কারখানার কাজের সময় বদলাতে বলেছে গুজরাট, কয়লার সরবরাহে টান
ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (সিইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর ১৯১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯৬টিতে জ্বালানির মজুত ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এ সংখ্যা ছিল ৬০। দেশটির অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল গুজরাট কারখানাগুলোকে সন্ধ্যার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় এড়িয়ে উৎপাদন চালানোর অনুরোধ করেছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট দেশের অন্যতম বড় শিল্পরাজ্যের কর্মদিবসেও ছড়িয়ে পড়েছে।
সূচিপত্র
- কারখানার কাজের সময় বদলাতে বলেছে গুজরাট, কয়লার সরবরাহে টান
- জ্বালানির মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কম—এর অর্থ কী
- গরম ও কম বৃষ্টিপাত গ্রিডের সরবরাহ-চাহিদা উভয় দিকেই চাপ বাড়াচ্ছে
- সন্ধ্যার সময়ে সংকট কেন বেশি
- কয়লা আসছে বেশি, তবু মজুত কমছে
- বাধ্যতামূলক আমদানির পরিকল্পনা কেন স্থগিত
- চাহিদা বাড়ায় বিদ্যুতের খরচও বাড়ছে
- সংকট নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে
- আবহাওয়া ঠান্ডা হলে মজুত বাড়ানোর সুযোগ আসতে পারে
- মূল কথা
প্রায় এক মাসে আশঙ্কাজনকভাবে কম মজুত থাকা কেন্দ্রের সংখ্যা ৩৬টি বা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। কয়লা মন্ত্রণালয় সরবরাহ বাড়ালেও অক্টোবরের শুরু থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট কয়লার মজুত প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। অনেক কেন্দ্রের মজুত দিয়ে তিন দিনেরও কম সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত গরম আবহাওয়া, সেচের বাড়তি চাহিদা ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। ফলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে, আর তাতে তাদের জ্বালানির মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
সিইএর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৫৬ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা, যা ২০২৩ সালের আগস্টের পর কোনো মাসে সর্বোচ্চ। প্রায় এক দশকের মধ্যে যেকোনো সেপ্টেম্বরের তুলনায়ও এ ঘাটতিকে সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও, নির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে চাহিদা মেটেনি।
গুজরাটের পদক্ষেপে বোঝা যায়, চাপটা সবচেয়ে বেশি কোথায়: দিনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পরের সময়ে। উত্তর গুজরাট ভিজ কোম্পানি লিমিটেড শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাসিন্দাদের বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অনুরোধ করে বার্তা পাঠিয়েছে। কারখানাগুলোকে স্বেচ্ছায় অন্য সময়ে কাজ সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জ্বালানির মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কম—এর অর্থ কী
১৯ অক্টোবরের সিইএর হিসাবে, পর্যবেক্ষণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেকের কিছু বেশি ছিল আশঙ্কাজনক মজুতের শ্রেণিতে। এর আগে ৮ অক্টোবর ১৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭টিতে মজুত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে ছিল; সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল ৫০।
জ্বালানির মজুত দুইভাবে হিসাব করা যায়: একটি কেন্দ্রের হাতে থাকা কয়লা দিয়ে কত দিন চালানো সম্ভব, এবং নির্ধারিত চাহিদার তুলনায় কতটা মজুত রয়েছে। প্রথম হিসাবটি কেন্দ্রটির তাৎক্ষণিক পরিচালন সক্ষমতা বোঝায়; দ্বিতীয়টি দেখায়, প্রত্যাশিত মজুতের তুলনায় হাতে কতটা রয়েছে।
১৭ অক্টোবরের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রের হাতে নির্ধারিত মজুতের এক-চতুর্থাংশেরও কম কয়লা ছিল। কয়লা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আশঙ্কাজনক মজুত থাকা হিসেবে চিহ্নিত কেন্দ্রগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখতে সরবরাহ অন্যদিকে পাঠানো হচ্ছে।
৮ অক্টোবরের এক হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার মজুত ছিল ২ কোটি ৬ লাখ টন; সুপারিশকৃত মজুত ৬ কোটি ১২ লাখ টনের তুলনায় তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ প্রকৃত মজুত ও সুপারিশকৃত মজুতের মধ্যে ঘাটতি ছিল প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ টন।
সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে সংকট কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা দেখা যায়:
- সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি: ৬০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কম ছিল।
- ১ অক্টোবর: বছরের অন্তত শেষ পর্যন্ত ১০০টির বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ কার্যকর হয়।
