দক্ষিণ কোরিয়ার ১৫ ট্রিলিয়ন ওনের বাজি: তীব্র বিতর্কের মধ্যেই সর্বজনীন নগদ সহায়তা দিতে চান প্রেসিডেন্ট লি

পড়তে 12 মিনিট
South Korean Won Money Investment Growth Chart Graph Stock Photo ...

উচ্চ ঝুঁকির অর্থনৈতিক পরীক্ষা

সাহসী ও বিতর্কিত এক পদক্ষেপে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের প্রশাসন ১৫.২ ট্রিলিয়ন ওনের (১১ বিলিয়ন ডলার) বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এর লক্ষ্য, প্রত্যেক নাগরিকের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়া। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নগদ অর্থের সমতুল্য ভাউচার সবার মধ্যে বিতরণ করে ভোক্তা ব্যয় বাড়ানো এবং এর মাধ্যমে দেশের মন্থর অর্থনীতিকে চাঙা করা। কানাডা সফর শেষে প্রেসিডেন্ট লির দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেওয়া এই সিদ্ধান্ত তাঁর এক দশকের বেশি সময় ধরে সমর্থন করে আসা নীতিগত ভাবনার বাস্তবায়ন। তবে এ নিয়ে পরিকল্পনার যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য পরিণতি ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. উচ্চ ঝুঁকির অর্থনৈতিক পরীক্ষা
  2. প্রস্তাবের খুঁটিনাটি: কে কত পাবেন?
  3. প্রেসিডেন্ট লির যুক্তি: অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিকার
  4. দীর্ঘদিনের ভাবনা: লি জে মিয়ংয়ের মৌলিক আয় উদ্যোগের রাজনৈতিক ইতিহাস
  5. সিওংনামের মেয়র থেকে প্রেসিডেন্টের নীতি
  6. গিয়ংগি প্রদেশের পরীক্ষা
  7. জাতীয় পর্যায় ও রাজনৈতিক লড়াই
  8. বিতর্কের ঝড়: জনতুষ্টিবাদ, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা
  9. জনতুষ্টিবাদের অভিযোগ
  10. মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
  11. সর্বজনীন মৌলিক আয়ের (UBI) বিস্তৃত সমালোচনা
  12. পূর্ববর্তী নজির ও বিকল্প: অতীতের শিক্ষা এবং অন্য মডেল
  13. ২০২০ সালের কোভিড-১৯ ত্রাণ
  14. সর্বজনীন মৌলিক আয়ের বাইরে: অন্যান্য কল্যাণ মডেলের খোঁজ
  15. সামনের পথ: জাতীয় পরিষদে রাজনৈতিক লড়াই
  16. সংক্ষেপে

প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য হলো তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়া এবং স্থানীয় বাণিজ্যকে চাঙা করার জন্য সরাসরি অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা। সরকারের যুক্তি, ভোক্তা চাহিদা দুর্বল থাকায় অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ধসের দ্বারপ্রান্তে। তাই সরাসরি অর্থের জোগান শুধু উপকারীই নয়, প্রয়োজনীয়ও। তবে এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে রক্ষণশীল বিরোধী দল। তাদের ভাষ্য, ভোটারদের পুরস্কৃত করার জন্য এটি জনতুষ্টিবাদী কৌশল। তারা মূল্যস্ফীতির তীব্র বৃদ্ধি-সহ গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতির আশঙ্কাও করছে। চূড়ান্ত ভোটের জন্য প্রস্তাবটি জাতীয় পরিষদে যাওয়ার সময় দক্ষিণ কোরিয়া এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরীক্ষায় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনার বিপরীতে অপরিণামদর্শী রাজস্বনীতির ঝুঁকি বিবেচনা করতে হচ্ছে দেশটিকে।

প্রস্তাবের খুঁটিনাটি: কে কত পাবেন?

১৫.২ ট্রিলিয়ন ওনের নগদ অনুদানটি ৩০.৫ ট্রিলিয়ন ওনের (২২.১ বিলিয়ন ডলার) বৃহত্তর সম্পূরক বাজেটের মূল অংশ। অর্থনীতিতে সরাসরি অর্থের জোগান দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। অর্থ উপমন্ত্রী লিম কি-কিউনের অনুমান, এ পরিকল্পনায় নতুন করে প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন ওনের ভোগব্যয় সৃষ্টি হতে পারে। অর্থ বিতরণে সবার জন্য একটি নির্ধারিত ন্যূনতম অঙ্কের পাশাপাশি আরও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে প্রত্যেক নাগরিক সুবিধা পাবেন, আর যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের দেওয়া হবে তুলনামূলক বেশি সহায়তা।

নগদ অর্থের সমতুল্য ভাউচার বণ্টনের স্তরগুলো হলো:

  • সবার জন্য ন্যূনতম সহায়তা: বয়স, লিঙ্গ বা আয়নির্বিশেষে প্রত্যেক দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক অন্তত ১৫০,০০০ ওন পাবেন।
  • সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তা: চরম দারিদ্র্যে বসবাসকারী এবং কাজ পেতে অক্ষম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ব্যক্তিরা ৪০০,০০০ ওন করে পাওয়ার যোগ্য হবেন।
  • ‘দারিদ্র্যের কাছাকাছি’ ব্যক্তিদের সহায়তা: ‘দারিদ্র্যের কাছাকাছি’ আয়শ্রেণিতে থাকা ব্যক্তিরা ৩০০,০০০ ওন পাবেন।
  • বিস্তৃত পরিসরে অতিরিক্ত সহায়তা: সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ব্যয় আরও বাড়াতে আয়ের ভিত্তিতে নিচের ৯০ শতাংশে থাকা নাগরিকেরা অতিরিক্ত ১০০,০০০ ওন পাবেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক বিদেশিরা এ পরিকল্পনার আওতায় পড়বেন কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “এ মুহূর্তে বিদেশিরা এর আওতায় নেই, তবে টাস্কফোর্সের আলোচনার মাধ্যমে ব্যতিক্রম রাখা হতে পারে। কারা নির্দিষ্টভাবে সুবিধা পাবেন, তা ওই আলোচনায় চূড়ান্ত হবে।” এতে বিদেশিদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকছে, তবে মূল লক্ষ্য যে দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকেরা, সেটিও স্পষ্ট হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রেসিডেন্ট লি ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের নির্ধারিত আলোচনার পর সোমবার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি জাতীয় পরিষদে পেশ করা হবে। ক্ষমতাসীন কোরিয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির স্বস্তিদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাস হবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট লির যুক্তি: অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিকার

প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের কাছে এই সর্বজনীন নগদ অনুদান কোনো আমূল নতুন ধারণা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দর্শনকে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করা। তাঁর যুক্তি, প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং বৈষম্য বাড়ার এই সময়ে প্রচলিত জোগান-পক্ষীয় অর্থনীতি যথেষ্ট নয়। এর পরিবর্তে, ভোগ ও প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক চক্র গড়ে তুলতে নাগরিকদের ব্যয়ক্ষমতা সরাসরি বাড়ানোই সরকারের ভূমিকা বলে তিনি মনে করেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে লি পরিস্থিতির জরুরি দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

সাধারণ মানুষ যে ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে এখনই রাষ্ট্রীয় বাজেট ব্যবহারের সময়।

এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সংকট এমন এক সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার জন্য প্রচলিত ধারার বাইরের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করে প্রশাসন। সর্বজনীন বণ্টনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ন্যায্যতার বিষয়টিও লি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। তাঁর যুক্তি, সরকারি ব্যয়ের সুফল ব্যাপকভাবে সবার মধ্যে ভাগ হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন:

কোনো কারণে অর্থ ব্যয় করলে, আমার মনে হয় জনগণের অন্তত ন্যায্যভাবে তার সুফল ভোগ করা উচিত।

আধুনিক অর্থনীতিতে ভোগ চাহিদার ঘাটতিই একটি কেন্দ্রীয় সমস্যা—এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এ দৃষ্টিভঙ্গি। ২০২০ সালে গভর্নর থাকাকালে এক ফোরামে তিনি নিজের ভাবনা ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন: “আমরা সরবরাহ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছি, কিন্তু আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন সরবরাহ বাড়লেই ভোক্তা ব্যয় বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এখন ভোক্তাদের ব্যয়ক্ষমতা বাড়ানোয় সরকারের ভূমিকা কেন্দ্রীভূত হওয়া উচিত।” নগদ অর্থ বিতরণের এ পরিকল্পনা সেই দর্শনের চূড়ান্ত প্রকাশ: ভোক্তাদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা, যাতে তাঁরা তা ব্যয় করেন এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে স্থানীয় অর্থনীতি আবার চাঙা হয়।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিনের ভাবনা: লি জে মিয়ংয়ের মৌলিক আয় উদ্যোগের রাজনৈতিক ইতিহাস

সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়ার পক্ষে প্রেসিডেন্ট লির অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গভীরে প্রোথিত, তাঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ারও বহু আগে থেকে। আকস্মিক ও বড় পরিসরের নীতিগত পদক্ষেপ মনে হলেও এটি আসলে এক দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর গড়ে তোলা ও পরীক্ষা করা ধারণাগুলোর জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ। বিরোধীরা একসময় তাঁর মৌলিক আয়ের পরীক্ষাগুলোকে অবাস্তব ও জনতুষ্টিবাদী বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে সেগুলো ধীরে ধীরে সমর্থন পেয়েছে, পৌর পর্যায় থেকে প্রাদেশিক পর্যায়ে এবং এখন পুরো দেশে বিস্তৃত হয়েছে।

সিওংনামের মেয়র থেকে প্রেসিডেন্টের নীতি

এই নীতির সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যায় গিয়ংগি প্রদেশের সিওংনাম শহরের মেয়র হিসেবে লির সময়কালে। প্রায় এক দশক আগে তিনি বেশ কয়েকটি প্রগতিশীল কল্যাণ কর্মসূচি চালু করেন। এর মধ্যে ছিল বিনা মূল্যে স্কুলের পোশাক দেওয়া, বিনা মূল্যে প্রসব-পরবর্তী সেবার ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে, তরুণদের জন্য মৌলিক আয় চালু করা। সে সময় গিয়ংগি প্রাদেশিক সরকার এসব পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করায় দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু হয়। তবে ২০১৮ সালে গিয়ংগি প্রদেশের গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার পর লির রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে যায়। এতে তাঁর ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অনেক বড় পরিসর তৈরি হয়।

গিয়ংগি প্রদেশের পরীক্ষা

গভর্নর হিসেবে লি ২০১৯ সালে “তরুণদের মৌলিক আয়” কর্মসূচি চালু করেন, যা নমুনার আকারের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম মৌলিক আয় পরীক্ষা হয়ে ওঠে। কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট আবাসিক শর্ত পূরণকারী প্রদেশটির ২৪ বছর বয়সী সব বাসিন্দাকে প্রতি তিন মাসে ২৫০,০০০ ওন করে দেওয়া হয়। চাকরি বা বাবা-মায়ের আয়ের সঙ্গে কোনো শর্ত না জুড়ে বছরে মোট ১ মিলিয়ন ওন দেওয়া হতো। কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল “স্থানীয় মুদ্রা” ব্যবহার—এমন একধরনের ভাউচার, যা কেবল গিয়ংগি প্রদেশের ক্ষুদ্র, স্বতন্ত্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খরচ করা যেত; বড় সুপারমার্কেট ও ফ্র্যাঞ্চাইজি দোকানে নয়। এর দুটি লক্ষ্য ছিল: তরুণদের জন্য আর্থিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করা এবং প্রণোদনার অর্থ যেন সরাসরি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উপকারে আসে তা নিশ্চিত করা। গিয়ংগি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জরিপে কর্মসূচিটিকে অত্যন্ত সফল বলে পাওয়া যায়। ৮০ শতাংশের বেশি সুবিধাভোগী সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং ভোক্তাদের ব্যয় স্থানীয় দোকানের দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে সরে যায়। এসব দোকান বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানায়।

জাতীয় পর্যায় ও রাজনৈতিক লড়াই

গিয়ংগিতে দৃশ্যমান সাফল্যের পর লি ধারাবাহিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে মৌলিক আয়নীতি চালুর পক্ষে কথা বলেছেন। কোভিড-১৯ মহামারি এ উদ্যোগে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ২০২০ সালে সরকারের এককালীন ত্রাণ অনুদান ব্যাপক জনসমর্থন পায় এবং সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়ার ধারণাকে স্বাভাবিক করে তোলে। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসেবে লি প্রত্যেক নাগরিককে ২৫০,০০০ ওন করে দেওয়ার ১৩ ট্রিলিয়ন ওনের প্রস্তাবের পক্ষে প্রচার চালান। তবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়ল এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং শেষ পর্যন্ত ভেটো দেন। ভেটো অগ্রাহ্য করার মতো পর্যাপ্ত ভোট না থাকায় পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি ব্যর্থ হয়। এখন লি প্রেসিডেন্টের দপ্তরে এবং তাঁর দল আইনসভা নিয়ন্ত্রণ করায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। ফলে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত নীতি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিতর্কের ঝড়: জনতুষ্টিবাদ, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা

সরকারের আশাবাদী পূর্বাভাস সত্ত্বেও সর্বজনীন নগদ অনুদান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছে। তাঁদের আশঙ্কা, এর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার অভিযোগ, মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি এবং নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে সর্বজনীন মৌলিক আয়ের কার্যকারিতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন।

জনতুষ্টিবাদের অভিযোগ

তাৎক্ষণিক এবং রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে উত্তপ্ত সমালোচনা এসেছে রক্ষণশীল পিপল পাওয়ার পার্টির কাছ থেকে। দলটির মুখপাত্র হো জুন-সুক এ অনুদানকে বিচক্ষণ অর্থনৈতিক নীতির বদলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এক বিবৃতিতে হো বলেন, এই কর্মসূচি:

নির্বাচনে জয়ের জন্য লি (ভোটারদের) পুরস্কৃত করছেন—এমন সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে।

এ বিষয়ে আগের বিতর্কের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়লও একই মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এ ধরনের পরিকল্পনাকে “জনতুষ্টিবাদী” বলে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছিলেন, “বিবেচনাহীন নগদ অনুদান এই দেশের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করতে পারে।” প্রেসিডেন্ট লি ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, অর্থনৈতিক দুর্দশা মোকাবিলা করা সরকারের মূল দায়িত্ব, কোনো জনতুষ্টিবাদী কৌশল নয়। এ বছরের শুরুতে লি পাল্টা বলেছিলেন, “অর্থনীতিকে বাঁচানো জনতুষ্টিবাদ নয়।” দক্ষিণ কোরীয়দের সামনে থাকা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে নিজের রাজস্বনীতিকে তিনি আগ্রাসী, তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে অর্থনীতিবিদেরা এ প্রস্তাবের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা, চাহিদা বেড়ে সরবরাহকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে। সাবেক আইনপ্রণেতা ও অর্থনীতিবিদ ইউ সঙ-মিন সতর্ক করে বলেছেন, “এত বড় অঙ্কের অর্থের জোগানে দাম আরও বেড়ে যাবে।” এ উদ্বেগ নতুন নয়। কোভিড-১৯ ত্রাণ তহবিল নিয়ে ২০২০ সালের বিতর্কের সময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রবার্ট ব্যারো দক্ষিণ কোরীয় সরকারকে সর্বজনীন অর্থপ্রদানের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এ ধরনের নীতি অদক্ষ এবং সহায়তা আরও সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া উচিত। ব্যারো বলেন:

আমার মনে হয়, যাঁরা চাকরি ও আয় হারিয়েছেন, নগদ অর্থ তাঁদের লক্ষ্য করে দেওয়া উচিত। সবাইকে অর্থ দেওয়ার ধারণাটি অপচয়মূলক, কারণ অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি।

সর্বজনীন মৌলিক আয়ের (UBI) বিস্তৃত সমালোচনা

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবটি সর্বজনীন মৌলিক আয়ের উপকারিতা নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কের অংশ। এ ব্যবস্থার কাঠামোগত বিভিন্ন সমালোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের কর্মসূচির সম্ভাব্য কয়েকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন:

  • বিপুল ব্যয়: সর্বজনীন মৌলিক আয়ের কর্মসূচি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। রাজস্বের দিক থেকে টেকসই করতে প্রায়ই কর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হয়, নয়তো অন্যান্য জরুরি সরকারি সেবায় বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হয়।
  • অদক্ষ লক্ষ্য নির্ধারণ: ধনীসহ সবাইকে অর্থ দেওয়ায়, যাঁদের সত্যিই প্রয়োজন তাঁদের লক্ষ্য করে আরও কার্যকরভাবে ব্যয় করা যেত—এমন সম্পদের অপচয় হিসেবে সর্বজনীন মৌলিক আয়কে দেখা হয়।
  • কাজের প্রণোদনা কমে যাওয়া: বড় উদ্বেগ হলো, শর্তহীন আয় মানুষের কাজ করার প্রেরণা কমাতে পারে। এতে কর্মশক্তি সংকুচিত হতে পারে এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
  • দারিদ্র্যের অসম্পূর্ণ সমাধান: সহায়ক হলেও, বাস্তবসম্মত অধিকাংশ সর্বজনীন মৌলিক আয় পরিকল্পনায় অর্থের পরিমাণ সবাইকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার জন্য যথেষ্ট বেশি হয় না। অথচ এর জন্য বিপুল সরকারি ব্যয় হয়।
বিজ্ঞাপন

বিরোধীদের যুক্তির ভিত্তি এসব সমালোচনাই: উদ্দেশ্য মহৎ হতে পারে, তবে জটিল অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় এ নীতি একটি ভোঁতা এবং সম্ভাব্য ক্ষতিকর হাতিয়ার।

পূর্ববর্তী নজির ও বিকল্প: অতীতের শিক্ষা এবং অন্য মডেল

প্রেসিডেন্ট লির প্রস্তাবটি বিচ্ছিন্নভাবে আসেনি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নেওয়া একটি বড়, তবে ভিন্ন ধরনের নগদ অনুদান কর্মসূচির পর এটি এসেছে। পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায়ও যোগ দিয়েছে। এ ইতিহাস ও বিকল্প মডেলগুলো পর্যালোচনা করলে বর্তমান পরিকল্পনার সম্ভাব্য গতিপথ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়।

২০২০ সালের কোভিড-১৯ ত্রাণ

২০২০ সালের মে মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনের প্রশাসন মহামারিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বড় পরিসরে নগদ কুপন কর্মসূচি চালু করে। তবে লির বর্তমান পরিকল্পনা থেকে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: ২০২০ সালের ত্রাণ ছিল নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য, সবার জন্য নয়। প্রাথমিক সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার যোগ্য ছিল আয়ের ভিত্তিতে নিচের ৭০ শতাংশ পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল: এক সদস্যের পরিবার পেয়েছিল ৪০০,০০০ ওন, আর চার বা তার বেশি সদস্যের পরিবার পেয়েছিল ১ মিলিয়ন ওন। পরে মুন প্রশাসন ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত ভাউচার দিয়ে সহায়তার পরিধি বাড়ায়। এ নজির দেখায়, দক্ষিণ কোরিয়ার সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সহায়তা থেকে সবার জন্য সহায়তার মডেলে যাওয়া আদর্শগত ও বাস্তব—দুই দিক থেকেই বড় পরিবর্তন।

সর্বজনীন মৌলিক আয়ের বাইরে: অন্যান্য কল্যাণ মডেলের খোঁজ

সামাজিক সুরক্ষাবলয় নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কে সর্বজনীন মৌলিক আয়ের বেশ কয়েকটি বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে আলোচনায় উঠে আসা একটি মডেল হলো “অংশগ্রহণমূলক আয়” (PI), যার প্রস্তাব করেছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যান্থনি অ্যাটকিনসন। সর্বজনীন মৌলিক আয়ের মতো এটিও নিয়মিত অর্থ দেয়, তবে তা শর্তহীন নয়। এ আয় পেতে ব্যক্তিদের পরিচর্যার কাজ, স্বেচ্ছাসেবা, শিক্ষা বা পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মতো অনুমোদিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখার প্রত্যাশা করা হয়। সমর্থকদের যুক্তি, অংশগ্রহণমূলক আয় ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা নাগরিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার মতো সর্বজনীন মৌলিক আয়ের সম্ভাব্য কিছু নেতিবাচক দিক এড়াতে সহায়তা করে। অন্য আরও প্রচলিত বিকল্পের লক্ষ্য বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। উদাহরণ হিসেবে, কিছু অর্থনীতিবিদ অর্জিত আয়কর ক্রেডিটের (EITC) মতো কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। এ ব্যবস্থায় কম আয়ের কর্মীদের মজুরির সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ যোগ হয়। ফলে আর্থিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি কাজ করার প্রণোদনাও তৈরি হয়। এসব বিকল্প মডেল দেখায়, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর একাধিক পথ রয়েছে এবং প্রতিটিরই সুবিধা-অসুবিধা আলাদা।

