চীনের কার্বন নিঃসরণ কি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে: নবায়নযোগ্য জ্বালানির উল্লম্ফন বিশ্বের জন্য কী অর্থ বহন করে

পড়তে 8 মিনিট
চীনের কার্বন নিঃসরণ কি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে: নবায়নযোগ্য জ্বালানির উল্লম্ফন বিশ্বের জন্য কী অর্থ বহন করে

চীনের কার্বন নিঃসরণ: এক ঐতিহাসিক মোড়?

বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী দেশ চীন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্ভাব্য এক মোড়ে পৌঁছেছে। প্রথমবারের মতো দেশটির কার্বন নিঃসরণ কমেছে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অভাবনীয় বিস্তারের ফলে। এ অগ্রগতির বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা, আন্তর্জাতিক কয়লা শিল্প এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ভবিষ্যতের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

সূচিপত্র
  1. চীনের কার্বন নিঃসরণ: এক ঐতিহাসিক মোড়?
  2. নিঃসরণ কমার পেছনে কী? নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্থান
  3. এটাই কি সর্বোচ্চ পর্যায়? বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক
  4. কয়লা: এখনো বড় বাধা
  5. চীনের জলবায়ুনীতি: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সীমাবদ্ধতা
  6. নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের ভূমিকা
  7. অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: লাভবান ও ক্ষতিগ্রস্ত
  8. সামনের চ্যালেঞ্জ: চীন কি বিশ্বকে ১.৫°C লক্ষ্যে পৌঁছাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে?
  9. সংক্ষেপে

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসের আগের এক বছরে চীনের কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) নিঃসরণ ১.৬% কমেছে। পরবর্তী মাসগুলোতেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৩০% দায়ী একটি দেশের জন্য ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ হ্রাস নজিরবিহীন—এর আগে চীনের নিঃসরণ কমেছে কেবল অর্থনৈতিক সংকটের সময়, যেমন কোভিড-১৯ মহামারি বা বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়। এবার পরিবর্তনের চালিকাশক্তি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি।

নিঃসরণ কমার পেছনে কী? নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্থান

চীনের নিঃসরণ কমার প্রধান কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত ও নজিরবিহীন সম্প্রসারণ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে চীন বিশ্বের বাকি সব দেশের সম্মিলিত সংযোজনের চেয়েও বেশি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করেছে। শুধু ২০২৫ সালের মে মাসেই দেশটি ৯০ গিগাওয়াট (GW) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা স্থাপন করেছে—যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০টি সৌর প্যানেল স্থাপনের সমান। চীনের জ্বালানি ব্যবস্থায় এখন বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা সব তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতাকে (কয়লা, গ্যাস ও তেলসহ) ছাড়িয়ে গেছে।

কার্বন ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানির চাহিদা বাড়তে থাকলেও অতিরিক্ত চাহিদা জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিদ্যুৎ খাতের নিঃসরণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৮% কমেছে; বিদ্যুতের চাহিদা ২.৫% বাড়লেও সামগ্রিক নিঃসরণ কমেছে ১.৬%।

CREA-র নীতিবিশেষজ্ঞ বেলিন্ডা শ্যাপে এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন:

চীনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদনক্ষমতা দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এর ফলে পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার অংশ কমেছে এবং নিঃসরণ হ্রাস পেয়েছে।

চীনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উদ্যোগ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি রপ্তানিও করছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অবকাঠামোর দিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মনোযোগ সরাচ্ছে। ২০২৩ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যে চীনের রপ্তানি ৩৫% বেড়েছে। এখন বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি সৌর প্যানেল, ৬০% বায়ু টারবাইন এবং ৭০% বৈদ্যুতিক যানবাহন চীনেই উৎপাদিত হয়।

বিজ্ঞাপন

এটাই কি সর্বোচ্চ পর্যায়? বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক

নিঃসরণের সাম্প্রতিক হ্রাস আশাব্যঞ্জক হলেও, স্থায়ী সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার সময় এখনো আসেনি বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীনের নিঃসরণ সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ মাত্রার চেয়ে এখন মাত্র ১% কম। তাই জ্বালানির চাহিদায় স্বল্পমেয়াদি বৃদ্ধি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের গতি কমে গেলে নিঃসরণ আবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। ভবিষ্যৎ গতিপথ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে:

  • চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জ্বালানির চাহিদা
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিস্তারের গতি
  • আসন্ন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নীতিগত সিদ্ধান্ত
  • বিশ্ব বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের চায়না ক্লাইমেট হাবের পরিচালক লি শুও বর্তমান সময়কে স্থিতিশীলতার পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন:

দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিঃসরণের কয়েক দশক পর চীন সম্ভবত নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, অথবা এর খুব কাছাকাছি রয়েছে। আমরা এখন স্থিতিশীলতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরে সংযুক্তির পর্যায়ে প্রবেশ করছি, যা আরও নিঃসরণ হ্রাসে সহায়তা করতে পারে।

তবে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেল (IPCC) সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে নিঃসরণকে শুধু সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেই হবে না, দ্রুত কমাতেও হবে। বিপর্যয়কর জলবায়ু প্রভাব এড়াতে কেবল স্থিতিশীলতা যথেষ্ট নয়।

কয়লা: এখনো বড় বাধা

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক বিস্তার সত্ত্বেও চীনের জ্বালানি ব্যবস্থায় কয়লা এখনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০২২ ও ২০২৩ সালে বেইজিং প্রতি সপ্তাহে গড়ে দুটি নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন করে। এসব কেন্দ্রের অনেকগুলো এখন চালু হচ্ছে, তবে আগের প্রজন্মের কেন্দ্রগুলোর তুলনায় এগুলোতে কম কয়লা ব্যবহার হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে কয়লা আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫% কমেছে।

চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার অংশ কমে ৫০ শতাংশের সামান্য বেশি হয়েছে, যা ২০১৬ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২৪% এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে; জুনে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির ৮৯% পূরণ করেছে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কয়লার ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর অঙ্গীকার করেছেন। তবে কয়েকটি প্রদেশের অর্থনীতিতে কয়লার গুরুত্ব থাকায় এ রূপান্তর জটিল হয়ে উঠেছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুনীতি ফেলো জোরিত গোসেন্স এর বৈশ্বিক প্রভাব তুলে ধরে বলেন:

অস্ট্রেলিয়ার তাপবিদ্যুৎ কয়লা রপ্তানির প্রায় ৩০% চীন আমদানি করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে চীনের ঝোঁক এবং দেশের ভেতরে কয়লার সরবরাহ বাড়ার ফলে অস্ট্রেলীয় কয়লার চাহিদা কমবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথে এগোলে এশিয়ার অন্যান্য বাজারও একই পথ অনুসরণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

চীনের জলবায়ুনীতি: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সীমাবদ্ধতা

চীন উচ্চাভিলাষী জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে: ২০৩০ সালের আগে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন। দেশটি ইতিমধ্যে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে—নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর আগেই, ২০২৪ সালে তা ১,৪০০ GW-এর বেশি হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিবহির্ভূত জ্বালানির অংশ ২৫%-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও অর্জনের পথে চীন।

তবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কার্বন তীব্রতা (জিডিপির প্রতি একক উৎপাদনে নিঃসরণ) কমানোর ২০২৪ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি চীন। পরিকল্পিত ৩.৯% হ্রাসের বদলে কমেছে ৩.৪%। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কার্বন তীব্রতা ১৮% কমানোর লক্ষ্য থেকেও দেশটি পিছিয়ে রয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জ্বালানির চাহিদার ব্যাপক বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় গতিতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো কঠিন করে তুলেছে।

প্যারিস চুক্তির ১.৫°C সীমা পূরণের ক্ষেত্রে চীনের বর্তমান নীতি ও লক্ষ্যমাত্রাকে ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার “অত্যন্ত অপর্যাপ্ত” বলে মূল্যায়ন করেছে। জ্বালানিসংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা চীন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হলেও, কার্বন তীব্রতা কমানোর লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে চীনকে অর্থনীতির সব খাতজুড়ে উচ্চাভিলাষী নিরঙ্কুশ নিঃসরণসীমা নির্ধারণ এবং কয়লার ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লানতাউ গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ডেভিড ফিশম্যান বলেন:

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনে চীনের জ্বালানি খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরও অনেক কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, আর সর্বোচ্চ নিঃসরণের পরপরই এসব পরিবর্তন শুরু করা দরকার।

বিজ্ঞাপন

নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের ভূমিকা

সরকারের জোরালো সমর্থন ও কৌশলগত বিনিয়োগ চীনের জ্বালানি রূপান্তরকে এগিয়ে নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনদর্শন, যা শি জিনপিং চিন্তাধারা নামে পরিচিত, তাতে “পরিবেশগত সভ্যতা” গড়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে চীন বিশ্বের বৃহত্তম নিঃসরণ বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্বন নিঃসরণের অনুমতিপত্র কেনাবেচা করতে পারে এবং নিঃসরণ কমাতে উৎসাহিত হয়।

২০২৬–২০৩০ সালের জন্য চীনের আসন্ন জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা, যা পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকাশ করা হবে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের উদ্যোগের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে নতুন নীতিও চালু করছে। এ নীতি কার্যকর হওয়ার আগে উৎপাদনক্ষমতা স্থাপনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নীতির এ পরিবর্তনে নতুন বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দাম কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে চীনের জলবায়ু কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চলমান শুল্কবিরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ুনীতির পরিবর্তন বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সবুজ জ্বালানিতে ভর্তুকি থেকে কয়লায় ভর্তুকির দিকে সরে গেলেও, চীন নিজের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্বার্থে সবুজ কর্মসূচিতে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি বলেছেন, চীন জলবায়ু কার্যক্রমের গতি কমাবে না। এ বছরের শেষের দিকে প্যারিস চুক্তির অধীনে নতুন জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করার কথা দেশটির।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: লাভবান ও ক্ষতিগ্রস্ত

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক চীনের অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করছে এবং এর বৈশ্বিক প্রভাবও রয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি—বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ—এখন চীনের জিডিপির ১০%-এর বেশি জোগান দেয়। ২০২৪ সালে এ খাতে বিনিয়োগ ও বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজারে চীন শীর্ষে; বিশ্বে বিক্রি হওয়া সব বৈদ্যুতিক গাড়ির ৭০% দেশটিতে উৎপাদিত হয়।

তবে এ রূপান্তর কয়লার ওপর নির্ভরশীল অঞ্চল ও শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অস্ট্রেলিয়ায় বিএইচপির মাউন্ট আর্থার কয়লাখনি বন্ধ হয়ে যাওয়া চাহিদা কমে যাওয়ার স্পষ্ট উদাহরণ। কয়লার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে নতুন শিল্পে রূপান্তরের জন্য সহায়তা দেওয়া দরকার বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবর্তনের বিরোধিতা অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ হতে পারে।

চীনের আর্থিক খাতও এতে ভূমিকা রাখে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক ও আর্থিক উন্নয়ন ঐতিহাসিকভাবে নিঃসরণ বাড়ালেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে দূষণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। মানবসম্পদ ও টেকসই কৃষিও নিঃসরণ কমাতে অবদান রাখে।

সামনের চ্যালেঞ্জ: চীন কি বিশ্বকে ১.৫°C লক্ষ্যে পৌঁছাতে নেতৃত্ব দিতে পারবে?

অগ্রগতি সত্ত্বেও কার্বন নিরপেক্ষতার পথে চীনের যাত্রা এখনো নিশ্চিত নয়। দেশটির জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং কয়লা এখনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, ফলে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কর্তৃপক্ষকে কয়লার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নিরঙ্কুশ নিঃসরণসীমা না থাকা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত থাকায় জলবায়ু অঙ্গীকার পূরণে চীনের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ বা এমনকি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার জন্য পরিবর্তনের বর্তমান গতি যথেষ্ট দ্রুত নাও হতে পারে। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষমতা নির্ভর করছে চীনের পদক্ষেপের ওপর। বিশ্বের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে চীন বৈশ্বিক উৎপাদিত পণ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি তৈরি করে এবং বিশ্বের CO2 নিঃসরণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঘটায়। দেশটির সিদ্ধান্তই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।

তবু নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের নেতৃত্ব এবং নতুন জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার প্রতি অঙ্গীকার আশার আলো দেখায়। চীন নিঃসরণ হ্রাসের ধারা ধরে রাখতে পারবে কি না এবং অন্য দেশগুলোকে একই পথে এগোতে অনুপ্রাণিত করতে পারবে কি না, তা নির্ধারণে আগামী কয়েক বছর গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সংক্ষেপে

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদনক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ায় ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত এক বছরে চীনের কার্বন নিঃসরণ ১.৬% কমেছে।
  • অর্থনৈতিক মন্দার বদলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির কারণে নিঃসরণ কমার ঘটনা এটাই প্রথম।
  • সৌর, বায়ু ও বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনে চীন বিশ্বে শীর্ষে এবং নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর আগেই ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে।
  • চীনের জ্বালানি ব্যবস্থায় কয়লা এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর অংশ কমছে।
  • কার্বন তীব্রতা কমানোর ২০২৪ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চীন ব্যর্থ হয়েছে এবং ২০২৫ ও ২০৩০ সালের জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
  • পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর বৈশ্বিক কয়লার বাজারকে নতুন রূপ দিচ্ছে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো রপ্তানিকারক দেশের বাজারকে।
  • বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫°C-এ সীমিত রাখার প্রচেষ্টায় চীনের আসন্ন জলবায়ুনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
  • দীর্ঘস্থায়ী অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার ও নিরঙ্কুশ নিঃসরণসীমা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে