বিতর্কিত শোলে ২১ অক্টোবরের রসদ পৌঁছেছে জাহাজে
চীনা কোস্টগার্ডের মুখপাত্র জিয়াং লুয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইন ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর দক্ষিণ চীন সাগরের সেকেন্ড থমাস শোলে থাকা বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিয়েছে। জিয়াং বলেন, চীন এ সরবরাহের অনুমতি দিয়েছিল, পণ্যবাহী ফিলিপাইনের জাহাজটি পরীক্ষা করেছিল এবং পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে।
সূচিপত্র
একই শোলে ২৫ সেপ্টেম্বরের রসদ সরবরাহ কার্যক্রমে চীন বাধা দিয়েছে বলে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড অভিযোগ করার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এ অভিযান চালানো হলো। এর আগে ১৯ অক্টোবর কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল ম্যানিলা। ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, চীনা রাষ্ট্রদূতের কিছু মন্তব্যে বলপ্রয়োগের হুমকি ছিল।
চীন যে শোলকে রেন’আই জিয়াও বলে, সেই সেকেন্ড থমাস শোল বেইজিং ও ম্যানিলার মধ্যে বারবার সংঘাতের কেন্দ্রে এসেছে। সেখানে সিয়েরা মাদ্রে জাহাজটি রেখেছে ফিলিপাইন। অন্যদিকে, চীন শোলটিকে তাদের নানশা ছুনদাও নামে পরিচিত দ্বীপপুঞ্জের অংশ বলে দাবি করে। জাহাজে থাকা ফিলিপাইনের সদস্যরা বাইরে থেকে পৌঁছানো রসদের ওপর নির্ভরশীল।
জিয়াং সর্বশেষ অভিযানটিকে চীনের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনী ও কোস্টগার্ড তাৎক্ষণিকভাবে নিজস্ব বিবরণ দেয়নি। ২১ অক্টোবরের অভিযানে কী পরিমাণ পণ্য ছিল, কয়টি জাহাজ অংশ নিয়েছিল এবং বিস্তারিত ব্যবস্থা কী ছিল, তা জানানো হয়নি।
চীনের ভাষ্য অনুযায়ী, কোস্টগার্ড যা করেছে
জিয়াং বলেন, রসদবাহী ফিলিপাইনের জাহাজটি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে তা যাচাই করার পর চীনা কোস্টগার্ড পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণ করেছে। তাঁর বিবরণে অভিযানটি চীনের অনুমতি নিয়ে হয়েছে বলে তুলে ধরা হয়, যা বিতর্কিত জলসীমার ওপর কর্তৃত্বের বেইজিংয়ের দাবির প্রতিফলন।
মুখপাত্র আরও বলেন, নানশা ছুনদাও ও আশপাশের জলসীমায়, রেন’আই জিয়াওসহ, চীনের দাবিকৃত অধিকার রক্ষায় কোস্টগার্ড আইন প্রয়োগ ও অভিযান চালিয়ে যাবে। সিয়েরা মাদ্রে জাহাজের কাছে যেসব জাহাজ যাবে, তাদের জন্য এর অর্থ হলো—এই একটি সরবরাহ অভিযানেই চীনা কোস্টগার্ডের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকবে না।
যাচাই, পর্যবেক্ষণ ও অনুমোদন—চীনের বিবরণে এগুলো আলাদা আলাদা পদক্ষেপ। যাচাইয়ের অর্থ সংশ্লিষ্ট জাহাজটি পরীক্ষা করা; পর্যবেক্ষণের অর্থ এর কার্যক্রম নজরে রাখা; আর অনুমোদন বলতে বেইজিংয়ের দাবি, তারা অভিযানের অনুমতি দিয়েছে। কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে বা চীনা সদস্যরা ফিলিপাইনের জাহাজে উঠেছিলেন কি না, জিয়াংয়ের বিবৃতিতে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।
ফিলিপাইনের সদস্যরা অভিযানটি কীভাবে দেখেছেন, তা জানতে ম্যানিলার তাৎক্ষণিক বিবরণ দরকার। আপাতত, সম্পন্ন হওয়া সরবরাহের বিস্তারিত চীনা কোস্টগার্ডের বিবৃতির ওপর নির্ভর করছে।
পরস্পরবিরোধী দাবির মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা
সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে মানবিক সহায়তা হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানোর বিষয়ে চীন ও ফিলিপাইন এর আগে একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছেছিল। বৃহত্তর মতবিরোধ চলতে থাকলেও বাস্তব কোনো সমস্যা সামাল দিতে নেওয়া সাময়িক বোঝাপড়াকেই অস্থায়ী সমঝোতা বলা হয়।
সেকেন্ড থমাস শোলে বাস্তব সমস্যাটি হলো, নোঙর করে রাখা জাহাজে থাকা লোকজনের জন্য রসদ নিশ্চিত করা। বৃহত্তর মতবিরোধের বিষয় শোলটির নিয়ন্ত্রণ এবং এর আশপাশের কর্মকাণ্ডে প্রতিটি সরকারের দাবিকৃত কর্তৃত্ব। দুই পক্ষ সরবরাহের শর্ত নিয়ে বিরোধে থাকলেও জাহাজে খাবার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো দরকার।
২১ অক্টোবরের বিবৃতিতে চীনের অনুমোদন, জাহাজ পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে, তবে এসব পদক্ষেপ অস্থায়ী সমঝোতার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়নি। আলোচনা বা রসদ সরবরাহের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের নতুন সময়সূচিও জানানো হয়নি।
সিয়েরা মাদ্রে জাহাজটিকে অবৈধভাবে নোঙর করা হয়েছে বলে চীনের বর্ণনা তাদের নিজস্ব অবস্থান। শোলটি নিয়ে ফিলিপাইনেরও দাবি রয়েছে, আর সরবরাহে অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে বেইজিংয়ের দাবিও কর্তৃত্ব নিয়ে চলমান মতবিরোধের অংশ।
১৯৯৯ সালের মে মাস থেকে শোলটিতে জাহাজটি
ফিলিপাইন ১৯৯৯ সালের মে মাসে এলটি-৫৭ নামে পরিচিত ট্যাংক অবতরণকারী জাহাজ বিআরপি সিয়েরা মাদ্রেকে সেকেন্ড থমাস শোলে নোঙর করে। ২০২৬ সালের অক্টোবর নাগাদ জাহাজটি সেখানে ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে।
শোলটিতে জাহাজটি ফিলিপাইনের একটি অগ্রবর্তী অবস্থান হিসেবে কাজ করছে। সেখানে জাহাজটির উপস্থিতি বজায় রাখায় রসদ সরবরাহ একটি নিয়মিত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে: নির্দিষ্ট একটি স্থানে থাকা সদস্যদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছাতে হয়, যেখানে চীনা কোস্টগার্ডের জাহাজও চলাচল করে।
বেইজিংয়ের দাবি, জাহাজটি সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ম্যানিলা বারবার দিয়েছে। জাহাজটি এখনো শোলটিতে রয়েছে, আর সেটি সরিয়ে নেওয়ার চীনের দাবি সেখানে ফিলিপাইনের উপস্থিতি নিয়ে তাদের আপত্তির অংশ।
দীর্ঘদিন ধরে জাহাজটি সেখানে থাকায় সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটিও কূটনৈতিক গুরুত্ব পায়। প্রতিটি যাত্রায় শুধু একটি জাহাজে পণ্য পৌঁছানোই হয় না। ফিলিপাইনের জাহাজগুলো এমন জলসীমায় যায়, যেখানে চীন বলেছে তারা আইন প্রয়োগ করবে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বারবার মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সর্বশেষ অভিযানের আগে সেপ্টেম্বরে বিরোধ
২৫ সেপ্টেম্বর সেকেন্ড থমাস শোলে রসদ সরবরাহ অভিযানে চীন বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড। চীনের বক্তব্য, ফিলিপাইনের জাহাজগুলো তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল এবং ঘটনাস্থলে পর্যবেক্ষণ ও মৌখিক সতর্কবার্তার মাধ্যমে চীনা সদস্যরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।
সেই বিরোধের ২৬ দিন পর ২১ অক্টোবরের সরবরাহ অভিযানটি হয়। চীন পরবর্তী অভিযানটিকে অনুমোদিত ও পর্যবেক্ষিত বলে বর্ণনা করেছে, আর আগের অভিযানটি বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলেছিল ফিলিপাইন। একই অগ্রবর্তী অবস্থানে প্রবেশের শর্ত এক যাত্রা থেকে পরের যাত্রায় কীভাবে বিরোধের কারণ হতে পারে, এ দুই ঘটনা তা দেখায়।
সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ চীন সাগরের আরেকটি শোলের কাছেও পৃথক সংঘাত ঘটে। ফিলিপাইনের কোস্টগার্ডের দাবি, জ্বালানি নিতে যাওয়া ফিলিপাইনের একটি নৌকায় চীনা কোস্টগার্ডের জাহাজ ধাক্কা দিয়েছিল। সংঘর্ষের জন্য ফিলিপাইনকে দায়ী করে চীন।
ওই সংঘর্ষ ও ২৫ সেপ্টেম্বরের রসদ সরবরাহ নিয়ে বিরোধ ছিল আলাদা ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক এ দুই ঘটনা ২১ অক্টোবরের সরবরাহ অভিযানকে সমুদ্রে সাম্প্রতিক মুখোমুখি পরিস্থিতি এবং সতর্কবার্তা, জাহাজের চলাচল ও দায়দায়িত্ব নিয়ে মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে এনেছে।
রাষ্ট্রদূতকে ঘিরেও কূটনৈতিক উত্তেজনা
সর্বশেষ রসদ সরবরাহ অভিযানের দুই দিন আগে, ১৯ অক্টোবর, ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। ম্যানিলার ভাষ্য, রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে বলপ্রয়োগের হুমকি ছিল। এ নিয়ে তারা গুরুতর উদ্বেগ জানায় এবং তীব্র আপত্তি জানায়।
চীনা কূটনীতিক তাঁর মন্তব্যে হুমকি ছিল বলে ম্যানিলার ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বিরোধটি কোস্টগার্ডের কর্মকাণ্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে দুই সরকারের কূটনৈতিক কথাবার্তায় ব্যবহৃত ভাষা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা:
- মে ১৯৯৯: ফিলিপাইন বিআরপি সিয়েরা মাদ্রেকে সেকেন্ড থমাস শোলে নোঙর করে।
- সেপ্টেম্বর ২০২৬: আরেকটি শোলের কাছে চীনা জাহাজ ফিলিপাইনের একটি নৌকায় ধাক্কা দিয়েছে বলে অভিযোগ করে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড। ফিলিপাইনকে দায়ী করে চীন।
- ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: সেকেন্ড থমাস শোলে রসদ সরবরাহ অভিযানে চীন বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করে ম্যানিলা। বেইজিং জানায়, তারা সতর্কবার্তা দিয়েছিল এবং অভিযান পর্যবেক্ষণ করেছিল।
- ১৯ অক্টোবর ২০২৬: বলপ্রয়োগের হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করা মন্তব্যের জন্য ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে।
- ২১ অক্টোবর ২০২৬: সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে ফিলিপাইনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে অনুমতি দেওয়া ও তা পর্যবেক্ষণের কথা জানায় চীন।
এই সরবরাহ কেন গুরুত্বপূর্ণ
চীনের বিবরণ অনুযায়ী, সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে থাকা ফিলিপাইনের সদস্যদের জন্য তাৎক্ষণিক ফল ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আগমন। দুই সরকারের কাছে এ অভিযান তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান আবার সামনে এনেছে: ম্যানিলা তাদের অগ্রবর্তী অবস্থান বজায় রেখেছে, আর বেইজিং বলছে, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করে এবং আশপাশে আইন প্রয়োগের অভিযান চালিয়ে যাবে তারা।
দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তৃত জলসীমা নিয়ে চীনের দাবির সঙ্গে ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের দাবিরও overlap রয়েছে। সেকেন্ড থমাস শোলের সংঘাত সেই বৃহত্তর ভূগোলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বিরোধ। এর কেন্দ্রে রয়েছে নোঙর করে রাখা ফিলিপাইনের একটি জাহাজ এবং সেখানে বারবার রসদ পৌঁছে দেওয়ার যাত্রা।
অস্থায়ী রসদ সরবরাহ সমঝোতা জাহাজে থাকা সদস্যদের প্রয়োজন মেটানোর একটি উপায় দিয়েছে দুই পক্ষকে। সমুদ্রে মুখোমুখি পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে ২৫ সেপ্টেম্বরের বিরোধের মতো ঘটনার পর, সরবরাহ কীভাবে এগোয় তার ওপরই এর বাস্তব কার্যকারিতা নির্ভর করছে।
২১ অক্টোবরের অভিযানে অগ্রবর্তী অবস্থানে রসদ পৌঁছেছে, তবে দুই সরকারের ঘোষিত অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। চীন বলছে, শোলের আশপাশে তাদের কোস্টগার্ডের অভিযান চলবে, আর সিয়েরা মাদ্রে ২৭ বছরেরও বেশি আগে ফিলিপাইন যেখানে নোঙর করেছিল, সেখানেই রয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- চীনের দাবি, ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে ফিলিপাইনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে তারা অনুমতি দিয়েছিল এবং তা পর্যবেক্ষণ করেছে।
- কোস্টগার্ডের মুখপাত্র জিয়াং লুয়ের ভাষ্য, চীনা সদস্যরা রসদবাহী জাহাজটি পরীক্ষা করেন এবং পুরো অভিযান দেখেন।
- চীনে রেন’আই জিয়াও নামে পরিচিত বিতর্কিত সেকেন্ড থমাস শোলে জাহাজটি ১৯৯৯ সালের মে মাস থেকে রয়েছে।
- মানবিক সহায়তা হিসেবে রসদ সরবরাহের বিষয়ে একটি অস্থায়ী সমঝোতা রয়েছে, তবে শোলটিতে কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ দুটির বিরোধ চলছে।
- ২৫ সেপ্টেম্বরের রসদ সরবরাহ নিয়ে বিরোধ এবং ১৯ অক্টোবর ফিলিপাইনের কূটনৈতিক প্রতিবাদের পর এ অভিযান চালানো হয়।
- সর্বশেষ সরবরাহ সম্পর্কে ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনী ও কোস্টগার্ড তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিবরণ দেয়নি।






