এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ দুর্ঘটনা: জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ ও ককপিটে বিভ্রান্তি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা

পড়তে 6 মিনিট
Air India Crash Investigators Focus On a Dangerous Runway and a Pilot’s Actions

মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ বিধ্বস্ত

১২ জুন ভারতের আহমেদাবাদে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। উড্ডয়নের মাত্র ৩৪ সেকেন্ড পর এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় প্রায় ২৭০ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে বিমানের প্রায় সব আরোহী এবং মাটিতে থাকা কয়েকজনও ছিলেন। বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরোর (এএআইবি) প্রাথমিক অনুসন্ধানে ককপিটে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। উড্ডয়নের পরপরই বিমানের ইঞ্জিনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ ‘RUN’ থেকে ‘CUTOFF’ অবস্থায় চলে যাওয়ার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ বিধ্বস্ত
  2. ককপিটে কী ঘটেছিল?
  3. জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ এবং এর ভূমিকা
  4. যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি মানবিক ভুল?
  5. নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতা ও উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা নির্দেশনা
  6. শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়া ও চলমান তদন্ত
  7. এ ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে তদন্ত করা হয়?
  8. বিশেষ উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা-সংক্রান্ত তথ্য বুলেটিনের ভূমিকা
  9. বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় বৃহত্তর প্রভাব
  10. সংক্ষেপে

এএআইবির প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে ককপিটের কার্যপ্রণালি, পাইলটদের যোগাযোগ এবং বোয়িং ৭৮৭-এর জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নকশা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারীরা ঘটনার ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী শিক্ষা নেওয়া যায়, তা জানতে বিমান চলাচল জগৎও নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

ককপিটে কী ঘটেছিল?

এএআইবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী দুটি সুইচই উড্ডয়নের তিন সেকেন্ডের মধ্যে ‘RUN’ থেকে ‘CUTOFF’ অবস্থানে নেওয়া হয়। এতে কার্যত দুই ইঞ্জিনই বন্ধ হয়ে যায় এবং সংকটময় মুহূর্তে বিমানটি শক্তিহীন হয়ে পড়ে। এয়ার ইন্ডিয়া ১৭১ নামে পরিচালিত ফ্লাইটটি উড্ডয়ন থেকে আছড়ে পড়া পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৩০ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল।

ককপিটের কথোপকথনের রেকর্ডিংয়ে দুই পাইলটের মধ্যে বিভ্রান্তির মুহূর্ত ধরা পড়েছে। সহ-পাইলট ক্লাইভ কুন্ডার বিমানটি চালাচ্ছিলেন, আর পাইলট-ইন-কমান্ড সুমিত সাবরওয়াল পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। রেকর্ডিংয়ে কুন্ডারকে বলতে শোনা যায়, “আপনি বন্ধ করলেন কেন?” জবাবে সাবরওয়াল বলেন, “আমি তা করিনি।” এই কথোপকথন ককপিটে ভুল বোঝাবুঝি বা অনিচ্ছাকৃত কোনো পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। তবে সঠিক কারণ এখনো তদন্তাধীন।

দুই পাইলটই অভিজ্ঞ ছিলেন। বোয়িং ৭৮৭ উড়িয়ে সাবরওয়ালের প্রায় ৮,৬০০ ঘণ্টা এবং কুন্ডারের ১,১০০ ঘণ্টার বেশি অভিজ্ঞতা ছিল। প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে, ফ্লাইটের আগে দুজনই পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়েছিলেন। ফলে ক্লান্তিকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ এবং এর ভূমিকা

বোয়িং ৭৮৭-এর জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচগুলো ইঞ্জিনে জ্বালানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। স্বাভাবিক কার্যক্রমে উড্ডয়ন ও ফ্লাইটের সময় এসব সুইচ ‘RUN’ অবস্থানে থাকে, যাতে ইঞ্জিনে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহ হয়। সুইচ ‘CUTOFF’ অবস্থানে নিলে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে ইঞ্জিন থেমে যায়। সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে বা অবতরণের পরই এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

এ ঘটনায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সুইচগুলো আবার ‘RUN’ অবস্থানে নেওয়া হয় এবং ইঞ্জিনের গ্যাসের তাপমাত্রা (ইজিটি) বেড়ে যায়, যা ইঞ্জিন পুনরায় চালুর চেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। তবে ততক্ষণে বিমানটি এত নিচুতে ও ধীরগতিতে ছিল যে আর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি মানবিক ভুল?

এএআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবহাওয়াজনিত কোনো সমস্যা ছিল না এবং উড্ডয়নের সময় বিমানের ওজন অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল। এতে তদন্তকারীদের নজর ককপিটের কার্যক্রম বা সম্ভাব্য যান্ত্রিক অস্বাভাবিকতার দিকে পড়েছে। ককপিটের কথোপকথনের রেকর্ডিংয়ে বিভ্রান্তির প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ভুল যোগাযোগ, অনিচ্ছাকৃতভাবে সুইচ নড়ে যাওয়া বা কার্যপ্রণালি বুঝতে ভুল করার মতো মানবিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

তবে তদন্ত এখনো চলছে এবং কারিগরি ত্রুটিসহ সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কতা ও উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা নির্দেশনা

প্রাথমিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) ২০১৮ সালের একটি বিশেষ উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা-সংক্রান্ত তথ্য বুলেটিনের (এসএআইবি) উল্লেখ রয়েছে। বুলেটিনে বোয়িং ৭৮৭ বিমানে “জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচের লকিং ব্যবস্থা খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা” সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। সুইচ যাতে দুর্ঘটনাবশত নড়ে না যায়, সে জন্য এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। তবে এসএআইবিটি ছিল পরামর্শমূলক, বাধ্যতামূলক নয়; এয়ার ইন্ডিয়াও সুপারিশ করা পরিদর্শন করেনি।

তা সত্ত্বেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উড়োজাহাজ এবং এর জিই জিএনএক্স-১বি ইঞ্জিন—উভয়ের ক্ষেত্রেই সব বাধ্যতামূলক উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা নির্দেশনা এবং সতর্কতামূলক সার্ভিস বুলেটিন মেনে চলা হয়েছিল। এতে বাধ্যতামূলক নয় এমন নিরাপত্তা সুপারিশ কতটা কার্যকর এবং সেগুলো মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নে বিমান সংস্থাগুলো কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়া ও চলমান তদন্ত

প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক বিবৃতিতে এয়ার ইন্ডিয়া শোক প্রকাশ করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তদন্তকারীদের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার অঙ্গীকারও করেছে বিমান সংস্থাটি। এএআইবি জানিয়েছে, তদন্ত চলছে এবং বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকে আরও প্রমাণ, নথি ও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এয়ার ইন্ডিয়া এক্সে (আগের টুইটার) বলেছে: “আমরা প্রাণহানির ঘটনায় শোকাহত এবং এই কঠিন সময়ে সহায়তা দিতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এয়ার ইন্ডিয়া।”

তদন্ত অব্যাহত থাকায় দুর্ঘটনার মূল কারণ স্পষ্ট করতে এবং নিরাপত্তা কার্যপ্রণালি উন্নত করতে সহায়ক আরও অনুসন্ধানের জন্য অপেক্ষা করছে বিমান চলাচল সম্প্রদায়।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে তদন্ত করা হয়?

বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এতে একাধিক সংস্থা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যুক্ত থাকে। এএআইবি বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (ডিজিসিএ) এবং এফএএ ও বোয়িংয়ের মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার, ককপিট কথোপকথনের রেকর্ডিং, রক্ষণাবেক্ষণের নথি এবং ক্রুদের প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত রেকর্ড বিশ্লেষণ করছে।

তদন্তকারীরা জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচের নকশা ও ব্যবহার-সুবিধাও পরীক্ষা করবেন, যাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে সুইচ চালু হয়ে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি আছে কি না তা বোঝা যায়। মানবিক বিষয় নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা ঘটনার সময় ককপিটের কার্যপ্রণালি, যোগাযোগ এবং কাজের চাপ মূল্যায়ন করবেন।

বিশেষ উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা-সংক্রান্ত তথ্য বুলেটিনের ভূমিকা

বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পর্যায়ে না পৌঁছানো সম্ভাব্য নিরাপত্তা সমস্যা সম্পর্কে পরিচালকদের সতর্ক করতে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এসএআইবি জারি করে। এসব বুলেটিন মূল্যবান দিকনির্দেশনা দিলেও, বিষয়টি উড়োজাহাজ চলাচলের উপযোগিতা নির্দেশনায় (এডি) উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত তা মেনে চলা স্বেচ্ছাধীন। এডি আইনত বাধ্যতামূলক। এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনা এ ধরনের পরামর্শের যথার্থতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আরও কঠোর পরবর্তী পদক্ষেপ দরকার কি না, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে উসকে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় বৃহত্তর প্রভাব

এই মর্মান্তিক ঘটনা বিমান চলাচলের নিরাপত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে:

  • ককপিটে স্পষ্ট যোগাযোগ এবং মানসম্মত কার্যপ্রণালি মেনে চলার গুরুত্ব
  • গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনিচ্ছাকৃতভাবে সক্রিয় হওয়া ঠেকাতে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন
  • বাধ্যতামূলক ও পরামর্শমূলক নিরাপত্তা সুপারিশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
  • মানবিক বিষয় ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে পাইলট প্রশিক্ষণের ক্রমাগত উন্নয়ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বাণিজ্যিক বিমান চলাচল পরিসংখ্যানগতভাবে অত্যন্ত নিরাপদ হলেও, এ ধরনের বিরল কিন্তু ভয়াবহ ঘটনা সতর্ক থাকা ও নিরাপত্তা উন্নত করার ধারাবাহিক প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।

বিমান চলাচল নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “প্রতিটি দুর্ঘটনাই একের পর এক ঘটনার শৃঙ্খল। নকশাগত ত্রুটি, কার্যপ্রণালিতে গাফিলতি বা যোগাযোগের ঘাটতি—যেকোনো একটি যোগসূত্র ভাঙতে পারলেই বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব।”

সংক্ষেপে

  • আহমেদাবাদ থেকে উড্ডয়নের ৩৪ সেকেন্ড পর এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ বিধ্বস্ত হয়; এতে প্রায় ২৭০ জনের প্রাণহানি ঘটে
  • উড্ডয়নের পরপরই ইঞ্জিনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ দুটি ‘CUTOFF’ অবস্থানে নেওয়ায় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়
  • ককপিটের কথোপকথনের রেকর্ডিংয়ে সুইচের অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে পাইলটদের মধ্যে বিভ্রান্তির প্রমাণ পাওয়া যায়
  • আবহাওয়া বা ওজনজনিত কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি; দুই পাইলটই পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়েছিলেন এবং অভিজ্ঞ ছিলেন
  • ২০১৮ সালে এফএএর একটি পরামর্শমূলক বুলেটিনে জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচের লকিং ব্যবস্থা নিয়ে সম্ভাব্য সমস্যার কথা জানানো হয়েছিল, তবে তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক ছিল না
  • তদন্ত চলছে; মানবিক বিষয়, ককপিটের কার্যপ্রণালি এবং সম্ভাব্য যান্ত্রিক সমস্যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে
  • দুর্ঘটনাটি পরামর্শমূলক নিরাপত্তা বুলেটিনের কার্যকারিতা এবং উন্নত সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে