সাধারণ পরিবেশনা থেকে রাজনৈতিক মুখোমুখি
২০ অক্টোবর তাইনান রেলস্টেশনে YOASOBI-র গান Gunjo বাজানোর সময় এক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পরিবেশনা থামিয়ে দেন এক ব্যক্তি। তিনি ফোনে সরাসরি সম্প্রচার করতে করতে চীনের জাতীয় সংগীত গাইছিলেন। পরিবেশনা শেষ করে শিক্ষার্থী ক্যামেরার দিকে ঘুরে তাইওয়ান ও চীন প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্লোগান দিলে ওই ব্যক্তি জবাব দিতে গিয়ে তোতলাতে থাকেন।
সূচিপত্র
ঘটনাটি ঘটে নতুন খোলা স্টেশনের একটি জনসাধারণের ব্যবহারের পিয়ানোর পাশে। প্রায় ৪০ বছর আগে কেনা ইয়ামাহা পিয়ানোটি কয়েক দিন আগেই স্টেশনে আনা হয়। তাইনানের সাবেক পুলিশপ্রধান ওয়াং ওয়েন-চুংয়ের পরিবারের দান করা পিয়ানোটি সেখানে পৌঁছায়।
শিক্ষার্থী Threads-এ ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে বলেন, ওই ব্যক্তি বারবার তার পরিবেশনায় বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার পরও আরও কিছুক্ষণ গোলমাল চলেছিল। তখন আরেকজন পিয়ানোবাদী ওই ব্যক্তির মন্তব্যের শিকার হন; পরে রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।
ওই ব্যক্তির জাতীয়তা ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের পদক্ষেপের বিবরণ প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, আর শিক্ষার্থীর পোস্টে ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতির ভিডিও রয়েছে। এসব বর্ণনার সঙ্গে ঘটনার ব্যবস্থাপনা ব্যাখ্যা করে পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি।
পিয়ানোর পাশে কী ঘটেছিল?
জাপানি দল YOASOBI-র গান Gunjo বাজাচ্ছিলেন শিক্ষার্থী, এমন সময় ফোন হাতে ওই ব্যক্তি কাছে আসেন। শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বারবার বাধা দেন এবং পরিবেশনার সঙ্গে চীনের জাতীয় সংগীত গাইতে থাকেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ওই ব্যক্তি একটি স্যুটকেস টেনে নিয়ে পিয়ানোর সুরের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে গান গাইছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, তিনি তাইনান স্টেশনে চীনের জাতীয় সংগীত গাওয়া প্রথম ব্যক্তি হওয়ার দাবিও করেন।
তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী গানটি শেষ করেন এবং শ্রোতাদের অভিবাদন জানাতে উঠে দাঁড়ান। তখন ওই ব্যক্তি সরাসরি সম্প্রচার দেখা দর্শকদের উদ্দেশে তরুণ সংগীতশিল্পীর প্রশংসা করেন।
ফোন হাতে থাকা ব্যক্তি দর্শকদের বলেন:
এই বাচ্চাটা অসাধারণ, ভাইয়েরা।
এরপর উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী সরাসরি সম্প্রচারের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেন:
তাইওয়ান দীর্ঘজীবী হোক, চীন প্রজাতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক!
ওই ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে তোতলাতে শুরু করেন এবং শিক্ষার্থীকে থামতে বলেন। এর আগে তার বাধা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীর কথার পর তার প্রতিক্রিয়ার বৈপরীত্যই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ও আলোচনার কেন্দ্রীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীর বক্তব্য কেন নজর কাড়ে
শিক্ষার্থীর জবাবে একই সংক্ষিপ্ত ঘোষণায় দুটি নাম উঠে আসে: তাইওয়ান, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, এবং চীন প্রজাতন্ত্র, যা তাইওয়ান সরকার আনুষ্ঠানিক নাম হিসেবে ব্যবহার করে। বেইজিং থেকে পরিচালিত রাষ্ট্রটির নাম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন; ওই ব্যক্তি দেশটির জাতীয় সংগীত গাইছিলেন।
এই নামগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন এমন পাঠকদের জন্য বলা যায়, চীন প্রজাতন্ত্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন দুটি ভিন্ন সরকারকে বোঝায়। শিক্ষার্থীর বক্তব্যে তাইওয়ান ও সেখানকার বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সমর্থন সরাসরি ওই ব্যক্তির সম্প্রচারে উঠে আসে।
Threads ব্যবহারকারীরা শিক্ষার্থীর ক্ষিপ্র জবাবের প্রশংসা করেন। কেউ কেউ কথাটিকে এমন এক মন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেন, যা সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যক্তির আচরণ বদলে দেয়। অন্যদের মন্তব্যে উঠে আসে জনসমক্ষে পরিবেশনায় বিঘ্ন ঘটানো এবং পিয়ানোবাদীর প্রতি অসম্মান দেখানোর বিষয়টি।
সরাসরি সম্প্রচারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জল্পনাও শুরু হয়। ওই ব্যক্তির সম্প্রচার কোন প্ল্যাটফর্মে হচ্ছিল, তা শনাক্ত করা যায়নি; সম্প্রচারটির পরিণতি সম্পর্কেও কিছু জানানো হয়নি। দৃশ্যমান মুখোমুখি ঘটনাটি তার বিস্মিত প্রতিক্রিয়ায় শেষ হলেও স্টেশনের ভেতরে বিরোধ চলতে থাকে।
দ্বিতীয় পিয়ানোবাদী ও পুলিশ ডাক
শিক্ষার্থী চলে যাওয়ার পর এক বয়স্ক নারী পিয়ানো বাজাতে শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি তার উদ্দেশে উসকানিমূলক মন্তব্য করতে থাকেন এবং তাইওয়ানে রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ "ব্লুবার্ড" শব্দটি বারবার ব্যবহার করেন।
পাশে থাকা লোকজন রেলওয়ে কর্মীদের খবর দেন এবং পুলিশের সহায়তা চান। এক প্রত্যক্ষদর্শীর অনুমান, ফোন করার প্রায় পাঁচ মিনিট পর পুলিশ সদস্যরা পৌঁছান।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই ব্যক্তি তাইওয়ানি ভাষায় কথা বলেন এবং নিজেকে তাইওয়ানি বলে পরিচয় দেন। তিনি আরও দাবি করেন, পিয়ানো বাজানো নারী তার গির্জার সহ-সদস্য এবং তিনি শুধু গান শুনছিলেন ও সঙ্গে গাইছিলেন।
মূল বর্ণনায় বলা হয়েছে, ওই নারী ও সেখানে উপস্থিত অন্যরা তাদের পরিচিত হওয়ার দাবি নাকচ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীর আরও বিস্তারিত বর্ণনায় বলা হয়েছে, কথোপকথনের সময় নারীটি নীরব ছিলেন; পরে অন্যরা নিশ্চিত করেন, তাদের দুজনের মধ্যে পরিচয় ছিল না।
পুলিশ সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে অন্য তলায় যেতে রাজি করান, এরপর তিনি চলে যান। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুলিশ অভিযোগকারী ব্যক্তির নাম ও টেলিফোন নম্বর লিখে নেয় এবং সংঘাতে না জড়ানোর পরামর্শ দেয়।
পিয়ানো ব্যবহারকারীদের জন্য তাৎক্ষণিক ফল ছিল পুলিশের হস্তক্ষেপে ওই ব্যক্তিকে পরিবেশনার স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া। হস্তক্ষেপের বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনাও এখন ঘটনাটি ঘিরে আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
পারিবারিক বাড়ি থেকে রেলস্টেশনের প্রাঙ্গণে
তাইনান স্টেশনে পিয়ানোটি আসার পেছনের গল্প ছিল একেবারেই আলাদা। এটি ছিল তাইনান সিটি পুলিশ বিভাগের সাবেক প্রধান ওয়াং ওয়েন-চুংয়ের পরিবারের। বছরের পর বছর সংগীতের পাঠ নেওয়ার সময় পিয়ানোটি তার তিন মেয়ের সঙ্গী ছিল।
ওয়াংয়ের দ্বিতীয় মেয়ে জানান, মধ্য-শরৎ উৎসবের কিছু আগে তার বাবা মারা যান। তার মা ইয়াং শুয়ে-লিয়েন তাইচুংয়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের হ্সিনচুর বাড়ির জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলেন। বাড়িটি বিক্রি করার কথা ছিল।
পরিবার প্রথমে জানতে চেয়েছিল, কারও পিয়ানোটি দরকার কি না। রোটারির সঙ্গে যুক্ত এক আত্মীয় দানের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাইনান স্টেশনে পিয়ানো রাখার জায়গা খুঁজে পান। মেয়ে জানান, এর আগে এ ধরনের দানে বাদ্যযন্ত্র প্রায়ই গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয় বা গির্জায় দেওয়া হতো।
১৪ অক্টোবর পিয়ানোটি হ্সিনচুর বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরদিন তাইনান স্টেশনে পৌঁছায়। স্টেশনের নতুন স্থাপনাগুলো ১৭ অক্টোবর খুলে দেওয়া হয়। ফলে নতুন জায়গায় যাত্রীরা আসা শুরু করার অল্প আগেই পিয়ানোটি সেখানে বসানো হয়।
ওয়াংয়ের কর্মজীবনের শেষ কর্মস্থল ছিল তাইনান, আর অবসরও নেন এই শহর থেকে; তাই পরিবারের কাছে শহরটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শুরুতে দানটি ইয়াংয়ের নামে করার কথা থাকলেও, সেই সংযোগ স্মরণে রাখতে পরিবার ওয়াংয়ের নাম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
ঘটনার পেছনের তারিখগুলো
একটি ব্যক্তিগত বাড়ি থেকে ব্যস্ত জনসাধারণের স্টেশনে পিয়ানোটি এসেছে এক সপ্তাহের মধ্যেই। তারিখগুলো থেকে বোঝা যায়, মুখোমুখি ঘটনার সময় পিয়ানোটি কেন এরই মধ্যে মানুষের নজর কাড়ছিল।
- ১৪ অক্টোবর: পরিবারের ইয়ামাহা পিয়ানোটি হ্সিনচুর বাড়ি থেকে সরানো হয়।
- ১৫ অক্টোবর: রোটারির সহায়তায় ব্যবস্থা করা দানের মাধ্যমে পিয়ানোটি তাইনান স্টেশনে পৌঁছায়।
- ১৭ অক্টোবর: তাইনান স্টেশনের নতুন স্থাপনাগুলো খুলে দেওয়া হয়।
- ২০ অক্টোবর: উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পরিবেশনায় বাধা দেওয়া হয়; পরে আরও একটি বিরোধের ঘটনা ঘটে এবং পুলিশ আসে।
অর্থাৎ স্টেশন খোলার তিন দিন পর এবং পিয়ানো পৌঁছানোর পাঁচ দিন পর ঘটনাটি ঘটে। এই অল্প সময়েই যাত্রীরা থেমে পিয়ানো বাজাতে ও শুনতে শুরু করেছিলেন; পরিবেশনার ভিডিওও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছিল।
দানের পেছনে ৪০ বছরের সংগীতচর্চা
ওয়াংয়ের পরিবার প্রায় চার দশক আগে ইয়ামাহা পিয়ানোটি ব্যবহৃত অবস্থায় কিনেছিল। তিন বোনের প্রত্যেকেই অন্তত ১০ বছর পিয়ানো শিখেছেন। তাদের মা প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট অনুশীলন করতে বলতেন।
একজন শিক্ষক বাড়িতে এসে প্রায় দেড় ঘণ্টা পাঠ দিতেন; তিন মেয়ের প্রত্যেকে পালা করে প্রায় ৩০ মিনিট করে শিখত। ইয়াং পিয়ানোটি যত্ন করে ব্যবহারের ওপরও জোর দিতেন; এতে স্টিকার লাগানো বা ক্ষতি করা নিষেধ ছিল। মেয়ের মতে, মায়ের এই যত্নের কারণেই বছরের পর বছর পিয়ানোটি ভালো অবস্থায় থেকেছে।
ওয়াংয়ের কাজের জন্য তাকে প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। ফলে সন্তানদের বড় করে তোলা ও সংগীতশিক্ষার বড় অংশের দায়িত্ব ছিল ইয়াংয়ের ওপর। সপ্তাহান্তে তিনি নিয়মিত তিন মেয়েকে ট্রেনে করে স্বামীর কর্মস্থলে নিয়ে যেতেন।
এসব যাত্রার কারণে রেলভ্রমণ বোনদের শৈশবের অংশ হয়ে উঠেছিল। তাই পিয়ানোটি স্টেশনে নতুন ঠিকানা পাওয়ায় পরিবারের সঙ্গে তার আরেকটি ব্যক্তিগত যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। অবসর নেওয়ার পর ওয়াংয়ের বাড়িতে সংগীত শোনার সুযোগও বেড়েছিল; নাতি-নাতনিরা বেড়াতে এসে বাজালেও তিনি শুনতেন।
তিন বোনের কেউই সংগীত পেশায় যাননি। দ্বিতীয় বোনের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে পিয়ানো বাজানো নিছক দৈনন্দিন দায়িত্ব না থেকে অনুভূতি প্রকাশ ও মন ভালো করার উপায় হয়ে ওঠে। এখন অপরিচিত মানুষদের পিয়ানোটি বাজাতে থামতে দেখে পরিবার আনন্দিত। অনলাইনে আলোচিত মুখোমুখি ঘটনার পাশাপাশি এতে ভাগাভাগি করে আনন্দ পাওয়ার এক শান্ত গল্পও যুক্ত হয়েছে।
মূল তথ্য
- ২০ অক্টোবর তাইনান স্টেশনে এক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পরিবেশনায় বাধা দেন এক ব্যক্তি; তিনি সরাসরি সম্প্রচার করতে করতে চীনের জাতীয় সংগীত গাইছিলেন।
- শিক্ষার্থী বাজানো শেষ করে ক্যামেরার দিকে তাইওয়ান ও চীন প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্লোগান দেন।
- প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি পরে আরেক পিয়ানোবাদীকে বিরক্ত করেন; এতে রেলওয়ে কর্মী ও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
- প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওই ব্যক্তি চলে যাওয়ার আগে পুলিশ তাকে অন্য তলায় নিয়ে যায়।
- তাইনানের সাবেক পুলিশপ্রধান ওয়াং ওয়েন-চুংয়ের পরিবার পিয়ানোটি দান করে; এটি ১৫ অক্টোবর স্টেশনে পৌঁছায়।
- যাত্রীরা বাজানোর সুযোগ পাওয়ার আগে প্রায় ৪০ বছর ধরে ইয়ামাহা পিয়ানোটি পরিবারের জীবনের অংশ ছিল।