বিজ্ঞাপন

সামনের পথ: জাতীয় পরিষদে রাজনৈতিক লড়াই

মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর ১৫.২ ট্রিলিয়ন ওনের নগদ অনুদানের ভাগ্য এখন জাতীয় পরিষদের হাতে। সিউলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আইন প্রণয়নের পরবর্তী ধাপ তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট লির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কোরিয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির ২৯৮টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন রয়েছে, যা তাদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। বাজেট বিল পাস করতে উপস্থিত আইনপ্রণেতাদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ফলে বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়াই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ নীতি পাস করানোর মতো আসন প্রশাসনের রয়েছে।

সোমবারের আনুষ্ঠানিক ভোটের আগে প্রেসিডেন্ট লি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পিপল পাওয়ার পার্টির অন্তর্বর্তী নেতা কিম ইয়ং-তে। এসব আলোচনা ঐকমত্য গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হলেও, বিষয়টি নিয়ে গভীর আদর্শগত বিভাজন থাকায় মৌলিক ফলাফল বদলানোর সম্ভাবনা কম। প্রস্তাবটি একটি বৃহত্তর সম্পূরক বাজেটের অংশ। এর আগে দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমাতে সম্প্রতি ১৩.৮ ট্রিলিয়ন ওনের একটি প্যাকেজও নেওয়া হয়েছে। এই বিপুল ব্যয় দক্ষিণ কোরিয়ার ৬৭৩.৩ ট্রিলিয়ন ওনের নিশ্চিত ২০২৫ সালের বার্ষিক বাজেটের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা সরকারের উল্লেখযোগ্য আর্থিক অঙ্গীকারেরই ইঙ্গিত দেয়। অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তন না হলে দক্ষিণ কোরিয়া দেশজুড়ে একটি অর্থনৈতিক পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে, যা দেশের ভেতরে ও বাইরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সংক্ষেপে

  • দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি চাঙা করতে দেশটির সব নাগরিককে সর্বজনীন নগদ অনুদান দেওয়ার ১৫.২ ট্রিলিয়ন ওনের (১১ বিলিয়ন ডলার) পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের প্রশাসন।
  • পরিকল্পনায় স্তরভিত্তিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে: প্রত্যেকে ন্যূনতম ১৫০,০০০ ওন পাবেন, আর কম আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য অর্থের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪০০,০০০ ওন।
  • প্রেসিডেন্ট লির দীর্ঘদিনের মৌলিক আয়ের পক্ষে প্রচারের পরিণতি এ নীতি। গিয়ংগি প্রদেশের গভর্নর থাকাকালে তিনি “তরুণদের মৌলিক আয়” কর্মসূচির মাধ্যমে এর পরীক্ষা চালিয়েছিলেন।
  • প্রস্তাবটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধীরা একে ভোটারদের পুরস্কৃত করার জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপ বলছে, আর অর্থনীতিবিদেরা মূল্যস্ফীতি ক্ষতিকরভাবে বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন।
  • সমালোচকদের যুক্তি, কোভিড-১৯ মহামারির সময় আগের প্রশাসনের নেওয়া নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণের তুলনায় সবার জন্য অর্থ দেওয়া অপচয়মূলক ও অদক্ষ পদক্ষেপ।
  • জাতীয় পরিষদে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাস হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতিতে মৌলিক আয় তত্ত্বের বড় পরীক্ষা শুরু হবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে