অ্যান্টার্কটিকায় রাশিয়া ও চীনের বিস্তার: বিজ্ঞান, কৌশল ও বরফাচ্ছাদিত মহাদেশের ভবিষ্যৎ

পড়তে 8 মিনিট
অ্যান্টার্কটিকায় রাশিয়া ও চীনের বিস্তার: বিজ্ঞান, কৌশল ও বরফাচ্ছাদিত মহাদেশের ভবিষ্যৎ

সন্ধিক্ষণে অ্যান্টার্কটিকা: রাশিয়া ও চীনের বিস্তার ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা

বিশ্বের সর্বশেষ বিশাল প্রাকৃতিক বন্যভূমি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত অ্যান্টার্কটিকা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। বরফাচ্ছাদিত মহাদেশটিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে রাশিয়া ও চীনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দুই দেশই তাদের কর্মকাণ্ডকে শান্তিপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক বলে দাবি করলেও, অনেক পর্যবেক্ষকের আশঙ্কা, তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা গবেষণার গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থা এবং পৃথিবীর অন্যতম ভঙ্গুর পরিবেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সূচিপত্র
  1. সন্ধিক্ষণে অ্যান্টার্কটিকা: রাশিয়া ও চীনের বিস্তার ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
  2. রাশিয়া ও চীনের অ্যান্টার্কটিকা বিস্তারের পেছনে কী কারণ?
  3. অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থা: রক্ষাকবচ, নাকি কাগুজে বাঘ?
  4. বিজ্ঞান, নাকি কৌশল? দ্বৈত ব্যবহারের জটিলতা
  5. সম্পদের প্রতিযোগিতা: তেল, খনিজ ও ক্রিল
  6. ২০৪৮ সালের প্রশ্ন: খনন নিষিদ্ধের বিধান কি টিকবে?
  7. ভূরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি হ্রাস
  8. সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও অ্যান্টার্কটিক চুক্তির ভবিষ্যৎ
  9. পরিবেশগত ঝুঁকি: সর্বশেষ বন্যভূমি রক্ষা
  10. সংক্ষেপে

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের ষষ্ঠ স্থায়ী গবেষণাকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা এবং দূরপাল্লার উড়োজাহাজের জন্য নতুন রানওয়ে নির্মাণসহ রাশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্র আবার চালু ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ। এমন সময়ে এই উন্নয়নগুলো ঘটছে, যখন অ্যান্টার্কটিকা-সংক্রান্ত বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্রের মেরুবিজ্ঞান বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁটের মুখে পড়েছে। এতে শূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা পূরণে অন্য দেশগুলো এগিয়ে আসতে পারে।

রাশিয়া ও চীনের অ্যান্টার্কটিকা বিস্তারের পেছনে কী কারণ?

আনুষ্ঠানিকভাবে, রাশিয়া ও চীন উভয়ই তাদের অ্যান্টার্কটিকা-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডকে বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরে, যা ১৯৫৯ সালের অ্যান্টার্কটিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই চুক্তিতে মহাদেশটিকে শান্তি ও বিজ্ঞানের জন্য নিবেদিত একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ গভীরভাবে দেখলে আরও জটিল চিত্র সামনে আসে।

মেরি বার্ড ল্যান্ডে পরিকল্পিত চীনের নতুন কেন্দ্রটি হবে মহাদেশে দেশটির ষষ্ঠ গবেষণাকেন্দ্র এবং সেখানে ২৫ জন পর্যন্ত গবেষক কাজ করতে পারবেন। চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি, কেন্দ্রটি জলবায়ু ও সামুদ্রিক গবেষণায় মনোযোগ দেবে; তারা কোনো “ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য” থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড ও রাশিয়ার ঘাঁটির কাছাকাছি এর অবস্থান নানা প্রশ্ন তুলেছে, বিশেষ করে এর উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ সক্ষমতার কারণে। কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষকের উদ্বেগ, সামরিক নজরদারি বা যোগাযোগে আড়িপাতাসহ দ্বৈত উদ্দেশ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়া শুধু তার রুস্কায়া কেন্দ্রটি আবার চালু ও উন্নতই করছে না, নতুন বিমানঘাঁটি নির্মাণ এবং সরবরাহ ও পরিবহন-সক্ষমতার পরিধি বাড়াচ্ছে। রুশ গবেষণা জাহাজগুলো ওয়েডেল সাগরে ভূকম্পন জরিপ চালিয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, নিছক বৈজ্ঞানিক গবেষণার বদলে তেল ও গ্যাসের মজুত খুঁজে বের করাই এর উদ্দেশ্য হতে পারে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রুশ গবেষকেরা অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে আনুমানিক ৫১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আবিষ্কার করেছেন—সৌদি আরবের জানা মজুতের প্রায় দ্বিগুণ। তবে রাশিয়ার দাবি, তাদের কর্মকাণ্ড চুক্তির বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

দুই দেশই নতুন সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা গড়ার প্রস্তাবে বাধা দিয়েছে। এতে সংরক্ষণবাদীরা হতাশ হয়েছেন এবং সন্দেহ বেড়েছে যে ভবিষ্যতে জীবসম্পদ ও খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য।

অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থা: রক্ষাকবচ, নাকি কাগুজে বাঘ?

১৯৫৯ সালে স্বাক্ষরিত অ্যান্টার্কটিক চুক্তিতে এখন ৫৪টি দেশ স্বাক্ষরকারী। এটি বিশ্বের অন্যতম সফল আন্তর্জাতিক চুক্তি। এতে সামরিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, আঞ্চলিক দাবিগুলো স্থগিত এবং ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ প্রটোকলের অধীনে খনিজ উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চুক্তির মূলনীতি হলো শান্তি, বিজ্ঞান ও পরিবেশ সুরক্ষা।

তবে চুক্তিটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে। এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই এবং খনন নিষিদ্ধের বিধানটি ২০৪৮ সালে পর্যালোচনার কথা রয়েছে। ফলে মহাদেশটির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভূরাজনৈতিক পরামর্শক স্যামুয়েল জার্ডিনের ভাষায়, “উল্লেখযোগ্য তেলের মজুত আবিষ্কারের ফলে অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থাকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে; রাশিয়া ও চীন শাসনব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক শোষণের দিকে নিতে চাইছে।”

চুক্তি অনুযায়ী গবেষণাকেন্দ্র পরিদর্শনের অনুমতি রয়েছে, তবে এমন পরিদর্শন খুব কম হয় এবং অনেক সময় আগাম জানিয়ে দেওয়া হয়। অ্যান্টার্কটিক চুক্তি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিনিধি বিল মুনটিয়ান আরও কঠোর নজরদারির পক্ষে:

সামরিক সরঞ্জাম, জনবল বা গোয়েন্দা নজরদারির জন্য সেখানে কী আছে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিছানার নিচে টর্চ জ্বেলে দেখুন—ওটা কি টেডি বিয়ার, নাকি ভয়ংকর কোনো দানব? আমাদের কাছে টর্চ আছে। সেটা ব্যবহার করুন।

বিজ্ঞান, নাকি কৌশল? দ্বৈত ব্যবহারের জটিলতা

আধুনিক অ্যান্টার্কটিক গবেষণাকেন্দ্রগুলোতে ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ, জিপিএস রিসিভার ও স্যাটেলাইট সংযোগের মতো উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক ও সামরিক—দুই উদ্দেশ্যেই কাজে লাগতে পারে। তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফরি ম্যাকগি বলেন,

এখানে আমরা ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ, জিপিএস এবং স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে এমন গ্রাউন্ড-স্টেশন রিসিভারের কথা বলছি। এর ফলে এসব সরঞ্জাম দ্বৈত উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এগুলো বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহার করা যায়, আবার সামরিক ও নজরদারি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, তথ্য আপলোড ও ডাউনলোড কিংবা সামরিক কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবেও কাজে লাগানো যায়।

দ্বৈত ব্যবহারের এই জটিলতাই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে। সামরিক কর্মকাণ্ড বা বাণিজ্যিক খননের সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। তবে বর্তমানে নির্মিত অবকাঠামো ভবিষ্যতে অন্য কাজে ব্যবহার করা হতে পারে, বিশেষত চুক্তির বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে বা উপেক্ষা করা হলে।

বিজ্ঞাপন

সম্পদের প্রতিযোগিতা: তেল, খনিজ ও ক্রিল

ধারণা করা হয়, অ্যান্টার্কটিকায় তেল, গ্যাস, কয়লা ও খনিজের বিপুল অনাবিষ্কৃত মজুত রয়েছে। পাশাপাশি আছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মৎস্যক্ষেত্র। ওয়েডেল সাগরে ৫১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আবিষ্কারের সাম্প্রতিক রুশ দাবি এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে যে বৈজ্ঞানিক অভিযানের আড়ালে সম্পদের সন্ধান চালানো হতে পারে।

অন্যদিকে, চীন দ্রুত তার অ্যান্টার্কটিক ক্রিল মাছ ধরার শিল্প সম্প্রসারণ করছে, বিশাল ট্রলার পাঠাচ্ছে এবং নতুন সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। দক্ষিণ মহাসাগরের বাস্তুতন্ত্রে ক্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। অতিরিক্ত মাছ ধরলে তিমি, সিল ও পেঙ্গুইনের ওপর ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খনন ও বৃহৎ পরিসরে সম্পদ উত্তোলন বর্তমানে নিষিদ্ধ হলেও, নিয়ম বদলালে এগিয়ে থাকার সুযোগ পেতে রাশিয়া ও চীন উভয়ই প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মহাদেশটিতে প্রবেশ সহজ হচ্ছে এবং সম্পদের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে। ফলে অ্যান্টার্কটিকার সম্পদ কাজে লাগানোর প্রলোভন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে।

২০৪৮ সালের প্রশ্ন: খনন নিষিদ্ধের বিধান কি টিকবে?

অ্যান্টার্কটিক চুক্তির পরিবেশ সুরক্ষা প্রটোকল (মাদ্রিদ প্রটোকল) বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া সব ধরনের খনিজ সম্পদ-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। তবে ২০৪৮ সালে এই নিষেধাজ্ঞা পর্যালোচনার কথা রয়েছে এবং যেকোনো স্বাক্ষরকারী দেশ যেকোনো সময় পুনরায় আলোচনার আহ্বান জানাতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, চীন ও রাশিয়া এমন আলোচনায় প্রভাব বিস্তার, এমনকি নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে, যা আইনসম্মতভাবে সম্পদ উত্তোলনের পথ খুলে দিতে পারে।

র‍্যান্ড করপোরেশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “প্রটোকল পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা সামনে রেখে চীন উন্নত খনন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, যেখানে তারা কিছু খননকে বৈধ করার চেষ্টা করতে পারে।” বর্তমান ব্যবস্থায় প্রয়োগ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা না থাকায়, শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে কাজ করবে বলে মনে করলে বাস্তবে একতরফা পদক্ষেপ নিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ভূরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি হ্রাস

কয়েক দশক ধরে অ্যান্টার্কটিকায় সবচেয়ে বড় ও উন্নত উপস্থিতি বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরুতে একমাত্র গবেষণাকেন্দ্রটি পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় নেতৃত্ব—দুটিই দেশটির ভূমিকার অংশ। তবে সাম্প্রতিক ও প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটে মেরুবিজ্ঞান তহবিল ৭০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দুর্বল করতে পারে।

ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অফিস অব পোলার প্রোগ্রামসের অবকাঠামো উন্নয়নে বিলম্ব হচ্ছে এবং তাদের সর্বশেষ বিশেষায়িত অ্যান্টার্কটিক গবেষণা জাহাজটি বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে গেলে রাশিয়া ও চীন সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে, ফলে মহাদেশটিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডের মতো অ্যান্টার্কটিকায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী অন্য দেশগুলোও পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। মহাদেশটির ৪২ শতাংশের ওপর দাবি জানানো অস্ট্রেলিয়া আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং চীনের সর্বশেষ গবেষণাকেন্দ্রের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। যুক্তরাজ্যের পরিবেশ নিরীক্ষা কমিটি বিশেষত রুশ ভূকম্পন জরিপের বিষয়ে কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়েছে।

সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও অ্যান্টার্কটিক চুক্তির ভবিষ্যৎ

উত্তেজনা বাড়লেও প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র এখনো রয়েছে। যৌথ বৈজ্ঞানিক প্রকল্প, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ চলছে। চুক্তির পরামর্শমূলক বৈঠকগুলোও আলোচনার সুযোগ করে দেয়।

তবে সামগ্রিক প্রবণতা কৌশলগত প্রতিযোগিতার দিকে। নতুন সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা গড়ার প্রস্তাব ঠেকাতে রাশিয়া ও চীন নিজেদের অবস্থান সমন্বয় করেছে এবং সরবরাহব্যবস্থা ও গবেষণায় সহযোগিতার চুক্তি করেছে। দুই দেশই তাদের বরফভাঙা জাহাজের বহর বাড়াচ্ছে এবং মেরু অঞ্চলে কাজের জন্য নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে।

কিছু বিশ্লেষক এর সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের তুলনা করছেন, যেখানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মুখে রাশিয়া ও চীন অংশীদারত্ব আরও গভীর করেছে। অ্যান্টার্কটিকায় প্রবেশ তুলনামূলকভাবে কঠিন এবং তাৎক্ষণিকভাবে লাভজনকও কম। তবু বিশ্বব্যাপী উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরীক্ষাক্ষেত্র এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে মহাদেশটিকে ক্রমেই বেশি দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশগত ঝুঁকি: সর্বশেষ বন্যভূমি রক্ষা

অ্যান্টার্কটিকা অনন্য বাস্তুতন্ত্র, পরিচিত বন্যপ্রাণী এবং জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ নথির আবাসস্থল। এর বরফস্তরে বিশ্বের ৯০ শতাংশ মিঠাপানি রয়েছে এবং আশপাশের মহাসাগরগুলো বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। মহাদেশটির সুরক্ষা শুধু ভূরাজনীতির বিষয় নয়, পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সঙ্গেও জড়িত।

পরিবেশবাদীদের সতর্কতা, বিজ্ঞান, পর্যটন বা সম্পদ উত্তোলন—যে উদ্দেশ্যেই হোক, মানুষের উপস্থিতি বাড়লে অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, দূষণ ও বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশ ইতিমধ্যে বড় উদ্বেগের বিষয়। তেল উত্তোলন বা বৃহৎ পরিসরে খননের সম্ভাবনা সংরক্ষণবাদীদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাদের যুক্তি, বাণিজ্যিক শোষণের জন্য মহাদেশটিকে নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবেই রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক চুক্তি বৈঠকগুলোতে সম্রাট পেঙ্গুইন সুরক্ষা, প্লাস্টিক দূষণ এবং পর্যটন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক বিভেদের কারণে অগ্রগতি ধীর। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যান্টার্কটিকা পরিচালনায় যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার চেতনা ভূমিকা রেখেছে, তা বজায় রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ।

সংক্ষেপে

  • রাশিয়া ও চীন অ্যান্টার্কটিকায় দ্রুত নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। তাদের বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে সামরিক ও সম্পদ-সংক্রান্ত উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
  • সামরিক কর্মকাণ্ড ও খনন নিষিদ্ধ করা অ্যান্টার্কটিক চুক্তি ব্যবস্থা দুর্বল প্রয়োগ এবং ২০৪৮ সালে পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনাসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।
  • সাম্প্রতিক রুশ ভূকম্পন জরিপ এবং বিপুল তেলের মজুতের দাবি ভবিষ্যতে সম্পদের প্রতিযোগিতা নিয়ে আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
  • চীনের নতুন গবেষণাকেন্দ্র এবং ক্রিল মাছ ধরার শিল্পের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ তুলে ধরেছে।
  • যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট কাটছাঁটে দেশটির প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে মহাদেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ম নির্ধারণে রাশিয়া ও চীনের সুযোগ বাড়তে পারে।
  • পরিবেশবাদীদের সতর্কতা, মানুষের কর্মকাণ্ড বাড়লে অ্যান্টার্কটিকার অনন্য বাস্তুতন্ত্র অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে।
  • অ্যান্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে জোরালো আন্তর্জাতিক নজরদারি, চুক্তির নীতির প্রতি নতুন অঙ্গীকার এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে শান্তি ও বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে