ভূমিকা: বৃহৎ শক্তির টানাপোড়েনে ক্ষুদ্র এক রাজ্য
হিমালয়ের উঁচুতে অবস্থিত ছোট্ট রাজ্য ভুটান—যার জনসংখ্যা মাত্র ৮ লাখ—নিজেকে খুঁজে পেয়েছে জটিল ও উচ্চঝুঁকির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে। এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি চীন ও ভারতের মাঝখানে থাকা ভুটানের সঙ্গে চীনের ৩০০ মাইল (৪৮০ কিলোমিটার) সীমান্তই দেশটির ১৪টি স্থলসীমান্তবর্তী প্রতিবেশীর মধ্যে একমাত্র, যা আনুষ্ঠানিকভাবে সীমানা নির্ধারিত নয়। এই অস্পষ্টতার কারণে ভুটান বিশ্লেষকদের ভাষায় চীনের “গ্রে জোন যুদ্ধকৌশল”-এর ঝুঁকিতে রয়েছে—ক্রমে বাড়তে থাকা, সামরিক নয় এমন এক চাপ প্রয়োগের কৌশল, যা এ অঞ্চলের মানচিত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- ভূমিকা: বৃহৎ শক্তির টানাপোড়েনে ক্ষুদ্র এক রাজ্য
- গ্রে জোন যুদ্ধকৌশল কী?
- ভুটান-চীন বিরোধের ঐতিহাসিক শিকড়
- চীনের ছয়-ধাপের কৌশল: পশুপালক থেকে গ্রাম
- ডোকলাম: বিরোধের কৌশলগত কেন্দ্র
- ভারতের ভূমিকা: নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা ও কৌশলগত অংশীদার
- সাম্প্রতিক অগ্রগতি: দ্রুততর আলোচনা ও নতুন দাবি
- বৃহত্তর প্রবণতা: চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে অবকাঠামো
- ভুটানের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে প্রভাব
- আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক তাৎপর্য
- সমাধানের সম্ভাবনা: চুক্তি কি সম্ভব?
- সারসংক্ষেপ
গত কয়েক দশকে চীন ভুটানের ভূখণ্ড নিয়ে তার দাবিগুলো ক্রমাগত এগিয়ে নিয়েছে। এ জন্য “ভূমিতে বাস্তবতা” তৈরি করতে বেসামরিক বসতি, অবকাঠামো প্রকল্প ও সামরিক চৌকির সমন্বিত ব্যবহার করেছে। চীনের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু ভুটানের ভূখণ্ড নয়, ভারতের ওপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তারও—বিশেষ করে সরু শিলিগুড়ি করিডোরে, যা ভারতের “চিকেনস নেক” নামে পরিচিত এবং দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই বিরোধের পরিবর্তনশীল রূপ আধুনিক রাষ্ট্রকৌশলের একটি উদাহরণ, যেখানে নির্মাণকাজ ও বয়ানের মাধ্যমেও শক্তি প্রয়োগ করা হয়, শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়।
গ্রে জোন যুদ্ধকৌশল কী?
গ্রে জোন যুদ্ধকৌশল বলতে এমন কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যা প্রচলিত শান্তি ও প্রকাশ্য সংঘাতের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। এসব কৌশলের লক্ষ্য হলো প্রচলিত সামরিক প্রতিক্রিয়া উসকে না দিয়ে কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জন করা। ভুটানে চীনের পদ্ধতি এর দৃষ্টান্ত: আক্রমণ চালানোর বদলে তারা পশুপালকদের পাঠায়, গ্রাম গড়ে, সড়ক নির্মাণ করে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের পক্ষে স্থিতাবস্থা বদলে দেয়।
ওয়েস্ট পয়েন্টের মডার্ন ওয়ার ইনস্টিটিউট-এর বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রে জোনের কর্মকাণ্ড অস্পষ্ট, অস্বীকারযোগ্য এবং ক্রমসঞ্চিত। এগুলো “না খুব গরম, না খুব ঠান্ডা”—সামরিক প্রতিক্রিয়া উসকে দেওয়ার সীমার নিচে থাকে, কিন্তু ভূমিতে বাস্তবতা বদলে দেওয়ার মতো তীব্র হয়। এ কৌশল বয়ানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল—কোনো কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক বা ন্যায়সংগত হিসেবে উপস্থাপন করা এবং অপর পক্ষের দাবির বৈধতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা।
ভুটানেই শুধু চীনের গ্রে জোন কৌশল ব্যবহৃত হয়নি। দক্ষিণ চীন সাগরেও একই ধরনের কৌশল দেখা গেছে, যেখানে বিরোধপূর্ণ প্রবালপ্রাচীরে কৃত্রিম দ্বীপ ও বেসামরিক চৌকি গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবরও “সমৃদ্ধ গ্রাম” ও অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যকর সীমান্ত বদলে দেওয়া হয়েছে।
ভুটান-চীন বিরোধের ঐতিহাসিক শিকড়
ভুটান-চীন সীমান্ত বিরোধের সূত্রপাত ১৯৫০-এর দশকে, যখন চীন তিব্বতকে অন্তর্ভুক্ত করে। তিব্বত বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে আসার পর চীন তিব্বতের ভুটানের কিছু অংশের ওপর ঐতিহাসিক দাবিগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, এরপর সেগুলো জোরালোভাবে এগিয়ে নেয়। পরবর্তী দশকগুলোতে চীন তিনটি প্রধান এলাকার ওপর দাবি জানাতে শুরু করে: উত্তরে পাসামলুং ও জাকারলুং এবং পশ্চিমে ডোকলাম। সময়ের সঙ্গে এসব দাবির পরিধি বেড়ে মেনচুমা উপত্যকা এবং আরও সম্প্রতি পূর্বাঞ্চলের সাকতেং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পর্যন্ত পৌঁছেছে।
অনেক প্রতিবেশী দেশের বিপরীতে, ভুটান কখনো চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। এর বদলে ১৯৮৪ সাল থেকে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক সীমান্ত আলোচনায় যুক্ত রয়েছে। ২৫টিরও বেশি দফা আলোচনা এবং সীমানা নিষ্পত্তিতে “তিন ধাপের রোডম্যাপ” নিয়ে ২০২১ সালের সমঝোতা স্মারক সত্ত্বেও কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি। সীমান্ত নির্ধারিত না থাকায় চীন বিরোধপূর্ণ এলাকায় ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
চীনের ছয়-ধাপের কৌশল: পশুপালক থেকে গ্রাম
ভুটানে নিজেদের দাবি সুসংহত করতে চীন পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি ধাপে এগিয়েছে:
- প্রাথমিক অনুপ্রবেশ: বিতর্কিত এলাকায় তিব্বতি পশুপালকদের পাঠানো হয়, এতে স্থানীয় ভুটানি পশুপালকেরা সরে যেতে বাধ্য হন।
- আশ্রয়কেন্দ্র ও চৌকি: পশুপালকদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করা হয়। এর পরপরই তাদের “সুরক্ষায়” সামরিক টহল ও চৌকি বসানো হয়।
- অবকাঠামো উন্নয়ন: এসব চৌকিকে তিব্বতের সঙ্গে যুক্ত করতে সড়ক তৈরি করা হয়, যাতে কর্মী ও সরঞ্জাম দ্রুত সরানো যায়।
- স্থায়ী বসতি: বেসামরিক গ্রাম গড়ে তোলা হয়। বসতি স্থাপনকারীদের প্রায়ই সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়, যা এলাকায় চীনের প্রশাসনিক ও সামরিক উপস্থিতিকে পাকাপোক্ত করে।
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুটানের বিতর্কিত ভূখণ্ডের প্রায় ৮২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে চীন অন্তত ২২টি গ্রাম গড়ে তুলেছে—যা ভুটানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২ শতাংশ। প্রশাসনিক ভবন, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবাসহ এসব বসতির অবস্থান প্রায়ই প্রত্যন্ত, উচ্চভূমির এলাকায়। সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত মেনচুমা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৬৭০ মিটার (১৫,৩০০ ফুট) উঁচুতে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংলগ্ন ভূখণ্ডের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের চেয়েও উঁচু।
এ কঠোর পরিবেশে বসতি স্থাপনে উৎসাহ দিতে চীন তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়—খবরে বলা হয়েছে, জনপ্রতি বছরে সর্বোচ্চ ২০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ২,৮০০ ডলার) পর্যন্ত। এসব গ্রামে বেসামরিক মানুষ, সীমান্ত পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের উপস্থিতি থাকায় ওই এলাকাগুলোর ওপর সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়া ভুটানের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ডোকলাম: বিরোধের কৌশলগত কেন্দ্র
চীনের দাবি কয়েকটি অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হলেও পশ্চিম ভুটানের ডোকলাম মালভূমি সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডোকলাম ভারত, চীন ও ভুটানের ত্রিদেশীয় সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। এখান থেকে শিলিগুড়ি করিডোর দেখা যায়—সরু এই ভূখণ্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ডোকলামের নিয়ন্ত্রণ চীনকে এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথের ওপর প্রভাবশালী অবস্থান দেবে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
২০১৭ সালে ডোকলামে দক্ষিণ দিকে সড়ক সম্প্রসারণের চীনা প্রচেষ্টা ভারতের সঙ্গে ৭৩ দিনের সামরিক অচলাবস্থার জন্ম দেয়। ভুটানের অনুরোধে ভারত হস্তক্ষেপ করেছিল। উভয় পক্ষের সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সংকটের অবসান হলেও এরপর চীন এলাকাটিতে স্থায়ী সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলেছে এবং নিজেদের দাবি অব্যাহত রেখেছে।
চীন বারবার ভুটানকে একটি “সমন্বিত চুক্তির” প্রস্তাব দিয়েছে: উত্তরের কম কৌশলগত এলাকাগুলোর দাবি ছেড়ে দিলে তার বিনিময়ে ডোকলাম ও পশ্চিমের সংলগ্ন অঞ্চলগুলো চীনকে দিতে হবে। ভারতের চাপ—যে দেশ ডোকলামকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে—থাকায় ভুটান এখন পর্যন্ত এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভারতের ভূমিকা: নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা ও কৌশলগত অংশীদার
ভুটান-চীন বিরোধে ভারতের সংশ্লিষ্টতা গভীর এবং বহুমাত্রিক। ২০০৭ সালের ভারত-ভুটান মৈত্রী চুক্তির আওতায় জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতায় দুই দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; কার্যত এর ফলে ভারত ভুটানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতায় পরিণত হয়েছে। ভারত ভুটানকে অর্থনৈতিক সহায়তা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সমর্থন দেয়। শিলিগুড়ি করিডোরের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন চীনা অগ্রযাত্রা ঠেকাতেও ভারতের প্রবল আগ্রহ রয়েছে।
ভারতের প্রভাব নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। চীনা বিশ্লেষকেরা ভারতের ভূমিকাকে “আধিপত্যবাদী” বলে বর্ণনা করেছেন। তাদের যুক্তি, ভুটানের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংযোগপথের ওপর নয়াদিল্লির নিয়ন্ত্রণ দেশটির অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়। অন্যদিকে ভুটান দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও দেশটি জোর দিয়ে বলেছে, সীমান্ত নিষ্পত্তিতে ভারতের উদ্বেগ বিবেচনায় নিতে হবে।
ভারতের চাপ কখনো কখনো সরাসরি দেখা গেছে। থিম্পু ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ২০১৩ সালে ভারত ভুটানের জ্বালানি ভর্তুকি স্থগিত করে। ২০১৭ সালের ডোকলাম অচলাবস্থায় চীনের নির্মাণকাজ থামাতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল নির্ণায়ক। অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা জোরদার এবং চীনের প্রভাব আগেভাগে ঠেকানোর লক্ষ্যে ভারত ভুটানের জলবিদ্যুৎ খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং বাংলাদেশি বন্দর ব্যবহারের ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি: দ্রুততর আলোচনা ও নতুন দাবি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-ভুটান সীমান্ত আলোচনার গতি বেড়েছে। ২০২১ সালের “তিন ধাপের রোডম্যাপে” সীমান্ত চিহ্নিত ও সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়। এরপর বিশেষজ্ঞ দলের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিংয়ে জ্যেষ্ঠ চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যা সম্পর্কের সম্ভাব্য উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে আলোচনা চললেও চীন বিতর্কিত এলাকায় তাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। উপগ্রহচিত্রে নতুন গ্রাম, সড়ক ও সামরিক স্থাপনা দেখা গেছে, বিশেষত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং ডোকলামের আশপাশে। ২০২০ সালে চীন পূর্ব ভুটানের সাকতেং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে নতুন দাবি তোলে—যে অঞ্চলটি আগে সীমান্ত আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই পদক্ষেপকে ব্যাপকভাবে কৌশলগত সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়, যার মাধ্যমে দর-কষাকষিতে বাড়তি সুবিধা তৈরি এবং চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আগে থেকেই বিরোধপূর্ণ এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়, সে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ভুটান সরকার বিরোধ নিষ্পত্তির ইচ্ছা জানালেও ভারতের সঙ্গে চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা এবং চীনের সঙ্গে ক্ষমতার অসমতা তাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং যেমন বলেছেন, “আমরা নিশ্চয়ই একটি সমস্যার সমাধান করে আরেকটি সমস্যার জন্ম দিতে চাই না।”
বৃহত্তর প্রবণতা: চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে অবকাঠামো
ভুটানে চীনের কৌশল রাষ্ট্রকৌশল ও চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে অবকাঠামো ব্যবহারের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। তিব্বত মালভূমিজুড়ে এবং সীমান্ত বরাবর চীন বাঁধ, সড়ক, রেলপথ ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যেগুলো বেসামরিক ও সামরিক—দুই ধরনের কাজেই ব্যবহৃত হয়। এসব প্রকল্প দ্রুত সেনা চলাচল, নজরদারি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়।
উদাহরণস্বরূপ, উজানের পানিসম্পদের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ দেশটিকে ভাটির দেশগুলো—ভারত ও বাংলাদেশসহ—নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়। ভারত ও ভুটান সীমান্তে “সমৃদ্ধ গ্রাম” নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো ভূখণ্ডগত দাবি জোরদার করা এবং সামরিক রসদ সরবরাহ সহজ করা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, অবকাঠামো “রাষ্ট্রক্ষমতার সুপ্ত হাতিয়ার” হয়ে উঠেছে—প্রকাশ্য সংঘাত না ঘটিয়ে প্রতিবেশীদের ওপর চাপ দেওয়ার একটি উপায়।
এ পদ্ধতি শুধু হিমালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধপূর্ণ প্রবালপ্রাচীরে কৃত্রিম দ্বীপ ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের মাধ্যমে চীনের কর্মকাণ্ডও একই কৌশল অনুসরণ করে। এসব পদক্ষেপের সম্মিলিত প্রভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে বদলে যায়, আর ছোট দেশগুলোর পক্ষে প্রতিরোধ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
ভুটানের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে প্রভাব
ভুটানের জন্য চীনের গ্রে জোন কৌশলের পরিণতি শুধু কৌশলগত নয়, গভীরভাবে ব্যক্তিগতও। পাগসামলুং উপত্যকার মতো অনেক বিতর্কিত এলাকার ভুটানি জনগণের কাছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। চীনা গ্রাম নির্মাণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের উচ্ছেদ তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা বিপন্ন করে এবং ভুটানের ঐতিহাসিক দাবিকে দুর্বল করে।
নতুন চীনা বসতির বাসিন্দাদের অনেকেই তিব্বতি; তাঁদের কঠোর জলবায়ু ও সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগের মুখোমুখি হতে হয়। এসব সম্প্রদায়কে সহায়তা দিতে চীন হস্তশিল্পের কর্মশালা ও গ্রিনহাউসে চাষাবাদের মতো প্রকল্প চালু করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর কার্যকারিতা অনিশ্চিত। এসব বসতি দেশপ্রেমমূলক কর্মকাণ্ড ও “সীমান্ত টহল”-এর কাজেও ব্যবহৃত হয়, যা চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি ও জাতীয় পরিচয়কে জোরদার করে।
ভুটানের দুর্দশার দিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগের অভাব চীনকে তার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করেছে। যত বেশি গ্রাম গড়ে উঠছে এবং যত বেশি ভূখণ্ড কার্যত দখল হয়ে যাচ্ছে, ভুটানের পক্ষে নিজেদের ভূমি ফিরে পাওয়ার সুযোগ ততই কমছে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক তাৎপর্য
