উত্তর কোরীয় শ্রমিক গ্রহণে চীন: জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন?
হাজার হাজার উত্তর কোরীয় শ্রমিককে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক নজরদারির মুখে পড়েছে চীন। এ পদক্ষেপ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছে বলে মনে হচ্ছে। ২০১৭ সালে গৃহীত এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বন্ধ করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, এ অর্থ পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়। এসব বিধিনিষেধ সত্ত্বেও একাধিক প্রতিবেদন ও তদন্তে দেখা গেছে, চীন বিভিন্ন শিল্পে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এতে জোরপূর্বক শ্রম, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূচিপত্র
- উত্তর কোরীয় শ্রমিক গ্রহণে চীন: জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন?
- পটভূমি: জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ও এর উদ্দেশ্য
- চীন কেন উত্তর কোরীয় শ্রমিক নিচ্ছে?
- কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পৃক্ততা
- জোরপূর্বক শ্রম ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
- ঘটনাভিত্তিক বিশ্লেষণ: চীনা মাছ ধরার জাহাজে উত্তর কোরীয় শ্রমিক
- উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের কীভাবে বিদেশে পাঠানো হয়?
- শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও সাক্ষ্য
- চীনের জবাব ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
- বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব
- বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
- আরও স্বচ্ছতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি
- সংক্ষেপে
চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক সম্পর্কে অবগত সূত্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ প্রায় ৩,০০০ উত্তর কোরীয় শ্রমিক জিলিন প্রদেশের হুনচুনে পৌঁছান। মে মাসে লিয়াওনিং প্রদেশের দানদংয়ে যান আরও ৫০০ জন। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণী; উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর পোশাক কারখানা ও সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্য অঞ্চলগুলোতেও উত্তর কোরীয় শ্রমিক নেওয়ার আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে, যা শ্রমিক আমদানির আরও বিস্তৃত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
পটভূমি: জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ও এর উদ্দেশ্য
২০১৭ সালে ইউএনএসসি ২৩৯৭ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে উত্তর কোরীয় নাগরিকদের কাজের অনুমতিপত্র দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয় এবং ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব উত্তর কোরীয় শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য স্পষ্ট: বিদেশে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের আয়ের বড় অংশ পিয়ংইয়ংয়ের সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং নিষিদ্ধ অস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থায়নে ব্যবহার করে। উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সরাসরি জবাব ছিল এই নিষেধাজ্ঞা। এসব পরীক্ষা আগের আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করেছিল।
নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, চীনে এক লাখ পর্যন্ত উত্তর কোরীয় শ্রমিক থাকতে পারেন। উৎপাদনশিল্প, সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে আসা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
চীন কেন উত্তর কোরীয় শ্রমিক নিচ্ছে?
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা কারণে চীন উত্তর কোরীয় শ্রমিক নিচ্ছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘রাস্ট বেল্ট’ প্রদেশগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসংখ্যা হ্রাস, শ্রমিক সংকট ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়াসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চীনের অর্থনীতি। অনেক তরুণ চীনা কারখানা বা গ্রামীণ এলাকায় কাজ করতে অনিচ্ছুক। ফলে সস্তা ও নির্ভরযোগ্য শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা উত্তর কোরীয় শ্রমিকেরা পূরণ করতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরীয় শ্রমিক গ্রহণ পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার চীনের বৃহত্তর কৌশলের অংশও হতে পারে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কে কখনো উত্তেজনা, কখনো শীতলতা দেখা গেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সীমান্ত বন্ধ থাকায় শ্রমিক যাতায়াত থেমে গিয়েছিল। আবার শ্রমিক পাঠানো শুরু হওয়া প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে বেইজিংয়ের আগ্রহের ইঙ্গিত দিতে পারে, বিশেষত রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক জোরদার হওয়া এবং উত্তর কোরিয়া বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে।
কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পৃক্ততা
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, উত্তর কোরীয় শ্রমিক নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু স্থানীয় সরকার পর্যায়ে হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এতে বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পৃক্ততা ও অনুমোদনের ইঙ্গিত রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই কেন্দ্রীকরণ চীনের পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পরিচালনায় বিষয়টির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে।
জোরপূর্বক শ্রম ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের প্রশ্নের বাইরেও চীনে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের ব্যবহার গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করেছে। এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস ফাউন্ডেশন (ইজেএফ), আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তদন্তে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের তথ্য উঠে এসেছে, বিশেষ করে মাছ ধরা ও সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে।
বিদেশে থাকা উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের সাধারণত তাঁদের সরকারের নিরাপত্তা এজেন্টরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখেন। তাঁদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়—প্রায়ই দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি। তাঁদের মজুরির অধিকাংশই উত্তর কোরীয় সরকার বাজেয়াপ্ত করে। চলাফেরার স্বাধীনতা তাঁদের খুবই সীমিত বা একেবারেই নেই, কঠোর জীবনযাপনের পরিবেশে থাকতে হয় এবং প্রায়ই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। এসব পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার জোরপূর্বক শ্রমের সূচকগুলোর সঙ্গে মেলে।
ঘটনাভিত্তিক বিশ্লেষণ: চীনা মাছ ধরার জাহাজে উত্তর কোরীয় শ্রমিক
জোরপূর্বক শ্রমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর একটি হলো চীনের পতাকাবাহী গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের নিয়োগ। ইজেএফের ২০২৪ সালের এক তদন্তে বলা হয়েছে, ভারত মহাসাগরে চলাচলকারী অন্তত ১২টি চীনা টুনা মাছ ধরার লংলাইনারে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর কোরীয় নাবিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ইন্দোনেশীয় ও ফিলিপিনো নাবিকদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের এক দশক পর্যন্ত সমুদ্রে আটকে রাখা হয়। শনাক্ত হওয়া এড়াতে তাঁদের এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হতো এবং জাহাজ ছেড়ে যাওয়া বা মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো মৌলিক স্বাধীনতা থেকেও বঞ্চিত করা হতো।
এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ট্রেন্ট এসব নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন:
চীনা মাছ ধরার জাহাজে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের ব্যবহার আমাদের সমুদ্রগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার এক জোরালো প্রমাণ। চীনের গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবেই অবৈধ মাছ ধরা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া যায়। তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে উত্তর কোরীয়দের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত রাখা ইজেএফের উদ্ঘাটিত গুরুতর অনিয়মগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে ভয়াবহ।
এসব চর্চা শুধু আন্তর্জাতিক শ্রমমান লঙ্ঘন করে না, বৈশ্বিক সামুদ্রিক খাবারের সরবরাহব্যবস্থার অখণ্ডতাকেও দুর্বল করে। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছে যেতে পারে।
উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের কীভাবে বিদেশে পাঠানো হয়?
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উপায় হিসেবে উত্তর কোরীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকদের বিদেশে কাজ করতে পাঠিয়ে আসছে। সাধারণত সরকার শ্রমিকদের বাছাই করে এবং কঠোর নজরদারির মধ্যে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশে পাঠায়। তাঁদের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং আয়ের অধিকাংশ সরকারকে পাঠাতে হয়; ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তাঁরা সামান্য অংশই রাখতে পারেন।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদেশে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের যাতায়াত সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। আগে থেকেই বিদেশে থাকা অনেক শ্রমিক দেশে ফিরতে না পেরে আটকে পড়েন। ২০২৩ সালে ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে চীন কিছু উত্তর কোরীয় শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠাতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে শ্রমিকের নতুন করে আগমনের তথ্য রয়েছে, যা মহামারির পর প্রথম বড় পরিসরের শ্রমিক পাঠানোর ঘটনা।
শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও সাক্ষ্য
নাবিক ও শ্রমিকদের সাক্ষ্যে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের কঠিন বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার এক নাবিক বলেন:
চার বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার পরও ছয়জন কোরীয়কে বাড়ি যেতে দেওয়া হয়নি। তাঁদের শুধু এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে পাঠানো হয়েছিল।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে বিচ্ছিন্ন থাকার মানসিক চাপের কথা আরেকজন জানান:
যখনই আমরা তাদের দেখতাম, খুব মানসিক চাপে মনে হতো। ছয় মাস সমুদ্রে থাকাও আমার কাছে অনেক দীর্ঘ সময়। বছরের পর বছর এমনটা কেমন, তা আমি কল্পনাও করতে পারি না।
