সিউলের শেয়ারবাজারে ধস, স্থগিত হলো উভয় বাজারের লেনদেন
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রকল্পে অর্থায়নের খরচ বাড়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সেমিকন্ডাক্টর শেয়ার বিক্রি করায় বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান দুই শেয়ারবাজারে ৮ শতাংশের বেশি পতন হয়। এতে লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সূচিপত্র
- সিউলের শেয়ারবাজারে ধস, স্থগিত হলো উভয় বাজারের লেনদেন
- যেভাবে লেনদেনের দিনটি খারাপের দিকে গেল
- লেনদেনের সুরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে
- যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি কোরীয় শেয়ারে ধাক্কা দিল কেন
- এআইয়ের চাহিদার মুখে সম্প্রসারণের খরচ
- দুই দিক থেকে চাপে কোরীয় চিপ নির্মাতারা
- প্রযুক্তি খাতের দরপতন ছড়িয়ে পড়ে এশিয়াজুড়ে
- ডলারের শক্তিতে বাড়তি চাপ
- সুদের হার, বন্ড ও বাজারের পরবর্তী পরীক্ষা
- মূল বিষয়গুলো
স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫২ মিনিটে বেঞ্চমার্ক কসপি সূচক ৪৮১.৬৯ পয়েন্ট বা ৮.০২ শতাংশ কমে ৫,৫২৭.১২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। প্রযুক্তি কোম্পানির আধিক্য থাকা কসডাক সূচকও ৬৬.০৭ পয়েন্ট বা ৮.০২ শতাংশ কমে ৭৫৭.৮১ পয়েন্টে নেমে আসে। কোরিয়া এক্সচেঞ্জ দুপুর ১২টা ২৩ মিনিটে কসডাকে সার্কিট ব্রেকার চালু করে এবং দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিটে কসপির সব লেনদেন ২০ মিনিটের জন্য স্থগিত করে।
বিক্রির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ার ৯.৭ শতাংশ এবং এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ১১.৩৫ শতাংশ কমে যায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বিক্রি করেন, ফলে বাজারে চাপ আরও বাড়ে। এর আগে থেকেই বাজার টানা সপ্তম দিনের মতো লোকসানের পথে ছিল। দিনের সমাপনী দর এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট বিক্রির পরিমাণ তখনো জানা যায়নি।
তাৎক্ষণিক ধাক্কাটি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যেখানে সেপ্টেম্বরে ভোক্তা মূল্য প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, ফেডারেল রিজার্ভ ঋণের খরচ উঁচু রাখবে অথবা আবার সুদের হার বাড়াবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আরেকটি উদ্বেগ হলো, এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ খরচের তুলনায় যথেষ্ট আয় এনে দেবে কি না।
সিউলের বাইরেও পতনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৪.৮ শতাংশ কমে, আর জাপান বাদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারের এমএসসিআই সূচক ৩.৩ শতাংশ নেমে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার পতন আঞ্চলিক সূচকের শতকরা পতনের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল, যা দেখায় সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিক্রির চাপ কতটা তীব্র ছিল।
যেভাবে লেনদেনের দিনটি খারাপের দিকে গেল
কসপি সূচক ৫.৫৯ শতাংশ কমে ৫,৬৭৩.০১ পয়েন্টে লেনদেন শুরু করে এবং এরপরও পতন অব্যাহত থাকে। স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শেয়ার লেনদেনের শুরুতেই ৬.৬৮ শতাংশ কমে যায়, আর এসকে হাইনিক্সের শেয়ার কমে ৮.১০ শতাংশ। দুই চিপ নির্মাতারই টানা সপ্তম দিনের মতো দরপতন হতে যাচ্ছিল।
বিস্তৃত পরিসরে লেনদেন বন্ধের আগে এক্সচেঞ্জ প্রথমে কিছু স্বয়ংক্রিয় অর্ডারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। চাপ কত দ্রুত বেড়েছে, তা এই ধারাবাহিকতায় দেখা যায়:
- সকাল ৯টা ৭ মিনিট: কসপি বাজারে বিক্রির সাইডকার চালু হয়; এতে পাঁচ মিনিটের জন্য প্রোগ্রামভিত্তিক বিক্রির অর্ডার স্থগিত থাকে।
