কেন নদী অববাহিকায় বিশাল পানি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পে খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ডজুড়ে সেচের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর দৌধন জলাধারের পানিতে প্রায় ৯,০০০ হেক্টর জমি ডুবে যাবে, যার মধ্যে রয়েছে পান্না জাতীয় উদ্যানের ৪,১৪১ হেক্টর। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পরিবেশগত মূল্যায়নে উল্লেখ করা এই পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করে, কৃষকদের জীবনরেখা হিসেবে তুলে ধরা প্রকল্পটি কেন এমন এক বিরোধে পরিণত হয়েছে, যেখানে উচ্ছেদ হতে চলেছে মানুষের বাড়িঘর, বন ও জীবিকা।
সূচিপত্র
- কেন নদী অববাহিকায় বিশাল পানি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
- প্রকৌশল পরিকল্পনায় কী প্রতিশ্রুতি
- কত পরিবার উচ্ছেদের মুখে?
- ক্ষতিপূরণ বাড়লেও বিরোধ কেন থামেনি
- জীবিকার মূল্য শুধু বাড়ির দেয়ালে মাপা যায় না
- একাধিক প্রকল্পকে ঘিরে বিক্ষোভ আন্দোলন
- বনের ক্ষতি নথিভুক্ত, কাল্পনিক নয়
- পানির হিসাব নিয়ে বিরোধ এখনো রয়েছে
- সমীক্ষা ও আদালতের কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি
- বর্তমান বিরোধের প্রেক্ষাপট বোঝাতে যে তারিখগুলো গুরুত্বপূর্ণ
- মূল বিষয়গুলো
মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের মধ্যে এই সংযোগ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪,৬০৫ কোটি রুপি, অর্থাৎ ৪৪৬.০৫ বিলিয়ন রুপি। এটি বৃহত্তর জাতীয় নদী সংযোগ কর্মসূচির প্রথম বড় উপাদান, যার ব্যয় প্রায় ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভের বিবরণে কেন-বেতওয়া প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলা হয়েছে। জাতীয় কর্মসূচি এবং এই নির্দিষ্ট প্রকল্প দুটি আলাদা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি, একই প্রকল্পের পরস্পরবিরোধী হিসাব নয়।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে রয়েছেন বিট্টি বাই কোন্দার। তাঁর চার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে তাঁর সঙ্গে বিক্ষোভ করছেন। কেন নদীতে দাঁড়িয়ে, মুখে কাদা মেখে তিনি সেই জমির সঙ্গে তাঁর পরিবারের সম্পর্কের কথা বলেন, যে জমিতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাঁরা চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানির উচ্চতা বেড়ে তাঁদের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা কোন্দার আরও ভালো ক্ষতিপূরণ ও বসবাসের জায়গার দাবি জানিয়ে ক্ষতির বর্ণনা দেন এভাবে:
সরকার আমাদের থাকার জন্য অন্য জায়গা না দিয়েই জমি ও পানি কেড়ে নিচ্ছে।
প্রতীকী চিতায় শুয়ে থাকা নারী এবং পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসিন্দারা উচ্ছেদ নিয়ে বিরোধটি সবার সামনে তুলে ধরেছেন। তবে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর বিক্ষোভ সব একই বাঁধকে কেন্দ্র করে নয়। কোন আন্দোলন কোন প্রকল্পের, আর জমির ক্ষতিপূরণ ও প্রকৃত পুনর্বাসনের মধ্যে পার্থক্য—এসব আলাদা করে দেখা এখনো অমীমাংসিত বিষয়গুলো বুঝতে জরুরি।
প্রকৌশল পরিকল্পনায় কী প্রতিশ্রুতি
জাতীয় পানি উন্নয়ন সংস্থার পরিবেশগত মূল্যায়নের সারাংশ, যা ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এএফসি ইন্ডিয়া লিমিটেড প্রস্তুত করে, তাতে দৌধন গ্রামের কাছে একটি বাঁধের কথা বলা হয়েছে, যা বিদ্যমান গাঙ্গাউ বাঁধের ২.৫ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত হবে। পরিকল্পনায় মোট ২,৮৫৩ মিলিয়ন ঘনমিটার ধারণক্ষমতার জলাধার এবং প্রায় ২১৮.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খালের প্রস্তাব রয়েছে, যার শেষ হবে বারওয়া সাগরে।
খালটি বছরে ১,০৭৪ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি বহনের জন্য নকশা করা হয়েছিল, যার ৫৯১ মিলিয়ন ঘনমিটার বেতওয়া নদীতে সরিয়ে নেওয়ার কথা। নদী অববাহিকার মধ্যে পানি স্থানান্তর বলতে এক নদী ব্যবস্থার পানি অন্য নদী ব্যবস্থায় নেওয়া বোঝায়; মূল অববাহিকার ভেতর ভাটির দিকে পানি প্রবাহিত হওয়া নয়।
২০১২ সালের প্রথম পর্যায়ের পরিকল্পনায় মধ্যপ্রদেশের নতুন সেচ কমান্ড এলাকায় বছরে ৩২৩,০০০ হেক্টর, উত্তরপ্রদেশের বিদ্যমান কমান্ড এলাকায় ২৫২,০০০ হেক্টর এবং খালের দুই পাশে ৬০,২৯৪ হেক্টর জমিতে সেচের কথা বলা হয়। এই তিন শ্রেণি মিলিয়ে মোট ৬৩৫,২৯৪ হেক্টর। কমান্ড এলাকা বলতে সেচ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার জন্য নির্ধারিত কৃষিজমিকে বোঝায়।
একই মূল্যায়নে প্রায় ১.৩৪২ মিলিয়ন মানুষের পানীয় জল এবং ৭৮ মেগাওয়াট জলবিদ্যুতের পরিকল্পনা ছিল। সাম্প্রতিক প্রকল্প বিবরণে আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে: ৯০৪,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ, ১০৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ ও ২৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, পাশাপাশি বছরে প্রায় ১৯৪ মিলিয়ন ঘনমিটার পানীয় জল।
পরবর্তী বিবরণগুলোতে লোয়ার ওর প্রকল্প, কোঠা ব্যারাজ, বিনা কমপ্লেক্স বহুমুখী প্রকল্প এবং কেন খাল ব্যবস্থার সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পের পরিধির এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: ২০১২ সালের প্রথম পর্যায়ের পরিসংখ্যান এবং পরবর্তী মোট লক্ষ্যমাত্রাকে অভিন্ন প্রতিশ্রুতি বা ইতিমধ্যে দেওয়া সুবিধার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কত পরিবার উচ্ছেদের মুখে?
২০১২ সালের ডিসেম্বরের মূল্যায়নে জলাধারের ১০টি গ্রামের প্রায় ১,৫৮৫টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কথা বলা হয়েছে। এতে ৮০৬টি পরিবারকে প্রকল্পের পুনর্বাসনের আওতায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পান্না টাইগার রিজার্ভের ভেতরে থাকা চার গ্রামের ৭৭৯টি পরিবারকে জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের বিধান অনুযায়ী রাজ্য বন বিভাগের মাধ্যমে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনিক এই বিভাজন ওই পরিবারগুলোর মানবিক ক্ষতি কমায় না।
পরবর্তী একটি পুনর্বাসন পরিকল্পনায় ১০টি গ্রামের ১,৯১৩টি পরিবার, অর্থাৎ ৮,৩৩৯ জনের কথা বলা হয়েছে। এটি আগের মূল্যায়নের তুলনায় ৩২৮টি পরিবার বেশি। আরেকটি বিবরণে ২১টি গ্রামের ৭,১৯৩টি পরিবারের জন্য জমি অধিগ্রহণের বৃহত্তর পরিসরের কথা আছে, যার মধ্যে ছত্তিশগড়ে ১৪টি এবং পান্নায় সাতটি গ্রাম রয়েছে। এই হিসাবগুলো ভিন্ন সময়কাল বা এলাকার; এগুলো একত্র করে উচ্ছেদের একটিমাত্র সংখ্যা বলা যায় না।
পুরোনো মূল্যায়নেই একটি অসংগতি রয়েছে: এক জায়গায় ১,৫৮৫-কে মোট জনসংখ্যা বলা হয়েছে, আবার অন্যত্র এই সংখ্যাকে পরিবারের সংখ্যা বলা হয়েছে এবং সমীক্ষা এলাকার জনসংখ্যা ৭,২২৪ উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণে হালনাগাদ, সমন্বিত তালিকা প্রয়োজন।
জমির হিসাবও সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। মূল্যায়নে জলাধারের মোট প্লাবন এলাকা ৯,০০০ হেক্টর বলা হয়েছে, তবে জলাধারের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির পরিমাণ আলাদাভাবে ২,১৭১ হেক্টর উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে ছোট এই সংখ্যাটিকে বৃহত্তর প্লাবিত এলাকার ভেতরে গ্রামের জমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মূল্যায়নে খাল, কেন নদীর বাম তীরের খাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আরও ৪,২০৯.৬৭ হেক্টর এবং টাউনশিপ ও সুযোগ-সুবিধার জন্য ৪২.৩৭ হেক্টর জমির হিসাব রয়েছে।
ক্ষতিপূরণ বাড়লেও বিরোধ কেন থামেনি
জমির ক্ষতিপূরণ প্রতি হেক্টরে অন্তত ১২.৫ লাখ রুপি বলে জানানো হয়েছে, যা প্রাথমিক প্রস্তাবের ৫ লাখ রুপির চেয়ে বেশি। অর্থাৎ আগের অঙ্কের আড়াই গুণ। কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষিত নীতি হলো, প্রতি হেক্টরে ১২.৫ লাখ রুপি অথবা ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পুনর্বাসন-পরবর্তী পুনর্বাসনে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও স্বচ্ছতার অধিকার আইনে হিসাব করা অঙ্ক—এই দুটির মধ্যে যেটি বেশি, তা দেওয়া হবে।
বাড়িঘর, গাছ, কুয়া ও অন্যান্য সম্পদের মূল্য আলাদাভাবে নির্ধারণ করার কথা। প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের একটি বিশেষ প্যাকেজের কথা বলা হয়েছে, যাতে প্রাপ্তবয়স্কপ্রতি ১২.৫ লাখ রুপি দেওয়ার কথা ছিল; বিবাহিত দম্পতিকে একটি ইউনিট হিসেবে গণনা করা হয়। বাড়ির জন্য ৫০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ রুপি দেওয়ার কথাও রয়েছে। অন্য একটি বিবরণে যোগ্য পরিবারকে জমিসহ ৭ লাখ রুপি অথবা জমি ছাড়া ১২.৫ লাখ রুপি সহায়তার কথা বলা হয়েছে। এসব বিবরণে ভিন্ন ভিন্ন সুবিধার কথা আছে; সব পরিবারের জন্য এক অভিন্ন অর্থপ্রদানের প্রমাণ এগুলো নয়।
বিক্ষোভের বিবরণে জেলা প্রশাসক হিসেবে চিহ্নিত ঊষা পরমার বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। ছত্তিশগড়ের জেলাশাসক পার্থ জয়সওয়াল আলাদাভাবে বলেন, প্রায় ৭৫০ কোটি রুপি বিতরণ করা হয়েছে এবং দৌধনের ৩০ থেকে ৩৫টি মামলা এখনো অমীমাংসিত। এই বক্তব্যগুলোর কোনোটিই প্রমাণ করে না যে প্রতিটি সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ হয়েছে বা বিকল্প আবাসন ও পরিষেবা প্রস্তুত।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে, পরিবারের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং বিকল্প সম্পদের মূল্যের চেয়ে কম অর্থ দেওয়া হয়েছে। সুকভাহার সোনু সৌর বলেন, দুই একর জমির জন্য তিনি ১০ লাখ রুপি পেয়েছেন, অথচ কাছাকাছি জমি প্রতি একর ১২ লাখ রুপিতে বিক্রি হচ্ছিল। তাঁর হিসাবে, সমমানের দুই একর কিনতে ২৪ লাখ রুপি লাগবে। এই তুলনা স্থানীয় দাম নিয়ে একজন বাসিন্দার বক্তব্য, যাচাইকৃত বাজারমূল্য নয়।
কাদওয়ারার বিনোদ আহিরওয়ারের বক্তব্য, প্রায় ১০ লাখ রুপি খরচে নির্মিত বাড়িটির মূল্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার রুপি। অন্য বিক্ষোভকারীরা নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামে বসবাস করেন না এমন ব্যক্তিদের কথিত অর্থপ্রাপ্তির তদন্ত দাবি করছেন। এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অনিয়মের ঘটনা থেকে আলাদা করে দেখা দরকার।
জীবিকার মূল্য শুধু বাড়ির দেয়ালে মাপা যায় না
২০১২ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসত কৃষিভিত্তিক কাজ থেকে; বনজ গৌণ পণ্য থেকে আসত আরও ৮ শতাংশ। শ্রমজীবীদের মধ্যে কৃষিশ্রমিকের হার ছিল প্রায় ৫৬.৩৮ শতাংশ এবং চাষির হার ৩৮ শতাংশ। ফলে উচ্ছেদে শুধু বাড়ির মালিকানা নয়, কাজ ও সম্পদে প্রবেশাধিকারও হুমকির মুখে পড়ে।
মেইনারির বাসিন্দা ভগবতী সৌর বলেন, তাঁদের পরিবারের প্রায় পাঁচ একর জমিতে আম, মহুয়া ও পেয়ারা গাছ রয়েছে। সাক্ষাৎকারের সময় তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ বা এ-সংক্রান্ত নোটিশ পাননি। অন্য বাসিন্দারাও বলেন, সমীক্ষায় বাড়িঘর, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বা বয়স্ক আত্মীয়দের নাম বাদ পড়েছে। এমন বাদ পড়া নির্ধারণ করতে পারে কোনো পরিবার আলাদা পুনর্বাসন সুবিধা পাবে কি না।
স্থানীয় পুরোহিত ধনিরাম ভাটনগর বলেন, তিনি যে মন্দিরে কাজ করতেন সেটি ডুবে গেছে এবং ক্ষতিপূরণে তাঁর বাড়ির কথা বিবেচনা করা হলেও হারানো আয়ের বিষয়টি ধরা হয়নি:
মন্দিরই ছিল আমার আয়ের একমাত্র উৎস, আর এখন সেটি আর নেই।
পরিবেশগত মূল্যায়নে স্থানীয় মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে এবং নতুন পুনর্বাসন উপনিবেশে সেগুলো প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে মন্দির পুনর্নির্মাণ করলেই পুরোহিতের আয় বা তাঁকে সহায়তাকারী সম্প্রদায়ের জীবিকা পুনরুদ্ধার হয়েছে, তা প্রমাণ হয় না।
দৌধন থেকে সড়কপথে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কাওয়ার করোন্দিয়ায় জমির প্লট পাওয়া বাসিন্দাদের পানির সরবরাহ অপর্যাপ্ত বলে খবর রয়েছে। ৫,০০০ লিটারের ট্যাংকারের জন্য তাঁদের ৫০০ রুপি দিতে হয়। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবরের পুনর্বাসন আদেশে পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সুবিধার ব্যবস্থা রাখার কথা আছে। ট্যাংকারের ওপর নির্ভরতার খবর দেখায়, অর্থপ্রদানের নথি এবং সম্পন্ন পুনর্বাসন এক বিষয় নয়।
একাধিক প্রকল্পকে ঘিরে বিক্ষোভ আন্দোলন
কেন-বেতওয়া প্রকল্পবিরোধী আন্দোলনে ২০২৩ সালে ১৮ দিন ধরে প্রতীকী চিতায় অবস্থান, অনশন এবং ২০২৬ সালের বিক্ষোভ ছিল। বাসিন্দারা বিকল্প কৃষিজমি চান, যার মধ্যে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারপ্রতি তিন একর জমির দাবি এবং যোগ্যতা নির্ধারণের শেষ তারিখ ২০২৬ সাল করার দাবিও রয়েছে। এগুলো দাবি, ক্ষতিপূরণ নীতিতে নিশ্চিত পরিবর্তন নয়।
দৌধনের বিবরণে ২০২৬ সালের ১৩ মে উচ্ছেদের কথা রয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি এবং সরকারি জমিতে থাকা খালি স্থাপনা সরানো হয়েছে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, যথেষ্ট আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়নি। ৮ জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনেও বর্ষাকালে জোর করে স্থানান্তর ও স্থাপনা ভাঙার অভিযোগ এবং ন্যায্য পুনর্বাসনের দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পুলিশ কুপিতে কর্মী অমিত ভাটনগর ও অন্য বিক্ষোভকারীদের আটক করে; এতে আন্দোলনের সেই পর্যায়ের অবসান ঘটে বলে খবর। বাসিন্দারা এই হস্তক্ষেপকে তাঁদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন। স্থাপনা ভাঙা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্ত করা দরকার; কোনো একটি বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত সত্য ধরে নেওয়া যায় না।
২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর তারিখের একটি পৃথক বিবরণে মধ্যপ্রদেশ সরকারের মাঝগাঁও সেচ প্রকল্পের বিরুদ্ধে পান্না জেলায় পানি নিয়ে বিক্ষোভের কথা রয়েছে। ৬ অক্টোবর বানহারি কালানে নারীরা পানিতে নামেন এবং তাঁদের কেউ কেউ প্রতীকী চিতায় শুয়ে পড়েন। ওই বিবরণে এই আন্দোলনকে ছত্তিশগড়ে এর আগে হওয়া কেন-বেতওয়া বিক্ষোভ থেকে আলাদা বলা হয়েছে। বিক্ষোভের ধরন ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে উদ্বেগের মিল থাকলেও প্রকল্প দুটিকে এক করে দেখা উচিত নয়।
বনের ক্ষতি নথিভুক্ত, কাল্পনিক নয়
২০১২ সালের মূল্যায়নে ৫,২৫৮ হেক্টর বনভূমি ডুবে যাওয়ার হিসাব রয়েছে, যার মধ্যে পান্না জাতীয় উদ্যানের ৪,১৪১ হেক্টর। ফলে জলাধারের ৯,০০০ হেক্টর এলাকার প্রায় ৫৮.৪ শতাংশ বনভূমি। ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমির প্রায় ৭৮.৮ শতাংশ পড়েছে জাতীয় উদ্যানের অংশে।
জাতীয় উদ্যানের ঘোষিত ৫৪,৩০০ হেক্টর আয়তনের তুলনায় মূল্যায়নে আবাসস্থল কমে যাওয়ার হার ৭.৬৭ শতাংশ বলা হয়েছে। এতে সতর্ক করা হয়েছে, জলাধার গড়ে উঠলে বাঘের বিচরণে প্রভাব পড়তে পারে এবং স্থলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিরোধের বিষয় শুধু কতটুকু জমি হারাবে তা নয়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের কোথায় সেই জমি অবস্থিত, সেটিও।
মূল্যায়নে ভাটির দিকে নদীর প্রবাহ, পানির রাসায়নিক গঠন ও তাপমাত্রায় পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। জলাধার ও সেচ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়বে বলে এতে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে বর্ষার পর যেসব স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ইতিমধ্যে ভূপৃষ্ঠের দুই মিটারের কম নিচে থাকে, সেখানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, পরিবেশের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয়, তবে বৃক্ষরোপণ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মতো ব্যবস্থা নিয়ে তা কমানো যেতে পারে। ২০১২ সালের মূল্যায়নে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের জন্য ২,৯১৫.০৬ কোটি রুপি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার জন্য ৩,৫৪৩.৯৮ কোটি রুপি বরাদ্দের কথা রয়েছে। এগুলো ২০১২ সালের সমীক্ষার হিসাব; বর্তমানে কত ব্যয় হয়েছে বা সংরক্ষণের কী ফল এসেছে, তার যাচাইকৃত বিবরণ নয়।
পানির হিসাব নিয়ে বিরোধ এখনো রয়েছে
প্রকল্পের মূল যুক্তি হলো, কেন নদীতে থাকা পানি বেতওয়া অববাহিকার ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করতে পারে। সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপলের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাকুর এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন:
এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে, কারণ এটি একটি জলবিদ্যাগত অনুমানের ওপর নির্ভর করছে: কেন অববাহিকায় উদ্বৃত্ত পানি আছে এবং বেতওয়া অববাহিকায় ঘাটতি রয়েছে।
ঠাকুর আরও বলেন:
এই অনুমান কখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০১২ সালের মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় সরকার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের মধ্যে ২০০৫ সালের ২৫ আগস্টের চুক্তির অধীনে পানি বণ্টনের কথা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে দৌধনে কেন নদী থেকে পরিবেশগত প্রয়োজন বাদ দিয়ে ৩,৩৮৭ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে; এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশের জন্য ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং মধ্যপ্রদেশের জন্য ১,৬৮৭ মিলিয়ন ঘনমিটার বরাদ্দ ছিল।
এরপর বলা হয়েছে, বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরির সময় হিসাব করা পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির ফলে মধ্যপ্রদেশ ২,৩৭৯.৬২ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ব্যবহার করতে পারবে। তাই পানির ভারসাম্যের হিসাব একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: প্রস্তাবিত পানি স্থানান্তরের পাশাপাশি বিদ্যমান সেচ, পানীয় জল এবং নদীর প্রবাহ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পানিও নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের এক মুখপাত্রের কাছে বৈজ্ঞানিক অনুমান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি; বরং বুন্দেলখণ্ডে সেচ, পানীয় জল ও জলবিদ্যুতের সুবিধা নিয়ে ২১ আগস্টের একটি বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন। বিবরণে ওই বিবৃতির বছর উল্লেখ করা হয়নি। মূল্যায়নে প্রকল্পের হিসাব ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তবে নির্ভরযোগ্য উদ্বৃত্ত পানির বিষয়ে ঠাকুরের প্রশ্নের মীমাংসা করা হয়নি।
সমীক্ষা ও আদালতের কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি
প্রশাসকেরা ক্ষতিপূরণের তালিকা আরও যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে জয়সওয়াল বলেন, বাদ পড়া নাম যাচাই করতে দল মাঠে কাজ করছে। বিজাওয়ার মহকুমা শাসক বিজয় দ্বিবেদী জানান, ছত্তিশগড়ের ১৪টি গ্রামে বসতভিটার জন্য ৮৪ কোটি রুপি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির জন্য ২৬৭ কোটি রুপি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩,৭১৮টি পরিবারের জন্য ৪৬৪ কোটি রুপির একটি প্যাকেজ রয়েছে। তারিখ ও পরিধি যাচাই না করে এই শ্রেণিগুলোর অঙ্ক অন্য প্রতিবেদনে দেওয়া মোট হিসাবের সঙ্গে যোগ করা উচিত নয়।
পরে জেলাশাসক মৃণাল মীনা পাঁচটি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত ৫৯ জনের জন্য ৭.৩৭ কোটি রুপি বরাদ্দের কথা জানান এবং নতুন সমীক্ষার নির্দেশ দেন। বাদ পড়া নাম, পরে যুক্ত হওয়া ব্যক্তি এবং যোগ্যতা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রামভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রতিবেদনগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অরিহন্ত তিওয়ারি বনাম ভারত সরকার মামলায়, মামলা নম্বর WP/14875/2026, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কেন্দ্রীয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটির ২০১৯ সালের প্রতিবেদন নিয়ে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে রাজ্যের জবাব চেয়েছে। মামলাটি পান্না টাইগার রিজার্ভ, কেন ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য এবং উচ্ছেদ হওয়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত ছাড়পত্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জটি জাতীয় পরিবেশ আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল; পরে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি কমিটির কাছে পাঠায়।
হাইকোর্ট আলাদা অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠনের আবেদন নাকচ করে বলেছে, তাতে সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি হবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মানা হয়নি, এমন অনুমান করতেও আদালত অস্বীকৃতি জানায়। জবাব চাওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রকল্পটি বেআইনি বলে রায় দেওয়া হয়েছে, কিংবা পরিবেশগত আপত্তিগুলোর সমাধান হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম সম্পর্কে ব্যাখ্যা এবং ভারতের পানিসংক্রান্ত সংঘাতবিষয়ক নীতি সংলাপ ফোরামের ২০২২ সালের ২১ জানুয়ারির চিঠির জবাব চেয়েছে আদালত। ২০২৬ সালের মামলা-সংক্রান্ত বিবরণে ১৩ অক্টোবর শুনানির তারিখ দেওয়া হয়েছিল; পরবর্তী কোনো ফলাফলের কথা জানানো হয়নি। আলাদাভাবে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্তে প্রকল্প চালুর আগে পুনর্বাসন ও পুনর্বাসন-পরবর্তী পুনর্বাসনের বিষয়গুলো সম্পন্ন করার কথা রয়েছে।
বর্তমান বিরোধের প্রেক্ষাপট বোঝাতে যে তারিখগুলো গুরুত্বপূর্ণ
প্রকল্পটি কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে, আর ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ ও বিক্ষোভের নিজস্ব সময়সূচি রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা প্রধান ঘটনাগুলো হলো:
- ২৫ আগস্ট ২০০৫: কেন্দ্রীয় সরকার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরিতে সম্মত হয়।
- ডিসেম্বর ২০১২: প্রথম পর্যায়ের পরিবেশগত মূল্যায়নে প্রকৌশল পরিকল্পনা, উচ্ছেদের হিসাব এবং বনভূমির ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরা হয়।
- ২০১৯: কেন্দ্রীয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
- ডিসেম্বর ২০২১: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা প্রকল্পটি অনুমোদন করে।
- সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ২০২৩: বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ এবং ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত আদেশ ঘোষণা করা হয়।
- এপ্রিল ২০২৫: নির্মাণকাজের গতি বাড়ে বলে খবর।
- মে থেকে জুলাই ২০২৬: উচ্ছেদ, ক্ষতিপূরণ যাচাই ও বিক্ষোভের খবর প্রকাশিত হয়; এরপর ১৯ জুলাই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটক করে।
- অক্টোবর ২০২৬: পান্নায় মাঝগাঁও প্রকল্পের বিরুদ্ধে পৃথক বিক্ষোভের বিবরণ আসে, আর কেন-বেতওয়া মামলাটি ১৩ অক্টোবর শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়।
অমীমাংসিত বিষয়গুলোর বাস্তবসম্মত যাচাই এখনো জরুরি: ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের যাচাইকৃত তালিকা, সম্পদের ন্যায্য মূল্যায়ন, কার্যকর পুনর্বাসন পরিষেবা এবং পরিবেশ ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত শর্ত মেনে চলা। নির্মাণের অগ্রগতি ও বিতরণ করা অর্থ এই চিত্রের অংশ, তবে কোনোটিই একা প্রমাণ করে না যে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো নতুন করে জীবন গড়তে পারবে।
মূল বিষয়গুলো
- কেন-বেতওয়া প্রকল্পের ব্যয় ৪৪,৬০৫ কোটি রুপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে; এর লক্ষ্য বুন্দেলখণ্ডের চাহিদা মেটাতে পানি স্থানান্তর করা।
- ২০১২ সালের মূল্যায়নে ৯,০০০ হেক্টর জমি ডুবে যাওয়ার হিসাব রয়েছে, যার মধ্যে পান্না জাতীয় উদ্যানের ৪,১৪১ হেক্টর।
- পরিবারের সংখ্যা সময়কাল ও প্রকল্পের পরিধি অনুযায়ী ভিন্ন: পুরোনো মূল্যায়নে ১,৫৮৫টি পরিবার, পরবর্তী জলাধার পরিকল্পনায় ১,৯১৩টি এবং বৃহত্তর অধিগ্রহণ এলাকায় ৭,১৯৩টি পরিবার।
- যোগ্যতার তালিকা, সম্পদের মূল্যায়ন, জীবিকার ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প বসতিতে জীবনযাপনের পরিস্থিতি নিয়ে বাসিন্দাদের আপত্তি রয়েছে।
- পান্নায় মাঝগাঁও প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কেন-বেতওয়া আন্দোলন থেকে পৃথক।
- প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরও সমীক্ষা ও আদালতে জবাব এখনো বাকি; পরবর্তী শুনানির ফলাফল বা পুনর্বাসন সম্পন্ন হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।






