সূচিপত্র
ইন্দোনেশিয়ায় মেধা পাচার: দক্ষ প্রতিভার ক্রমবর্ধমান বহির্গমন
ইন্দোনেশিয়ার দক্ষ তরুণ পেশাজীবীরা আরও ভালো চাকরির সুযোগের খোঁজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই প্রবণতা ব্যাপকভাবে “মেধা পাচার” নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এটি উদ্বেগ তৈরি করছে। তাঁদের সতর্কবার্তা, প্রতিভার এই ক্ষয় অব্যাহত থাকলে দেশটির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যাহত হতে পারে। সীমিত দেশীয় চাকরির সুযোগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিদেশে বেশি বেতন ও উন্নত জীবনযাত্রার হাতছানি—শিক্ষিত ইন্দোনেশীয়দের দেশত্যাগের পেছনে এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ওয়ার্কিং হলিডে ভিসা (WHV) পাওয়া ইন্দোনেশীয়দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে: ২০২২-২০২৩ সালে ২,৯৮৪ জন থেকে ২০২৩-২০২৪ সালে ৪,২৮৫ জনে। অস্ট্রেলিয়ার WHV কর্মসূচিতে এখন নাগরিকত্বের দিক থেকে ইন্দোনেশীয়রাই সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। #KaburAjaDulu (আগে বেরিয়ে পড়ি) হ্যাশট্যাগের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও চাকরির বাজার নিয়ে তরুণ ইন্দোনেশীয়দের ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন।ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: বিদেশে সুযোগের খোঁজে
২৫ বছর বয়সী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্নাতক ফিকরি হাইকাল এই প্রবণতার উদাহরণ। উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেতে ব্যর্থ হওয়ার এবং ইন্দোনেশিয়ায় কোনো চাকরির প্রস্তাব না পাওয়ার পর তিনি WHV কর্মসূচির আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। এখন তিনি একটি পোলট্রি কারখানায় কাজ করেন—যে কাজের কথা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।আমি কখনো ভাবিনি যে কারখানার শ্রমিক হব,তিনি বলেন। তাঁর ভাষ্য, অস্ট্রেলিয়ায় শ্রমিকের ঘাটতি থাকায় ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় সেখানে কাজ পাওয়া সহজ হয়েছে। একইভাবে, বালির একটি বৃত্তিমূলক পর্যটন কলেজের স্নাতক ভিওনা মহারানি আতিথেয়তা শিল্পে ইন্টার্নশিপ করতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। বালির কয়েকটি পাঁচ তারকা হোটেলে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় ভিওনা তাঁর পেশাগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ খুঁজছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে হোক বা অন্য কোনো দেশে, বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগকে আমি অত্যন্ত মূল্য দেব,তিনি বলেন।
বিজ্ঞাপন
ইন্দোনেশিয়ায় মেধা পাচারের কারণ কী?
দক্ষ কর্মীদের দেশত্যাগের পেছনে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন:- চাকরির সীমিত সুযোগ: অনেক স্নাতক ইন্দোনেশিয়ায়, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক খাতে, উপযুক্ত কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খান।
- অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: মজুরি স্থবির থাকা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগের অভাব তরুণ পেশাজীবীদের অন্যত্র কাজ খুঁজতে উৎসাহিত করে।
- শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ: আনুষ্ঠানিক চাকরির অংশ কমে যাওয়া এবং অনানুষ্ঠানিক কাজ বেড়ে যাওয়া দক্ষ কর্মীদের কাজে লাগাতে দেশটির অক্ষমতার প্রতিফলন।
- দুর্নীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ: ব্যাপক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি ব্যবসার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটায় এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
বিজ্ঞাপন
অর্থনৈতিক ও জনমিতিক ঝুঁকি
মেধা পাচার অব্যাহত থাকলে ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎ বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সেন্টার অব রিফর্ম অন ইকোনমিকস (CORE) ইন্দোনেশিয়ার নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল সতর্ক করে বলেছেন, শীর্ষ প্রতিভাদের হারালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে।মেধা পাচার দীর্ঘস্থায়ী হলে ইন্দোনেশিয়া তার সেরা প্রতিভাদের হারাতে পারে। অথচ তাঁরা বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করে এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখে দেশের ভেতরেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারতেন,ফয়সাল বলেন। গদজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রম বিশেষজ্ঞ তাদজুদ্দিন নুর এফেন্দি ২০৪৫ সালের মধ্যে দেশটিকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটিতে পরিণত করার লক্ষ্য—ইন্দোনেশিয়ার “গোল্ডেন ইন্দোনেশিয়া” ভাবনা—নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষ কর্মীদের দেশত্যাগে স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ব্যাপক সমৃদ্ধি অর্জনের আগেই দেশটির জনমিতিক রূপান্তর ত্বরান্বিত হয়ে জনসংখ্যা বয়স্ক হয়ে উঠতে পারে—এই পরিস্থিতি “জনমিতিক প্যারাডক্স” নামে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
আশার কোনো দিক আছে কি? রেমিট্যান্স ও মেধার প্রত্যাবর্তন
চ্যালেঞ্জ থাকলেও মেধা পাচারের কিছু সম্ভাব্য সুফল রয়েছে। বিদেশে কর্মরত ইন্দোনেশীয় অভিবাসীরা প্রায়ই দেশে অর্থ পাঠান, যা দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ইন্দোনেশিয়ার অভিবাসী কর্মী সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ১৩ শতাংশ বেড়ে ২৫৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহে (প্রায় ১৫.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) দাঁড়ায়। এই অর্থ ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, দক্ষ ইন্দোনেশীয়দের দেশে ফিরতে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা ও অবকাঠামো তৈরি করে সরকার মেধা পাচারকে “মেধা প্রত্যাবর্তনে” রূপ দিতে পারে। দেশে ফেরা পেশাজীবীরা মূল্যবান আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নিয়ে আসেন, যা উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আনতে পারে।বিদেশে থাকা ইন্দোনেশীয়দের সরকার দেশে ফিরতে উৎসাহিত করতে পারলে তা হবে বড় অর্জন, কারণ তাঁরা বিদেশের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সঙ্গে নিয়ে আসবেন,তাদজুদ্দিন বলেন।
বিজ্ঞাপন
এই প্রবণতা ঠেকাতে কী করা যায়?
গদজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হেমপ্রি সুয়াতনার মতো শিক্ষাবিদেরা শিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়ের পক্ষে মত দেন। Kampus Merdeka-এর মতো কর্মসূচির লক্ষ্য ইন্টার্নশিপ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চাকরির জন্য প্রস্তুত করা। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগে রূপ নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ড. সুয়াতনা চাকরির চাহিদা নিরূপণ এবং স্নাতকদের দক্ষতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য বিধানের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলেরও আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিয়োগে স্বজনপ্রীতির মতো সমস্যার সমাধানেও তিনি জোর দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা একমত, ইন্দোনেশিয়ার সেরা ও মেধাবীদের ধরে রাখতে দেশের চাকরির বাজারের উন্নয়ন, উদ্ভাবনে উৎসাহ এবং আরও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এসব পরিবর্তন না এলে দেশটি তার জনমিতিক সুবিধা হারানোর এবং অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।সংক্ষেপে
- দক্ষ তরুণ পেশাজীবীরা আরও ভালো সুযোগের খোঁজে বিদেশে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ায় উল্লেখযোগ্য মেধা পাচার ঘটছে।
- এর প্রধান কারণ চাকরির সীমিত সুযোগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের ভেতরে শ্রমবাজারের প্রতিকূলতা।
- এই প্রবণতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক সুবিধাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
- বিদেশে কর্মরতদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে সুবিধা দিচ্ছে, তবে দক্ষ ইন্দোনেশীয়দের দেশে ফেরাতে নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
- মেধা পাচার ঠেকাতে শিক্ষাকে চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি জরুরি।