- সকাল ৯টা ১২ মিনিট: কসডাক বাজারেও বিক্রির সাইডকার চালু হয়।
- সকাল ১০টা ৮ মিনিট: কসপি সূচক ৫,৫৮০.৪৪ পয়েন্টে ছিল, যা ৭.১৩ শতাংশ কম।
- সকাল ১১টা ১৬ মিনিট: কসপি ৭.২০ শতাংশ কমে ৫,৫৭৬.৪৬ পয়েন্টে ছিল, আর কসডাক ৭.১১ শতাংশ কমে ৭৬৫.২৭ পয়েন্টে নেমেছিল।
- দুপুর ১২টা ২৩ মিনিট: কসডাকে সার্কিট ব্রেকার চালু হয়।
- দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিট: এক্সচেঞ্জ কসপির সব লেনদেন ২০ মিনিটের জন্য স্থগিত করে।
প্রায় ১১ সপ্তাহ আগে, ২৯ জুলাইয়ের পর এই প্রথম একই দিনে উভয় বাজারে সার্কিট ব্রেকার চালু হলো। ওই তারিখের পর বৃহস্পতিবারই প্রথমবারের মতো দুই বাজারে একই সঙ্গে বিক্রির সাইডকার চালু হয়।
লেনদেনের সুরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে
সাইডকার ও সার্কিট ব্রেকার বাজারের ভিন্ন ভিন্ন অংশে লেনদেন থামায়। কসপি ২০০ ফিউচার—একটি প্রধান শেয়ার সূচকের সম্ভাব্য অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত চুক্তি—৫ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ার পর কসপি সাইডকার চালু হয়। এটি সাময়িকভাবে প্রোগ্রামভিত্তিক বিক্রি সীমিত করে। এ ধরনের বিক্রিতে কম্পিউটার ব্যবস্থা আগে থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অর্ডার দেয়।
সার্কিট ব্রেকার আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করে, আক্রান্ত শেয়ারবাজারের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। অস্বাভাবিক দ্রুত দর ওঠানামার সময় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের তথ্য পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। বৃহস্পতিবার কসপির লেনদেন ২০ মিনিট স্থগিত ছিল।
সম্পূর্ণ লেনদেন বন্ধ হওয়ার আগেই বিক্রির চাপ ছিল ব্যাপক। সকালের লেনদেনে কসপি বাজারের ৯১২টি শেয়ারের মধ্যে ৮৪৪টির দর কমেছিল, অর্থাৎ ৯২.৫ শতাংশ; দর বেড়েছিল মাত্র ৬১টির। বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বিনিয়োগকারীরা পুরো এক্সচেঞ্জজুড়েই শেয়ার বিক্রি করছিলেন।
৬ অক্টোবর থেকে কসপি সূচকের পতন চলছিল। ১৩ অক্টোবর প্রথমবার ৬,০০০ পয়েন্টের নিচে নামার পর বৃহস্পতিবার দিনের লেনদেনে টানা তৃতীয় সেশনের মতো সূচকটি ৬,০০০-এর নিচে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি কোরীয় শেয়ারে ধাক্কা দিল কেন
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যসূচকে দেখা যায়, বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। তেলের ও পেট্রলের দাম বৃদ্ধি এতে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানির বাইরেও পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ ছড়িয়েছে।
ঋণ ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ব্যবহার করে। সুদের হার বাড়লে ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয় এবং দাম বাড়ার গতি কমতে পারে। তবে সম্প্রসারণের জন্য ঋণ নিতে হয় এমন কোম্পানির খরচও বেড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ এআই সরঞ্জাম কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এশিয়ার বাজার খোলার আগেই ওয়াল স্ট্রিটে এসব উদ্বেগের প্রভাব পড়েছিল। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১.১ শতাংশ এবং নাসডাক কম্পোজিট ১.৯ শতাংশ কমে, ফলে টানা তৃতীয় সেশনে তাদের পতন হয়। ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক টানা ষষ্ঠ সেশনে কমে, যা ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে দীর্ঘ পতনের ধারাবাহিকতা।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতারা বৈশ্বিক বিনিয়োগ-শৃঙ্খলের অংশ। অর্থায়নের খরচ বাড়লে যেসব প্রকল্প তাদের পণ্য কেনে, সেগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা দুর্বল হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানির শেয়ার নতুন করে মূল্যায়ন করেন।
এআইয়ের চাহিদার মুখে সম্প্রসারণের খরচ
এআইয়ে ব্যবহৃত কম্পিউটিং অবকাঠামো সরবরাহকারী কোরউইভ অর্থায়ন-সংক্রান্ত উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল। বুধবার কোম্পানিটির শেয়ার সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ কমে। ২০৩২ সালে মেয়াদপূর্তির বন্ডগুলো প্রতি ডলার অভিহিত মূল্যের বিপরীতে ৭৮ সেন্টের নিচে লেনদেন হয়; চার মাস আগে ইস্যুর সময় এর দাম ছিল আরও বেশি।
বন্ড হলো বিনিয়োগকারীদের দেওয়া কোম্পানির ঋণ। দাম ৭৮ সেন্টের নিচে নামার অর্থ, বিনিয়োগকারীরা ওই দাবির অভিহিত মূল্যের ৭৮ শতাংশেরও কম দামে বিক্রি করতে রাজি ছিলেন। মূল দরের তুলনায় এই পতন ২২ শতাংশের বেশি। বন্ডের দাম কমলে ঋণগ্রহীতার জন্য নতুন অর্থ সংগ্রহ ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
সিঙ্গাপুরে স্যাক্সো ব্যাংকের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা বলেন, অর্থায়ন ব্যয়বহুল হলে প্রবৃদ্ধিকে বিনিয়োগকারীরা যেভাবে মূল্যায়ন করেন, বাজারের উদ্বেগ তার পরিবর্তন ঘিরে।
“এশিয়ার এই বিক্রির চাপ প্রযুক্তি খাতের মৌলিক অবস্থার আকস্মিক অবনতির চেয়ে মূলধনের খরচ নতুন করে মূল্যায়নেরই ইঙ্গিত বেশি দেয়,” বলেন চানানা।
শুধু শক্তিশালী চাহিদাই কেন শেয়ারহোল্ডারদের সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করেন চানানা।
সুদের হার যখন বেশি, অস্থির এবং আবার বাড়তে পারে, তখন এই প্রবৃদ্ধির জন্য কত দাম দেওয়া উচিত, তা নিয়ে তাঁরা ক্রমেই বেশি প্রশ্ন তুলছেন।
বাজারের আলোচনায় উদ্ধৃত গার্টনারের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এরপর ২০২৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আরও প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। পরবর্তী সময়ের এই অঙ্ক বছরে গড়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এ বছরের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে কত বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, তা এই হিসাব তুলে ধরে।
বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপিত তৃতীয় প্রান্তিকের শক্তিশালী ফলাফল সত্ত্বেও অ্যানথ্রোপিকের রাজস্ব বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় অস্বস্তি বেড়েছে। মিরে অ্যাসেট সিকিউরিটিজের সিও সাং-ইয়ং বলেন, অবকাঠামোয় ব্যয় প্রকৃত আয়ে রূপ নিচ্ছে কি না এবং কোম্পানিগুলো এর অর্থায়ন চালিয়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ বাড়ছে। জেপিমরগ্যানের বিশ্লেষকেরাও অর্থায়নের ঝুঁকি এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময়কে এআই শেয়ারের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
দুই দিক থেকে চাপে কোরীয় চিপ নির্মাতারা
স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্স এআই খাতে ব্যয়ের অনিশ্চয়তা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে ছিল। সিএক্সএমটি নামে পরিচিত চ্যাংশিন মেমোরি টেকনোলজিস উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং বেশি তথ্য ধারণে সক্ষম উচ্চ ঘনত্বের ডিআরএএম নকশায় অগ্রগতি করছে।
ডিআরএএম একধরনের মেমোরি, যা কম্পিউটার কাজ করার সময় সাময়িকভাবে তথ্য ধরে রাখে। প্রতিযোগীর উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে এবং দামের প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে। কোরীয় মেমোরি নির্মাতাদের জন্য এ উদ্বেগ এমন সময় দেখা দিয়েছে, যখন বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছেন, নতুন কম্পিউটিং সক্ষমতার পেছনে গ্রাহকেরা কতটা ব্যয় করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারেও পতন ছড়ায়। সকালের লেনদেনে এসকে স্কয়ারের শেয়ার ১১.৩৮ শতাংশ এবং স্যামসাং ইলেকট্রো-মেকানিকসের শেয়ার ১৫.২১ শতাংশ কমে। বাজারজুড়ে বহু শেয়ারের দরপতনের সঙ্গে এ অবস্থাও দেখায়, বিনিয়োগকারীরা কত ব্যাপকভাবে তাঁদের বিনিয়োগ কমাচ্ছিলেন।
ব্রডকমের প্রধান নির্বাহী হক ট্যানও সতর্ক করেছিলেন, এআই খাতের কিছু বিনিয়োগকারী কার্যত জুয়া খেলছেন। তাঁর সতর্কবার্তায় কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন এবং আজকের অবকাঠামোগত ব্যয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত আয়ের ব্যবধান নিয়ে নজরদারি আরও বেড়েছে।
প্রযুক্তি খাতের দরপতন ছড়িয়ে পড়ে এশিয়াজুড়ে
জাপানের আরেক মেমোরি নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ার ১১ শতাংশের বেশি কমে, আর এআই খাতের বড় বিনিয়োগকারী সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ার কমে ৯.৪ শতাংশ। তাইওয়ানের শেয়ারবাজার ৩ শতাংশের বেশি নেমে যায়। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির শেয়ার প্রায় ৩ শতাংশ কমে এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন দরের কাছাকাছি পৌঁছায়।
হংকং ও চীনের মূল ভূখণ্ডের বাজারেও দুর্বলতা দেখা দেয়। হ্যাং সেং সূচক ১.১ শতাংশ, চীনের সিএসআই ৩০০ সূচক ১.৪ শতাংশ এবং সাংহাই কম্পোজিট সূচক ১.৫ শতাংশ কমে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মিনিম্যাক্স ৮.৭ শতাংশ, জেড.এআই ৯.১ শতাংশ, সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ৪.৫ শতাংশ, বাইদু ৪.৪ শতাংশ এবং আলিবাবা ৩.১ শতাংশ কমে।
ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর—দুই বাজারেই প্রায় ১ শতাংশ পতন হয়। সিঙ্গাপুরের ডিবিএস গ্রুপ ও ওসিবিসির শেয়ারও প্রায় ১ শতাংশ কমে, ফলে নগররাষ্ট্রটির শেয়ারবাজার তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে। মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের শেয়ারের দরও সামান্য কমে।
বৃহস্পতিবার পরে প্রকাশের কথা থাকা টিএসএমসির তৃতীয় প্রান্তিকের আয়শিল্পের সম্ভাবনা যাচাইয়ের তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। কোম্পানিটির টানা ষষ্ঠ প্রান্তিকে রেকর্ড মুনাফা করার প্রত্যাশা ছিল। এআই চিপের চাহিদা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে কি না, তার ইঙ্গিত পেতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখছিলেন।
ডলারের শক্তিতে বাড়তি চাপ
দক্ষিণ কোরীয় ওন ডলারের বিপরীতে ০.৮ শতাংশ দুর্বল হয়ে প্রতি ডলারে ১,৩৫২.৮৪ ওনে দাঁড়ায়, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফিলিপাইনের পেসো ডলারের বিপরীতে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬৩.০৯-এ নামে, আর তাইওয়ানের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে ৩২.৩২০-এ নেমে আগস্টের শুরুর পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে পৌঁছায়।
স্থানীয় মুদ্রার দর কমলে ডলারে মূল্য নির্ধারিত পণ্য কেনা ব্যয়বহুল হয়। ডলারের ঋণ পরিশোধে স্থানীয় মুদ্রায় খরচও বেড়ে যায়। ঋণের খরচ আগে থেকেই বাড়তে থাকা কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থের ওপর এতে আরও চাপ পড়ে।
বিভিন্ন প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দর মাপার ইউএস ডলার সূচক মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশের পর ১৮ মাসের সর্বোচ্চে ওঠে। তবে এশিয়ার লেনদেনের শুরুতে সেই বৃদ্ধির বেশির ভাগই খুইয়ে ফেলে। উদীয়মান বাজারের মুদ্রার এমএসসিআই সূচক ০.৪ শতাংশ কমে, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লেনদেনের দিন।
বিস্তৃত প্রবণতার বিপরীতে চীনের ইউয়ানের দর সামান্য বেড়ে ডলারে ৬.৬৯২৩ হয়। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরে কর্মসংস্থান অপ্রত্যাশিতভাবে ৩৯,৩০০ কমে যাওয়ার পর অস্ট্রেলীয় ডলারের দর ০.২ শতাংশ কমে ০.৬৯৫৬ ডলারে দাঁড়ায়। প্রত্যাশা ছিল কর্মসংস্থান ২০,০০০ বাড়বে।
সুদের হার, বন্ড ও বাজারের পরবর্তী পরীক্ষা
বিনিয়োগকারীরা ফেডারেল রিজার্ভের আরেক দফা সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনায় বাজি বাড়ান, যদিও লেনদেনের সময় প্রত্যাশায় পরিবর্তন আসে। ফিউচার বাজারের এক হিসাব অনুযায়ী, ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের বৈঠকে সুদের হার ০.২৫ শতাংশ-পয়েন্ট বাড়ার সম্ভাবনা ছিল ৩১.৬ শতাংশ, যা আগের দিনের ২২.১ শতাংশের চেয়ে বেশি। পরে সিএমই ফেডওয়াচের হিসাবে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা ধরা হয় ৭৫ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর পর ফেডের বেঞ্চমার্ক সুদের হার ছিল ৩.৭৫ থেকে ৪.০০ শতাংশের মধ্যে। মূল্যস্ফীতির চাপ ও ভোক্তা ব্যয়ের পরবর্তী নির্ধারিত পরীক্ষা হিসেবে বৃহস্পতিবার পরে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদক মূল্যসূচক ও খুচরা বিক্রির তথ্য প্রকাশের কথা ছিল। ফেডপ্রধান কেভিন ওয়ার্শেরও শুক্রবার ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।
শেয়ারবাজারের পতনের সময় সরকারি বন্ডের ক্রেতা বাড়ে। ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৭.৮ বেসিস পয়েন্ট বা ০.০৭৮ শতাংশ-পয়েন্ট কমে ৫.১১০ শতাংশে নামে। ইল্ড কমলে বন্ডের দাম বাড়ে। শেয়ারের লোকসান থেকে সুরক্ষা খুঁজছিলেন বিনিয়োগকারীরা। দুর্বল প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সুদের হার বৃদ্ধিতে বাধা দিতে পারে কি না, সেটিও তাঁরা বিবেচনা করছিলেন।
সিঙ্গাপুরে ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারের এশিয়া গবেষণা বিভাগের প্রধান মার্ক ম্যাথিউস প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে তুলনামূলক আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
“আমি উদ্বিগ্ন নই, কারণ শেয়ারগুলোর দাম বেশি নয়, মন্দার কোনো লক্ষণ নেই এবং এআই খাতের অধিকাংশ অংশেই চাহিদা এখনো সরবরাহের চেয়ে অনেক বেশি,” বলেন ম্যাথিউস।
তবে বৃহস্পতিবারের তাৎক্ষণিক চাপের কেন্দ্রে ছিল অর্থায়ন: ঋণ নেওয়ার দাম, সম্প্রসারণে অর্থ জোগাড়ের সক্ষমতা এবং সেই ব্যয়কে সমর্থন করার মতো আয়। ফেডের অক্টোবরের বৈঠকের আগে টিএসএমসির ফলাফল ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অর্থনৈতিক তথ্য বিনিয়োগকারীদের বিবেচনার জন্য নতুন পরিসংখ্যান দেবে।
মূল বিষয়গুলো
- বৃহস্পতিবারের লেনদেনে কসপি ও কসডাক—দুই সূচকই ৮.০২ শতাংশ কমে যায়; উভয় বাজারে সার্কিট ব্রেকার চালু হয়।
- সেমিকন্ডাক্টর শেয়ার বিক্রি বাড়ার সময় স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ৯.৭ শতাংশ এবং এসকে হাইনিক্স ১১.৩৫ শতাংশ কমে।
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি ঋণের খরচ ও এআই বিনিয়োগের মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
- কোরউইভের শেয়ার ও বন্ডের দরপতনে এআই খাতে অর্থায়নের ঝুঁকি নজরে আসে।
- ওনের দর ০.৮ শতাংশ কমে; জাপানের নিক্কেই ৪.৮ শতাংশ এবং আঞ্চলিক এমএসসিআই সূচক ৩.৩ শতাংশ নেমে যায়।
- টিএসএমসির আয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্য এবং ফেডের ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের বৈঠক ছিল পরবর্তী বড় নির্ধারিত পরীক্ষা।