এসব বর্ণনা এই ব্যবস্থার শোষণমূলক চরিত্র এবং বিদেশে থাকা উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার অভাব তুলে ধরে।
চীনের জবাব ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের মুখে চীনা কর্মকর্তারা সাধারণত অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন:
চীন সব সময় আইন ও বিধিবিধান মেনেই সমুদ্রে মাছ ধরার কাজ করে। গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়ার (ডিপিআরকে) সঙ্গে চীনের সংশ্লিষ্ট সহযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়।
তবে বেসরকারি সংস্থা, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থাপিত প্রমাণ ভিন্ন কথা বলে। বন্দরে শনাক্ত হওয়া এড়াতে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তরের মতো গোপন প্রচেষ্টা এসব চর্চার অবৈধতা সম্পর্কে সচেতনতার ইঙ্গিত দেয়।
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব
চীনের শিল্পে উত্তর কোরীয়দের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী। উত্তর কোরীয় শ্রমে উৎপাদিত সামুদ্রিক খাবার, পোশাক ও অন্যান্য পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের মতো দেশের আমদানি নিষেধাজ্ঞা এবং নৈতিকভাবে পণ্য সংগ্রহের মানদণ্ড লঙ্ঘন করতে পারে। এতে বর্তমান নজরদারি ও আইন প্রয়োগব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে তাঁদের কেনাকাটার কোনো যোগসূত্র নেই, তা নিশ্চিত করার দায় কোম্পানি ও ভোক্তাদের কতটা—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
উত্তর কোরীয় শ্রমিক গ্রহণের বিষয়টি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও বুঝতে হবে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক জটিল; ঐতিহাসিক বন্ধন, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও পরিবর্তনশীল জোট এ সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি পিয়ংইয়ং বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চীন উত্তর-পূর্ব সীমান্তে প্রভাব ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপায় হিসেবে উত্তর কোরীয় শ্রমিক গ্রহণকে দেখতে পারে।
এ ছাড়া, ২০২৩ সালে চীন ও উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকীতে বড় কোনো উদ্যাপন না হওয়াকে কিছু বিশ্লেষক দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে আবার শ্রমিক পাঠানো শুরু হওয়া পরিবর্তিত আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সম্পর্ক মেরামত ও জোরদার করার বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা হতে পারে।
আরও স্বচ্ছতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি
মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক নজরদারি সংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। ইজেএফসহ অন্যান্য সংগঠন জাহাজের অবস্থান বাধ্যতামূলকভাবে জানানো, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তর বন্ধ করা বা কঠোর নজরদারিতে রাখা এবং জোরপূর্বক শ্রম শনাক্ত ও প্রতিরোধে বন্দরে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নত করার মতো পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেছে।
সম্মিলিত দায়িত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে ইজেএফের স্টিভ ট্রেন্ট বলেন:
এর প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত পড়ে; এই অবৈধ শ্রমে ধরা মাছ বিশ্বের নানা প্রান্তের সামুদ্রিক খাবারের বাজারে পৌঁছে যায়। এর জন্য চীনই প্রধানত দায়ী। তবে আধুনিক দাসত্বে উৎপাদিত পণ্য যখন আমাদের নিজেদের খাবারের থালায়ও পাওয়া যায়, তখন স্পষ্ট হয় যে পতাকাবাহী রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও সম্মিলিত দায়িত্ব নিতে হবে।
সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ না নিলে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের শোষণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে, যা মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটোকেই ক্ষুণ্ন করবে।
সংক্ষেপে
- জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছে বলে মনে হলেও, ২০২৪ সালে চীন হাজার হাজার উত্তর কোরীয় শ্রমিক গ্রহণ করেছে। তাঁদের মূলত পোশাক কারখানা ও সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
- অস্ত্র কর্মসূচির জন্য সরকার যাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় বিদেশে উত্তর কোরীয় নাগরিকদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- তদন্তে চীনে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক জোরপূর্বক শ্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উঠে এসেছে, বিশেষ করে মাছ ধরার শিল্পে।
- অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার রাজনৈতিক বিবেচনা—দুই কারণেই চীন উত্তর কোরীয় শ্রমিক নিচ্ছে।
- চীনা কর্মকর্তারা অনিয়ম অস্বীকার করলেও, উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের ব্যবহার গোপন করার সচেতন প্রচেষ্টার প্রমাণ রয়েছে।
- চীনের শিল্পে উত্তর কোরীয়দের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগের প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও নৈতিকভাবে পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
- জোরপূর্বক শ্রম মোকাবিলা ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের সুরক্ষায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।