- ৮ অক্টোবর: পর্যবেক্ষণাধীন ১৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭টিতে মজুত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে ছিল।
- ১৯ অক্টোবর: আশঙ্কাজনক মজুত থাকা কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে ১৯১টির মধ্যে ৯৬টিতে দাঁড়ায়।
- ২১ অক্টোবর: সন্ধ্যায় বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে কারখানাগুলোর প্রতি গুজরাটের আহ্বানের কথা প্রকাশ্যে আসে।
গরম ও কম বৃষ্টিপাত গ্রিডের সরবরাহ-চাহিদা উভয় দিকেই চাপ বাড়াচ্ছে
সিইএর হিসাবে, ভারতে দৈনিক সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ গিগাওয়াট বেশি। গিগাওয়াট দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ব্যবহারের হার মাপা হয়। সর্বোচ্চ চাহিদা বাড়লে একই সময়ে গ্রিডে আরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয়।
কম বৃষ্টিপাতে দুই দিক থেকেই চাপ বেড়েছে। পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, আর শুষ্ক আবহাওয়ায় সেচের জন্য কৃষকদের পানি তোলার প্রয়োজন বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী গরমে এয়ার কন্ডিশনারসহ শীতলীকরণ যন্ত্রপাতিও স্বাভাবিক গ্রীষ্মকাল পেরিয়েও চালু থাকছে।
সিইএর হিসাবে, এক বছর আগের তুলনায় সেপ্টেম্বরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, আর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ২০ শতাংশ। আর্থিক গবেষণার হিসাবে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ১৬ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯০০ কোটি ইউনিটে দাঁড়িয়েছে; বৃহত্তর তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ১৬ শতাংশ, ১১ হাজার ৮০০ কোটি ইউনিটে।
দুই হিসাবেই একই পরিচালনগত চাপের চিত্র উঠে এসেছে: পানি থেকে বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে, আর জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোকে বেশি কাজ করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণও চাহিদা মেটানোর জন্য সরবরাহযোগ্য বিদ্যুতের পরিমাণ কমিয়েছে।
সন্ধ্যার সময়ে সংকট কেন বেশি
গুজরাটের অনুরোধ বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টার জন্য। এ সময় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় কারখানা, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য গ্রাহকের মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এ সময়ের বাইরে উৎপাদনের শিফট সরালে একটি কারখানার সারা দিনের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার একই রকম থাকলেও রাজ্যের একই সময়ে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা কমতে পারে।
সূর্যের আলো প্যানেলে পড়লে সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ব্যাটারিতে এর কিছুটা পরে ব্যবহারের জন্য জমিয়ে রাখা সম্ভব, তবে দিনের উৎপাদিত বিদ্যুতের সবটা সন্ধ্যা পর্যন্ত সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ভারতে নেই। তাই সূর্যাস্তের পর চাহিদা মেটাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত কয়লা ও বিদ্যুতের চাহিদা জানিয়েছে গুজরাট। ভবিষ্যতের ব্যবহার মেটাতে রাজ্যটি কয়লা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিকল্পনাও করছে। কারখানাগুলোর প্রতি তাৎক্ষণিক আহ্বানটি স্বেচ্ছামূলক; এতে কারখানা বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ করার কথা নয়, বরং উৎপাদনের সময় বদলানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ চেয়েছে পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, কেরালা, তামিলনাড়ু ও হিমাচল প্রদেশও। রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, ছত্তিশগড় ও দিল্লি থেকেও অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদার খবর পাওয়া গেছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে বাস্তবিক বিকল্প হতে পারে কর্মী ও যন্ত্রপাতির কাজের সময় পুনর্নির্ধারণ করা, অথবা সন্ধ্যায় বিদ্যুতের সীমিত সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা করা। সরবরাহকারীদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জোগাড় করতে হলে এমন কেন্দ্র খুঁজতে হবে, যেখানে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে, এবং সেই কেন্দ্র চালু রাখার মতো জ্বালানিও নিশ্চিত করতে হবে।
কয়লা আসছে বেশি, তবু মজুত কমছে
কয়লা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক সরবরাহ সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অক্টোবরে রেলে দৈনিক গড়ে ৪৬৫টির বেশি রেক কয়লা পাঠানো হয়েছে; টানা তিন দিন ৪৭০টির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। রেক বলতে কয়লা বহনকারী সংযুক্ত মালবাহী ওয়াগনের সারিকে বোঝায়।
রেলপথে পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কয়লা উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ভিন্ন ভিন্ন স্থানে। বেশি কয়লা উৎপাদন করলেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাভ হয় না; কয়লাটি বোঝাই, পরিবহন ও খালাস করে বয়লারে দিতে হয়। সরকার কয়লা ইন্ডিয়া লিমিটেডকে উৎপাদন বাড়াতে এবং রেলওয়েকে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে বলেছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, দৈনিক ৪৬৫ থেকে ৪৭৫টি রেকের পরিবহন বজায় রাখা গেলে মজুত স্থিতিশীল করতে এবং উৎসবের সময়, শীতকাল ও পরবর্তী গ্রীষ্মের চাহিদার জন্য মজুত পুনর্গঠনে সহায়তা হবে। সড়ক ও অন্যান্য মাধ্যমেও সরবরাহ বেড়েছে।
তারপরও অক্টোবরের প্রথম ১৭ দিনে মজুত দৈনিক গড়ে প্রায় ৪৮ হাজার টন কমেছে। এ হার সেপ্টেম্বরের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশ; ওই মাসে দৈনিক গড় হ্রাস ছিল প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টন। দৈনিক ক্ষয় কমে আসায় সরবরাহ ও ব্যবহারের ভারসাম্য উন্নত হয়েছে বলে বোঝা যায়, কিন্তু মজুত কমতে থাকায় রিজার্ভের ওপর চাপ রয়ে গেছে।
বাধ্যতামূলক আমদানির পরিকল্পনা কেন স্থগিত
আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেশীয় কয়লার সঙ্গে আমদানি করা কয়লা মেশাতে বাধ্য করার প্রস্তাব সরকার স্থগিত রেখেছে। এতে জ্বালানির আরেকটি উৎস যোগ হতো, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও রুপির দরপতনে আমদানি করা কয়লার খরচ বেড়ে যায়।
মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত তাপীয় কয়লার দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। আর্থিক গবেষণার হিসাবে, সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশীয় কয়লার দাম ছিল টনপ্রতি ১১১ ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। রুপির দরপতনে ডলারে নির্ধারিত পণ্যের দাম স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেড়ে যায়।
সরবরাহে সংকট দেখা দিলে অতীতে দেশীয় কয়লার ঘাটতি মেটাতে ভারত আমদানি বাধ্যতামূলক করেছে। এবার সরকার দেশীয় উৎপাদন ও পরিবহনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে; পাশাপাশি আশা করছে, আবহাওয়া ঠান্ডা হলে বিদ্যুতের ব্যবহার কমবে। আমদানির বাধ্যবাধকতা স্থগিত রাখার আলোচনা সম্পর্কে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও কয়লা ইন্ডিয়া প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য দেয়নি।
প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। আর্থিক গবেষণার হিসাবে, স্পট বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ফেব্রুয়ারিতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ১০ দশমিক ৮ ডলার থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ২৬ ডলারে পৌঁছায়, যা দ্বিগুণেরও বেশি। গ্যাসের দাম বাড়ায় বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে এ জ্বালানি ব্যবহার আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির ‘কোল মিড-ইয়ার আপডেট ২০২৬’-এ চলতি বছর ভারতে কয়লার চাহিদা ১৩৫ কোটি ৩০ লাখ টন হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে চাহিদা কমেছিল। সংস্থাটি চাহিদা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালীতে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কথা উল্লেখ করেছে। এ নৌপথ পারস্য উপসাগরকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
চাহিদা বাড়ায় বিদ্যুতের খরচও বাড়ছে
সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের ব্যবহার আনুমানিক ১৬ হাজার ২০০ কোটি ইউনিটে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ শতাংশ বেড়ে ২৬৯ গিগাওয়াট হয়েছে। বিদ্যুতের এক ইউনিট হলো এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা, অর্থাৎ এক কিলোওয়াট ক্ষমতার কোনো যন্ত্র এক ঘণ্টা চালালে যত বিদ্যুৎ লাগে।
আর্থিক গবেষণার হিসাবে, সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ঘাটতি ৭ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এটি নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতির পরিমাণ। অন্যদিকে, সিইএর মাসিক ৫৬ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টার ঘাটতি পুরো মাসে অপূরণীয় বিদ্যুতের চাহিদার মোট পরিমাণ বোঝায়।
সরবরাহে টান পড়ায় পাইকারি দাম বেড়েছে। ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জে সেপ্টেম্বরে ওজনযুক্ত গড় বাজারমূল্য ছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৯ রুপি, এক বছর আগে যা ছিল ৩ দশমিক ৪ রুপি। বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এটি বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাজারের দাম; পরিবারের বিল নির্ভর করে সরবরাহকারীর নির্ধারিত ট্যারিফ ও কেনার ব্যবস্থার ওপর।
বিতরণ কোম্পানিগুলোও আর্থিক চাপে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছে তাদের বকেয়া আনুমানিক ৮৫ হাজার ৭০০ কোটি রুপি বা ৮৫৭ বিলিয়ন রুপি। বাজার থেকে বেশি দামে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিনলে আগে থেকেই বকেয়া থাকা কোম্পানিগুলোর খরচ আরও বাড়ে।
সংকট নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে
সিইএর চেয়ারপারসন ঘনশ্যাম প্রসাদ ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিদ্যমান পরিকল্পনার অতিরিক্ত হিসেবে ভারতের আরও ১০৫ থেকে ১৫০ গিগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা লাগতে পারে। বিদ্যমান পরিকল্পনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৭ গিগাওয়াট কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা যোগ করার লক্ষ্য রয়েছে।
রাজ্যগুলোর বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে, তাৎক্ষণিক সংকটের বাইরেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও আসামের কর্তৃপক্ষ দরপত্রের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ ৭ গিগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ চেয়েছে। এ কেনাকাটা নিয়ে গবেষণায় ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া আগের এক সময়ে ১৭ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তির কথাও বলা হয়েছে।
ভারত নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে। প্রসাদ বলেন, আগের বছরে প্রায় ৫০ গিগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে এবং বার্ষিক সংযোজন ৫০ গিগাওয়াট ছাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং পাম্পড স্টোরেজ জলবিদ্যুৎকে সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পাম্পড স্টোরেজ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি উঁচুতে তোলা হয়; পরে বিদ্যুতের প্রয়োজন হলে তা টারবাইনের মধ্য দিয়ে ছাড়া হয়। ব্যাটারির মতো এ ব্যবস্থাও দিনের এক সময়ের বিদ্যুৎ অন্য সময়ের জন্য কাজে লাগাতে পারে। গুজরাটে দেখা দেওয়া সময়ভিত্তিক সমস্যার মোকাবিলায় এ ধরনের প্রকল্প কাজে আসবে, আর তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট মেটাতে দরকার কয়লার সরবরাহ।
আবহাওয়া ঠান্ডা হলে মজুত বাড়ানোর সুযোগ আসতে পারে
তাপমাত্রা কমার সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার কমবে এবং কয়লার মজুত পুনরুদ্ধার করা যাবে বলে আশা করছে সরকার। ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের পূর্বাভাসে পরবর্তী দুই সপ্তাহে তাপমাত্রা সামান্য কম থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে; তবে আগের ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এ সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক মজুত কমার হার সেপ্টেম্বরের তুলনায় কম হলেও, মজুত প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। মজুত ফেরাতে সরবরাহকে ধারাবাহিকভাবে কয়লার ব্যবহার ছাড়িয়ে যেতে হবে; শুধু ব্যবহারের সমান সরবরাহ হলে চলবে না।
১০০টির বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ অন্তত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সুপারিশকৃত জ্বালানি মজুত কবে ফিরিয়ে আনা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানানো হয়নি। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় কারখানার বিদ্যুতের ব্যবহার অন্য সময়ে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকে বোঝা যায়, হাতে থাকা বিদ্যুৎ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারে রাজ্যগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
মূল কথা
- ১৯ অক্টোবর সিইএ ১৯১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯৬টিতে মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কম পেয়েছে; সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এ সংখ্যা ছিল ৬০।
- সরবরাহ বাড়ানো সত্ত্বেও অক্টোবরের শুরু থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার মজুত প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে।
- বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টার মধ্যে উৎপাদন স্বেচ্ছায় অন্য সময়ে সরিয়ে নিতে কারখানাগুলোকে বলেছে গুজরাট।
- গরমে চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের ঘাটতি ৫৬ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে।
- আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি ও রুপির দরপতনের কারণে কয়লা আমদানি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব স্থগিত রাখা হয়েছে।
- জ্বালানির মজুত পুনর্গঠনে দেশীয় কয়লা উৎপাদন, রেলপথে সরবরাহ ও আবহাওয়া ঠান্ডা হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।






