রাসায়নিকভাবে পুনঃপ্রোগ্রাম করা কোষ থেকে গড়ে ওঠে সংগঠিত ভ্রূণের মডেল
স্টেম সেল গবেষক ডিং শেংয়ের নেতৃত্বে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল রাসায়নিকভাবে প্ররোচিত স্টেম সেল থেকে ইঁদুরের ভ্রূণের মডেল তৈরি করেছে। এতে রক্তকোষ, বিকাশমান রক্তনালি, প্রজননকোষের প্রাথমিক বংশধারা এবং ছন্দময় সংকোচনে সক্ষম হৃদ্যন্ত্রের টিস্যু তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় জরায়ুর বাইরে নিষেকের পর জরায়ুতে স্থাপনের আগের পর্যায় থেকে অঙ্গ গঠনের সূচনা পর্যন্ত বিকাশ অনুসরণ করা হয়েছে।
সূচিপত্র
- রাসায়নিকভাবে পুনঃপ্রোগ্রাম করা কোষ থেকে গড়ে ওঠে সংগঠিত ভ্রূণের মডেল
- রাসায়নিক পুনঃপ্রোগ্রামিংয়ে যা বদলে যায়
- কোষের গুচ্ছ থেকে প্রাথমিক অঙ্গে মডেলের বিকাশ
- ভিত্তি ছিল তিন রাসায়নিকের মিশ্রণ
- তিনটি প্রকাশনায় গবেষণাক্ষেত্রের অগ্রগতি
- ভিন্ন পদ্ধতিতেও বিকাশের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছানো গেছে
- গর্ভধারণ গবেষণায় সহায়ক টিস্যুর গুরুত্ব
- প্রজননকোষ ও রক্তনালি থেকে আরও ব্যবহারের ইঙ্গিত
- আরও বিকাশ ঘটানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ
- মূল বিষয়গুলো
মডেলগুলো ভ্রূণীয় বিকাশের ৮.৫তম দিনে, যা E8.5 নামে পরিচিত, প্রাকৃতিক ইঁদুরের ভ্রূণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় কালচার করার পর এদের কার্যকর হৃদ্যন্ত্রের টিস্যু E10.5 পর্যায়ের প্রাকৃতিক ভ্রূণের টিস্যুর সঙ্গে অনেকটাই তুলনীয় হয়ে ওঠে। নেচার-এ প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম Modelling mouse embryogenesis from chemically induced totipotent stem cells।
সিংহুয়ার স্কুল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসের প্রতিষ্ঠাতা ডিন ডিং এবং তাঁর সহকর্মীরা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর বদলে একটি রাসায়নিকভাবে প্ররোচিত কোষের ধরন দিয়ে কাজ শুরু করেন। উপযুক্ত কালচার পরিবেশে কোষগুলো নিজে থেকেই এমন কাঠামো তৈরি করে, যাতে বিকাশমান দেহের টিস্যু এবং সাধারণত দেহের বাইরে গঠিত সহায়ক টিস্যু—দুটিই থাকে।
এই গবেষণার মূল অর্জন হলো বিকাশের ধারাবাহিকতা: একই প্রাথমিক কোষগোষ্ঠী থেকে প্রাথমিক বিকাশের একের পর এক পর্যায় তৈরি হয়েছে, শুধু আলাদা আলাদা টিস্যুর খণ্ড নয়। তবে পূর্ণাঙ্গ কোনো ইঁদুর তৈরি হয়নি। প্রাথমিক বিকাশ কীভাবে ঘটে এবং কোন পর্যায়ে তা ব্যাহত হতে পারে, তা অনুসন্ধানের জন্য এই কাজ একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
রাসায়নিক পুনঃপ্রোগ্রামিংয়ে যা বদলে যায়
প্রাথমিক কোষগুলোকে রাসায়নিকভাবে প্ররোচিত টোটিপোটেন্ট স্টেম সেল বা ciTotiSC বলা হয়। টোটিপোটেন্সি বলতে দেহের সব ধরনের কোষ এবং বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক টিস্যু—প্লাসেন্টায় অবদান রাখা টিস্যুসহ—তৈরির ক্ষমতাকে বোঝায়। ইঁদুরের নিষিক্ত ডিম্বাণু এবং একেবারে প্রাথমিক ভ্রূণের কোষগুলোর এই ব্যতিক্রমী বিকাশক্ষমতা থাকে।
প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলের বিকাশক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত: এগুলো দেহের বহু ধরনের কোষ তৈরি করতে পারে, কিন্তু টোটিপোটেন্সিতে ভ্রূণের বাইরের সহায়ক কোষধারাও অন্তর্ভুক্ত। ডিংয়ের দল রাসায়নিক ব্যবহার করে ইঁদুরের প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলকে আরও প্রাথমিক অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাথমিক কোষগুলোকে টোটিপোটেন্ট-সদৃশ বলা হয়েছে।
তাই পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়াটির কয়েকটি ধাপ রয়েছে। গবেষকেরা উপযুক্ত স্টেম সেলগোষ্ঠী তৈরি করেন, রাসায়নিকভাবে সেগুলোর অবস্থা পরিবর্তন করেন এবং এরপর সংগঠিত বিকাশ শুরুর উপযোগী পরিবেশ দেন। আগের ভিত্তিমূলক গবেষণায় সরাসরি প্রাথমিক উপাদান হিসেবে ইঁদুরের প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল ব্যবহার করা হয়েছিল।
একটি কোষের ধরন থেকে কাজ শুরু করার বিষয়টিও এই ফলাফলের কেন্দ্রে রয়েছে। অনেক ভ্রূণের মডেল তৈরিতে কয়েকটি বিশেষায়িত কোষগোষ্ঠী একত্র করতে হয়। এখানে একটি প্ররোচিত কোষের ধরনই মডেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কোষধারা জুগিয়েছে; বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কোষগুলো ধীরে ধীরে আলাদা ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
কোষের গুচ্ছ থেকে প্রাথমিক অঙ্গে মডেলের বিকাশ
সিংহুয়ার মডেলগুলো মোরুলা—কোষের একটি ঘন প্রাথমিক গুচ্ছ—এবং ব্লাস্টোসিস্টের মতো পর্যায় অতিক্রম করেছে। ব্লাস্টোসিস্ট হলো গহ্বর ও পৃথক কোষগোষ্ঠীসমৃদ্ধ একটি কাঠামো। গবেষকেরা দেখেছেন, মডেলগুলোর ব্লাস্টোসিস্টের আকৃতি এবং কোষগুলোর বিভিন্ন বিকাশধারায় বিভাজন—দুটিই প্রাকৃতিক ব্লাস্টোসিস্টের সঙ্গে মেলে।
প্রাকৃতিক ব্লাস্টোসিস্ট সাধারণত পরবর্তী বিকাশের আগে জরায়ুতে স্থাপিত হয়। পরীক্ষাগারের এই ব্যবস্থায় জরায়ুর বাইরে বিকাশ চলতে পেরেছে, ফলে গবেষকেরা এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পেরেছেন, যা স্বাভাবিকভাবে মায়ের দেহের ভেতরে ঘটে।
গ্যাস্ট্রুলেশন ছিল অন্যতম বড় মাইলফলক। এই পর্যায়ে কোষগুলো পুনর্বিন্যস্ত হয়ে তিনটি প্রাথমিক স্তর তৈরি করে, যেগুলো থেকে স্নায়ুতন্ত্র, পেশি ও অন্ত্রের মতো টিস্যু গড়ে ওঠে। মডেলগুলোতে ভ্রূণের অক্ষও গঠিত হয়েছে—শরীরের স্থানিক বিন্যাস, যা বিভিন্ন দেহাঞ্চল কোথায় তৈরি হবে তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
এরপর রক্তকোষ তৈরি ও প্রাথমিক অঙ্গের বিকাশ ঘটে। গবেষণার ধারাবাহিকতা বর্ণনা করতে নেচার-এ প্রকাশিত প্রবন্ধে লেখকেরা লিখেছেন:
ফলে ciTotiSC থেকে তৈরি EM (ciToti-EM) গ্যাস্ট্রুলেশন, ভ্রূণের অক্ষ গঠন, রক্তকোষ উৎপাদন এবং অঙ্গ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়সহ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক সফলভাবে অতিক্রম করেছে। এগুলো ৮.৫তম দিনের (E8.5) প্রাকৃতিক ভ্রূণের (NE) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়।
E8.5 ও E10.5 হলো প্রাকৃতিক ইঁদুরের ভ্রূণ বিকাশের পর্যায়, যেগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ভ্রূণের সামগ্রিক মডেলটি E8.5 পর্যায়ের ভ্রূণের সঙ্গে মিলে যায়; আর দীর্ঘ সময় কালচারের পর হৃদ্যন্ত্রের টিস্যুকে E10.5 পর্যায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই দুই মানদণ্ড পরীক্ষার ভিন্ন দিক বোঝায়।
ভিত্তি ছিল তিন রাসায়নিকের মিশ্রণ
ডিংয়ের দল এই গবেষণার ভিত্তি তৈরি করেছিল এমন এক কাজের মাধ্যমে, যা ২০২২ সালের ২১ জুন অনলাইনে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং পরে ২০২৩ সালের মে মাসে নেচার-এর ৬১৭তম খণ্ডের ৭৯২–৭৯৭ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। রাসায়নিকভাবে কোষ প্ররোচিত করার আগের ওই গবেষণায় ইঁদুরের প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল থেকে ciTotiSC তৈরি ও ধরে রাখার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।
মিশ্রণে ছিল TTNPB, 1-azakenpaullone এবং WS6; এদের সম্মিলিতভাবে TAW বলা হয়। TTNPB হলো রেটিনোয়িক অ্যাসিডের একটি অ্যানালগ, আর WS6 কিনেজ নামের কিছু এনজাইমকে বাধা দেয়। এ ধরনের ক্ষুদ্র অণু কোষের ভেতরের সংকেত বদলে কোন বিকাশ-প্রক্রিয়া সক্রিয় হবে, তা পরিবর্তন করতে পারে।
প্ররোচিত কোষগুলো ইঁদুরের দুই-কোষ পর্যায়ের ভ্রূণের কোষের সঙ্গে তিন ধরনের পরিমাপে সাদৃশ্য দেখিয়েছিল: জিনের কার্যকলাপ, DNA-র সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিপাকের সঙ্গে যুক্ত অণু। এই পরিমাপগুলো মিলিয়ে কোষের পরিবর্তিত অবস্থা যাচাই করার জন্য গবেষকেরা কয়েকটি উপায় পেয়েছিলেন।
দলটি আট-কোষ পর্যায়ের ভ্রূণে কোষগুলো প্রবেশ করিয়েও পরীক্ষা চালায়। প্রবেশ করানো কোষগুলো ভ্রূণীয় ও ভ্রূণবহির্ভূত—দুই ধরনের কোষধারায় দক্ষতার সঙ্গে অবদান রাখে। ওই পরীক্ষায় বিদ্যমান একটি ভ্রূণের পাশাপাশি কোষগুলোর বিকাশগত অবদান যাচাই করা হয়েছিল; সাম্প্রতিক গবেষণায় বরং শুধু প্ররোচিত কোষের ধরন থেকে তৈরি মডেল অনুসরণ করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় কোষগুলোকে ধরে রাখাও আগের কাজের একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। স্থিতিশীলভাবে কোষের জোগান থাকলে বিজ্ঞানীরা একই প্রাথমিক অবস্থা নিয়ে বারবার গবেষণা করতে পারেন; প্রাকৃতিকভাবে কোষটি যে অল্প সময়ের জন্য থাকে, তার ওপর নির্ভর করতে হয় না।
তিনটি প্রকাশনায় গবেষণাক্ষেত্রের অগ্রগতি
সাম্প্রতিক ফলাফলের পেছনে রয়েছে সিংহুয়া দলের আগের কোষ-প্ররোচিত করার কাজ এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের তৈরি ভিন্ন একটি রাসায়নিক পদ্ধতি। প্রকাশনার তারিখগুলো একই রকম শব্দে বর্ণিত হলেও ভিন্ন প্রাথমিক কোষ ব্যবহার করা অগ্রগতিগুলো আলাদা করে বুঝতে সাহায্য করে।
- ২১ জুন, ২০২২: ডিংয়ের দল ciTotiSC প্ররোচিত ও ধরে রাখার রাসায়নিক পদ্ধতি অনলাইনে প্রকাশ করে। প্রবন্ধটি পরে ২০২৩ সালের মে মাসে নেচার-এ ছাপা হয়।
- ৭ আগস্ট, ২০২৫: গুয়াংঝৌ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, গুয়াংঝৌ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, ফুদান ইউনিভার্সিটি, ওয়েস্টলেক ইউনিভার্সিটি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা সেল-এ ভ্রূণ-প্রবর্তক কোষভিত্তিক একটি পদ্ধতি অনলাইনে প্রকাশ করেন।
- ১৪ অক্টোবর, ২০২৬: সিংহুয়া দলের নেচার-এর প্রবন্ধে ciTotiSC থেকে ধারাবাহিকভাবে ভ্রূণের মডেল তৈরি, প্রাথমিক অঙ্গ গঠন এবং কার্যকর হৃদ্যন্ত্রের টিস্যুর কথা বলা হয়।
সব গবেষণার অভিন্ন লক্ষ্য হলো রাসায়নিকভাবে কোষের পরিচয় নিয়ন্ত্রণ করা। তবে কোন বিকাশগত অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, কী রাসায়নিক পরিবেশ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পরবর্তী বিকাশ সম্পর্কে কী প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে—এসব দিক থেকে পরীক্ষাগুলো আলাদা।
ভিন্ন পদ্ধতিতেও বিকাশের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছানো গেছে
২০২৫ সালের সেল-এর গবেষণায়, যার শিরোনাম A complete model of mouse embryogenesis through organogenesis enabled by chemically induced embryo founder cells, আট থেকে ১৬-কোষ পর্যায়ের ইঁদুরের ভ্রূণের কোষের মতো কোষ তৈরি করা হয়। গবেষকেরা এগুলোকে প্ররোচিত ভ্রূণ-প্রবর্তক কোষ বা iEFC বলেন।
তাদের K4 প্ররোচন-পদ্ধতিতে ছিল CHIR99021, ALK5 inhibitor E6165452 এবং RARα agonist AM580। সিংহুয়া দলের ciTotiSC গবেষণায় ব্যবহৃত TAW মিশ্রণের চেয়ে এটি ভিন্ন এবং ভিন্ন একটি প্রাথমিক বিকাশগত কোষপরিচয়কে লক্ষ্য করে।
iEFC কোষ ৯৫ শতাংশ দক্ষতায় ব্লাস্টোসিস্টের মডেল তৈরি করে, যেগুলোকে ব্লাস্টোয়েড বলা হয়। প্রাকৃতিক ভ্রূণের সঙ্গে এগুলো মিলিয়ে করা পরীক্ষায়, ভ্রূণীয় ও ভ্রূণবহির্ভূত—দুই ধরনের টিস্যুতে অবদান রাখা কাইমেরিক ভ্রূণ তৈরির দক্ষতা ৪৭ থেকে ৭৩ শতাংশ বলে জানানো হয়। কাইমেরায় বিভিন্ন প্রাথমিক কোষগোষ্ঠীর কোষ থাকে।
৯৫ শতাংশের হিসাবটি ব্লাস্টোয়েড তৈরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর ৪৭ থেকে ৭৩ শতাংশের সীমাটি কাইমেরা-সংক্রান্ত পরীক্ষার। প্রতিটি হার ভিন্ন পরীক্ষামূলক ফলাফল মাপে এবং দুটিই iEFC গবেষণার অংশ।
এই মডেলগুলো E8.5–E8.75 পর্যায়ের প্রাকৃতিক ভ্রূণের সঙ্গে তুলনীয় আকৃতি পেয়েছিল। এগুলোতে ছয় থেকে ১৪ জোড়া সোমাইট তৈরি হয়েছিল। সোমাইট হলো পুনরাবৃত্ত টিস্যু-খণ্ড, যা মেরুদণ্ড ও কঙ্কালের পেশির মতো কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখে। গবেষকেরা লুপ তৈরি করা হৃদ্নালির পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল, চোখের কুঁড়ি, অন্ত্র, লেজের কুঁড়ি এবং স্থানান্তররত আদিম জননকোষের কথাও বর্ণনা করেন।
সিংহুয়ার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে, সেল-এর গবেষণাটি দেখায় যে রাসায়নিকভাবে প্ররোচিত প্রাথমিক কোষাবস্থা সংগঠিত ভ্রূণের মডেল তৈরির একাধিক পথ তৈরি করতে পারে। এই পদ্ধতিগুলোর তুলনা করলে প্রাথমিক কোষের পরিচয় পরবর্তী বিকাশকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীদের সহায়তা হতে পারে।
গর্ভধারণ গবেষণায় সহায়ক টিস্যুর গুরুত্ব
সিংহুয়ার মডেলে বিকাশমান দেহের টিস্যুর পাশাপাশি ভ্রূণবহির্ভূত টিস্যুও তৈরি হয়। ভ্রূণের বিকাশের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে এই সহায়ক কোষধারাগুলো ভূমিকা রাখে, তাই দলের গবেষণা-পরিকল্পনায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
ডিংয়ের মতে, এই ব্যবস্থা দিয়ে ভ্রূণবহির্ভূত টিস্যুর অস্বাভাবিকতা কীভাবে বিকাশকে প্রভাবিত করে তা অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের উপায় খোঁজা সম্ভব। বিকাশমান দেহ ও সহায়ক টিস্যুর মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান কীভাবে ব্যাহত হয়, এমন মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা তা পরীক্ষা করতে পারেন।
দলটি সম্ভাব্য গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে জরায়ুতে স্থাপন এবং প্লাসেন্টার বিভিন্ন জটিলতার কথা উল্লেখ করেছে। দুই দিকের পারস্পরিক ক্রিয়া রয়েছে—এমন একটি মডেল একক কোষগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণার তুলনায় ভিন্ন পরীক্ষামূলক সুযোগ দেয়।
এর ব্যবহারিক মূল্য হলো সময়ের সঙ্গে একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারা। কোষের পরিচয় বা টিস্যুর বিন্যাসে প্রাথমিক পরিবর্তনের পর কীভাবে বিকাশগত সমস্যা দেখা দেয়, গবেষকেরা তা অনুসন্ধান করতে পারেন। এতে প্রাথমিক ব্যাঘাতের সঙ্গে তার পরিণতির যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব হয়।
প্রজননকোষ ও রক্তনালি থেকে আরও ব্যবহারের ইঙ্গিত
সিংহুয়ার মডেলে আদিম জননকোষ দেখা গেছে। এগুলো হলো সেই কোষধারার প্রাথমিক পূর্বসূরি, যা শেষ পর্যন্ত শুক্রাণু বা ডিম্বাণু তৈরি করে। একটি বিশেষায়িত কালচার ব্যবস্থায় স্থানান্তরের পর পূর্বসূরি কোষগুলো আরও বিকশিত হয় এবং মিয়োসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবেশের সক্ষমতা দেখায়। মিয়োসিস হলো সেই কোষবিভাজন, যা প্রজননকোষকে স্বাভাবিকের অর্ধেক ক্রোমোজোম বহনের উপযোগী করে।
কোষগুলো এখনো অপরিণত, এবং তাদের প্রজননক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়নি। ডিং প্রস্তাব করেছেন, কার্যকর শুক্রাণু বা ডিম্বাণু নেই এমন ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে এমন একটি পদ্ধতি থেকে উপকৃত হতে পারেন কি না, তা অনুসন্ধান করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে প্রজননে জড়িত নয় এমন কোষ থেকে শুরু করে সীমিত সময়ের বিকাশের মাধ্যমে প্রজননকোষের পূর্বসূরি তৈরি করা হবে, এরপর আরও পরীক্ষাগারভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
এ মুহূর্তে এটি গবেষণার একটি প্রস্তাবিত দিক। চলমান কাজের মূল বিষয় ইঁদুরের বিকাশ, কোষের পরিচয় এবং কোন পরিবেশে প্রজননকোষের বংশধারা তৈরি হতে পারে, তা বোঝা।
বিকাশমান রক্তনালি ও রক্তকোষ থেকে আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবহারের ইঙ্গিত মেলে: অর্গানয়েডের উন্নতি। অর্গানয়েড হলো পরীক্ষাগারে তৈরি ছোট কাঠামো, যা অঙ্গের কিছু বৈশিষ্ট্য পুনর্নির্মাণ করে। ডিংয়ের মতে, ভেতরের রক্তনালির অভাব অর্গানয়েড কতটা বড় ও জটিল হতে পারবে, তার সীমা তৈরি করে।
যে ব্যবস্থায় রক্তনালি ও অঙ্গের টিস্যু একসঙ্গে বিকশিত হয়, তা বড় কাঠামোকে সহায়তা করার উপায় অনুসন্ধানে গবেষকদের কাজে লাগতে পারে। একই মডেলে একাধিক বিকাশমান টিস্যুব্যবস্থা থাকায় সেগুলো কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে, তা গবেষণার ভিত্তি তৈরি হয়।
আরও বিকাশ ঘটানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ
বিকাশ এগোতে থাকলে মডেলগুলোর পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার দক্ষতা কমে যায়, আর কিছু কাঠামো প্রাকৃতিক ভ্রূণের থেকে এখনো আলাদা। এই সীমাবদ্ধতার কতটা কালচারের পরিবেশ, মডেল নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নাকি দুটির সম্মিলিত প্রভাব থেকে আসে, তা গবেষকদের এখনো নির্ধারণ করতে হবে।
ডিংয়ের কথায়, দলের তাৎক্ষণিক মনোযোগ মৌলিক গবেষণায়। চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক লক্ষ্য হলো জরায়ুতে স্থানান্তরের পর বিকাশ এবং সুস্থ ইঁদুরের জন্ম। এই লক্ষ্য অর্জনে বিকাশের দক্ষতায় বর্তমান ঘাটতি কাটিয়ে উঠে আরও সম্পূর্ণ ও সমন্বিত বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মানুষের ক্ষেত্রে, প্রয়োগ করতে গেলে আরও বৈজ্ঞানিক জটিলতা দেখা দেবে এবং কঠোর নৈতিক পর্যালোচনা ও জনপরিসরে আলোচনার প্রয়োজন হবে। তাই সম্ভাব্য প্রজনন-সংক্রান্ত ব্যবহারের পাশাপাশি এ ধরনের গবেষণা কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, সে প্রশ্নও রয়েছে।
এই অর্জন ইতিমধ্যেই ইঁদুরের প্রাথমিক বিকাশকে আরও ধারাবাহিকভাবে দেখার সুযোগ দিচ্ছে: একটি প্ররোচিত কোষের ধরন থেকে সহায়ক টিস্যু, ভ্রূণীয় কাঠামো এবং বিকাশমান কয়েকটি কার্যকর বৈশিষ্ট্য একই ধারাবাহিক বিকাশপ্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। পরবর্তী পরীক্ষার লক্ষ্য হলো, এই প্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে কেন তা কম নির্ভরযোগ্য হয়ে পড়ে, তা বোঝা।
মূল বিষয়গুলো
- সিংহুয়ার গবেষকেরা নিষেক ছাড়াই শুধু রাসায়নিকভাবে প্ররোচিত টোটিপোটেন্ট-সদৃশ স্টেম সেল থেকে ইঁদুরের ভ্রূণের মডেল তৈরি করেছেন।
- ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত নেচার-এর প্রবন্ধে E8.5 পর্যায়ের ভ্রূণের মতো মডেল এবং পরে E10.5 পর্যায়ের ভ্রূণের সঙ্গে তুলনীয় হৃদ্যন্ত্রের টিস্যুর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
- মডেলগুলোতে ভ্রূণীয় ও ভ্রূণবহির্ভূত টিস্যু, রক্তকোষ, বিকাশমান রক্তনালি এবং আদিম জননকোষ তৈরি হয়েছে।
- এই গবেষণা ২০২২ সালের জুনে প্রথম অনলাইনে প্রকাশিত দলের রাসায়নিকভাবে কোষ প্ররোচিত করার পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে হয়েছে।
- ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত সেল-এর একটি ভিন্ন গবেষণায় প্ররোচিত ভ্রূণ-প্রবর্তক কোষ এবং আলাদা রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রাথমিক অঙ্গ গঠন পর্যন্ত পৌঁছানো হয়।
- পূর্ণাঙ্গ কোনো ইঁদুর তৈরি হয়নি। সিংহুয়ার মডেলগুলোর বিকাশ এগোলে দক্ষতা কমে যায়, আর প্রজনন-সংক্রান্ত ব্যবহার এখনো গবেষণার প্রস্তাব মাত্র।






