চীনের কারখানা কেন্দ্রে হাঙ্গেরির উত্থান: অর্থনৈতিক জোয়ার, স্থানীয় প্রতিরোধ এবং ইউরোপীয় শিল্পের ভবিষ্যৎ

পড়তে 9 মিনিট
চীনের কারখানা কেন্দ্রে হাঙ্গেরির উত্থান: অর্থনৈতিক জোয়ার, স্থানীয় প্রতিরোধ এবং ইউরোপীয় শিল্পের ভবিষ্যৎ
সূচিপত্র
  1. হাঙ্গেরির রূপান্তর: ইউরোপের প্রান্তিক অবস্থান থেকে চীনের কারখানা কেন্দ্রে
  2. কেন হাঙ্গেরি? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চালিকাশক্তি
  3. ইভি ও ব্যাটারির জোয়ার: প্রধান প্রকল্প ও অর্থনৈতিক প্রভাব
  4. বিওয়াইডি: হাঙ্গেরিতে ইউরোপের ইভি ভবিষ্যৎ গড়া
  5. সিএটিএল: চীনের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি কারখানা
  6. অন্য প্রধান কোম্পানি: ইভি এনার্জি, সেমকর্প ও জেটানেট
  7. গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ: এর বৈশিষ্ট্য কী?
  8. স্থানীয় প্রতিরোধ: পরিবেশ ও সামাজিক উদ্বেগ
  9. তৃণমূলের আন্দোলন: মাইকেপের্চের মায়েরা
  10. স্বাস্থ্য ও সম্পত্তি নিয়ে আশঙ্কা
  11. সরকার ও কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া
  12. রাজনৈতিক প্রভাব: হাঙ্গেরি, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন
  13. ইভির বাইরেও: বৈচিত্র্য ও চীনা বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ
  14. সামনের চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা
  15. সংক্ষেপে

হাঙ্গেরির রূপান্তর: ইউরোপের প্রান্তিক অবস্থান থেকে চীনের কারখানা কেন্দ্রে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের জন্য ইউরোপের শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে দ্রুত উঠে এসেছে হাঙ্গেরি; এমনকি মহাদেশের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে দেশটি। একসময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রান্তিক খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হাঙ্গেরি এখন বৈশ্বিক শিল্পগত গতিপ্রকৃতির এক নাটকীয় পরিবর্তনের কেন্দ্রে। চীনা পুঁজি, প্রযুক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রবাহ এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে হাঙ্গেরির অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক সুযোগ, রাজনৈতিক কৌশল এবং স্থানীয় প্রতিরোধের সম্মিলন। চীনা কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যান (ইভি) ও ব্যাটারি খাতে, নতুন কারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরির সরকার সক্রিয়ভাবে এই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেছে, উদার ভর্তুকি দিয়েছে এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে দেশটিকে তুলে ধরেছে। তবে কারখানাগুলো যত গড়ে উঠছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবেশগত ঝুঁকি, সামাজিক পরিবর্তন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে হাঙ্গেরির গভীরতর সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে উদ্বেগও তত বাড়ছে।

কেন হাঙ্গেরি? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চালিকাশক্তি

চীনের কারখানা কেন্দ্র হিসেবে হাঙ্গেরির উত্থান আকস্মিক নয়। ইউরোপে অবস্থান পোক্ত করতে আগ্রহী চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশটিকে অনন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে কয়েকটি বিষয়:
  • কৌশলগত অবস্থান: ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হাঙ্গেরি ইইউর বিশাল ভোক্তা বাজার এবং প্রতিষ্ঠিত মোটরগাড়ি সরবরাহব্যবস্থায় সরাসরি প্রবেশাধিকার দেয়।
  • প্রতিযোগিতামূলক শ্রমব্যয়: হাঙ্গেরির মজুরি পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম—জার্মানির গড় ঘণ্টাপ্রতি শ্রমব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে শ্রমনির্ভর উৎপাদনের জন্য দেশটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
  • সরকারি প্রণোদনা: অরবান প্রশাসন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে উচ্চপ্রযুক্তি ও মোটরগাড়ি খাতে, উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি, করছাড় ও সরাসরি অনুদান দিয়েছে।
  • চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্য: হাঙ্গেরির সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, ২০১৫ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যোগ দিয়েছে এবং ইইউর ভেতরে ধারাবাহিকভাবে চীনের স্বার্থকে সমর্থন করেছে।
এই বিষয়গুলো মিলে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য অনুকূল ও লাভজনক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করেছে। মারকাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ ও রোডিয়াম গ্রুপের যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইউরোপে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ৩০ শতাংশের বেশি—প্রায় ৩.১ বিলিয়ন ইউরো—হাঙ্গেরিতে এসেছে। এই অঙ্ক ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সম্মিলিত বিনিয়োগকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন

ইভি ও ব্যাটারির জোয়ার: প্রধান প্রকল্প ও অর্থনৈতিক প্রভাব

হাঙ্গেরিতে চীনা বিনিয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ হলো বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারি উৎপাদন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ। ইউরোপে চীনের সক্রিয় পাঁচটি বৃহত্তম বিনিয়োগ প্রকল্পের চারটিই এখন হাঙ্গেরিতে। বিওয়াইডি, সিএটিএল, ইভি এনার্জি ও সেমকর্পের মতো কোম্পানি এই সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বিওয়াইডি: হাঙ্গেরিতে ইউরোপের ইভি ভবিষ্যৎ গড়া

চীনের বৈদ্যুতিক যান নির্মাতা বিওয়াইডি হাঙ্গেরিকে তাদের ইউরোপীয় সদর দপ্তর করেছে। বুদাপেস্টে নতুন কেন্দ্র এবং সেজেদে বড় একটি কারখানা গড়ে উঠছে, যেখানে ২০২৫ সালে উৎপাদন শুরুর কথা। বিওয়াইডির প্রধান নির্বাহী ওয়াং চুয়ানফুর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ইউরোপীয় কেন্দ্রটিতে ২,০০০ কর্মসংস্থান হবে। এটি বিক্রয়, বিক্রয়োত্তর সেবা, পরীক্ষণ এবং স্থানীয় বাজারের উপযোগী গাড়ির মডেল উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে। উৎপাদন স্থানীয়করণ, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং চীনে তৈরি গাড়ির ওপর ইইউর নতুন শুল্কের প্রভাব সামলানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ এই বিনিয়োগ।

সিএটিএল: চীনের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি কারখানা

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইভি ব্যাটারি উৎপাদক সিএটিএল পূর্ব হাঙ্গেরির মাইকেপের্চের কাছে ৮ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে একটি ব্যাটারি কারখানা নির্মাণ করছে। ২২১ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই কারখানা বিএমডব্লিউ ও মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো বড় গাড়ি নির্মাতাদের ব্যাটারি সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। করছাড় ও সরাসরি অনুদানসহ উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা দিয়ে হাঙ্গেরি সরকার সিএটিএলকে সহায়তা করেছে। তবে কোম্পানিটি বলেছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা ছিল একাধিক বিষয়ের মধ্যে মাত্র একটি।

অন্য প্রধান কোম্পানি: ইভি এনার্জি, সেমকর্প ও জেটানেট

অন্য চীনা কোম্পানিগুলোও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে। ব্যাটারি সেল কারখানার জন্য ইভি এনার্জি প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ইউরো সরাসরি অনুদান পেয়েছে। অন্যদিকে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিভাজক তৈরিতে ৩৭০ মিলিয়ন ইউরোর একটি কারখানা চালু করছে সেমকর্প। মোটরগাড়ি খাতের বাইরেও চীনের টেলিযোগাযোগ জায়ান্ট ফাইবারহোম কিসবেরে জেটানেট নামে অপটিক্যাল কেবল উৎপাদনকেন্দ্র চালু করেছে, যা হাঙ্গেরির শিল্পভিত্তিকে আরও বৈচিত্র্যময় করছে।
বিজ্ঞাপন
হাঙ্গেরির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী পেতের সিয়ার্তোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে ৭,০০০ বিলিয়ন ফোরিন্ট (প্রায় ১৭.৩ বিলিয়ন ইউরো) মূল্যের ৫৪টি বড় চীনা বিনিয়োগ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এগুলোর মাধ্যমে সরাসরি ৩০ হাজারের বেশি নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। মোটরগাড়ি শিল্পের প্রযুক্তিগত রূপান্তরে বৈশ্বিক নেতা হিসেবে হাঙ্গেরির উত্থানের প্রমাণ হিসেবে সরকার এসব প্রকল্পকে তুলে ধরছে।

গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ: এর বৈশিষ্ট্য কী?

হাঙ্গেরিতে চীনা বিনিয়োগের বড় অংশই গ্রিনফিল্ড প্রকল্প—অর্থাৎ বিদ্যমান কোম্পানি অধিগ্রহণের বদলে একেবারে নতুন করে কারখানা ও স্থাপনা নির্মাণ। গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগের ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো কার্যক্রম, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি গড়তে এবং যৌথ উদ্যোগ বা অধিগ্রহণের জটিলতা এড়াতে আগ্রহী চীনা কোম্পানিগুলোর কাছে এই পদ্ধতি বিশেষ আকর্ষণীয়। গ্রিনফিল্ড এফডিআই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাসহ স্বাগতিক দেশকে উল্লেখযোগ্য সুফল দেয়। তবে বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরতা, স্থানীয় শিল্পের স্থানচ্যুতি এবং বড় পরিসরে শিল্পায়নের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় প্রতিরোধ: পরিবেশ ও সামাজিক উদ্বেগ

চীনা বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল স্পষ্ট হলেও, গ্রামীণ হাঙ্গেরির দ্রুত শিল্পায়ন স্থানীয় প্রতিরোধের ঢেউ তুলেছে; বিশেষ করে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশাল ব্যাটারি কারখানা ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নির্মাণে একসময়ের শান্ত গ্রামগুলো শিল্পকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে। এতে দূষণ, পানির ব্যবহার এবং কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তৃণমূলের আন্দোলন: মাইকেপের্চের মায়েরা

সিএটিএলের নতুন ব্যাটারি কারখানার কাছে মাইকেপের্চ গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দারা আরও স্বচ্ছতা ও পরিবেশগত সুরক্ষার দাবিতে সংগঠিত হয়েছেন। পরিবেশ প্রকৌশলী ও তিন সন্তানের মা ইভা কোজমা মাইকেপের্চ মাদার্স ফর দ্য এনভায়রনমেন্ট (মিয়াকো) প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। দলটি শিল্প উন্নয়নে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করা তৃণমূল সংগঠনগুলোর একটি জাতীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। এই আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ করেছেন, মামলা করেছেন এবং কঠোরতর পরিবেশগত মান কার্যকরের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। তাঁদের উদ্বেগের ভিত্তি আছে: হাঙ্গেরিতে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে গড়ে ওঠা ব্যাটারি কারখানাগুলোর আগের তদন্তে পানিদূষণ, বিষাক্ত নিঃসরণ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে এসেছিল। চীনা কোম্পানি হালমস—ঝেজিয়াং হুয়াশুও টেকনোলজির হাঙ্গেরীয় শাখা—সহ অন্য প্রতিষ্ঠানও পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনের জন্য জরিমানার মুখে পড়েছে।

স্বাস্থ্য ও সম্পত্তি নিয়ে আশঙ্কা

ভেরা চুভারস্কির মতো কয়েকজন বাসিন্দা কারখানার সম্ভাব্য দূষকের কারণে সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কায় এমনকি অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় সম্পত্তির দাম কমেছে, ফলে পরিবারের পক্ষে বাড়ি বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং জনসাধারণের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ না হওয়ায় অসহায়ত্বের অনুভূতি আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন

সরকার ও কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া

সমালোচনা বাড়তে থাকায় সেমকর্পের মতো কোম্পানিগুলো পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সব মান মেনে চলার এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। এদিকে হাঙ্গেরির সরকার কয়েকটি নাগরিক সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে বিদেশি সহায়তা ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ভিন্নমত দমনের চেষ্টা হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই উত্তেজনার মধ্যেও স্থানীয় আন্দোলনকারীরা কিছু সাফল্য পেয়েছেন। আলশোজোলচায় বিক্ষোভের মুখে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কারখানার পরিকল্পনা থেমে যায়। হেভেশে জনরোষের কারণে মেয়র একটি চীনা রাসায়নিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেন। এসব ঘটনা দেখায়, শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্বার্থের মুখেও নাগরিকদের অংশগ্রহণ শিল্প উন্নয়নের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক প্রভাব: হাঙ্গেরি, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন

চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর হাঙ্গেরির সিদ্ধান্তের বড় রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে—দেশের অভ্যন্তরে এবং বৃহত্তর ইইউ পরিসরেও। প্রধানমন্ত্রী অরবানের চীনপন্থী অবস্থান ব্রাসেলসের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছে। বিশেষ করে চীনকে “ব্যবস্থাগত প্রতিদ্বন্দ্বী” আখ্যা দিয়ে এবং চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে ইইউর অবস্থান কঠোর হওয়ার পর এই বিরোধ আরও বেড়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় চীনা টিকা গ্রহণ করা প্রথম ইউরোপীয় দেশ ছিল হাঙ্গেরি। হংকং ও শিনজিয়াংয়ের মতো বিষয়ে চীনের সমালোচনা করে ইইউর নেওয়া পদক্ষেপও দেশটি ধারাবাহিকভাবে আটকে দিয়েছে। এই অবস্থানের কারণে অন্য ইইউ সদস্যদের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক চাপে পড়েছে; স্থগিত হয়েছে ইইউর পুনরুদ্ধার তহবিল এবং বুদাপেস্টের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর নজরদারি বেড়েছে। একই সঙ্গে চীনা পুঁজির ওপর হাঙ্গেরির অর্থনৈতিক নির্ভরতা জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠছে। তিসা পার্টির পেতের মাগিয়ারের মতো বিরোধী নেতারা সতর্ক করেছেন, প্রকৃত সার্বভৌমত্বের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন অর্থনীতি দরকার—চীনা ঋণ বা রুশ প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নয়। ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রনীতি ও বিনিয়োগ কৌশল কোন পথে এগোবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিজ্ঞাপন

ইভির বাইরেও: বৈচিত্র্য ও চীনা বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ

ইভি ও ব্যাটারি খাত সংবাদ শিরোনামে প্রাধান্য পেলেও হাঙ্গেরিতে চীনা বিনিয়োগ ক্রমেই বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। ফাইবারহোমের সহায়তায় জেটানেটের অপটিক্যাল কেবল কারখানা চালু হওয়া উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়। প্রচলিত উৎপাদন খাতের বাইরেও অর্থনৈতিক রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে হাঙ্গেরির সরকার চীনা গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং সেবা খাতের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। চীনা রপ্তানিপণ্যের জন্য বুদাপেস্ট মধ্য ইউরোপের একটি বড় আকাশপথের সরবরাহকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। রেকর্ড পরিমাণ পণ্য পরিবহন এবং চীনের একাধিক শহরের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে। এই অবকাঠামো শুধু উৎপাদন নয়, ই-কমার্স ও প্রযুক্তি হস্তান্তরকেও সহায়তা করছে এবং চীনের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় হাঙ্গেরির সংযোগ আরও গভীর করছে।

সামনের চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা

অর্থনৈতিক জোয়ার সত্ত্বেও, চীনের কারখানা কেন্দ্র হিসেবে হাঙ্গেরির অবস্থান কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে:
  • পরিবেশ ও সামাজিক প্রতিরোধ: স্থানীয় বিক্ষোভ ও আইনি চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের গতি কমাতে বা ধরন বদলাতে পারে, বিশেষ করে পরিবেশগত উদ্বেগ যথাযথভাবে মোকাবিলা না করা হলে।
  • রাজনৈতিক অস্থিরতা: সরকার পরিবর্তন বা জনমতের রদবদলে হাঙ্গেরির চীনপন্থী অবস্থান বদলে যেতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
  • ইইউর নীতিগত পরিবর্তন: শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক নজরদারিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবর্তনশীল বাণিজ্য ও বিনিয়োগনীতি হাঙ্গেরিতে চীনা প্রকল্পের লাভজনকতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
  • অর্থনৈতিক নির্ভরতা: বিদেশি পুঁজির ওপর, বিশেষ করে একটি দেশের পুঁজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তা সত্ত্বেও, হাঙ্গেরিতে চীনা বিনিয়োগের গতি প্রবল বলেই মনে হচ্ছে। শিল্পনেতারা দেশে শক্ত অবস্থান গড়ে তুললে সরবরাহকারী ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বৃহত্তর একটি বলয় গড়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে চীন ও হাঙ্গেরির অর্থনীতির সংযোগ আরও গভীর হবে।

সংক্ষেপে

  • চীনা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের জন্য হাঙ্গেরি ইউরোপের শীর্ষ গন্তব্য হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারি খাতে।
  • কৌশলগত অবস্থান, কম শ্রমব্যয়, উদার সরকারি প্রণোদনা এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক এর প্রধান কারণ।
  • বিওয়াইডি, সিএটিএল, ইভি এনার্জি ও অন্যদের বড় প্রকল্প হাঙ্গেরির শিল্পভিত্তিকে বদলে দিচ্ছে এবং কয়েক দশ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।
  • বিনিয়োগের বড় অংশই গ্রিনফিল্ড প্রকল্পে, যার ফলে চীনা কোম্পানিগুলো কার্যক্রম ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছে।
  • পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উদ্বেগ তুলে ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে; প্রকল্প থামানো বা পরিবর্তন করাতেও কিছু সাফল্য পেয়েছে।
  • হাঙ্গেরির চীনপন্থী অবস্থানের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
  • চীনা বিনিয়োগ ইভির বাইরেও টেলিযোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থার মতো উচ্চপ্রযুক্তি খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।
  • চীনের কারখানা কেন্দ্র হিসেবে হাঙ্গেরির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ইইউ-চীন সম্পর্কের পরিবর্তনের ভারসাম্য রক্ষার ওপর।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে