চীনের প্রযুক্তি অগ্রযাত্রা পরিমাপের ভিন্ন এক উপায়
বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির পাশাপাশি রয়েছে ব্যবসায়িক এক ধাঁধা: উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েও কোম্পানিগুলো খুব সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার আইন বিভাগের অধ্যাপক অ্যাঞ্জেলা হুইউয়ে ঝাং এবং লন্ডন বিজনেস স্কুলের ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান ও পরিচালন বিভাগের অধ্যাপক এস. অ্যালেক্স ইয়াং এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বেইজিং উদ্ভাবনকে একক কোম্পানির ব্যবস্থাপকের মতো নয়, বরং বিশাল এক প্ল্যাটফর্মের মালিকের মতো পরিচালনা করে।
সূচিপত্র
- চীনের প্রযুক্তি অগ্রযাত্রা পরিমাপের ভিন্ন এক উপায়
- কোন বৈশিষ্ট্যে রাষ্ট্রকে প্ল্যাটফর্মের মতো মনে হয়?
- দুর্বল মুনাফার পাশাপাশি শিল্পশক্তি কেন বাড়তে পারে
- কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনা ও খণ্ডিত ব্যবস্থার সহাবস্থান
- গবেষণাগার থেকে কারখানায় পৌঁছানোর কঠিন পথ
- কারখানা কেন এখনো কেন্দ্রে
- আইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সুফল বণ্টন
- যুক্তিটি যেভাবে বিকশিত হয়েছে
- পাঠকদের কাছে এই কাঠামোর তাৎপর্য
- মূল বিষয়গুলো
তাঁদের যৌথ প্রকল্প, দ্য প্ল্যাটফর্ম স্টেট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ককে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। একেকটি কোম্পানি প্রতিযোগিতা করে, কখনো তীব্রভাবে; আর রাষ্ট্র তাদের কার্যক্রমের পরিবেশ নির্ধারণ করে। জাতীয় পর্যায়ে এর সুফলের মধ্যে থাকতে পারে আরও শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, সস্তা প্রযুক্তি ও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা—এমনকি পৃথক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা করতে হিমশিম খেলেও।
ঝাং ও ইয়াং ১৮ জুন ২০২৬, সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ে এই কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবেন বলে নির্ধারিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিএল অনুষ্ঠানের ঘোষণায় এমন এক রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে, যে উদ্ভাবন বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করে, অংশগ্রহণকারীদের জন্য নিয়ম নির্ধারণ করে এবং প্রস্থান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রাখে।
প্রযুক্তি চীনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় কেন্দ্রীয় স্থান নেওয়ার সময়েই এই যুক্তি সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত এক মন্তব্যে ঝাং ও ইয়াং সম্প্রতি শেষ হওয়া ‘টু সেশনস’—চীনের জাতীয় আইনসভা ও রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার বার্ষিক বৈঠক—ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রযুক্তিই হবে দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রধান চালিকাশক্তি।
ব্যবসা, কর্মী ও বিদেশি প্রতিযোগীদের জন্য মূল প্রশ্ন হলো, জাতীয় এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা এবং সুফল বণ্টনের সিদ্ধান্তে কীভাবে রূপ নেয়।
কোন বৈশিষ্ট্যে রাষ্ট্রকে প্ল্যাটফর্মের মতো মনে হয়?
একটি বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীকে একত্র করে এবং তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের শর্ত নির্ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি অনলাইন বাজার ঠিক করতে পারে কারা পণ্য বিক্রি করবে, বিক্রেতাদের কোন নিয়ম মানতে হবে এবং লেনদেন কীভাবে হবে। ঝাং ও ইয়াং চীনের উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে একই ধরনের সাংগঠনিক ধারণা প্রয়োগ করেছেন।
তাঁদের কাঠামোর তিনটি প্রধান নীতি হলো: শুধু একেকটি বিজয়ী বেছে নেওয়ার বদলে বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয় করা; মালিকানা বেছে বেছে ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীদের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে নিয়ন্ত্রণ রাখা; এবং আগে বিস্তার ঘটিয়ে পরে মূল্য আহরণ করা।
কোম্পানিগুলো পণ্য তৈরি, ক্রেতা খোঁজা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়। তবে তাদের স্বাধীনতা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে, যার প্রবেশপথ ও নিয়ম রাষ্ট্রের কর্তৃত্বাধীন। ফলে সরকারের সরাসরি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হতে পারে।
গবেষকদের মতে, চীনের স্বতন্ত্র সমন্বয়ের ভিত্তি হলো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং উদ্ভাবনের সুফল কীভাবে বণ্টন ও ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। বড় বাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়, আর প্রশাসনিক ক্ষমতা সরকারকে বৃহত্তর নেটওয়ার্ক পরিচালনার উপায় দেয়।
এই প্রকল্পে মূল প্রশ্নটি বদলে যায়: কোনো একটি কোম্পানি সফল কি না, তা নয়; বরং বাস্তুতন্ত্রটি জাতীয় লক্ষ্য পূরণে কাজে লাগে এমন সক্ষমতা গড়ে তুলছে কি না। এতে লোকসান, কম দাম ও তীব্র প্রতিযোগিতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়।
দুর্বল মুনাফার পাশাপাশি শিল্পশক্তি কেন বাড়তে পারে
হংকংয়ের অনুষ্ঠানের সারসংক্ষেপে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বিশেষভাবে এসেছে, কারণ এই খাতগুলো বাড়তে থাকা শিল্পশক্তি ও কঠিন ব্যবসায়িক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে। চীন এসব খাতে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে, অথচ কোম্পানিগুলো মুনাফা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
একটি কোম্পানির আর্থিক আয় এবং একটি দেশের শিল্পগত আয় ভিন্ন বিষয় পরিমাপ করে। ব্যবসার জন্য এমন রাজস্ব দরকার, যা খরচ মেটায় এবং বিনিয়োগের প্রতিদান দেয়। অন্যদিকে সরকার বৃহত্তর সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, দক্ষ কর্মী, বেশি উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিদেশি প্রযুক্তির ওপর কম নির্ভরতাকেও মূল্য দিতে পারে।
ঝাং ও ইয়াংয়ের কাঠামো অনুযায়ী, তীব্র প্রতিযোগিতা কোম্পানির মুনাফার হার কম রেখেও এসব সক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। সুফল গ্রাহক, সরবরাহকারী ও বৃহত্তর শিল্পব্যবস্থার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে; কোনো পণ্য তৈরি বা বিক্রি করা কোম্পানির ভেতরেই তা পুরোপুরি জমা হয় না।
মূল্য আহরণের আগে বিস্তার ঘটানোর নীতি বড় পরিসরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা ব্যাখ্যা করে। তবে এতে সম্প্রসারণকারী কোম্পানিগুলোর ওপর চাপও পড়ে: উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আয়ের চেয়ে দ্রুত এগোতে পারে। চীনের উদ্ভাবন মডেল বোঝার ক্ষেত্রে এই টানাপোড়েনকে কেন্দ্রীয় বিষয় করে তোলে কাঠামোটি।
কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনা ও খণ্ডিত ব্যবস্থার সহাবস্থান
মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ বা মেরিকস এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক তুলনার একটি কার্যকর ভিত্তি দেয়। ২০২৪ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত তাদের সর্বজাতীয় উদ্ভাবনবিষয়ক প্রতিবেদন কৌশলগত প্রযুক্তিগত প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গবেষণা ও শিল্পকে সংগঠিত করার চীনের প্রচেষ্টা পর্যালোচনা করেছে।
এই পদ্ধতির তদারকির জন্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৩ সালের মার্চে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমিশন গঠন করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে তখন সহায়ক সংস্থা হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়। এই উদ্যোগ আগের জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা হলেও এটি এমন এক অর্থনীতিতে কাজ করছে, যেখানে বেসরকারি খাত বড়।
মেরিকসের বর্ণনায়, ব্যবস্থাটি আংশিকভাবে একে অপরের সঙ্গে মিলে যাওয়া নানা উদ্যোগ ও প্ল্যাটফর্মে বিস্তৃত। তাদের মূল্যায়নে, প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকার সম্পর্কে জনসমক্ষে স্পষ্ট ধারণা নেই, আর জাতীয় উদ্যোগগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বও অস্পষ্ট। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ২০২১ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত মেয়াদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি।
কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব কীভাবে এই খণ্ডিত ব্যবস্থার সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে, প্ল্যাটফর্ম কাঠামো তা বুঝতে সাহায্য করে। বহু প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন প্রকল্প অনুসরণ করতে দিয়ে রাষ্ট্র প্রতিযোগিতার শর্ত পরিচালনা করতে পারে। মেরিকস একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছে: শক্তিশালী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা থাকলেও অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার ও সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন।
চীনের বেসরকারি উদ্যোক্তারা এই আলোচনার কেন্দ্রীয় অংশ। মেরিকস বলেছে, রাষ্ট্রীয় নীতির পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও টেলিযোগাযোগ খাতে উদ্যোক্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গবেষণাগার থেকে কারখানায় পৌঁছানোর কঠিন পথ
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নতুন আবিষ্কার করতে পারে, কিন্তু সেগুলো প্রস্তুতকারকদের অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য কিছু নাও দিতে পারে। একাডেমিক গবেষণা ও শিল্পের প্রয়োজনের এই বিচ্ছিন্নতাকে মেরিকস ‘দুই স্তরের’ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই ব্যবধান বোঝার একটি সহজ উপায় হলো তিনটি ধাপ কল্পনা করা: একটি ধারণা আবিষ্কার, সেটিকে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপ দেওয়া এবং বিপুল পরিমাণে নির্ভরযোগ্যভাবে উৎপাদন করা। গবেষণার ফল এবং উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা—দুটোতেই চীন শক্তিশালী। দেশীয় উদ্ভাবনকে শিল্পপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
মেরিকস বলেছে, চীনা কোম্পানিগুলো প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ মৌলিক গবেষণা এড়িয়ে চলে, বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে, কারণ তারা এটিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব মনে করে। অন্যদিকে গবেষকেরা এমন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারেন, যা কারখানা ও গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলে না।
দুই পক্ষকে যুক্ত করতে বেইজিং কয়েকটি ব্যবস্থা চালু করেছে। সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গবেষণা সংস্থার সমাধানের জন্য প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ প্রকাশ করতে পারে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারকে যুক্ত করে উদ্ভাবন সমিতি গঠন করে। বাজারমুখী নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আবিষ্কারকে বাণিজ্যিক ব্যবহারে নিতে কাজ করছে; আর পেটেন্ট মালিকানা সংস্কারের লক্ষ্য গবেষকদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করা।
২০২৩ সালের অক্টোবরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রগতি আইন পর্যালোচনার সময় জাতীয় গণকংগ্রেস এই ব্যবধান এখনো রয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে। এ থেকে বোঝা যায়, উদ্ভাবনী বাস্তুতন্ত্র পরিচালনার কাজ শুধু সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়: প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংযোগ এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে উদ্ভাবন উৎপাদন পর্যন্ত পৌঁছায়।
কারখানা কেন এখনো কেন্দ্রে
চীনের শিল্প কৌশল সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বাইরেও বিস্তৃত। মেরিকসের বর্ণনায়, ইস্পাত, কয়লা ও জাহাজ নির্মাণের মতো ঐতিহ্যবাহী খাতসহ পূর্ণাঙ্গ, উন্নত ও নিরাপদ উৎপাদনভিত্তি বজায় রাখা নীতিগত অগ্রাধিকার।
মেরিকসের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক অংশে জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের পরিচালক ঝেং শানজিয়ে ঐতিহ্যবাহী উৎপাদনশিল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন:
চীনের উৎপাদনশিল্পের সক্ষমতার বেশির ভাগই ঐতিহ্যবাহী শিল্প থেকে আসে।
ঝেংয়ের যুক্তি ছিল, প্রতিষ্ঠিত শিল্পকে সরিয়ে দেওয়ার বদলে আধুনিকায়ন করা উচিত। এই পদ্ধতি উন্নত গবেষণাকে বিদ্যমান কারখানা, সরবরাহকারী ও শিল্পকর্মীদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে।
মেরিকস আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুই ফানের হিসাব উদ্ধৃত করেছে। তাতে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরে পতনের পর ২০২০ সালে মোট দেশজ উৎপাদনে উৎপাদনশিল্পের অংশ ছিল ২৬.৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে ২০২১ সালে ১.১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ০.৩ শতাংশ বৃদ্ধির কথা রয়েছে; একই সময়ে ঋণও বেড়েছে।
এই শিল্পভিত্তির অর্থনৈতিক মূল্য কোনো একক আবিষ্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। মেরিকসের যুক্তি, সৌর প্যানেল, সক্রিয় ওষুধি উপাদান এবং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামের মতো পণ্যে চীনের সক্ষমতা প্রতিস্থাপন করা অন্য দেশগুলোর জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে। উৎপাদনের পরিমাণ, ব্যয় ও গতি দিয়ে চীন কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করতে পারে।
এই অবস্থান ধরে রাখারও কিছু বিনিময়মূল্য আছে। মেরিকস বলেছে, শিল্প উৎপাদনে মনোযোগের ফলে আরও শক্তিশালী পারিবারিক ভোগ, কম কার্বন নিঃসরণ এবং রপ্তানি বাজারের ওপর কম নির্ভরতার মতো অন্য লক্ষ্যগুলো অগ্রাধিকারের তালিকায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
আইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সুফল বণ্টন
ঝাং ও ইয়াং প্ল্যাটফর্ম রাষ্ট্রের কেন্দ্রে আইনকে স্থান দিয়েছেন। নিয়ম উদ্ভাবন বাস্তুতন্ত্রজুড়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার সরকারি সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সম্প্রসারণের সুযোগ দেয়।
হংকংয়ের অনুষ্ঠানের সারসংক্ষেপে গবেষকেরা যে কয়েকটি টানাপোড়েন খতিয়ে দেখবেন, তার উল্লেখ রয়েছে। চীন তার অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সীমাবদ্ধ করে, অথচ যেসব এআই মডেলের উপাদান উন্মুক্তভাবে পাওয়া যায়, সেগুলোর আন্তর্জাতিক বিস্তার উৎসাহিত করে। দেশটি প্রথম দিককার এআই বিধিমালার কিছু চালু করেছে, কিন্তু প্রয়োগের নজির কম। চীনা এআই কোম্পানিগুলো শীর্ষস্থানীয় ফ্রন্টিয়ার গবেষণাগারের পেছনে রয়েছে, আর তাদের মূল্যায়ন মার্কিন সমমানের কোম্পানিগুলোর সামান্য অংশ।
অনুষ্ঠানের সারসংক্ষেপে কোনো কোম্পানির মূল্যায়ন বা তুলনাযোগ্য প্রয়োগসংক্রান্ত পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি। তাই এই উদাহরণগুলো ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে গবেষকদের যুক্তির গুণগত অংশ হিসেবেই রয়েছে।
উন্মুক্ত উৎসের এআই অন্য ডেভেলপারদের কোনো মডেল পরীক্ষা, রূপান্তর বা তার ভিত্তিতে নতুন কিছু তৈরির সুযোগ দিতে পারে—তা নির্ভর করে লাইসেন্স এবং কোন উপাদান প্রকাশ করা হয়েছে তার ওপর। প্রতিটি ব্যবহারকারীর কাছ থেকে প্রবেশাধিকারের জন্য মূল্য নেওয়ার চেয়ে মডেল ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। প্ল্যাটফর্ম কাঠামো অনুযায়ী, এভাবে বিস্তার ঘটলে ডেভেলপার ও অ্যাপ্লিকেশনের বৃহত্তর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে।
একই বণ্টন প্রশ্নের অংশ কর্মীরাও। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে কাজ হারানো মানুষের প্রতি সরকারি মনোযোগের পাশাপাশি কল্যাণরাষ্ট্রের বিরোধিতার কথাও অনুষ্ঠানের সারসংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। উদ্ভাবনে শিল্প সক্ষমতা বাড়লেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সামান্য আয় করলে এবং কিছু কর্মী চাকরি হারালে, সুফল কীভাবে পরিবারের কাছে পৌঁছাবে—তা একটি কেন্দ্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে।
যুক্তিটি যেভাবে বিকশিত হয়েছে
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ও গবেষণা কয়েক বছর ধরে বিস্তৃত। এই ধারাবাহিকতা চীনের নীতিগত অগ্রগতি এবং সেগুলো ব্যাখ্যার পরবর্তী প্রচেষ্টাকে আলাদা করে দেখতে সাহায্য করে:
- মার্চ ২০২৩: জাতীয় উদ্ভাবন ব্যবস্থার নতুন পদ্ধতির তদারকির জন্য শি কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমিশন গঠন করেন।
- ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩: পরবর্তী সময়ে মেরিকসের প্রকাশিত বিশ্লেষণটি চীনের উদ্ভাবন ও শিল্প বাস্তুতন্ত্র নিয়ে বার্লিনের এক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।
- অক্টোবর ২০২৩: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রগতি আইন পর্যালোচনা করে জাতীয় গণকংগ্রেস জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে চলমান ব্যবধান চিহ্নিত করে।
- ৫ মার্চ ২০২৪: জাতীয় উদ্ভাবন সমন্বয় ও শিল্পনীতি নিয়ে মেরিকসের পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়।
- ২৭ মার্চ ২০২৬: টু সেশনসে ঘোষিত অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে প্ল্যাটফর্ম রাষ্ট্রের যুক্তি মিলিয়ে ঝাং ও ইয়াং তাঁদের মন্তব্য প্রকাশ করেন।
- ১৮ জুন ২০২৬: ইউনিভার্সিটি অব হংকং কাঠামোটি নিয়ে ঝাং ও ইয়াংয়ের আলোচনার সময় নির্ধারণ করে।
১৮ জুনের অনুষ্ঠানটি ইংরেজিতে হবে; আগাম নিবন্ধন প্রয়োজন। স্থান চেং ইউ তুং টাওয়ারের ৮২৪ নম্বর কক্ষ। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ও সহযোগী ডিন সিদা লিউ আলোচনার সঞ্চালক হিসেবে তালিকাভুক্ত।
পাঠকদের কাছে এই কাঠামোর তাৎপর্য
ঝাং ও ইয়াংয়ের প্রকল্প এমন দুটি দৃষ্টিভঙ্গিকে একত্র করেছে, যেগুলো প্রায়ই আলাদা থাকে: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ এবং পরস্পর সংযুক্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে উৎপাদন সংগঠনের ধরন। প্ল্যাটফর্ম রাষ্ট্র নিয়ে তাঁদের গবেষণা যৌথভাবে করা পঞ্চম প্রকল্প; এর আগে তাঁদের দুটি যৌথ কাজ ‘ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
চীনে ব্যবসা করা নিয়ে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই কাঠামো বৃহত্তর নেটওয়ার্কের দিকে মনোযোগ দেয়: কারা অংশ নিতে পারে, কোন সংযোগস্থল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে, কীভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন হয় এবং সম্প্রসারণের সুফল কোথায় জমা হয়। বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর নীতিনির্ধারকদের কাছে শিল্প সক্ষমতার আলাদা মূল্য রয়েছে।
বিদেশি সরকারগুলোর জন্য মেরিকস একটি সম্পর্কিত টানাপোড়েন তুলে ধরেছে। প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ও পূর্ণাঙ্গ শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার চীনা প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে কঠিন করতে পারে, অথচ উৎপাদনের বিশাল পরিসর দেশটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রাখে। রপ্তানির সাফল্যও বেইজিংকে দেশীয় কোম্পানির প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মাপার একটি বাহ্যিক মানদণ্ড দেয়।
সমন্বিত চিত্রটি এমন এক উদ্ভাবন ব্যবস্থার, যার উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সক্ষমতা আছে, কিছু গবেষণাকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে দীর্ঘস্থায়ী অসুবিধা রয়েছে এবং সুফল কারা পাবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো নিতে হয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে প্রতিটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির দ্রুত বড় মুনাফা হওয়া উচিত—এমন ধারণা না করে, প্ল্যাটফর্ম রাষ্ট্রের যুক্তি ব্যাখ্যা করে কীভাবে এই ফলাফলগুলো একই সঙ্গে থাকতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- অ্যাঞ্জেলা হুইউয়ে ঝাং ও এস. অ্যালেক্স ইয়াং চীনকে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, পরস্পর সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্ল্যাটফর্ম রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
- তাঁদের কাঠামোতে বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয়, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্য আহরণের আগে সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
- মেরিকসের মতে, উদ্ভাবনের উদ্যোগগুলো খণ্ডিত এবং একাডেমিক গবেষণা ও শিল্প উৎপাদনের মধ্যে স্থায়ী ব্যবধান রয়েছে।
- চীনের উৎপাদন কৌশলে পৃথক কোম্পানির মুনাফার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থাকেও মূল্য দেওয়া হয়।
- ইউনিভার্সিটি অব হংকং গবেষকদের আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করেছে ১৮ জুন ২০২৬।






