পরিকল্পনার কেন্দ্রে ৩০ হাজার পরিবার ও পাঁচটি সেবা কেন্দ্র
ছয়টি জেলার ৩০ হাজার পরিবারের আয়ের সুযোগ বাড়াতে, প্রবীণদের জন্য পাঁচটি আদর্শ দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করতে এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের সেবা প্রদান উন্নত করতে শ্রীলঙ্কার জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর কলম্বোতে ব্যাংকটি এ অর্থায়নের ঘোষণা দেয়।
সূচিপত্র
এই প্যাকেজে নীতিগত সংস্কারে সহায়তার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং প্রকল্পের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনরুদ্ধারের জন্য সহনশীলতা ও সুযোগ জোরদার’ খাত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় শ্রীলঙ্কা দরিদ্র পরিবারগুলোর সহায়তার সঙ্গে সেগুলোকে সহায়তা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ও সেবাব্যবস্থার পরিবর্তনকে যুক্ত করবে।
এডিবির সরকারি ঘোষণায় একটি মৌলিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে: অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চললেও দারিদ্র্য এবং আকস্মিক আর্থিক বা অন্যান্য দুর্দশার ঝুঁকি এখনো বেশি। নারী, তরুণ, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বাসিন্দারা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শ্রীলঙ্কায় এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্যানন কাউলিন বলেন, যাদের জীবিকা এখনো অনিশ্চিত, তাদের কাছেও পুনরুদ্ধারের সুফল পৌঁছানো দরকার:
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবন ও জীবিকায় অর্থবহ উন্নতি বয়ে আনতে হবে।
এই কর্মসূচিতে তিনটি বাস্তব লক্ষ্য একত্র করা হয়েছে: পরিবারগুলোকে আয় করতে সহায়তা, প্রবীণদের যত্নের উন্নতি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তাকে আরও দ্রুত সাড়া দেওয়ার উপযোগী করা। সামাজিক সুরক্ষা বলতে এমন সহায়তা, সেবা ও সরকারি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং দুর্দশা মোকাবিলায় সাহায্য করে। এই প্যাকেজে মানুষ যে সহায়তা পায়, পাশাপাশি সেই সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
১০০ মিলিয়ন ডলার যেভাবে ভাগ করা হয়েছে
এডিবির অর্থায়ন সমানভাবে দুটি উপকরণে ভাগ করা হয়েছে; মোট অর্থের ৫০ শতাংশ করে প্রতিটিতে। নীতিগত ঋণটি সংস্কারে সহায়তা করবে, আর প্রকল্প ঋণটি কর্মসূচির আওতায় বিনিয়োগে সহায়তা করবে। দারিদ্র্য ও ঝুঁকি মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কার সরকারি উদ্যোগকে সহায়তার জন্য দুই ধরনের ঋণই দেওয়া হচ্ছে।
নীতিগত ঋণের লক্ষ্য হলো সরকারি বিধি, নীতি ও প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আনা। প্রকল্প ঋণ নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রম ও বিনিয়োগে অর্থায়ন করে। এ দুটিকে একত্র করায় সেবার নিয়মকানুন এবং সেগুলো বাস্তবে দেওয়ার কাজ, উভয় ক্ষেত্রেই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত প্রবীণ সেবা কেন্দ্র এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের সেবা প্রদান উন্নত করার জন্য এ সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। নতুন একটি কেন্দ্রের জন্য কীভাবে যত্নসেবা পরিচালিত হবে, তার কাঠামো প্রয়োজন; আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং তা ব্যবহারকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা দরকার। কর্মসূচিতে দুই দিকেই কাজ রয়েছে।
অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলো যে সহায়তা পাবে
জীবিকা সহায়তা দেওয়ার মাধ্যম হবে শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল এমপাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রাম। ছয়টি জেলার আসওয়েসুমা সামাজিক নিবন্ধনে চিহ্নিত ৩০ হাজার পরিবারকে এডিবির কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেওয়া হবে; এসব পরিবারের মধ্যে নারী ও তরুণরাও রয়েছেন।
