৯০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাসে সম্প্রসারণে নজর
ইউবিএসের অনুমান, তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ২০২৭ সালে কারখানা ও সরঞ্জামে ৯০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস ৮৫ বিলিয়ন ডলার। দুটি অঙ্কই বাজারের গড় ৭৫.৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। এতে প্রতিফলিত হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা এবং সরঞ্জামের ক্রমবর্ধমান দাম মেটাতে বিনিয়োগের বাজেট অনেক বাড়াতে হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সূচিপত্র
- ৯০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাসে সম্প্রসারণে নজর
- ব্যয় নিয়ে ব্যাংকগুলোর পূর্বাভাসের তুলনা
- চাহিদা ও সরঞ্জামের দাম বাড়াচ্ছে বাজেট
- এআই এজেন্ট কেন সিপিইউয়ের চাহিদা বাড়াচ্ছে
- ১০০ শতাংশের বেশি সক্ষমতা ব্যবহারের অর্থ
- প্যাকেজিংও সরবরাহে আরেকটি বাধা
- অ্যারিজোনা ও নতুন চিপপ্রক্রিয়ায় বাড়ছে ব্যয়
- বড় ব্যয়ের ভার সামলাতে হবে আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে
- শেয়ারের বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর
- সম্প্রসারণের সময়রেখার গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো
- মূল বিষয়গুলো
২০২৬ সালের জন্য টিএসএমসির ঘোষিত মূলধনী ব্যয় পরিকল্পনা ৬০ বিলিয়ন থেকে ৬৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৭ সালের জন্য ইউবিএসের পূর্বাভাস এই সীমার সর্বোচ্চ অঙ্কের চেয়ে ২৬ বিলিয়ন ডলার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি। গোল্ডম্যান স্যাকসের অনুমান অনুযায়ী বৃদ্ধি হবে প্রায় ৩৩ শতাংশ। মূলধনী ব্যয় হলো এমন অর্থ, যা দৈনন্দিন কার্যক্রমে নয়, বরং বহু বছর ধরে চিপ উৎপাদনে সক্ষম কারখানা নির্মাণ ও সরঞ্জাম বসাতে খরচ করা হয়।
এই পূর্বাভাসে ক্রমবর্ধমান একটি চ্যালেঞ্জের ব্যয় তুলে ধরা হয়েছে: গ্রাহকেরা আরও উন্নত প্রসেসর চাইছেন, অথচ উৎপাদন ও প্যাকেজিং সক্ষমতা সীমিত। এআইয়ের চাহিদা বিপুল পরিমাণ গাণিতিক কাজ করা অ্যাক্সিলারেটর ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে—পুরো ডেটা সেন্টার চালাতে দরকারি সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট, নেটওয়ার্ক চিপ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশেও।
২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রকৃত মূলধনী ব্যয়ের পরিমাণ টিএসএমসি এখনো ঘোষণা করেনি। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর দুপুর ২টায় নির্ধারিত তৃতীয় প্রান্তিকের আয়বিষয়ক ব্রিফিংয়ে বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা ব্যাখ্যা করার পরবর্তী সুযোগ পাবে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সিটিবিসি সিকিউরিটিজ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজরির গবেষক চ্যাং তুন-হসিয়াংয়ের ধারণা, কোম্পানির প্রচলিত প্রতিবেদন প্রকাশের ধারা অনুযায়ী ২০২৭ সালের পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাস জানুয়ারিতে আসবে।
মূল প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগ কত দ্রুত ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতায় রূপ নেবে। দামি যন্ত্রপাতির কারণে কারখানায় অতিরিক্ত চিপ উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই বাজেট বেড়ে যায়। নতুন উৎপাদনপ্রক্রিয়ার প্রস্তুতিতেও কয়েক বছর লাগে। তৈরি চিপগুলোকে গ্রাহকের জন্য প্রস্তুত পণ্যে রূপ দিতে প্যাকেজিং সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
ব্যয় নিয়ে ব্যাংকগুলোর পূর্বাভাসের তুলনা
বিভিন্ন পূর্বাভাসের বিস্তৃত পরিসরের ওপরের দিকে রয়েছে ইউবিএস ও গোল্ডম্যান স্যাকস। জেপি মরগ্যানের হিসাবে ২০২৭ সালে মূলধনী ব্যয় হবে ৮৬ বিলিয়ন ডলার, ব্যাংক অব আমেরিকার পূর্বাভাস ৮৩ বিলিয়ন ডলার, সিটির ৮১ বিলিয়ন ডলার এবং ইউয়ান্তার ৮০ বিলিয়ন ডলার। মর্গ্যান স্ট্যানলির প্রত্যাশা ৭৫ বিলিয়ন থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার।
ইউবিএসের ৯০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস বাজারের গড় ৭৫.৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। গোল্ডম্যান স্যাকসের ৮৫ বিলিয়ন ডলারের অনুমান ৯.৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। এই ব্যবধান দেখায়, বাজারের সার্বিক ধারণার তুলনায় সবচেয়ে আশাবাদী ব্যাংকগুলো কত বেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করছে।
২০২৬ সালের জন্য গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস ৬৪ বিলিয়ন ডলার এবং ইউবিএসের ৬৩ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাজারের গড় ৬১.৩ বিলিয়ন ডলার। এসব অনুমান টিএসএমসির ঘোষিত সীমার মধ্যেই রয়েছে। চ্যাং মনে করেন, আসন্ন ব্রিফিংয়ে এই সীমা আবার বাড়ানোর সম্ভাবনা কম, যদিও ব্যয় সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি যেতে পারে।
বিশ্লেষক হসিয়েহ চেন-ইয়েন ১২ অক্টোবর প্রথম প্রকাশিত এক মন্তব্যে ২০২৭ সালের জন্য ৭০ বিলিয়ন থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৮ সালের জন্য ৯০ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের অনুমান করেন। জেপি মরগ্যানও ২০২৮ সালে ১০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে, আর সিটির অনুমান ৯০ বিলিয়ন ডলার। গোল্ডম্যান স্যাকসের সংশোধিত পূর্বাভাসে ২০২৭ ও ২০২৮—দুই বছরেই ব্যয় ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংকটির নামে উল্লেখ করা আরেক পূর্বাভাসে ২০২৮ সালের ব্যয় ৯৮ বিলিয়ন ডলার বলা হয়েছে। বড় বিনিয়োগচক্রের প্রত্যাশা ব্যাপক হলেও বছরভিত্তিক অঙ্কে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
চাহিদা ও সরঞ্জামের দাম বাড়াচ্ছে বাজেট
টিএসএমসি জুলাইয়ের আয়বিষয়ক ব্রিফিংয়ে ২০২৬ সালের ব্যয় পরিকল্পনা প্রাথমিক ৫২ বিলিয়ন থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬০ বিলিয়ন থেকে ৬৪ বিলিয়ন ডলার করে। সীমার দুই প্রান্তই ৮ বিলিয়ন ডলার করে বেড়েছে। চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সি.সি. ওয়েই বলেন, গ্রাহকের চাহিদা বাড়াই সংশোধনের প্রধান কারণ; সরঞ্জামের মূল্যস্ফীতিও এতে অবদান রেখেছে।
ওয়েই বলেন, আগামী তিন বছরে কোম্পানির ব্যয় আগের তিন বছরের তুলনায় আরও বেশি ব্যবধানে ছাড়িয়ে যাবে, যা আগে ধারণা করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, এআইয়ের চাহিদা টিএসএমসির প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী এবং মাঝেমধ্যে ওঠানামা হলেও ২০২৯ বা ২০৩০ সাল পর্যন্ত তা জোরালো থাকতে পারে।
টিএসএমসির জুলাইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মার্কিন ডলারে হিসাব করা আয় ৪০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়বে। প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস বিনিয়োগে কোম্পানির আগ্রহের কারণ ব্যাখ্যা করে। তবে সরঞ্জামের দাম বাড়ায় প্রতি ডলার ব্যয়ে আগের তুলনায় কম উৎপাদন সক্ষমতা পাওয়া যেতে পারে।
এআই এজেন্ট কেন সিপিইউয়ের চাহিদা বাড়াচ্ছে
ওয়েই বলেন, এআই এজেন্টের কারণে এআই ডেটা সেন্টারে সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা সিপিইউয়ের গুরুত্ব বাড়ছে। এআই এজেন্ট একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বদলে তথ্য খোঁজা, সফটওয়্যার ব্যবহার এবং কাজ সমন্বয়ের মতো ধারাবাহিক কাজ করতে পারে।
গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ এবং অন্যান্য অ্যাক্সিলারেটর ভারী গণনার অধিকাংশ কাজ সামলায়। সিপিইউ কাজের সমন্বয়, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা করে। তাই পুরো ডেটা সেন্টারে কার্যক্রম বাড়লে একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চিপের চাহিদাও বাড়তে পারে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষক এভলিন ইউও গত এক বছরে এআই এজেন্টের কারণে সার্ভার সিপিইউয়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। ব্যাংকটির প্রত্যাশা, এআইয়ের চাহিদা জিপিইউ, নেটওয়ার্ক চিপ ও সিপিইউ—সব ক্ষেত্রেই ছড়াবে। ওয়েই বলেন, x86, Arm বা RISC-V আর্কিটেকচার ব্যবহার করা প্রায় সব সিপিইউ সরবরাহকারীই টিএসএমসির গ্রাহক। ফলে বিভিন্ন ধরনের প্রসেসর নকশায়ই এই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা রয়েছে।
এএমডির প্রধান নির্বাহী লিসা সু ৬ অক্টোবর তাইপেতে বলেন, ২০২৭ সালে চিপ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির এবং আরও উন্নত উৎপাদন সক্ষমতা দরকার। এএমডি সরবরাহ পরিকল্পনার সময়সীমা বাড়িয়ে তিন থেকে পাঁচ বছর করেছে, যা দেখায় গ্রাহকেরা পরবর্তী প্রান্তিকেরও অনেক পরের সময়ের কথা ভেবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
১০০ শতাংশের বেশি সক্ষমতা ব্যবহারের অর্থ
কেজিআই সিকিউরিটিজের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালে টিএসএমসির ৩ ন্যানোমিটার সক্ষমতার ব্যবহার ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সেমি অ্যানালাইসিসের প্রত্যাশা, ওই বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সক্ষমতার ব্যবহার ১০০ শতাংশ পেরোবে এবং এআই অ্যাপ্লিকেশনে ৩ ন্যানোমিটারের মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহৃত হবে।
সক্ষমতার ব্যবহার বলতে নির্ধারিত উৎপাদনসীমার সঙ্গে প্রকৃত উৎপাদনের তুলনাকে বোঝায়। ১০০ শতাংশের বেশি ব্যবহারের পূর্বাভাসের অর্থ, বিশ্লেষকেরা মনে করছেন উৎপাদন ওই মানদণ্ড ছাড়িয়ে যাবে। কারখানার উৎপাদনশীলতা বাড়লে বা উপলভ্য সক্ষমতা সম্প্রসারিত হলে মানদণ্ডও বদলাতে পারে। ১২০ শতাংশের অনুমানে সুনির্দিষ্ট কোন মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
সেমি অ্যানালাইসিসের পূর্বাভাস সত্যি হলে ৩ ন্যানোমিটার উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এআইয়ের বাইরের অ্যাপ্লিকেশনের জন্য থাকবে। ফলে এই উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অধিকাংশ ব্যবহারকারী হবে এআই খাত, যা বিভিন্ন ধরনের উন্নত চিপ তৈরি করা গ্রাহকদের মধ্যে সক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়াবে।
ওয়েই বলেন, উন্নত চিপের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ৩ ন্যানোমিটার ও তার নিচের উৎপাদনপ্রক্রিয়ার চাহিদা সরবরাহের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোনো শতাংশ জানাননি। গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় প্রসেসর ও অ্যাক্সিলারেটরের মধ্যে ওয়েফার উৎপাদন ভাগ করে দিতে টিএসএমসি তাদের সঙ্গে কাজ করছে।
প্যাকেজিংও সরবরাহে আরেকটি বাধা
ওয়েফার কারখানা থেকে চিপ বের হওয়ার পরও টিএসএমসির সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জ শেষ হয় না। উন্নত প্যাকেজিং প্রসেসর, মেমোরি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশকে এমনভাবে যুক্ত করে, যাতে সেগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। বড় এআই পণ্যের ক্ষেত্রে প্যাকেজিং সক্ষমতা সীমিত হলে পৃথক চিপ হাতে থাকা সত্ত্বেও সরবরাহে দেরি হতে পারে।
ওয়েই বলেন, টিএসএমসির উন্নত প্যাকেজিং সরবরাহ এতটাই সীমিত যে তা গ্রাহকদের পণ্য বাজারে আনার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্য সরবরাহকারীরা প্যাকেজিং সক্ষমতা বাড়ালে তিনি স্বাগত জানাবেন, কারণ টিএসএমসির ওয়েফার ব্যবহারকারী গ্রাহকেরা তখন আরও বেশি পণ্য তৈরি করতে এবং কোম্পানিটির উৎপাদন ব্যবসার চাহিদা বাড়াতে পারবেন।
গ্লোবালফাউন্ড্রিজ ৮ অক্টোবর পাঁচ বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের একটি উৎপাদন চুক্তির ঘোষণা দেয়। টিএসএমসির CoWoS প্যাকেজিং প্রযুক্তির জন্য নিউইয়র্কে সিলিকন ইন্টারপোজার তৈরি করবে প্রতিষ্ঠানটি। ইন্টারপোজার হলো এমন একটি সংযোগস্তর, যা প্যাকেজের ভেতরে চিপ ও মেমোরির মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়।
চুক্তির অধীনে ২০২৮ সালের প্রথমার্ধে বর্ধিত পরিমাণে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। ফলে ওই অতিরিক্ত সরবরাহ পেতে উল্লেখযোগ্য অপেক্ষা করতে হবে। খরচ কমাতে টিএসএমসি বিকল্প প্যাকেজিং সাবস্ট্রেটের সম্ভাবনাও যাচাই করছে। ওয়েই বলেন, উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ শুরুর আগে এসব প্রযুক্তি পরিণত হতে আরও প্রায় এক বছর লাগবে।
অ্যারিজোনা ও নতুন চিপপ্রক্রিয়ায় বাড়ছে ব্যয়
জুলাইয়ে টিএসএমসি অ্যারিজোনায় আরও ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এতে সেখানে পরিকল্পিত মোট বিনিয়োগ ১৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ওয়েই বলেন, উন্নত ওয়েফার উৎপাদন এবং প্যাকেজিংসহ পরবর্তী উৎপাদনধাপ মিলিয়ে আরও প্রায় চারটি কারখানা নির্মাণ করা হবে। এই বিনিয়োগে ২ ন্যানোমিটার ও তার নিচের প্রক্রিয়ার উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে উঠবে।
অ্যারিজোনার মোট বিনিয়োগ একাধিক বছরজুড়ে করা হবে, আর মূলধনী ব্যয়ের পূর্বাভাসে প্রতিটি বছরের ব্যয় হিসাব করা হয়। অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে টিএসএমসি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করেনি; বলেছে, গ্রাহকের চাহিদা অনুসারেই বিনিয়োগের গতি নির্ধারিত হবে। তাইওয়ান ও জাপানেও নির্মাণকাজ দ্রুত করা হচ্ছে।
অ্যারিজোনায় ওয়েফারের দ্বিতীয় কারখানায় ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা রয়েছে। একই বছর টিএসএমসির ২ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ এক বছর উৎপাদন চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন কারখানা নির্মাণে যন্ত্রপাতির অবচয় ব্যয়—যন্ত্রপাতির ব্যবহারযোগ্য জীবনজুড়ে এর দাম ভাগ করে নেওয়ার খরচ—এবং পরিচালন ব্যয়ও তৈরি হয়।
টিএসএমসির পরবর্তী A14 প্রক্রিয়ায় পরীক্ষামূলক উৎপাদন ২০২৭ সালে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। N2-এর তুলনায় একই বিদ্যুৎ ব্যবহারে এতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি কার্যক্ষমতা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একই কার্যক্ষমতা বজায় রেখে বিদ্যুৎ ব্যবহার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমানো যাবে, আর চিপের ঘনত্ব বাড়বে প্রায় ২০ শতাংশ। ওয়েই বলেন, উন্নত প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন থেকে সক্ষমতা প্রস্তুত করে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন শুরু করতে এখন পাঁচ থেকে সাত বছর লাগে।
বড় ব্যয়ের ভার সামলাতে হবে আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে
সিটির প্রত্যাশা, ২০২৭ সালে টিএসএমসির আয় ৪০ শতাংশের বেশি বাড়বে এবং এআই থেকে আয় আগের মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে ডলারে হিসাব করা আয় ৪২ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩৬.৯ শতাংশ বাড়বে। ২০২৬ সালের জন্য মর্গ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষক চার্লি চ্যান ৪১ থেকে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন। সিটির তাইওয়ান গবেষণা বিভাগের প্রধান চেন চিয়া-ইয়ের পূর্বাভাস ৪৬ শতাংশ, যা টিএসএমসির জুলাইয়ের ৪০ শতাংশের কিছু বেশি প্রবৃদ্ধির নির্দেশনার চেয়ে বেশি।
১৬ জন বিশ্লেষকের পূর্বাভাস নিয়ে এলএসইজির সংকলনে তৃতীয় প্রান্তিকের নিট মুনাফা ৭৪৬.৩ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার ধরা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি। এটি ১৫ অক্টোবরের ঘোষণার আগে করা মুনাফার পূর্বাভাস। ২০২৭ সালে শেয়ারপ্রতি আয় ১৬১.৩৬ তাইওয়ান ডলার হবে বলে ব্যাংক অব আমেরিকার অনুমান, আর চ্যাং বলেন, বাজারের প্রত্যাশা প্রায় ১৫০ তাইওয়ান ডলার।
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে মোট মুনাফার হার হবে ৬৭.২ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৬৭.৫ শতাংশ। মোট মুনাফার হার হলো পণ্য উৎপাদনের সরাসরি খরচ বাদ দেওয়ার পর আয়ের যে অংশ অবশিষ্ট থাকে। চ্যাংয়ের ধারণা, দাম বাড়ানোর ফলে নতুন কারখানা ও বিদেশি কার্যক্রমের খরচ কিছুটা সামাল দেওয়া যাবে এবং ২০২৭ সালে এই হার স্থিতিশীল থাকবে, অথবা ০.৫ শতাংশের কম বাড়বে।
চ্যান ও নোমুরার বিশ্লেষক চেং মিং-সুংয়ের প্রত্যাশা, ২০২৭ সালে উন্নত উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়বে। কিছু পুরোনো প্রক্রিয়ায় বাড়তে পারে প্রায় ৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত দাম বৃদ্ধির বিষয়টি টিএসএমসি নিশ্চিত করেনি। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে কোম্পানিটি বলেছিল, ২ ন্যানোমিটার উৎপাদন বাড়ানোর ফলে দ্বিতীয়ার্ধের মোট মুনাফার হার প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে; চাহিদা ও ব্যয়সংক্রান্ত উন্নতি এর কিছুটা প্রভাব পুষিয়ে দেবে।
ওয়েই বলেন, গবেষণা ও কারখানায় ধারাবাহিক বিনিয়োগে সহায়তা করার পাশাপাশি গ্রাহকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রাখার মতো হতে হবে দাম। পুরোনো উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় টিএসএমসির সম্প্রসারণও বেছে বেছে করা হচ্ছে; জাপানে ইমেজ সেন্সর এবং জার্মানিতে গাড়ি ও শিল্প খাতের পণ্যে জোর দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার চিপ ও এআই-সংশ্লিষ্ট সেন্সরের চাহিদা অনেক সাধারণ ভোক্তা ইলেকট্রনিক পণ্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
শেয়ারের বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর
ইউবিএস মনে করে, টিএসএমসির ভবিষ্যৎ মূল্য-আয় অনুপাত ২১-এ পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের অনুমান ২২, যেখানে বর্তমানে এই অনুপাত ১৭.৪। ভবিষ্যৎ মূল্য-আয় অনুপাত শেয়ারের দামের সঙ্গে প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ আয়ের তুলনা করে। অনুপাত বেশি হলে কোম্পানি যে পরিমাণ মুনাফা করবে বলে বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, তার প্রতিটি এককের জন্য তাঁরা বেশি দাম দিচ্ছেন।
সিটি তাইওয়ানে টিএসএমসির শেয়ারের লক্ষ্যমূল্য ৩,৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৪,০০০ তাইওয়ান ডলার করেছে। গোল্ডম্যান স্যাকস তাদের লক্ষ্যমূল্য ৩,১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩,৩০০ তাইওয়ান ডলার করেছে। আয়বিষয়ক পূর্বাভাসে তালিকাভুক্ত নয়টি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ম্যাকুয়ারির ৪,৪১০ তাইওয়ান ডলারের লক্ষ্যমূল্য সর্বোচ্চ। প্রবৃদ্ধি, মুনাফা এবং বিনিয়োগকারীরা যে মূল্যায়ন গ্রহণ করতে পারেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমান ভিন্ন হওয়ায় লক্ষ্যমূল্যেও পার্থক্য রয়েছে।
সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির চালক হিসেবে সিটি কো-প্যাকেজড অপটিকস বা CPO-এর কথাও বলেছে। এই প্রযুক্তিতে কম্পিউটিং যন্ত্রাংশের কাছাকাছি অপটিক্যাল সংযোগ স্থাপন করা হয়, যাতে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। হসিয়েহর অক্টোবরের মন্তব্যে বলা হয়েছে, অপটিক্যাল যোগাযোগ সরঞ্জামের চাহিদা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করেছেন, প্রসেসর, মেমোরি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা ও সার্কিট বোর্ডের দাম বাড়ায় সার্ভার সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয়ও বাড়ছে।
সক্ষমতায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গ্রাহকদের পূর্বাভাসের পাশাপাশি ডেটা সেন্টার নির্মাণের স্থান, অগ্রগতি ও স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করছে টিএসএমসি। ওয়েই ব্যাখ্যা করেন, প্রতিটি গ্রাহকের আশাবাদী পরিকল্পনা যোগ করে মোট চাহিদা নির্ধারণ করা যায় না। সরবরাহ করা চিপ যেন মজুত না হয়ে কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়, সেটিই নিশ্চিত করতে চায় কোম্পানিটি।
সম্প্রসারণের সময়রেখার গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো
টিএসএমসির বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত কয়েক বছরজুড়ে বিস্তৃত। আসন্ন আয় ঘোষণায় হালনাগাদ নির্দেশনা আসতে পারে। তবে গ্রাহকেরা কখন বাড়তি সক্ষমতা পাবেন, তা নির্ধারণ করবে কারখানা চালু হওয়া, প্যাকেজিং সরবরাহ এবং নতুন উৎপাদনপ্রক্রিয়া।
- জুলাই ২০২৬: টিএসএমসি বার্ষিক ব্যয় পরিকল্পনা বাড়িয়ে ৬০ বিলিয়ন থেকে ৬৪ বিলিয়ন ডলার করে এবং অ্যারিজোনার জন্য আরও ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
- ৬ অক্টোবর ২০২৬: এএমডির প্রধান নির্বাহী লিসা সু ২০২৭ সালে চিপ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান।
- ৮ অক্টোবর ২০২৬: গ্লোবালফাউন্ড্রিজ CoWoS-এর জন্য সিলিকন ইন্টারপোজার সরবরাহে পাঁচ বছরের চুক্তির ঘোষণা দেয়।
- ১৫ অক্টোবর ২০২৬: টিএসএমসির তৃতীয় প্রান্তিকের আয়বিষয়ক ব্রিফিং দুপুর ২টায় নির্ধারিত।
- জানুয়ারি ২০২৭: কোম্পানির প্রচলিত প্রতিবেদন প্রকাশের নিয়ম অনুযায়ী টিএসএমসির পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক পূর্বাভাস আসবে বলে চ্যাংয়ের প্রত্যাশা।
- ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ: অ্যারিজোনার দ্বিতীয় ওয়েফার কারখানায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা রয়েছে।
- ২০২৮ সালের প্রথমার্ধ: গ্লোবালফাউন্ড্রিজের চুক্তির আওতায় বর্ধিত উৎপাদন শুরুর কথা রয়েছে।
- ২০২৮: A14-এর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য টিএসএমসির।
আলোচনার বিবরণ অনুযায়ী, টেক্সাসে সম্ভাব্য বিনিয়োগও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে টিএসএমসি। কারখানার অবস্থান, ব্যয় এবং সক্ষমতা বণ্টন নিয়ে কোম্পানির পরবর্তী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অ্যারিজোনা, তাইওয়ান ও জাপানে বিদ্যমান অঙ্গীকারও থাকবে।
মূল বিষয়গুলো
- ইউবিএসের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালে টিএসএমসির মূলধনী ব্যয় হবে ৯০ বিলিয়ন ডলার; গোল্ডম্যান স্যাকসের অনুমান ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
- বাজারের গড় ৭৫.৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জন্য টিএসএমসির ঘোষিত বাজেট ৬০ বিলিয়ন থেকে ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
- এআই এজেন্ট অ্যাক্সিলারেটর ও নেটওয়ার্ক চিপের পাশাপাশি সিপিইউয়ের চাহিদাও বাড়াচ্ছে।
- সেমি অ্যানালাইসিসের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালে টিএসএমসির ৩ ন্যানোমিটার উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করবে এআই।
- উন্নত প্যাকেজিং এখনো সরবরাহের বাধা। গ্লোবালফাউন্ড্রিজের অতিরিক্ত উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরুর প্রত্যাশা রয়েছে।
- নতুন কারখানা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সক্ষমতা বাড়লেও যন্ত্রপাতি, পরিচালনা ও অবচয় ব্যয়ও বাড়ে।
- ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মূলধনী ব্যয়ের পরিমাণ টিএসএমসি এখনো ঘোষণা করেনি।






