জরুরি অবস্থা: ভারতের গণতন্ত্রে এক সন্ধিক্ষণ
১৯৭৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত ও সুদূরপ্রসারী সময়গুলোর একটি। নাগরিক অধিকার স্থগিত করা হয়, রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাবন্দি করা হয় এবং সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়। জরুরি অবস্থাকে প্রায়ই প্রকাশ্য কর্তৃত্ববাদের জন্য স্মরণ করা হয়। তবে এর তুলনায় কম আলোচিত, কিন্তু সমান তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা ছিল কংগ্রেস সরকারের গোপনে ভারতের শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ—সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় রূপান্তর।
সূচিপত্র
- জরুরি অবস্থা: ভারতের গণতন্ত্রে এক সন্ধিক্ষণ
- ইন্দিরা গান্ধীর সরকার রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বিবেচনা করেছিল কেন?
- নতুন ব্যবস্থাটি কেমন হতো?
- বিয়াল্লিশতম সংশোধনী: রাষ্ট্রপতিশাসনের ছায়া
- কংগ্রেসের অনুগতরা ও নেতৃত্বের ব্যক্তিপূজা
- পরবর্তী অধ্যায়: সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ও স্থিতিস্থাপকতা
- রাষ্ট্রপতিশাসন নিয়ে নতুন করে ভাবনা
- রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা শিকড় গাড়তে পারেনি কেন?
- বৃহত্তর তাৎপর্য: জরুরি অবস্থার উত্তরাধিকার ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক
- সংক্ষেপে
সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক গবেষণা ও সমসাময়িক বিবরণ অবলম্বনে এই নিবন্ধে সেই উদ্যোগের সূত্রপাত, লক্ষ্য ও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার অনুসন্ধান করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা কীভাবে সাংবিধানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল, রাষ্ট্রপতিশাসনের দিকে যাওয়ার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কী—তা এখানে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ইন্দিরা গান্ধীর সরকার রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বিবেচনা করেছিল কেন?
১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের মূল সংবিধানে ব্রিটিশ ব্যবস্থার আদলে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত আইনসভার কাছে জবাবদিহি করতেন, আর রাষ্ট্রপতি ছিলেন মূলত আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান। ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল; অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগ ও মুক্ত সংবাদমাধ্যম।
তবে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে এই ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছিল। কংগ্রেস পার্টির আধিপত্য ক্ষয় হচ্ছিল, জোটের রাজনীতি বাড়ছিল এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিচার বিভাগ নিজের ভূমিকা জোরদার করতে শুরু করেছিল। আদালতের এক রায়ে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল হওয়ায় তাঁর নিজের অবস্থান হুমকির মুখে পড়ে, আর তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে গান্ধীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টা ও দলীয় অনুগত নেতা বলতে শুরু করেন, ভারতের প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী নয় সংসদীয় ব্যবস্থা।
অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও গান্ধীর আস্থাভাজন বি কে নেহরু ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে লেখা এক চিঠিতে এই মত প্রকাশ করেন। তিনি জরুরি অবস্থাকে “জনসমর্থনে অর্জিত অসামান্য সাহস ও শক্তির এক দৃষ্টান্ত” বলে বর্ণনা করেন এবং যুক্তি দেন, সংসদীয় গণতন্ত্র দৃঢ়ভাবে শাসন পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। আইনসভার ওপর নির্ভরতার বাধা থেকে মুক্ত, সরাসরি নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতির পক্ষে তিনি মত দেন; যিনি জাতীয় স্বার্থে “কঠিন, অপ্রিয় ও জনসমর্থনহীন সিদ্ধান্ত” নিতে পারবেন। তাঁর উল্লেখ করা আদর্শ ছিল শার্ল দ্য গলের ফ্রান্স, যেখানে পঞ্চম প্রজাতন্ত্র সংসদীয় অস্থিতিশীলতার বদলে শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল।
কংগ্রেস নেতৃত্বের অনেকেই এসব ধারণার সঙ্গে একমত ছিলেন। তাঁদের চোখে বিচার বিভাগ ছিল “বাধা সৃষ্টিকারী” আর সংসদ ছিল “প্রতীকী কোরাস”। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে বিশেষভাবে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইন্দিরা গান্ধীকে সরাসরি “আজীবন রাষ্ট্রপতি” করা উচিত।
নতুন ব্যবস্থাটি কেমন হতো?
এই আলোচনাগুলো থেকে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো ছিল আমূল পরিবর্তনমূলক। নেহরু কল্পনা করেছিলেন একটানা সাত বছরের রাষ্ট্রপতি মেয়াদ, সংসদ ও রাজ্য বিধানসভায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতা-সংকুচিত বিচার বিভাগ এবং কঠোর মানহানি আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম। সাম্য ও বাক্স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার আদালতে বলবৎ করার সুযোগ তুলে দেওয়া হতো; অর্থাৎ অধিকার লঙ্ঘিত হলে নাগরিকেরা আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারতেন না।
“আমাদের সংবিধানের দিকে নতুন করে তাকানো: কিছু প্রস্তাব” শিরোনামে একটি গোপন নথি তৈরি করে আস্থাভাজন উপদেষ্টাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এতে মার্কিন রাষ্ট্রপতির চেয়েও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন একজন রাষ্ট্রপতির প্রস্তাব ছিল; বিচারপতি নিয়োগ ও আইন প্রণয়নের ওপর নিয়ন্ত্রণও থাকত তাঁর হাতে। রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে একটি নতুন “বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পরিষদ” আইন ও সংবিধ্যার ব্যাখ্যা দিত, যার ফলে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ত।
ইন্দিরা গান্ধী এসব ধারণা আরও খতিয়ে দেখার অনুমতি দিলেও প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেননি। প্রস্তাবগুলো তাঁর আনুষ্ঠানিক সমর্থন পেয়েছে—এমন ধারণা তৈরি না করতে তিনি সহযোগীদের নির্দেশ দেন। তা সত্ত্বেও, সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে কংগ্রেস পার্টির ভেতরে বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান গতি তৈরি হয়েছিল।
বিয়াল্লিশতম সংশোধনী: রাষ্ট্রপতিশাসনের ছায়া
সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার উদ্যোগ কখনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে রূপ না নিলেও, ১৯৭৬ সালের বিয়াল্লিশতম সংশোধনী আইনে এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। জরুরি অবস্থার চরম সময়ে পাস হওয়া এই সংশোধনী ভারতের ইতিহাসে সংবিধানের সবচেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল।
বিয়াল্লিশতম সংশোধনী:
- বিচার বিভাগ ও রাজ্যগুলোর ক্ষমতা খর্ব করে সংসদের ক্ষমতা বাড়ায়
- আইন বাতিল করা সুপ্রিম কোর্টের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে কঠিন করে তোলে; এ জন্য পাঁচ বা সাত বিচারপতির বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান করা হয়
- সংবিধান সংশোধনে সংসদের ক্ষমতা সীমিত করা “মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব” দুর্বল করার চেষ্টা করে
- রাজ্যে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারকে দেয়
- রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসনের মেয়াদ ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে এক বছর করে
- নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধকে বিচার বিভাগের এখতিয়ারের বাইরে রাখে
নামে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা না হলেও সংশোধনীটিতে এর “জিনগত ছাপ” ছিল—শক্তিশালী নির্বাহী বিভাগ, প্রান্তিক বিচার বিভাগ এবং দুর্বল ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি। দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা সতর্ক করে বলেছিল, “একটি সুনির্দিষ্ট আঘাতেই এই সংশোধনী সাংবিধানিক ভারসাম্যকে সংসদের অনুকূলে হেলিয়ে দেয়।”
কংগ্রেসের অনুগতরা ও নেতৃত্বের ব্যক্তিপূজা
এই সময়ে গান্ধীর অনুগতরা সরকারি প্রস্তাবের চেয়েও বেশি দূর এগিয়ে যান। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানসি লাল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গান্ধীর “আজীবন ক্ষমতা”র দাবি জানান; হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস সদস্যরা সংবিধান নতুন করে লেখার জন্য সর্বসম্মতভাবে নতুন গণপরিষদের দাবি তোলেন। এসব প্রস্তাবের চরমপন্থা দেখে প্রধানমন্ত্রী নাকি বিস্মিত হয়েছিলেন। এর বদলে তিনি সংসদে সংশোধনী বিল পাসের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেন।
১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিয়াল্লিশতম সংশোধনী সংসদের উভয় কক্ষে পাস হয়, ১৩টি রাজ্য বিধানসভায় অনুমোদিত হয় এবং রাষ্ট্রপতি এতে স্বাক্ষর করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা কখনো গৃহীত না হলেও এই পরিবর্তনগুলো ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে দেয়।
পরবর্তী অধ্যায়: সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ও স্থিতিস্থাপকতা
১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন ঘোষণা করলে জরুরি অবস্থার আকস্মিক অবসান ঘটে; নির্বাচনে তিনি বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। গান্ধীবিরোধী শক্তিগুলোর জোট জনতা পার্টি ক্ষমতায় এসে জরুরি অবস্থার কর্তৃত্ববাদী উত্তরাধিকার দ্রুত মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়। তেতাল্লিশতম ও চুয়াল্লিশতম সংশোধনীর মাধ্যমে নতুন সরকার বিয়াল্লিশতম সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো প্রত্যাহার করে এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনে।
তবে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে জনতা পার্টির শাসন বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে গান্ধী আবার ক্ষমতায় ফেরেন এবং কংগ্রেস পার্টি আবারও ভারতীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার ধারণা সুপ্ত থাকলেও তা বিলুপ্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতিশাসন নিয়ে নতুন করে ভাবনা
১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদ ছেড়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। তাঁর মুখ্য সচিব পরে জানান, এই পদক্ষেপ নিয়ে তিনি “খুবই আন্তরিক” ছিলেন। দলকে “ঝাঁকুনি দেওয়ার” এবং নেতৃত্বকে নতুন করে চাঙা করার উপায় হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি পদকে দেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গান্ধী তাঁর অনুগত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জৈল সিংকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান। নিজে প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকে রাষ্ট্রপতি পদের ওপর নিজের প্রভাব বজায় রাখেন।
১৯৮৪ সালে গান্ধী নিহত হওয়ার পরও কংগ্রেস পার্টির ভেতরে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত ছিল। জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বসন্ত সাঠে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় যাওয়ার পক্ষে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু করেন, কিন্তু গান্ধীর মৃত্যুর পর সেই আলোচনা স্তিমিত হয়ে যায়। সময়ের জটিল রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতার মধ্য দিয়ে ভারত সংসদীয় গণতন্ত্রই থেকে যায়।
রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা শিকড় গাড়তে পারেনি কেন?
গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা এবং কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন সত্ত্বেও ভারত কখনো রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় যায়নি। এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল:
- রাজনৈতিক সতর্কতা: কৌশলী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা হলেও ইন্দিরা গান্ধী সীমা ছাড়িয়ে যেতে সতর্ক ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতিশাসনের ধারণা খতিয়ে দেখার অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে সমর্থন করা থেকে বিরত ছিলেন। হয়তো আমূল পরিবর্তনের ঝুঁকি তিনি আঁচ করেছিলেন।
- জাতীয় ঐকমত্যের অভাব: কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা উৎসাহী হলেও অন্যরা—বিশেষ করে দলের বাইরের নেতারা—সন্দিহান বা বিরোধী ছিলেন। তামিলনাড়ুর কংগ্রেস-বহির্ভূত মুখ্যমন্ত্রী এম. করুণানিধি প্রস্তাবগুলোতে বিশেষভাবে আগ্রহ দেখাননি।
- প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা: স্বাধীনতা আন্দোলনে গভীর শিকড় এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে তাৎপর্যের কারণে ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থা সহজে বদলানোর মতো ছিল না। জরুরি অবস্থার পরও এই ব্যবস্থা আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার উদ্যোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়।
- জনরোষ: নাগরিক অধিকার স্থগিত করা ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করাসহ জরুরি অবস্থার বাড়াবাড়ি ব্যাপক জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করে। অনেক দিক থেকেই ১৯৭৭ সালের নির্বাচন ছিল কর্তৃত্ববাদের ওপর গণভোট; ভোটাররা নির্ণায়কভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন, যাঁর গবেষণায় এসব ঘটনা সামনে এসেছে, যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার উদ্যোগ ছিল মূলত ক্ষমতা সংহত করতে গান্ধীর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। রাঘবন বিবিসিকে বলেন, “লক্ষ্য ছিল এমনভাবে ব্যবস্থাটিকে নতুন করে সাজানো, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতার ওপর তাঁর দখল আরও শক্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল না—তাঁর শাসনের বেশির ভাগ স্থায়ী পরিণতি সম্ভবত অনিচ্ছাকৃত ছিল। জরুরি অবস্থার সময় তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বল্পমেয়াদি: নিজের পদকে যেকোনো চ্যালেঞ্জ থেকে সুরক্ষিত রাখা। বিয়াল্লিশতম সংশোধনী এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে বিচার বিভাগও তাঁর পথে দাঁড়াতে না পারে।”
বৃহত্তর তাৎপর্য: জরুরি অবস্থার উত্তরাধিকার ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক
জরুরি অবস্থা ও রাষ্ট্রপতিশাসন নিয়ে সেই টানাপোড়েন ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই ঘটনা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়াবাড়ি করলে সংসদীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে; একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিস্থাপকতাও দেখিয়ে দেয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রত্যাবর্তন—সবই ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থার শক্তির প্রমাণ দেয়।
ভারতে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার গুণাগুণ নিয়ে বিতর্ক আজও চলছে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার সমর্থকদের যুক্তি, এতে স্থিতিশীল ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জোটের রাজনীতির বিশৃঙ্খলা কমবে। সমালোচকদের সতর্কতা, এতে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য বহুত্ববাদ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে মত দেওয়া ওয়েবসাইট এবং ভাষ্যকারেরা প্রায়ই জরুরি অবস্থাকে সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে নির্বাহী বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের ভারসাম্য, বিচার বিভাগের ভূমিকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমসাময়িক বিতর্কেও এই ঘটনার উল্লেখ করা হয়।
সংক্ষেপে
- জরুরি অবস্থার সময় (১৯৭৫-৭৭) ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের আদলে ভারতকে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
- প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন সরাসরি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, প্রান্তিক বিচার বিভাগ এবং দুর্বল সংসদ; তবে এসব ধারণা কখনো আনুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত হয়নি।
- ১৯৭৬ সালের বিয়াল্লিশতম সংশোধনী আইনে এসব উচ্চাকাঙ্ক্ষার অনেকটাই প্রতিফলিত হয়: নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা সীমিত করা হয়।
- জরুরি অবস্থার পর জনতা পার্টি সরকার কর্তৃত্ববাদী অনেক বিধান প্রত্যাহার করে এবং গণতান্ত্রিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
- ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮২ সালে অল্প সময়ের জন্য নিজে রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা বিবেচনা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং এক অনুগত নেতাকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন।
- রাজনৈতিক সতর্কতা, ঐকমত্যের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে জনরোষের কারণে ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থা টিকে যায়।
- এই ঘটনা ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; শাসনব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতা এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্ককে এটি প্রভাবিত করে চলেছে।






