শেইন ও টেমুকে নিয়ে কেন সতর্কবার্তা দিচ্ছে ইইউ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনা অনলাইন খুচরা বিক্রেতা জায়ান্ট শেইন ও টেমুর ওপর নজরদারি জোরদার করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপের বাজারে আসা লাখ লাখ পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইইউর বিচারবিষয়ক কমিশনার মাইকেল ম্যাকগ্রা এসব প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়া বিপজ্জনক পণ্যের ব্যাপকতা ও গুরুতর অবস্থা দেখে প্রকাশ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এতে ভোক্তা সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রক বিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তে থাকা সংকট স্পষ্ট হয়েছে।
সূচিপত্র
- শেইন ও টেমুকে নিয়ে কেন সতর্কবার্তা দিচ্ছে ইইউ
- কোন পণ্যগুলো উদ্বেগের কারণ?
- রাসায়নিকগুলো সম্পর্কে জানা: ফথ্যালেট, পিএফএএস ও লিলিয়াল
- শেইন ও টেমু কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?
- ভোক্তা সংগঠনের তদন্ত ও আইনি অভিযোগ
- নিয়ন্ত্রক কঠোরতা: ইইউ কী করছে?
- গোপন ক্রেতা অভিযান ও সেফটি গেট সতর্কতা
- বৈশ্বিক চিত্র: সমস্যা শুধু ইউরোপের নয়
- এই প্ল্যাটফর্মগুলো এত জনপ্রিয় কেন?
- স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি: ভোক্তাদের যা জানা দরকার
- শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়া ও সামনের পথ
- সংক্ষেপে
ইইউর বাইরের বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি কমমূল্যের পার্সেল আসছে, যার বেশির ভাগই চীন থেকে। এতে ইইউর ভোক্তা সুরক্ষাব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপে পড়েছে। অতি সস্তা ও ফ্যাশনেবল পণ্যের জন্য পরিচিত শেইন ও টেমুর দ্রুত উত্থানে শুধু শুল্ক ও নিরাপত্তা পরীক্ষা ব্যবস্থাই চাপে পড়েনি, ইউরোপীয় ভোক্তারাও নানা বিপজ্জনক পণ্যের ঝুঁকিতে পড়েছেন—বিষাক্ত শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ রাসায়নিকযুক্ত প্রসাধনী পর্যন্ত।
কোন পণ্যগুলো উদ্বেগের কারণ?
ইইউর কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা সংগঠন ও স্বাধীন পরীক্ষাগারগুলোর তদন্তে শেইন ও টেমুতে বিক্রি হওয়া পণ্যে নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক কিছু বিষয় হলো:
- শিশুদের চুষনি—এতে দানা ঢিলে হয়ে যেতে পারে এবং বাতাস চলাচলের ছিদ্র নেই, ফলে শ্বাসরোধের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে।
- শিশুদের রেইনকোট ও পোশাকে ফথ্যালেট ও ফরমালডিহাইডসহ বিষাক্ত রাসায়নিকের মাত্রা আইনি সীমার চেয়ে শতগুণ বেশি।
- সানগ্লাস—এতে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই, ফলে চোখের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
- শর্টস ও জ্যাকেট—এগুলোর ফিতা অতিরিক্ত লম্বা, যা হোঁচট খাওয়া ও গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি করে।
- প্রসাধনী—এতে বিউটাইলফেনাইল মিথাইলপ্রোপিওনাল (লিলিয়াল) রয়েছে, যা প্রজনন সমস্যা ও ভ্রূণের বিকাশে ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ২০২২ সাল থেকে ইইউতে নিষিদ্ধ।
- শিশুদের খেলনা—এতে ছোট অংশ, ধারালো প্রান্ত ও রাসায়নিক ঝুঁকি রয়েছে; এর মধ্যে স্লাইম তৈরির কিটে অতিরিক্ত বোরন এবং স্যান্ডেলে উচ্চমাত্রার সিসাও পাওয়া গেছে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু ইইউতেই ঘটছে না। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষও এসব প্ল্যাটফর্মের পণ্যে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ, হরমোনের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটানো রাসায়নিক ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের বিপজ্জনক মাত্রার কথা জানিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সিউলের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক দল শেইনের জুতায় আইনি সীমার ২২৯ গুণ ফথ্যালেট এবং টেমুর স্যান্ডেলে অনুমোদিত সীমার ১১ গুণ সিসা পেয়েছে।
রাসায়নিকগুলো সম্পর্কে জানা: ফথ্যালেট, পিএফএএস ও লিলিয়াল
এসব পণ্যে পাওয়া অনেক রাসায়নিকই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে বলে জানা যায়:
- ফথ্যালেট প্লাস্টিককে নমনীয় করতে ব্যবহৃত হয়। তবে এগুলোকে অন্তঃক্ষরা ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী পদার্থ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এগুলো হরমোনের কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং প্রজননক্ষতি, বন্ধ্যত্ব ও ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- পিএফএএস (পার- ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ), যেগুলোকে প্রায়ই "চিরস্থায়ী রাসায়নিক" বলা হয়, পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকে এবং রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থায় বিঘ্ন, বিকাশজনিত সমস্যা ও ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
- লিলিয়াল (বিউটাইলফেনাইল মিথাইলপ্রোপিওনাল) একটি সুগন্ধি উপাদান, যা প্রজননক্ষমতা ও ভ্রূণের বিকাশে সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ইইউতে নিষিদ্ধ।
এসব পদার্থ ত্বকের মাধ্যমে শরীরে শোষিত হতে পারে, শ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করতে পারে বা গিলে ফেলা হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে খেলনা, পোশাক ও প্রসাধনীর মতো নিত্যব্যবহার্য জিনিসে এগুলোর উপস্থিতি উদ্বেগজনক।
শেইন ও টেমু কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?
শেইন ও টেমু—দুই প্রতিষ্ঠানই নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে এবং বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শেইনের দাবি, আন্তর্জাতিক পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং নিয়ম না মানা শত শত বিক্রেতাকে সরিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন উদ্যোগে তারা লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে। টেমুর বক্তব্য, তারা বিক্রেতাদের কঠোর যাচাই, সক্রিয় নজরদারি এবং অনিরাপদ পণ্য দ্রুত সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নিয়েছে। এ কাজে টিইউভি সুদ, এসজিএস ও ব্যুরো ভেরিটাসের মতো বৈশ্বিক সনদ প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে ভোক্তা অধিকারকর্মী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতে, এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বিপুলসংখ্যক পণ্য এবং তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতাদের ওপর নির্ভরতা—যাদের অনেকেই ইইউর বাইরে—ধারাবাহিকভাবে বিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা কঠিন করে তোলে। কর্তৃপক্ষ বা ভোক্তা সংগঠনগুলোর নজরে আসার পরই প্রায়ই অনিরাপদ পণ্য সরানো হয়। তত দিনে সেগুলো হাজারো ভোক্তার কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
ভোক্তা সংগঠনের তদন্ত ও আইনি অভিযোগ
নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে আনতে ইউরোপীয় ভোক্তা সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপীয় ভোক্তা সংগঠন (বিইইউসি) এবং ডেনমার্ক, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের জাতীয় সংগঠনগুলো ব্যাপক পরীক্ষা চালিয়ে খেলনা, প্রসাধনী ও গৃহস্থালি পণ্যে ব্যাপকভাবে নিয়ম না মানার প্রমাণ পেয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২১টি দেশের ২৪টি ভোক্তা সংগঠন শেইনের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে বিভ্রান্তিকর বিক্রয় কৌশল ও পণ্যের নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের কথা বলা হয়।
সাইপ্রাস ভোক্তা সমিতি বলেছে, "শেইন ইউরোপীয় আইন পুরোপুরি মেনে চলা পর্যন্ত ভোক্তাদের গুরুতর ক্ষতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নিলে আমরা হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাই।"
এসব অভিযোগের পর ইউরোপীয় কমিশন শেইন ও টেমু—দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। সামনে আরও কঠোর বিধি প্রয়োগ এবং নতুন নিয়ম চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
নিয়ন্ত্রক কঠোরতা: ইইউ কী করছে?
অনিরাপদ পণ্যের ঢল মোকাবিলা এবং ভোক্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ইইউ নানা পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে:
- আমদানির ক্ষেত্রে ১৫০ ইউরোর শুল্কমুক্ত সীমা তুলে দেওয়া। বর্তমানে এই নিয়মে কমমূল্যের প্যাকেজ শুল্ক পরীক্ষা বা আমদানি শুল্ক ছাড়াই ইইউতে প্রবেশ করতে পারে। এই ফাঁক কাজে লাগিয়ে শেইন ও টেমুর মতো প্ল্যাটফর্ম কোটি কোটি পার্সেল কম খরচে এবং সামান্য নজরদারিতে পাঠাতে পেরেছে।
- কঠোর শুল্ক পরীক্ষা চালানোর অর্থ জোগাতে এবং নিয়ম না মানা চালান নিরুৎসাহিত করতে আসা পার্সেলের ওপর হ্যান্ডলিং ফি চালু করা।
- সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বিধি প্রয়োগ ও তথ্য বিনিময়ের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ইইউ শুল্ক কর্তৃপক্ষ গঠন। বর্তমানে খণ্ডিত জাতীয় ব্যবস্থাগুলোর জায়গা নেবে এটি; ওই ব্যবস্থাগুলো এখন অতিরিক্ত চাপে রয়েছে।
- অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়া বিপজ্জনক ও অবৈধ পণ্যের জন্য আইনগতভাবে দায়ী করতে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) সম্প্রসারণ। শুধু তাদের নিজেদের সরাসরি বিক্রি নয়, তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতাদের বিক্রি করা পণ্যের ক্ষেত্রেও এই দায় প্রযোজ্য হবে।
এসব সংস্কারের ফলে শুল্কমুক্ত সীমা কমিয়ে দেওয়া এবং চীন থেকে আসা কমমূল্যের আমদানিতে অতিরিক্ত কর আরোপের সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপের সঙ্গে ইইউর নীতির সামঞ্জস্য হবে। এর লক্ষ্য কঠোর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান মেনে চলা ইউরোপীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং অনিয়ন্ত্রিত আমদানির ঝুঁকি থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া।
গোপন ক্রেতা অভিযান ও সেফটি গেট সতর্কতা
নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহে ইইউ গোপন ক্রেতা অভিযানও শুরু করেছে। অনিরাপদ পণ্য সম্পর্কে সদস্যদেশগুলোকে সতর্ক করতে সেফটি গেটের দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে তারা। ২০২৪ সালে সেফটি গেটে রেকর্ড ৪ হাজার ১৩৭টি সতর্কতা নথিভুক্ত হয়। এর এক-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল প্রসাধনীসংক্রান্ত; এরপর ছিল খেলনা ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম।
কমিশনার ম্যাকগ্রা জোর দিয়ে বলেন, "আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে পণ্যের নিরাপত্তা আইন এবং ভোক্তা সুরক্ষার বিধি প্রয়োগ জোরদার করব। বিষয়টি শুধু ভোক্তাদের সুরক্ষার নয়; ইউরোপীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করারও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।"
বৈশ্বিক চিত্র: সমস্যা শুধু ইউরোপের নয়
শেইন ও টেমুকে ঘিরে নিরাপত্তার উদ্বেগ শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এসব প্ল্যাটফর্মের বিপজ্জনক পণ্য নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বা ব্যবস্থা নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় সাপ্তাহিক পরিদর্শনে পোশাক ও অনুষঙ্গে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ পাওয়া গেছে; কিছু পণ্যে এর মাত্রা আইনি সীমার চেয়ে শতগুণ বেশি। অগ্নিঝুঁকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কনজ্যুমার প্রোডাক্ট সেফটি কমিশন টেমু থেকে কেনা শিশুদের ঘুমের পোশাকের কয়েক হাজার সেট প্রত্যাহার করেছে। আর মাল্টার ভোক্তা পরিষদে ভারী ধাতুর উচ্চমাত্রাযুক্ত জুতা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এসব তথ্য সমস্যাটির বৈশ্বিক চরিত্র তুলে ধরে। শেইন ও টেমুর কার্যক্রম যত বিস্তৃত হচ্ছে, দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত সরবরাহব্যবস্থা ও শিথিল নিরাপত্তামানের ঝুঁকিও তত বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এই প্ল্যাটফর্মগুলো এত জনপ্রিয় কেন?
বিপুল সম্ভার, ফ্যাশনেবল ও কমদামের পণ্য এবং আক্রমণাত্মক বিপণন কৌশলের মাধ্যমে শেইন ও টেমু দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফ্ল্যাশ সেল, কাউন্টডাউন টাইমার ও গেমের মতো কেনাকাটার অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিক কেনাকাটা এবং বারবার প্ল্যাটফর্মে ফেরাকে উৎসাহিত করে। তাদের ব্যবসায়িক মডেলে চীনের কারখানা থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পাঠানো হয়, ফলে প্রচলিত খুচরা বিক্রয়ব্যবস্থা ও শুল্ক পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
তবে এই মডেলে পৃথক পণ্যের উৎস ও নিরাপত্তা শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পণ্য তৈরি করে ছোট ও পরিচয়-অপ্রকাশিত সরবরাহকারীরা, যারা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তামান মেনে নাও চলতে পারে। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে ইইউভিত্তিক দায়ী পক্ষ না থাকায় বিধি প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আরও জটিল হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি: ভোক্তাদের যা জানা দরকার
পোশাক, খেলনা ও প্রসাধনীতে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয় নয়—এটি বাস্তব স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য। ফথ্যালেট, সিসা ও পিএফএএসের মতো রাসায়নিক বিকাশ ও প্রজননক্ষতি থেকে শুরু করে ক্যানসার এবং রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থায় বিঘ্ন—নানা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এসব পদার্থ পরিবেশে টিকে থেকে পানি ও মাটি দূষিত করতে পারে। ধোয়া বা নিত্যব্যবহারে এগুলো দূর নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অনলাইন মার্কেটপ্লেস থেকে অতি সস্তা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন, বিশেষ করে যেসব পণ্য সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে আসে বা শিশুদের জন্য তৈরি। ইইউ ইকোলেবেল, ওকো-টেক্স বা জিওটিএসের মতো সনদ আছে কি না দেখুন; এগুলো তুলনামূলক উচ্চতর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান মেনে চলার ইঙ্গিত দেয়। ইইউর বিশ্বস্ত দোকান থেকে কেনাকাটা করা এবং উৎস অস্পষ্ট বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য নেই—এমন পণ্য এড়িয়ে চলাও ঝুঁকি কমাতে পারে।
একজন ভোক্তা নিরাপত্তা অধিকারকর্মীর ভাষায়, "ভোক্তাদের মনে রাখা উচিত, সবচেয়ে কম দামের পণ্যে প্রায়ই নিরাপত্তা ও মানের বিনিময়ে সাশ্রয় করা হয়। সচেতনভাবে পছন্দ করা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে আরও বেশি জবাবদিহি দাবি করা জরুরি।"
শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়া ও সামনের পথ
শেইন ও টেমু নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার অঙ্গীকার করলেও বিপজ্জনক পণ্য বারবার শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বলছে, স্বেচ্ছামূলক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। টয় ইন্ডাস্ট্রিজ অব ইউরোপের (টিআইই) মতো শিল্পখাতের সংগঠনগুলোর আহ্বান, পণ্যের নিরাপত্তার জন্য ইইউভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠান দায়ী না থাকলে অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোকে আইনগতভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। টিআইইর পরীক্ষায় দেখা গেছে, টেমু থেকে কেনা ৯৫ শতাংশ খেলনা ইইউর নিরাপত্তাবিধি মেনে চলেনি; ১৯টির মধ্যে ১৮টি খেলনা শিশুদের জন্য বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কঠোর শুল্ক পরীক্ষা, অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর দায়বদ্ধতা এবং করের ফাঁক বন্ধ করাসহ ইইউর প্রস্তাবিত সংস্কার আন্তসীমান্ত ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এগুলো কার্যকর হলে শেইন ও টেমুর মতো প্ল্যাটফর্মকে ব্যবসায়িক মডেল ঢেলে সাজাতে, বিধি মেনে চলায় আরও বিনিয়োগ করতে এবং বিক্রি করা পণ্যের নিরাপত্তার জন্য বেশি দায় নিতে হতে পারে।
ভোক্তাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: অনলাইনে কেনাকাটার সুবিধা ও সাশ্রয়ী দাম আকর্ষণীয় হলেও সতর্ক থাকা জরুরি। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা সংগঠন ও শিল্পখাতের নজরদারি সংস্থাগুলো বাজার পর্যবেক্ষণ এবং আরও জোরালো সুরক্ষার দাবিতে কাজ চালিয়ে যাবে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা ও পছন্দও সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সংক্ষেপে
- শেইন ও টেমুতে বিক্রি হওয়া খেলনা, পোশাক ও প্রসাধনীসহ বিপজ্জনক পণ্য নিয়ে ইইউ জরুরি উদ্বেগ জানিয়েছে; এসব পণ্যে নিষিদ্ধ বা বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়া গেছে।
- তদন্তে ব্যাপক নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। ফথ্যালেট, পিএফএএস, সিসা ও লিলিয়ালের মতো পদার্থের মাত্রা আইনি সীমা ছাড়িয়েছে।
- দুই প্ল্যাটফর্মই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দাবি করলেও ভোক্তা সংগঠন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতে, লঙ্ঘনের ব্যাপকতার তুলনায় এসব ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত।
- শুল্কমুক্ত সীমা তুলে দেওয়া, হ্যান্ডলিং ফি আরোপ এবং অনিরাপদ পণ্যের জন্য অনলাইন মার্কেটপ্লেসকে আইনগতভাবে দায়ী করাসহ বড় ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্কারের কথা ভাবছে ইইউ।
- দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ জানানো হয়েছে, যা সমস্যাটির বৈশ্বিক চরিত্র তুলে ধরে।
- ভোক্তাদের বিশ্বস্ত উৎস থেকে কেনাকাটা, নিরাপত্তা সনদ যাচাই এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসের অতি সস্তা পণ্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
- শেইন ও টেমুর নিরাপত্তা চর্চা নিয়ে বিতর্ক বৈশ্বিক ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা সুরক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।