ভুটান-চীন সীমান্ত বিরোধ শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৃহত্তর প্রবণতার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। আইনি, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপায়ের সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন মিলিয়ে চীনের গ্রে জোন কৌশল সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ভারতের জন্য এই বিরোধের ঝুঁকি অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। ভুটানে চীনের যেকোনো সাফল্য, বিশেষত ডোকলামে, ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করবে এবং সম্ভাব্যভাবে শিলিগুড়ি করিডোরকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই ভারতকে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে: ভুটানকে সমর্থন করা, আবার চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়ানো।
এই বিরোধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে প্রশ্নও তুলছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যদি ক্রমবর্ধমান, সামরিক নয় এমন উপায়ে সীমান্ত বদলে দিতে পারে, তাহলে ছোট দেশগুলোর প্রতিকারের পথ কী? ভুটানে দেখা প্রবণতার সঙ্গে জর্জিয়ায় (দক্ষিণ ওসেটিয়ায় রাশিয়ার “সীমান্তায়ন”) এবং ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সাদৃশ্য রয়েছে, যেখানে বসতি স্থাপনের ফলে ভূমিতে বাস্তবতা বদলে গেছে।
সমাধানের সম্ভাবনা: চুক্তি কি সম্ভব?
সাম্প্রতিক দফায় দফায় আলোচনা এবং তিন ধাপের রোডম্যাপ স্বাক্ষর সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি এখনো নাগালের বাইরে। বিরোধপূর্ণ এলাকায় চীনের স্থায়ী বসতি নির্মাণ দর-কষাকষির পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। চীন দখল করা সব ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেবে—এমন সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে, বিশেষত যেসব এলাকায় এখন গ্রাম ও অবকাঠামো রয়েছে।
উত্তর লাংমারপো এবং চারিতাং চু ও ইয়াক চু উপত্যকার মতো যেসব এলাকায় এখনো স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠেনি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করাই ভুটানের সবচেয়ে ভালো আশা হতে পারে। তবে আলোচনা যত দীর্ঘায়িত হবে, ভুটানের ভূখণ্ড হারানোর আশঙ্কা ততই বাড়বে। ক্ষমতার অসমতা প্রকট: ভুটানের ৮ হাজার সদস্যের সেনাবাহিনী চীনের ২৫ লাখ সদস্যের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না।
যেকোনো চুক্তিতে ভারতের সম্মতিও লাগবে। ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে, ডোকলাম চীনের হাতে ছেড়ে দেওয়া তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী যেমন বলেছেন, “ডোকলাম ভারত, চীন ও ভুটানের মধ্যে একটি সংযোগস্থল। সমস্যা সমাধানের দায় শুধু ভুটানের নয়। আমরা তিন পক্ষ… অন্য দুই পক্ষ প্রস্তুত হলেই এ নিয়ে আলোচনা করতে পারি।”
সারসংক্ষেপ
- হিমালয়ের ছোট রাজ্য ভুটান চীনের চলমান ভূখণ্ড দখলের মুখে রয়েছে। প্রকাশ্য সংঘাত ছাড়াই সীমান্ত বদলাতে চীন গ্রে জোন কৌশল ব্যবহার করছে।
- বিরোধপূর্ণ এলাকায় গ্রাম, সড়ক ও সামরিক চৌকি গড়ে “ভূমিতে বাস্তবতা” তৈরি করা চীনের কৌশলের অংশ, যা পরে বদলানো কঠিন।
- ডোকলাম মালভূমি সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এর নিয়ন্ত্রণ চীনকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেবে।
- ভারত ভুটানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা এবং চীনের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করেছে। তবে ভুটানকে দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত আলোচনা দ্রুততর হয়েছে, কিন্তু চীন উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা কম।
- সামরিক নয় এমন উপায়ে সীমান্ত বদলাতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তর প্রবণতার উদাহরণ এই বিরোধ, যা সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
- ভুটানের জন্য ঝুঁকি শুধু ভূখণ্ডগত নয়, সাংস্কৃতিক ও অস্তিত্বগতও; ক্রমে দখল হয়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী ভূমি ও জীবনধারা হুমকির মুখে পড়েছে।






