ধসে পড়া ভবনে উদ্ধার অভিযান, হতাহতের হিসাবে ভিন্নতা
২০২৬ সালের ৮ জুন সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে দক্ষিণ ফিলিপাইনের সারাঙ্গানির উপকূলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে প্রাণঘাতী ভূমিধস হয়, ভবন ধসে পড়ে এবং উপকূলীয় জনপদে সুনামির ঢেউ আছড়ে পড়ে। এক হিসাবে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩৫, আহত ২০০ জনের বেশি; অন্য হিসাবে ৩২ জন নিহত, ২০০ জন আহত এবং ১২ জন নিখোঁজের কথা বলা হয়।
সূচিপত্র
- ধসে পড়া ভবনে উদ্ধার অভিযান, হতাহতের হিসাবে ভিন্নতা
- ভূমিকম্পের সংশোধিত পরিমাপে যা জানা যায়
- মিন্দানাওজুড়ে কম্পনের তীব্রতা ছিল ভিন্ন
- ভবন ধসের পাশাপাশি ভূমিধসেও প্রাণহানি
- স্কুলের অনুষ্ঠান থাকায় কিছু শিশু বাইরে ছিল
- নয়টি প্রদেশে সুনামি সতর্কতা জারি
- ইন্দোনেশিয়া, পালাউ ও জাপানেও ঢেউ পৌঁছায়
- হাসপাতাল, ফ্লাইট ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত
- যেভাবে এগিয়েছে জরুরি পরিস্থিতি
- যা এখনো নিশ্চিত নয়
- মূল বিষয়গুলো
হতাহতের ভিন্ন হিসাবের সমন্বয় করা হয়নি। উদ্ধার অভিযান চলার সময় কর্তৃপক্ষ তখনও হতাহতদের হিসাব করছিল। কোথায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে ভিন্নতা ছিল। এক প্রতিবেদনে জেনারেল সান্তোসকে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির শহর বলা হয়েছে; অন্যটিতে বলা হয়েছে, সারাঙ্গানি প্রদেশে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে, যেখানে গ্লানে ভূমিধসে ১৩ জন গ্রামবাসী মারা যান।
ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ৮ জুনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সতর্কবার্তায় ভূমিকম্পের সময় ও উপকূলের কাছের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। এ তথ্যের সূত্র হিসেবে ফিলিপাইন ইনস্টিটিউট অব ভলকানোলজি অ্যান্ড সিসমোলজি—যা PHIVOLCS নামে পরিচিত—এর কথা উল্লেখ করা হয়। সতর্কবার্তায় সময় লেখা হয় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট ৪১ সেকেন্ড এবং স্থানাঙ্ক দেওয়া হয় ৫.৫৭ ডিগ্রি উত্তর ও ১২৪.৯৮ ডিগ্রি পূর্ব।
সাত লাখের বেশি মানুষের বন্দরনগরী ও টুনা রপ্তানির কেন্দ্র জেনারেল সান্তোসে ব্যাপক ভবন ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধারকারী দল সুপারমার্কেট, গুদাম, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ এমন কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালায়, যেখানে মানুষ আটকে থাকতে পারেন। পৃথক এক প্রতিবেদনে শহরে অন্তত চারজন নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে, যা মোট ১২ জন নিখোঁজের হিসাবের চেয়ে ভৌগোলিকভাবে সীমিত সংখ্যা।
শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ক্লাস বাতিল করা হয়, হাসপাতালের রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হয় এবং জেনারেল সান্তোসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পরে উপকূলীয় সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও অব্যাহত পরাঘাত তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে থাকে।
ভূমিকম্পের সংশোধিত পরিমাপে যা জানা যায়
PHIVOLCS প্রথমে ১০ কিলোমিটার গভীরে ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্পের কথা জানায়। তাদের দ্বিতীয় ভূমিকম্প তথ্য বিজ্ঞপ্তিতে মাত্রা সংশোধন করে ৭.৮ এবং গভীরতা ৩৩ কিলোমিটার বলা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির সূত্র উল্লেখ করা প্রতিবেদনগুলোতে উপকেন্দ্র সারাঙ্গানির মাআসিমের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে বলে উল্লেখ করা হয়।
এই পরিমাপগুলো ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে। মাত্রা দিয়ে ভূমিকম্পের আকার বোঝানো হয়, আর গভীরতা জানায় ভূপৃষ্ঠের কত নিচে ভূমিকম্পটির সূচনা হয়েছিল। ভূকম্পন-সংক্রান্ত সংস্থাগুলো আরও তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রাথমিক হিসাব বদলাতে পারে। এই সংশোধন একই ভূমিকম্পের হালনাগাদ মূল্যায়ন, দ্বিতীয় কোনো ঘটনা নয়।
ভূমিকম্পটির কারণ হিসেবে কোটাবাটো ট্রেঞ্চ বরাবর ভূত্বকের নড়াচড়াকে উল্লেখ করা হয়। PHIVOLCS-এর পরিচালক তেরেসিতো বাকোলকল বলেন, ওই বছর ফিলিপাইনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটি। তাঁর হিসাবে গভীরতা ও মাআসিম থেকে দূরত্ব ছিল প্রায় ২০ মাইল, যা কিলোমিটারে সংশোধিত পরিমাপের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উপকূলের কাছের অবস্থানের কারণে একই সঙ্গে দুটি জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়: স্থলভাগে ধ্বংসাত্মক কম্পন এবং উপকূলে সুনামির ঝুঁকি। পরে সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ নিরাপদ—এমন প্রমাণ তা দেয়নি।
মিন্দানাওজুড়ে কম্পনের তীব্রতা ছিল ভিন্ন
যন্ত্রের পরিমাপে সারাঙ্গানির মালাপাতানে তীব্রতা VIII রেকর্ড করা হয়, যাকে PHIVOLCS ‘অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দক্ষিণ কোটাবাতোর কোরোনাডাল সিটি ও দাভাও অক্সিডেন্টালের সান্তা মারিয়ায় তীব্রতা VII, অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক কম্পন মাপা হয়। জেনারেল সান্তোস ও টি’বোলিতে যন্ত্রের পরিমাপে তীব্রতা ছিল VI।
তীব্রতা ও মাত্রা এক বিষয় নয়। ভূমিকম্পের আকার বোঝাতে একটি মাত্রা নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু কম্পনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী স্থানভেদে এর তীব্রতা বদলে যায়। যন্ত্রের তীব্রতা নির্ধারণ করা হয় ভূকম্পন সেন্সরের তথ্য থেকে; আর জানানো তীব্রতা নির্ভর করে কম্পন ও তার প্রভাব সম্পর্কে পর্যবেক্ষণের ওপর।
সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষিত তীব্রতা কত ছিল, তা নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্নতা ছিল। একটিতে জেনারেল সান্তোসে জানানো তীব্রতা VII বলা হয়েছে, অন্যটিতে পালিমবাং ও সেনেটর নিনয় আকিনোতে জানানো তীব্রতা VI-কে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন বলা হয়েছে। দুই প্রতিবেদনেই মালাপাতানে যন্ত্রের পরিমাপে বেশি, অর্থাৎ VIII তীব্রতার কথা বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে জানানো তীব্রতার এই অমিলের সমাধান হয়নি।
দাভাও সিটি, কোটাবাটো, জাম্বোয়াঙ্গা ও লেইতের কিছু অংশেও কম্পন অনুভূত হয়। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, আর বাসিন্দারা পরাঘাত অনুভব করতে থাকেন। এক হিসাবে পরাঘাতের সংখ্যা প্রায় ১৮০ বলা হয়েছে, তবে কোন সময়সীমায় তা গণনা করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
ভবন ধসের পাশাপাশি ভূমিধসেও প্রাণহানি
প্রাদেশিক দুর্যোগ প্রশমন কর্মকর্তা রেনে পুনজালান জানান, সারাঙ্গানির গ্লানে ভূমিধসে ১৩ জন গ্রামবাসী মারা গেছেন। তিনি প্রদেশটিতে আরও চারজনের মৃত্যুর খবর দেন। এই দুই সংখ্যা মিলিয়ে সারাঙ্গানিতে ১৭ জনের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়, তবে এতে জাতীয় পর্যায়ের ভিন্ন মোট সংখ্যা বা কোথায় বেশি প্রাণহানি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনের অমিলের নিষ্পত্তি হয় না।
দক্ষিণ কোটাবাতো, দাভাও অক্সিডেন্টাল ও বালুত দ্বীপে ভবন ধসে এবং ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্যদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। ক্ষতিগ্রস্ত একটি মসজিদে হতাহতের কথা কর্মকর্তারা জানান। গির্জা, শপিং মল, স্কুল ও হাসপাতালের ক্ষতির খবরও পাওয়া গেছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
জেনারেল সান্তোসে কয়েকটি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। প্রাদেশিক একটি রেডিও স্টেশন থাকা চারতলা বাণিজ্যিক ভবন আংশিক ধসে পড়লেও কর্মীরা নিচতলায় চলে আসায় কেউ আহত হননি। একটি স্কুলের ভেতরে মানুষ আটকে থাকতে পারেন—এমন খবরও খতিয়ে দেখছিল উদ্ধারকারী দল।
সিভিল ডিফেন্স অফিসের আঞ্চলিক পরিচালক রড সসমেনা ভূমিকম্পের সময় জেনারেল সান্তোসে যাচ্ছিলেন। তাঁর গাড়ির আকস্মিক নড়াচড়া এবং আশপাশের সড়কে মানুষের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন:
আমাদের পিকআপ ট্রাকটি হঠাৎ ঝাঁকুনি দিল, আমি ভেবেছিলাম টায়ার পাংচার হয়েছে।
কম্পন খুব শক্তিশালী ছিল, মানুষ ঘরবাড়ি থেকে রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে আসে।
হতাহতের সংখ্যা তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। নিখোঁজ ১২ জনের খবর এবং জেনারেল সান্তোসে অন্তত চারজন নিখোঁজ থাকার পৃথক হিসাব যোগ করা উচিত নয়, কারণ শহরের এই সংখ্যাটি বৃহত্তর মোট হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
স্কুলের অনুষ্ঠান থাকায় কিছু শিশু বাইরে ছিল
মাতানাও ন্যাশনাল হাইস্কুলে পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের জন্য শিক্ষার্থী ও কর্মীরা বাইরে থাকার সময় ছাদ ধসে পড়ে। ২০১৯ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং এটি ভেঙে ফেলার কথা ছিল। ভবনটির ধস আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত একটি স্থাপনার দিকে মনোযোগ এনেছে, যদিও ভেঙে ফেলার কাজ তখনও কেন শুরু হয়নি, তার কোনো ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই।
আরেকটি স্কুলের ঘটনা দাভাও অক্সিডেন্টালের মালিতায়। দুই মাসের গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শতাধিক ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থী ও প্রায় এক ডজন শিক্ষক বাইরে জড়ো হয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষক রোসাভেল কাচুয়েলা বলেন, কয়েকটি শিশু চিৎকার করে বা কাঁদে, তবে অধিকাংশই বসে স্থির ছিল এবং কোনো শিক্ষার্থী আহত হয়নি।
শিক্ষাবর্ষের শুরু কীভাবে বদলে গেল, তা বর্ণনা করে কাচুয়েলা বলেন:
স্কুলের প্রথম দিনে তাদের যে উচ্ছ্বাস ছিল, তা আতঙ্কে বদলে যায়।
মালিতার স্কুলে একটি ছাউনি ধসে মোটরসাইকেলের ক্ষতি হয়। স্কুলে এ দুটি ঘটনা ভিন্ন স্থানে ঘটেছে; অন্য কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলে মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে যে পৃথক খবর এসেছিল, তার সঙ্গে এগুলো গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
নয়টি প্রদেশে সুনামি সতর্কতা জারি
যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সতর্কবার্তায় সুনামি সতর্কতার আওতায় থাকা নয়টি এলাকার নাম দেওয়া হয়: সারাঙ্গানি, দাভাও অক্সিডেন্টাল, তাওই-তাওই, সুলু, বাসিলান, জাম্বোয়াঙ্গা দেল সুর, জাম্বোয়াঙ্গা সিবুগে, সুলতান কুদারাত ও দক্ষিণ কোটাবাটো। এতে বলা হয়, ৮ জুন সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট থেকে ৯টা ৩৭ মিনিটের মধ্যে প্রথম ঢেউ আছড়ে পড়ার পূর্বাভাস ছিল এবং ঢেউ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে পারে।
PHIVOLCS সতর্ক করে বলেছিল, ঢেউ স্বাভাবিক জোয়ারের স্তরের চেয়ে এক মিটারের বেশি উঁচু হতে পারে এবং বদ্ধ উপসাগর ও প্রণালিতে আরও উঁচু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সুনামি সতর্কতায় ঢেউ তিন মিটার পর্যন্ত উঁচু হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস ছিল, প্রতিটি উপকূলে শেষ পর্যন্ত ঢেউ কত উঁচু হয়েছিল তার পরিমাপ নয়।
ফিলিপাইনের কর্তৃপক্ষ জানায়, ছয়টি উপকূলীয় এলাকায় ঢেউয়ের উচ্চতা প্রায় ১.৪ মিটারে পৌঁছায়। বাকোলকল কিয়াম্বায় ৪.৬ ফুট উঁচু ঢেউয়ের কথা বলেন, যা প্রায় ১.৪ মিটারের সমান। সুলতান কুদারাত ও সারাঙ্গানিতেও প্রায় তিন ফুট বা ০.৯ মিটার উঁচু ঢেউ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
জাম্বোয়াঙ্গা দেল সুরের একটি উপকূলীয় গ্রামে খুঁটির ওপর তৈরি ছয়টি বাড়ি ভূমিকম্প ও উঁচু ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষয়ক্ষতি দেখায়, উপকূলে প্রভাব শুধু সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, যদিও পরিমাপ করা ঢেউ প্রাথমিক পূর্বাভাসের সর্বোচ্চ উচ্চতার চেয়ে নিচু ছিল।
ভূমিকম্পের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার জানায়, সুনামির হুমকি অনেকটাই কেটে গেছে। ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা বিকেলের মাঝামাঝি সুনামি সতর্কতা তুলে নেন। পরবর্তী মূল্যায়নগুলো প্রাথমিক সরিয়ে নেওয়ার পর্যায়ের অবসান ঘটালেও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা বা পরাঘাতের ঝুঁকি দূর করেনি।
ইন্দোনেশিয়া, পালাউ ও জাপানেও ঢেউ পৌঁছায়
ইন্দোনেশিয়া ও জাপানও সুনামি সতর্কতা জারি করে এবং ফিলিপাইনের বাইরেও ছোট ঢেউ পরিমাপ করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের কাছে একটি জোয়ার-পরিমাপক যন্ত্রে ২.৭ ফুট, অর্থাৎ প্রায় ০.৮২ মিটার উঁচু সুনামি ঢেউ ধরা পড়ে। প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার পালাউয়ে এক ফুট, অর্থাৎ প্রায় ০.৩০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের খবর দেয়।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা চিচিজিমা ও কুশিমোতোতে সর্বোচ্চ ৭.৮ ইঞ্চি, অর্থাৎ প্রায় ০.২০ মিটার উঁচু ঢেউ রেকর্ড করে। এই পরিমাপ কিয়াম্বায় জানানো প্রায় ১.৪ মিটার উঁচু ঢেউয়ের চেয়ে কম ছিল। মালয়েশিয়ার সাবাহ রাজ্যেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তবে সেখানে সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতা জানানো হয়নি।
স্থানভেদে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: একটি পরিমাপক যন্ত্রে ধরা ঢেউয়ের উচ্চতা দিয়ে পুরো উপকূলের উচ্চতা নির্ধারণ করা যায় না। PHIVOLCS বিশেষভাবে উপসাগর ও প্রণালিতে উঁচু ঢেউয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছিল, কারণ উপকূলের আকৃতি স্থানীয় পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
হাসপাতাল, ফ্লাইট ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত
ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া রোগীদের একটি স্কুলের বাইরে বসে থাকতে দেখা গেছে বলে জানানো হয়। কোন হাসপাতাল, কিংবা কখন সেখানে সেবা আবার শুরু হতে পারে, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। হাসপাতালে ক্ষয়ক্ষতির খবরে জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমে আরও চাপ পড়ে, যে কার্যক্রমে তখন ২০০ জনের বেশি আহতকে সামলাতে হচ্ছিল।
ফিলিপাইনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, জেনারেল সান্তোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল এবং ১৭টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বিমানবন্দর কখন খুলবে, তা নিশ্চিত করে জানানো হয়নি। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি যাচাই ও তল্লাশি চলার সময় আরও সমস্যা তৈরি হয়।
প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র ক্লাস বাতিলের নির্দেশ দেন এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোতে পাঠাতে বলেন। সরকারের সাড়াদান কার্যক্রম ঘোষণা করে তিনি বলেন:
জাতীয় সরকার কাজ শুরু করেছে এবং আমরা মিন্দানাওকে পিছনে ফেলে রাখব না।
যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানায়, সিভিল ডিফেন্স অফিস এবং ফিলিপাইনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করছে ও জরুরি সাড়াদানকারী দল মোতায়েন করছে। যুক্তরাষ্ট্রও ফিলিপাইনের সাড়াদান কার্যক্রমে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানায়। ফ্রান্স, জাপান ও নিউজিল্যান্ড সমর্থন জানালেও নির্দিষ্ট সহায়তার পরিমাণ বা সরবরাহের সময়সূচি উল্লেখ করা হয়নি।
যেভাবে এগিয়েছে জরুরি পরিস্থিতি
একই দিনে ভূমিকম্প, পরিমাপ সংশোধন ও সুনামি সতর্কতার ঘটনা ঘটে। কোনটি প্রাথমিক পূর্বাভাস, আর কোনটি পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত—তা বুঝতে সময়ক্রমটি সহায়ক:
- ৮ জুন, সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট ৪১ সেকেন্ড: PHIVOLCS সারাঙ্গানির উপকূলে ভূমিকম্প রেকর্ড করে।
- প্রাথমিক মূল্যায়ন: সংস্থাটি ৭.০ মাত্রা ও ১০ কিলোমিটার গভীরতার কথা জানায়।
- দ্বিতীয় ভূমিকম্প বিজ্ঞপ্তি: PHIVOLCS মাত্রা সংশোধন করে ৭.৮ এবং গভীরতা ৩৩ কিলোমিটার বলে জানায়।
- সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট থেকে ৯টা ৩৭ মিনিট: কর্তৃপক্ষ প্রথম সুনামি ঢেউ পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয় এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে ঢেউ চলতে পারে বলে সতর্ক করে।
- ভূমিকম্পের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর: প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার জানায়, সুনামির হুমকি অনেকটাই কেটে গেছে।
- বিকেলের মাঝামাঝি: উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি যাচাই চলার মধ্যেই ফিলিপাইনের কর্তৃপক্ষ সুনামি সতর্কতা তুলে নেয়।
সতর্কতার সময় PHIVOLCS উপকূলীয় বাসিন্দাদের উঁচু জায়গায় বা আরও ভেতরের দিকে সরে যেতে বলে। নৌযানের জন্য আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়: বন্দরে ও অগভীর উপকূলীয় পানিতে নৌকা নিরাপদে বাঁধতে এবং জলসীমার কাছ থেকে দূরে থাকতে; আর আগে থেকে গভীর পানিতে থাকা নৌকাগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকতে বলা হয়।
বাকোলকল আরও বলেন, পরাঘাতে আরও ধস হতে পারে বলে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ও ভবনে ফেরার আগে মানুষের নির্দেশনা নেওয়া উচিত। উপকূলীয় সতর্কতা শেষ হওয়ার পরও এই সতর্কতা প্রাসঙ্গিক ছিল।
যা এখনো নিশ্চিত নয়
চূড়ান্ত মৃত্যুসংখ্যা, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং ভবনের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ পরিমাণ তখনও নিশ্চিত হয়নি। প্রতিবেদনে হতাহতের ভিন্ন সংখ্যা এবং কোথায় বেশি মানুষ মারা গেছেন, সে বিষয়ে ভিন্ন বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রদেশভিত্তিক সমন্বিত হিসাব বা নিখোঁজদের নিশ্চিত তালিকা পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল ও স্কুলের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা, বিমানবন্দর পুনরায় খোলার সময় এবং ভবন পরিদর্শনের সময়সূচিও উল্লেখ করা হয়নি। সাড়াদান কার্যক্রমের প্রতিবেদনগুলোতে পরবর্তী ব্রিফিংয়ের সময় বা সমন্বিত ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন প্রকাশের কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ছিল ধসে পড়া স্থাপনার ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করা, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে থাকা নিরাপদ কি না তা যাচাই করা। সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও স্থলভাগে বিপদ অব্যাহত থাকার বিষয়টি জরুরি পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ: উপকূলীয় ঝুঁকি কমেছে, কিন্তু উদ্ধার অভিযান ও পরাঘাত চলেছে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ৮ জুন সকাল ৭টায় সারাঙ্গানির উপকূলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে।
- প্রতিবেদনে মৃত্যুসংখ্যা অন্তত ৩২ ও অন্তত ৩৫ বলা হয়েছে; আহত হয়েছেন প্রায় ২০০ বা তারও বেশি মানুষ।
- গ্লানে ভূমিধসে ১৩ জন গ্রামবাসী মারা যান; সারাঙ্গানিতে আরও চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
- উদ্ধারকারীরা জেনারেল সান্তোসের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে তল্লাশি চালান; সেখানে অন্তত চারজন নিখোঁজ বলে জানানো হয়।
- মালাপাতানে যন্ত্রের পরিমাপে VIII তীব্রতা রেকর্ড করা হয়, যা জানানো সেন্সর-পাঠগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
- কিয়াম্বায় সুনামির ঢেউ প্রায় ১.৪ মিটারে পৌঁছায়; ইন্দোনেশিয়া, পালাউ ও জাপানেও এর চেয়ে ছোট ঢেউ মাপা হয়।
- বিকেলের মাঝামাঝি ফিলিপাইনে সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও পরাঘাত ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন নিয়ে উদ্বেগ রয়ে যায়।
- ক্লাস বাতিল হয় এবং জেনারেল সান্তোস বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ১৭টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করা হয়।