সামাজিক নিবন্ধনে এমন তথ্য থাকে, যা সহায়তার জন্য পরিবার চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে আসওয়েসুমা নিবন্ধনের মাধ্যমে কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোকে শনাক্ত করা হবে। এতে সরকারের বিদ্যমান তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরির উদ্যোগ যুক্ত হবে।
পরিবারগুলোর কাজ খুঁজে পাওয়া বা ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কয়েকটি প্রয়োজন মেটাবে পরিকল্পিত সহায়তা:
- আয়মূলক কাজে সহায়তার জন্য জীবিকা অনুদান।
- কর্মসংস্থান ও ব্যবসায় সহায়তা।
- দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ।
- নির্ভরযোগ্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
এসব পদক্ষেপ একই চ্যালেঞ্জের ভিন্ন ভিন্ন দিক মোকাবিলা করে। অনুদানের অর্থ কাউকে আয়মূলক কাজ শুরু করতে সাহায্য করতে পারে, আর প্রশিক্ষণ সেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলে। আর্থিক সাক্ষরতা বলতে অর্থ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধারণাকে বোঝায়। বাজারে প্রবেশের সুযোগ উৎপাদক বা ব্যবসাকে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর পথ করে দেয়।
অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো আয় করা ও তা পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো। তাই কর্মসূচিতে অনুদানের মতো তাৎক্ষণিক বাস্তব সহায়তার সঙ্গে এমন সেবা যুক্ত করা হয়েছে, যা এ সহায়তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
প্রবীণদের সেবার মডেল পরীক্ষায় পাঁচটি কেন্দ্র
এই অর্থায়নে প্রবীণদের জন্য আলাদা গুরুত্ব রাখা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা দরিদ্র জেলাগুলোতে পাঁচটি আদর্শ প্রবীণ দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে সমন্বিত যত্ন ও সহায়তা সেবা দেওয়া হবে।
কেন্দ্রগুলো পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের স্থান হিসেবেও কাজ করবে। সেখানে প্রবীণদের যত্ন দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা হবে, যা পরে দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলোর দুটি উদ্দেশ্য থাকবে: স্থানীয়ভাবে সেবা দেওয়া এবং অন্য এলাকায় একই ধরনের সেবা কীভাবে চালু হতে পারে, তা নির্ধারণে সহায়তা করা।
প্রবীণদের যত্নের জন্য নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো জোরদার করতেও এডিবি সহায়তা করবে। বাস্তবে এর অর্থ হলো, কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি যত্নসেবা পরিচালনার সরকারি বিধি ও ব্যবস্থা নিয়েও কাজ করা।
দিবাযত্নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় কর্মসংস্থান ও পারিবারিক আয়ে সহায়তার পাশাপাশি প্রবীণদের প্রয়োজনও কর্মসূচিতে স্থান পেয়েছে। তাঁদের যত্ন ও সহায়তা পাওয়া জরুরি, তাই দারিদ্র্য মোকাবিলায় বৃহত্তর উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেবা প্রদান।
সহায়তা ব্যবস্থাপনা সহজ করা
শ্রীলঙ্কার সামাজিক সুরক্ষা সেবা প্রদান ব্যবস্থায় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কেস ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য পরিচালনায় সহায়তা দেওয়া হবে। এগুলো প্রশাসনিক কাজ হলেও সহায়তা কীভাবে সংগঠিত ও বাস্তবায়িত হয়, তাতে প্রভাব ফেলে।
পরিবীক্ষণে দেখা হয়, কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে কি না। মূল্যায়নে সেসব কার্যক্রমের ফলাফল খতিয়ে দেখা হয়। এ দুটির মাধ্যমে কর্মকর্তারা যাচাই করতে পারবেন, অনুদান, প্রশিক্ষণ ও যত্নসেবা লক্ষ্যভুক্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং কার্যকর ফল দিচ্ছে কি না।
কেস ব্যবস্থাপনার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত সহায়তার সমন্বয় করা। তথ্য পরিচালনা বলতে তথ্য ব্যবহারের নিয়ম ও দায়িত্ব বোঝায়। সেবা ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য নথিভুক্ত, আদান-প্রদান ও ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
এই বিনিয়োগগুলো কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রমকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। পরিবারকে সহায়তা দিতে উপকারভোগীদের তথ্য দরকার, প্রবীণদের যত্নের জন্য সংগঠিত সেবা প্রয়োজন, আর দুই ক্ষেত্রেই সেবা প্রদান অনুসরণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সামাজিক সুরক্ষাকে আরও কার্যকর ও মানুষের প্রয়োজনে দ্রুত সাড়াদানে সক্ষম করার পরিকল্পনার অংশ হলো এসব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য সহায়তা প্রস্তুত রাখা
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও জোরদার করার পরিকল্পনা করেছে এডিবি। অভিঘাত হলো এমন আকস্মিক ঘটনা, যা কোনো পরিবারের আয়, নিরাপত্তা বা দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের সক্ষমতা ব্যাহত করে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সময়মতো ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও সমন্বয়প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেবে কর্মসূচি। মানুষের সহায়তা প্রয়োজন হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কীভাবে কাজ সংগঠিত করবে এবং একসঙ্গে পদক্ষেপ নেবে, এর সঙ্গে বিষয়টি জড়িত।
জীবিকার উন্নয়নের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়াদানের উদ্যোগও রয়েছে। কাজ বা ব্যবসার মাধ্যমে কোনো পরিবার অগ্রগতি অর্জন করলেও আকস্মিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। কর্মসূচিটির লক্ষ্য হলো আয়ের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি এমন বিপর্যয়ের সময় সরকারি সহায়তা জোরদার করা।
বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ
পরবর্তী পর্যায়ে অনুমোদিত অর্থায়নকে নীতিগত পরিবর্তন, পরিবারকে সহায়তা, যত্নসেবা এবং সেবা প্রদান ব্যবস্থার উন্নয়নে রূপ দিতে হবে। জীবিকা উপাদান বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট মাধ্যম হলো ন্যাশনাল এমপাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রাম ও আসওয়েসুমা নিবন্ধন; আর প্রবীণদের যত্নের ক্ষেত্রে পাঁচটি কেন্দ্র হলো প্রাথমিক নির্দিষ্ট লক্ষ্য।
এডিবির ঘোষণায় ছয়টি জেলার নাম, প্রতিটি অনুদানের পরিমাণ বা ঋণ পরিশোধের শর্ত উল্লেখ করা হয়নি। সহায়তা কবে শুরু হবে এবং কেন্দ্রগুলো কবে চালু হবে, সে তারিখও জানানো হয়নি। পরিবারগুলো কোথায় সহায়তা পাবে, কতটা সহায়তা পাবে এবং কবে সেবা চালু হবে, তা এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করবে।
কর্মসূচির আওতা নির্ভর করবে কয়েকটি পরস্পর-সংযুক্ত কাজের ওপর: অংশগ্রহণকারী পরিবার শনাক্ত করা, অনুদান ও কর্মসংস্থান সহায়তা দেওয়া, যত্ন কেন্দ্র স্থাপন এবং সেগুলোর পেছনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। দারিদ্র্য ও জরুরি পরিস্থিতির ঝুঁকিতে এখনো থাকা মানুষের কাছে শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারকে আরও বাস্তব করে তোলাই কর্মসূচিটির ঘোষিত উদ্দেশ্য।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদনের ঘোষণা দেয় এডিবি।
- প্যাকেজটিতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের নীতিগত ঋণ এবং ৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণ রয়েছে।
- ছয়টি জেলার আসওয়েসুমা নিবন্ধিত ৩০ হাজার পরিবার জীবিকা সহায়তা পাবে।
- সহায়তার মধ্যে রয়েছে অনুদান, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায় সহায়তা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, আর্থিক সাক্ষরতা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
- দরিদ্র জেলাগুলোতে প্রবীণদের জন্য পাঁচটি আদর্শ দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
- কর্মসূচিতে সামাজিক সুরক্ষা প্রশাসন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বয়ও উন্নত করা হবে।






