরিবারের আয় বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছে ভোক্তাকেন্দ্রিক কোম্পানিগুলোও। ২০২৫ সালের প্রণোদনা পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকে ভোগ্যপণ্যের খাত সামগ্রিক বাজারের চেয়ে ভালো করেছে। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও পর্যটন খাতে বিশেষভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ভোগ্যপণ্যের জন্য সরকারের পুরোনো পণ্য বদলে নতুন পণ্য কেনার কর্মসূচি এবং বর্ধিত ভর্তুকি এসব খাতে চাহিদা আরও বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উত্থানে কি ঝুঁকি রয়েছে?
ইতিবাচক গতি সত্ত্বেও এই উত্থান কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, কোম্পানিগুলোর আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অর্থবহ পুনরুদ্ধার ছাড়া এই প্রবৃদ্ধি ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। চীনের অর্থনীতি এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে, যেমন:
- মূল্যহ্রাসের চাপ: দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদা কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে।
- আবাসন খাতের মন্দা: চীনে পরিবারের সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত। এই খাতের চলমান দুর্বলতা ভোক্তা আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
- সরকারি ঋণ ও জনমিতি: স্থানীয় সরকারের উচ্চ ঋণ এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
- ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা: বাণিজ্য বিরোধ ও নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ঘিরে, বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে।
চ্যানসন অ্যান্ড কোম্পানির এক বিশ্লেষক বলেন,
বিভিন্ন খাতের পারফরম্যান্সের মধ্যে ব্যবধান দেখায় যে বাজারে এখনো সার্বিক উন্নতি হয়নি। আয় ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অর্থবহ পুনরুদ্ধার ছাড়া এই উত্থান টেকার সম্ভাবনা কম।
এ ছাড়া বাজার এখনো খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল; দৈনিক লেনদেনের ৭০ শতাংশ তাঁদের দখলে। প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বাড়লেও খুচরা লেনদেনের আধিপত্য অস্থিরতা ও জল্পনামূলক ওঠানামা বাড়াতে পারে।
বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এর অর্থ কী?
চীনের শেয়ারবাজারের পুনরুত্থান বৈশ্বিক পুঁজিপ্রবাহের ধরন বদলে দিচ্ছে। স্থবিরতা-সহ-মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা ও বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে মার্কিন শেয়ারের ওপর চাপ বাড়ায়, বিনিয়োগকারীরা প্রবৃদ্ধির সুযোগ খুঁজতে ক্রমেই চীন ও অন্যান্য উদীয়মান বাজারের দিকে তাকাচ্ছেন। মার্কিন সমতুল্য কোম্পানিগুলোর তুলনায় চীনা শেয়ারের মূল্যায়ন ঐতিহাসিকভাবে কম, আর অনেক শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি জোরেশোরে নিজেদের শেয়ার কিনে নিচ্ছে, যা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়।
চীনা শেয়ারে বিদেশি পুঁজি ফিরতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত প্রবৃদ্ধিশীল শেয়ারে ৫৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে। এফএক্সআইয়ের মতো ইটিএফ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চীনের বৃহত্তম ও সবচেয়ে গতিশীল কোম্পানিগুলোতে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ দেয়, বিদেশি বাজারে আলাদা করে শেয়ার কেনার জটিলতা ছাড়াই।
তবে চীনে বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, করপোরেট সুশাসনের মানদণ্ডে পার্থক্য এবং মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও ধরে রাখা এবং চীনের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বাহ্যিক বিষয়গুলোর দিকে সতর্ক নজর রাখা জরুরি।
বৃহত্তর অর্থনীতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?
শেয়ারবাজারের পুনরুদ্ধার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও পুনরুজ্জীবিত করতে চীনা নীতিনির্ধারকদের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। সরকারের মনোযোগ সরবরাহমুখী বিনিয়োগ থেকে চাহিদামুখী সহায়তার দিকে সরে গেছে। পরিবারের আয় বাড়ানো, ভোগে সহায়তা এবং উদ্ভাবন উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সরকারি কর্মপ্রতিবেদনে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বচালিত গাড়ি ও ডিজিটাল পরিষেবার মতো নতুন শিল্পে সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো আবাসন ও শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হওয়ার সুফল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ চীনে পরিবারের সম্পদের ৭০ শতাংশের বেশি আবাসনসম্পদ। গৃহঋণের সুদের হার কমানো, উন্নয়নের জন্য অব্যবহৃত জমি অধিগ্রহণ এবং শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করার নীতি—সবই ইতিবাচক সম্পদ-প্রভাব সৃষ্টি ও ব্যয় বাড়ানোর কৌশলের অংশ।
অতিরিক্ত বিনিয়োগ এড়াতে পরিপক্ব শিল্পগুলোতে সরবরাহমুখী সংস্কারও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে; একই সঙ্গে উদীয়মান খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি উৎসাহিত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরির লক্ষ্যে সরকার পর্যটন, সংস্কৃতি এবং বিদেশে চীনা ব্র্যান্ডের সম্প্রসারণে উৎসাহ দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: এই উত্থান কি টেকসই?
সিটিগ্রুপ ও গোল্ডম্যান স্যাকসসহ বড় ব্যাংকগুলোর বাজার কৌশলবিদেরা ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার উন্নতি ও নীতিগত সহায়তার কথা উল্লেখ করে চীনা শেয়ার সম্পর্কে তাঁদের পূর্বাভাস উন্নত করেছেন। স্থানীয় বিমা তহবিল ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বাড়তি স্থিতিশীলতা জোগাচ্ছে। চায়না ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটালের বিশ্লেষকদের ধারণা, শেয়ারে বিনিয়োগে বাসিন্দাদের আগ্রহ বাড়তে থাকায় এই উত্থান এখনো শেষ হয়নি।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, বাজারের পুনরুদ্ধার সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে চীনের অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলো—যেমন পরিবারের আয়ের দুর্বল প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ এবং জনমিতির পরিবর্তন—সমাধান করতে হবে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে,
এই প্রচেষ্টার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পেতে চীনকে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সামষ্টিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবে শেয়ারবাজার নয়, বরং পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থানই ভোগকে চালিত করেছে।
আপাতত তারল্য, নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগকারীদের আশাবাদের সমন্বয়ে চীনা শেয়ারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিকে কোম্পানির আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবারের সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী উন্নতিতে রূপ দেওয়াই এখন চ্যালেঞ্জ।
সংক্ষেপে
- ২০২৫ সালে চীনের শেয়ারবাজার শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে; প্রধান সূচকগুলো সাম্প্রতিক সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে দুই অঙ্কের হারে বেড়েছে।
- পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ তারল্য, শেয়ারে পরিবারের বাড়তি বিনিয়োগ এবং লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি নীতি এই উত্থানের চালিকা শক্তি।
- প্রযুক্তি ও ভোগ্যপণ্যের খাত প্রবৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে; আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে।
- দ্বৈত তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোর জন্য নীতিগত সহায়তার ফলে হংকংয়ের আইপিও বাজারও উপকৃত হচ্ছে।
- অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, আবাসন বাজারের দুর্বলতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাসহ ঝুঁকি রয়ে গেছে।
- কম মূল্যায়ন ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনায় আকৃষ্ট হয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা চীনে পুঁজি পুনর্বণ্টন করছেন; তবে নিয়ন্ত্রক ও বাজারসংক্রান্ত ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের সতর্ক থাকতে হবে।
- এই উত্থানের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কোম্পানিগুলোর আয়ের উন্নতি এবং অব্যাহত নীতিগত সহায়তার ওপর।






