পরিচিত স্কুলের মাঠের সুরটির স্রষ্টার পরিচয় অবশেষে মিলল
২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চিনের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা এমন এক সুরের তালে দৌড়েছে, যার স্রষ্টার পরিচয় অনেকেই জানত না। এবার শিক্ষার্থী ও অন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অনলাইন অনুসন্ধানে এর পেছনের শিক্ষকের পরিচয় জানা গেছে: জিয়াং ইয়ানজুন, জিয়াংসু প্রদেশের ঝাংজিয়াগাংয়ের তাংছিয়াও সিনিয়র হাইস্কুলের শিক্ষক।
সূচিপত্র
নিজের স্কুলের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধানে ২০০৩ সালে জিয়াং সুরটি তৈরি করেন। স্কুলের বিরতির সময় দলবদ্ধ দৌড়ের জন্য শিক্ষকদের একটি সুরের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাঁরা যেসব রেকর্ডিং চেষ্টা করেছিলেন, সেগুলো উপযুক্ত হয়নি। প্রায় ২০ দিন ধরে তিনি শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকদের সঙ্গে নতুন সুর তৈরি ও পরীক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত প্রতি মিনিটে ১৭৬ বিটের গতি বেছে নেন।
রেকর্ডিংয়ে সুরের সঙ্গে ছিল জিয়াং ও তাঁর সহকর্মীদের বাড়ির উঠানে ধারণ করা দৌড়ের নির্দেশনামূলক হাঁকডাক। সেই ছোট্ট সূচনা থেকে রেকর্ডিংটির অনুলিপি শিক্ষক ও স্কুলগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, একসময় তা দেশের বিভিন্ন স্কুলের মাঠে পৌঁছে যায়।
সাম্প্রতিক এই পুনরাবিষ্কার বহুল পরিচিত একটি সুরের সঙ্গে এর স্রষ্টাকে যুক্ত করেছে। অনলাইনে কেউ কেউ মজা করে একে "পেটব্যথার সুর" বলে ডাকেন। এই নামটি স্মৃতিকাতরতার পাশাপাশি স্কুলের দৌড়ের কিছুটা অস্বস্তিকর দিকও তুলে ধরে।
দৌড়বিদদের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য তৈরি সুর
তাংছিয়াও সিনিয়র হাইস্কুলে এমন একটি কার্যক্রমের জন্য সুরের প্রয়োজন ছিল, যেখানে অনেক শিক্ষার্থী একসঙ্গে চলাফেরা করত। উপযোগী রেকর্ডিংয়ের কাজ শুধু মনোরম সুর দেওয়া ছিল না: এর বিটে স্থির গতি বজায় রাখতে সহায়তা করার পাশাপাশি হাঁকডাকের মাধ্যমে দৌড়বিদদের সংগঠিত করাও দরকার ছিল।
নিজের ডেস্কে বসে গতি ঠিক করে নেওয়ার বদলে জিয়াং শারীরিক শিক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেন। প্রায় ২০ দিন ধরে তিনি সুরটি রচনা, পরীক্ষা ও সংশোধন করেন। শেষ পর্যন্ত প্রতি মিনিটে ১৭৬ বিটের গতি বেছে নেওয়ায় রেকর্ডিংটি পেয়েছিল দ্রুত ও নিয়মিত ছন্দ।
এক মিনিটে কতটি সংগীতের বিট হয়, তা দিয়ে সুরের গতি মাপা হয়। প্রতি মিনিটে ১৭৬ বিট হলে প্রতি সেকেন্ডে তিনটির সামান্য কম বিট শোনা যায়। এই নিয়মিত ছন্দ ব্যাখ্যা করে কেন রচনার সময় গতিকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল: শিক্ষার্থীদের এমন একটি ছন্দ দরকার ছিল, যা অনুসরণ করে তারা একসঙ্গে দৌড়াতে পারে।
সহযোগিতার ফলে সুরটির সঙ্গে যে কার্যক্রমে এটি বাজানো হতো, তার সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়। সুরটি রচনা করেন জিয়াং, আর দৌড়ের জন্য এটি কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করতে সাহায্য করেন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকেরা। নির্দিষ্ট একটি স্কুলের প্রয়োজন থেকে তৈরি রেকর্ডিংটি পরে স্কুলটির বাইরেও বহু মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কণ্ঠস্বর ধারণ করা হয়েছিল বাড়ির উঠানে
সুরের সঙ্গে শোনা যেত এমন দৌড়ের নির্দেশনামূলক হাঁকডাক রেকর্ড করতে জিয়াং সহকর্মী শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানান। তাঁরা তাঁর বাড়ির উঠানে সেই রেকর্ডিং করেন, বাদ্যযন্ত্রের ছন্দের সঙ্গে যোগ করেন মানুষের কণ্ঠে নির্দেশনা।
জোরে গোনা, শিস ও ঢোলের শব্দ রেকর্ডিংটির পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। স্কুলের মাইকে যারা এটি শুনত, তাদের কাছে এসব শব্দ ছিল একসঙ্গে চলার সংকেত, দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে শোনা কোনো সংগীত নয়।
রেকর্ডিং তৈরির এসব তথ্য বহু শ্রোতার কাছে স্কুলজীবনের নিত্যদিনের অংশ হয়ে ওঠা সুরটির নির্দিষ্ট উৎস তুলে ধরে। এর পেছনে ছিলেন একজন সংগীত শিক্ষক, কণ্ঠ দিতে রাজি হওয়া কয়েকজন সহকর্মী এবং দৌড়বিদদের উপযোগী করে সুরটি গড়ে তুলতে বারবার চেষ্টা।
স্কুলে স্কুলে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে অনুলিপি
শিক্ষকেরা অডিওটির অনুলিপি করতে শুরু করেন, ফলে এটি তাংছিয়াও সিনিয়র হাইস্কুলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্কুলটি প্রায় ১০০টি সিডি তৈরি করে বিতরণ করে, যাতে অন্য স্কুলগুলো চালানোর ও অনুলিপি করার মতো একটি রেকর্ডিং পায়।
এই প্রচারই সহজভাবে ব্যাখ্যা করে, সুরটি কীভাবে ব্যাপক পরিচিতি পেলেও এর স্রষ্টা অনেক শ্রোতার কাছে অপরিচিত থেকে গেলেন। শিক্ষার্থীরা শরীরচর্চার সময় চূড়ান্ত অডিওটি শুনত, আর শিক্ষকেরা প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ নিজেদের মধ্যে বিনিময় করতেন। স্কুলের দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্য দিয়েই সুরটি ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৭ ও ২০০৮ সালে ঝাংজিয়াগাংয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এর প্রচার আরও বাড়াতে সাহায্য করে। পরে চিনজুড়ে স্কুলগুলো রেকর্ডিংটি ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে একটি ক্যাম্পাসের জন্য তৈরি সুর অনেক জায়গার স্কুলজীবনের সাধারণ অংশ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় শিক্ষাগত প্রয়োজন থেকে দুই দশকেরও বেশি সময় পর অনলাইন অনুসন্ধান পর্যন্ত এর প্রধান ঘটনাগুলো হলো:
- ২০০৩: তাংছিয়াও সিনিয়র হাইস্কুলে জিয়াং শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকদের সঙ্গে প্রায় ২০ দিন ধরে কাজ করে দৌড়ের সুরটি রচনা করেন।
- সুরটি তৈরির পর: শিক্ষকেরা অডিওটির অনুলিপি করেন, আর স্কুলটি প্রায় ১০০টি সিডি তৈরি করে বিতরণ করে।
- ২০০৭ ও ২০০৮: ঝাংজিয়াগাংয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা রেকর্ডিংটি আরও বেশি স্কুলে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
- ২০ বছরেরও বেশি সময় পর: সুরটির স্রষ্টার খোঁজে শিক্ষার্থী ও অন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা জিয়াংয়ের পরিচয় শনাক্ত করেন।
অনলাইন অনুসন্ধানে সুরটির সঙ্গে স্রষ্টার যোগসূত্র
সম্প্রতি শিক্ষার্থী ও অন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা পরিচিত রেকর্ডিংটির স্রষ্টাকে খুঁজতে শুরু করেন। তাঁদের সম্মিলিত অনুসন্ধান আবার তাংছিয়াও সিনিয়র হাইস্কুল ও জিয়াংয়ের কাছে গিয়ে পৌঁছায়। দীর্ঘদিন ধরে নাম না জেনেই শোনা এক সুরের রচয়িতার প্রতি এতে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।
অনলাইন অনুসন্ধান কীভাবে জিয়াংয়ের কাছে গিয়ে পৌঁছাল, তার সুনির্দিষ্ট ধাপগুলো জানানো হয়নি। তবে এই শনাক্তকরণে শ্রোতাদের খোঁজা মূল তথ্যটি পাওয়া গেছে: নিজের স্কুলের প্রয়োজন মেটাতে উদ্যোগী এক শিক্ষক সুরটি তৈরি করেছিলেন।
জানা গেছে, রেকর্ডিংটি কপিরাইট নিবন্ধন ছাড়াই তৈরি হয়েছিল। স্কুলগুলোর মধ্যে এর ছড়িয়ে পড়ার যে পথ জানা যায়, তা ছিল অনুলিপি করা অডিও ও সিডির মাধ্যমে; কোনো নামযুক্ত বাণিজ্যিক প্রকাশনার মাধ্যমে নয়। কতটি স্কুল এটি ব্যবহার করেছে বা কত শিক্ষার্থী এটি শুনেছে, তার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
এই তথ্যের ঘাটতির কারণে এর শ্রোতাদের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। তবে অনলাইনে নতুন করে মানুষের আগ্রহ দেখায়, কত সহজেই তাঁরা সুরটি চিনতে পারেন। এর ব্যাপ্তির সবচেয়ে স্পষ্ট মাপকাঠি হলো এর স্থায়িত্ব: ২০০৩ সালে তৈরি রেকর্ডিংটি দুই দশকেরও বেশি সময় পরও এত পরিচিত ছিল যে শ্রোতারা এর রচয়িতাকে খুঁজেছেন।
স্মৃতিতে কেন শুধু সংগীত নয়, আরও অনেক কিছু
"পেটব্যথার সুর" নামটি শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিতে হাস্যরস যোগ করে। সাবেক কিছু শিক্ষার্থীর কাছে সুরটির শুরু শুনলেই স্কুলের মাঠের কথা মনে পড়ার পাশাপাশি দৌড়ের কষ্টও তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসে।
জিয়াং আশা করেন, শুধু শরীরচর্চার ক্লান্তি নয়, সুরটি বন্ধুদের ও স্কুলজীবনের প্রাণচাঞ্চল্যের কথাও মনে করিয়ে দেবে। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় এই পুনরাবিষ্কারের ব্যক্তিগত দিকটি উঠে আসে: ব্যবহারিক প্রয়োজনের সুর তৈরি করা শিক্ষক এখন জানেন, সেটি অন্যদের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
সুরটির ইতিহাস সেই স্মৃতিগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু কাজের সঙ্গে যুক্ত করে। শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকদের সঙ্গে এর গতি পরীক্ষা করা হয়েছিল, সহকর্মীদের নিয়ে হাঁকডাক রেকর্ড করা হয়েছিল এবং শিক্ষকদের মধ্যে অনুলিপি ভাগাভাগির মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়েছিল। বহু শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠা এই সুরটির শুরু হয়েছিল একটি স্থানীয় সমস্যা ও তার সমাধানে তৈরি একটি রেকর্ডিং দিয়ে।
মূল তথ্য
- ঝাংজিয়াগাংয়ের তাংছিয়াও সিনিয়র হাইস্কুলের সংগীত শিক্ষক জিয়াং ইয়ানজুন ২০০৩ সালে পরিচিত দৌড়ের সুরটি তৈরি করেন।
- শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকদের সঙ্গে প্রায় ২০ দিন ধরে সুরটি তৈরি ও পরীক্ষা করে তিনি প্রতি মিনিটে ১৭৬ বিটের গতি চূড়ান্ত করেন।
- তাঁর বাড়ির উঠানে সহকর্মীরা দৌড়ের নির্দেশনামূলক হাঁকডাক রেকর্ড করেন।
- শিক্ষকেরা অনুলিপি ভাগাভাগি করেন, আর স্কুলটি প্রায় ১০০টি সিডি বিতরণ করে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে ঝাংজিয়াগাংয়ে অনুষ্ঠিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এর প্রচার বাড়াতে সাহায্য করে।
- ২০ বছরেরও বেশি সময় পর অনলাইন অনুসন্ধানে জিয়াংয়ের পরিচয় শনাক্ত হয়। তিনি আশা করেন, শ্রোতারা দৌড়ের কষ্টের পাশাপাশি বন্ধুদের ও স্কুলজীবনের কথাও মনে রাখবেন।






