চরম দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে ভারত, জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক

পড়তে 4 মিনিট
চরম দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে ভারত, জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক

ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ব্যাপকভাবে কমেছে: বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ভারতে চরম দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্বব্যাংক প্রতিদিন জনপ্রতি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা ৩ ডলারে উন্নীত করার পরও দেশটিতে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১১-১২ সালের ২৭.১ শতাংশ থেকে ২০২২-২৩ সালে মাত্র ৫.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এর অর্থ, এখন আরও লাখ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার ওপরে বলে বিবেচিত হচ্ছেন। সারা দেশে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিরই প্রতিফলন এটি।

সূচিপত্র
  1. ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ব্যাপকভাবে কমেছে: বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা
  2. কত মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন?
  3. গ্রাম ও শহরের দারিদ্র্য: ব্যবধান কমছে
  4. দারিদ্র্য হ্রাসে ভারতের সাফল্যের পেছনে কী?
  5. নতুন দারিদ্র্যসীমা বুঝে নেওয়া
  6. ভারত ও প্রতিবেশীদের তুলনা: স্পষ্ট ব্যবধান
  7. চ্যালেঞ্জ ও সামনের পথ
  8. সংক্ষেপে

বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ পদ্ধতিতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমন্বয় করা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যের আরও নির্ভুল চিত্র তুলে ধরে। ভারতের ক্ষেত্রে এর অর্থ, চরম দারিদ্র্যসীমা আগের দৈনিক ২.১৫ ডলারের মানদণ্ডের চেয়ে এখন ১৫ শতাংশ বেশি। ফলে এই অর্জন আরও উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে।

কত মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন?

বিশ্বব্যাংকের ‘দারিদ্র্য ও সমতা সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন’ অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ১৭ কোটি ১০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এ সময় চরম দারিদ্র্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৩৪ কোটি ৪০ লাখ থেকে কমে ৭ কোটি ৫০ লাখের কিছু বেশি হয়েছে। দেশের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় নিলে এই অগ্রগতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমা ধরে বিশ্বব্যাংকের হিসাব, ২০২৪ সালে ভারতে প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যে ছিলেন; দারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৪৪ শতাংশ। পুরোনো দৈনিক ২.১৫ ডলারের সীমা ব্যবহার করলে পতন আরও বেশি: ২০১১-১২ সালের ১৬.২ শতাংশ থেকে ২০২২-২৩ সালে হারটি ২.৩ শতাংশে নেমে আসে।

গ্রাম ও শহরের দারিদ্র্য: ব্যবধান কমছে

গ্রাম ও শহর, উভয় এলাকায় দারিদ্র্য কমেছে। গ্রামে চরম দারিদ্র্যের হার ১৮.৪ শতাংশ থেকে কমে ২.৮ শতাংশ হয়েছে, আর শহরে তা ১০.৭ শতাংশ থেকে কমে ১.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম ও শহরের দারিদ্র্যের ব্যবধান ৭.৭ শতাংশ পয়েন্ট থেকে কমে ১.৭ শতাংশ পয়েন্ট হওয়া ভারতের অগ্রগতির বিস্তৃত ভিত্তিকে তুলে ধরে।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল পাঁচটি রাজ্যে দেশের চরম দরিদ্র মানুষের ৫৪ শতাংশের বাস। এতে বোঝা যায়, এসব অঞ্চলে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নিলে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি আরও বাড়ানো সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

দারিদ্র্য হ্রাসে ভারতের সাফল্যের পেছনে কী?

বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বব্যাংকের মতে, শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়েই ভারতের এই সাফল্য এসেছে। সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল বিনা মূল্যে ও ভর্তুকিতে খাদ্য সহায়তার পরিসর বাড়ানো। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় এটি লাখ লাখ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা জাল হিসেবে কাজ করেছে।

পরিবারভিত্তিক জরিপের মান ও পরিসর উন্নত হওয়ায় নীতিনির্ধারকেরা দারিদ্র্য চিহ্নিত করা ও মোকাবিলার জন্য আরও ভালো উপকরণ পেয়েছেন। গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমে আসা থেকে বোঝা যায়, গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নতুন দারিদ্র্যসীমা বুঝে নেওয়া

মূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তন প্রতিফলিত করতে বিশ্বব্যাংক নিয়মিত আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা হালনাগাদ করে। ২০২৪ সালের জুনে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর চরম দারিদ্র্যসীমা দৈনিক ২.১৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩ ডলার করা হয়। ভারতের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে সীমাটি দৈনিক ৩.৬৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪.২০ ডলার করা হয়েছে। অর্থনীতি পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্যের পরিসংখ্যানকে প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ রাখতেই এই সমন্বয়।

বিজ্ঞাপন

ভারত ও প্রতিবেশীদের তুলনা: স্পষ্ট ব্যবধান

ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও প্রতিবেশী দেশগুলো আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। যেমন, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন; তাঁদের মধ্যে ১৬.৫ শতাংশ চরম দারিদ্র্যে রয়েছেন। পাকিস্তানে দারিদ্র্যের হার ৪২.৪ শতাংশে রয়ে গেছে, আর ২.৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দারিদ্র্য কমানোর জন্য অপর্যাপ্ত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জের কারণে ২০২৪-২৫ সালে দেশটিতে আরও ১৯ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসে তুলনামূলক বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এবং আরও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সহায়তা করেছে।

বিজ্ঞাপন

চ্যালেঞ্জ ও সামনের পথ

অগ্রগতি সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক অভিঘাত, স্বাস্থ্যসংকট বা “জীবনের আকস্মিক বিপর্যয়ের” কারণে ভারতের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আবার দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সবচেয়ে জনবহুল পাঁচটি রাজ্যেই এখনো চরম দরিদ্র মানুষের অর্ধেকের বেশি বাস করেন, আর কিছু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য রয়ে গেছে।

ভারতের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এখনো মহামারির আগের প্রবণতার তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম। বাণিজ্য উত্তেজনা ও পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক নীতির মতো বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও অগ্রগতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে দেশটির চলতি হিসাবের ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১১-১২ সালের ২৭.১ শতাংশ থেকে ২০২২-২৩ সালে ৫.৩ শতাংশে নেমেছে।
  • গত এক দশকে ১৭ কোটি ১০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
  • বিশ্বব্যাংক চরম দারিদ্র্যসীমা দৈনিক ৩ ডলারে উন্নীত করেছে, ফলে অর্জনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে।
  • দারিদ্র্য হ্রাসে সরকারি উদ্যোগ, বিশেষ করে বিনা মূল্যে ও ভর্তুকিতে খাদ্য সহায়তা, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
  • গ্রাম ও শহরের দারিদ্র্যের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
  • ভারতের অগ্রগতির সঙ্গে প্রতিবেশী পাকিস্তানের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে, যেখানে দারিদ্র্যের হার এখনো বেশি।
  • অনেক মানুষ এখনো আবার দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে থাকায় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক আশাবাদ রয়েছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে