পুনঃক্রয়ে বড় বন্ড পরিশোধের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমল
৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিলামের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১,৭১৬.১৪ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ড পুনঃক্রয় করেছে। এতে নভেম্বরে আসন্ন বড় অঙ্কের পরিশোধ কমেছে, পাশাপাশি সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয় পদ্ধতি প্রয়োগের পরীক্ষা হয়েছে। অর্থ বিভাগের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক এ কার্যক্রম পরিচালনা করে। জমা পড়া ৫৬টি দরপত্রের মধ্যে নিলাম কমিটির শর্ত অনুযায়ী মূল্য প্রস্তাব করা দরপত্রগুলোই গ্রহণ করা হয়।
সূচিপত্র
- পুনঃক্রয়ে বড় বন্ড পরিশোধের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমল
- নিলামে যা গ্রহণ করা হয়েছে, আর যা বাকি রয়েছে
- বন্ডধারীরা কীভাবে মূল্য প্রস্তাব জমা দিয়েছেন
- তারিখ ও ঐতিহাসিক দাবির ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার
- উচ্চ কুপনের সঙ্গে কমতে থাকা বাজার ইল্ড
- সুদের অর্থপ্রদান কমা মানেই প্রমাণিত সাশ্রয় নয়
- আগে নগদ অর্থ পেয়ে ব্যাংকগুলোর লাভ
- ভবিষ্যৎ নিলাম নির্ভর করবে নগদ অর্থ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর
- মূল বিষয়গুলো
এই কার্যক্রমের আওতাভুক্ত বন্ডের বকেয়া স্থিতি ছিল ৬,৬৬৬.৫৮ কোটি টাকা এবং এর বার্ষিক কুপন হার ছিল ১২.৩০%। গৃহীত পরিমাণ বকেয়া স্থিতির প্রায় ২৫.৭%, ফলে মেয়াদপূর্তিতে প্রায় ৪,৯৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এক কোটি টাকা ১ কোটি? না, ১০ মিলিয়ন টাকার সমান; গৃহীত পরিমাণ প্রায় ১৭.১৬ বিলিয়ন টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিশোধের চাপ ছড়িয়ে দেওয়া, পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি কমানো এবং সরকারের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি আরও ভারসাম্যপূর্ণ করাই এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি হলো, বিদ্যমান ঋণের মেয়াদ শেষ হলে ঋণগ্রহীতা নতুন অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারা, অথবা কেবল উচ্চ সুদে তা করতে পারার আশঙ্কা।
নিলামের ফলাফল এ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতাও দেখায়। লক্ষ্যবস্তু বন্ডের মাত্র প্রায় ৩০.২% বিক্রির জন্য প্রস্তাব করেছিলেন ধারকেরা, আর সরকার ওই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দরপত্র প্রত্যাখ্যান করে। ফলে প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রায় পুরো ইস্যু অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অধিকাংশ ঋণ বকেয়া থেকে যায়।
বাংলাদেশের প্রথম বন্ড পুনঃক্রয় হিসেবে এ লেনদেনকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক বিষয় বিবেচনা করা দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নামে প্রকাশিত বক্তব্যে এটিকে প্রথম বা নতুন উদ্যোগ বলা হয়েছে। তবে অন্য প্রতিবেদনগুলোতে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে আগের একটি সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান ঋণ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে এ কার্যক্রম নতুন একটি পদ্ধতি যুক্ত করেছে, তবে দেশের প্রথম এমন লেনদেন কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
নিলামে যা গ্রহণ করা হয়েছে, আর যা বাকি রয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক অংশ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৫৬টি দরপত্রের মোট মূল্য ২,০১৬.১৪ কোটি টাকা বলা হয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে এ অঙ্ক ২,০১৬.১৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ ০.০৪ কোটি বা ৪ লাখ টাকার পার্থক্য রয়েছে। উভয় প্রতিবেদনে গৃহীত পরিমাণ ১,৭১৬.১৪ কোটি টাকা বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া দরপত্রের মোট অঙ্ক ধরে হিসাব করলে সরকার প্রস্তাবিত অর্থের প্রায় ৮৫.১% গ্রহণ করেছে। তবে এই তুলনামূলক উচ্চ গ্রহণের হারকে পুরো বন্ড ইস্যুতে ব্যাপক অংশগ্রহণ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়: গৃহীত অঙ্ক বকেয়া স্থিতির মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
নিলামের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল প্রায় ৬,৬৬৭ কোটি টাকা। নিলামের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, পুরো অঙ্ক কিনতে সরকার বাধ্য নয়; বাজারের ইল্ডের ওপর নির্ভর করে কম পরিমাণও গ্রহণ করা হতে পারে। তাই চূড়ান্ত ফল ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়ে কম হলেও নিলামের নির্ধারিত শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে, এমনটা জরুরি নয়।
বাকি স্থিতির হিসাব সরাসরি করা যায়: ৬,৬৬৬.৫৮ কোটি টাকা থেকে গৃহীত ১,৭১৬.১৪ কোটি টাকা বাদ দিলে থাকে ৪,৯৫০.৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ কার্যক্রমে মেয়াদপূর্তির পরিশোধ প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে, নভেম্বরে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা পুরোপুরি দূর হয়নি। মূল অঙ্কের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের ব্যবস্থা সরকারকে এখনও করতে হবে।
বন্ডধারীরা কীভাবে মূল্য প্রস্তাব জমা দিয়েছেন
এ লেনদেনে একাধিক মূল্যভিত্তিক রিভার্স নিলাম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রচলিত সরকারি বন্ড নিলামে বিনিয়োগকারীরা সিকিউরিটিজ কিনে সরকারকে ঋণ দেওয়ার জন্য দর দেন। এ রিভার্স নিলামে বিদ্যমান ধারকেরা সিকিউরিটিজ ফিরিয়ে বিক্রির প্রস্তাব দেন এবং কোন দামে বিক্রি করতে রাজি, তা জানান।
প্রত্যেক সফল দরদাতা নিজের গৃহীত প্রস্তাবিত মূল্য পান; সব বিক্রেতার জন্য একক মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। মূল্য বা ইল্ড-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ না হলে নিলাম কমিটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এ ভিত্তিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দরপত্র প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
সরকারি সিকিউরিটিজের নিলামে সরাসরি অংশগ্রহণকারী প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলো নিজেরাই দরপত্র জমা দিতে পারে। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সংযুক্ত প্রাইমারি ডিলারদের সাহায্যে অংশ নিতে পারে। নিষ্পত্তির শর্ত অনুযায়ী, গৃহীত মূল্য এবং নিষ্পত্তির তারিখ পর্যন্ত জমা হওয়া সুদ পরিশোধ করার কথা।
তারিখ ও ঐতিহাসিক দাবির ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার
বন্ডটির পরিচিতি নম্বর ISIN BD0926191026। প্রতিবেদনগুলোতে এটিকে ১২.৩০% বার্ষিক কুপনযুক্ত দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড বলা হয়েছে; এর মেয়াদপূর্তির তারিখ ৬ নভেম্বর। পুনঃক্রয়ের নিষ্পত্তির তারিখ ছিল ১২ অক্টোবর।
প্রতিবেদনগুলোতে দেওয়া ঘটনাক্রম অনুযায়ী, নিলাম ও অর্থ পরিশোধ নভেম্বরে মেয়াদপূর্তির আগেই হওয়ার কথা:
- ডিসেম্বর ২০০৯: আগের একটি সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ে ব্যাংকিং খাতের বাইরের চারটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৫০৩ কোটি টাকার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল।
- ৪ বা ৬ নভেম্বর ২০২৪: সাম্প্রতিক কার্যক্রমের আওতাভুক্ত বন্ডটির মূল ইস্যুর তারিখ নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
- ৮ অক্টোবর: বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃক্রয়ের নিলাম করে ১,৭১৬.১৪ কোটি টাকা গ্রহণ করে।
- ১২ অক্টোবর: নিষ্পত্তির তারিখ নির্ধারিত ছিল; বিক্রেতাদের গৃহীত মূল্য ও জমা হওয়া সুদ পাওয়ার কথা।
- ৬ নভেম্বর: বাকি বন্ডের মূল অঙ্কের মেয়াদপূর্তির তারিখ নির্ধারিত ছিল।
প্রতিবেদনগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মূল ইস্যুর তারিখ ৪ নভেম্বর ২০২৪ বলা হয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে ৬ নভেম্বর ২০২৪ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে মেয়াদপূর্তির বছর স্পষ্ট করে বলা হয়নি, তাই সাম্প্রতিক নিলামের নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার বছর নিশ্চিত করতে এসব তারিখের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
নিলামের তারিখ ও নিষ্পত্তির তারিখের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়াদপূর্তির ২৮ দিন আগে বন্ড কেনা হয়েছে; অন্যগুলোতে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাস আগে। ১২ অক্টোবরের নির্ধারিত নিষ্পত্তির তারিখ ৬ নভেম্বরের ২৫ দিন আগে। সুদ হিসাবের ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘোষিত শর্তে ওই তারিখ পর্যন্ত জমা হওয়া সুদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের নজির উল্লেখ করে এ লেনদেনকে ১৭ বছর পরের ঘটনা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক কার্যক্রমের বছর ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ না থাকায়, এসব তারিখ থেকে প্রকৃত ব্যবধান স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায় না। তবে আগের লেনদেনের নথি থাকায় সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে ‘প্রথমবার’ দাবি নিঃশর্তভাবে করা কঠিন।
উচ্চ কুপনের সঙ্গে কমতে থাকা বাজার ইল্ড
নতুন ইস্যু করা সরকারি বন্ডের ইল্ড কমার সময় এ নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। ওই সপ্তাহের শুরুতে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের একটি নিলামে ইল্ড ছিল ৮.২৪৯৯%; আগের নিলামে তা ছিল ৮.৮৬৮৫%। অর্থাৎ ০.৬১৮৬ শতাংশ পয়েন্ট বা প্রায় ৬২ বেসিস পয়েন্ট কমেছে। এক বেসিস পয়েন্ট হলো এক শতাংশ পয়েন্টের এক-শতাংশ।
পুনঃক্রয় করা বন্ডটির কুপন ছিল অনেক বেশি, ১২.৩০%। কুপন হলো বন্ডের অভিহিত মূল্যের ওপর চুক্তি অনুযায়ী প্রদেয় সুদের হার। ইল্ড হলো বন্ডের জন্য দেওয়া দাম এবং ভবিষ্যতে পাওয়া অর্থপ্রদানের ভিত্তিতে নির্ধারিত রিটার্ন। এ দুটি অঙ্ক পরস্পর সম্পর্কিত, তবে একে অপরের বিকল্প নয়।
একটি প্রতিবেদনে পুনঃক্রয়ের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য ইল্ড ৭% বলা হয়েছে। অন্যটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মূল্য প্রকাশ করেনি। এ বক্তব্য দুটি পরস্পরবিরোধী নাও হতে পারে: ইল্ডের সীমা ও ক্রয়মূল্য ভিন্ন পরিমাপ। তবে সরকার প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ দিয়েছে এবং বিক্রেতারা অভিহিত মূল্যের বেশি পেয়েছেন কি না, তা জানতে লেনদেনের মূল্য প্রয়োজন।
বন্ডের দাম সাধারণত ইল্ডের বিপরীত দিকে চলে। বিনিয়োগকারীরা যখন কম ইল্ডে রাজি হন, তখন নির্দিষ্ট অর্থপ্রদানের ধারার জন্য সাধারণত বেশি দাম দিতে হয়। এখানে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান বাজার ইল্ড কম হলেই ১২.৩০% কুপনের বন্ড সরকারের জন্য পুনঃক্রয় করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সস্তা হয়ে যায় না।
বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত বন্ডের পরিমাণ সীমিত হওয়া থেকে বোঝা যায়, ধারকদের কাছে আকর্ষণীয় কুপন ছিল এবং পরিশোধের সময়ও বেশি দূরে ছিল না। বন্ড ধরে রাখলে বাকি চুক্তিভিত্তিক অর্থপ্রদান পাওয়া যেত; বিক্রি করলে অর্থটি কোথায় বিনিয়োগ করবেন, তা বিনিয়োগকারীদের ঠিক করতে হতো। অংশগ্রহণের মাত্রা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। শুধু নিলামের অঙ্ক থেকে ব্যাংকগুলোর বিক্রি বা ধরে রাখার কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
সুদের অর্থপ্রদান কমা মানেই প্রমাণিত সাশ্রয় নয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেছেন, মেয়াদপূর্তির প্রায় এক মাস আগে বন্ড পুনঃক্রয় করায় ওই বাকি মাসের সুদ পরিশোধের দায় থেকে সরকার মুক্ত হবে। এর অর্থ হলো, অবসায়িত ঋণের ওপর ভবিষ্যতে যে সুদ দিতে হতো, তা আর দিতে হবে না। তবে শুধু এ তথ্য দিয়ে লেনদেনের নিট সাশ্রয় প্রমাণ হয় না।
আনুমানিক পরিমাণ বুঝতে একটি হিসাব সহায়ক। ১২.৩০% বার্ষিক কুপন হারে ১,৭১৬.১৪ কোটি টাকার ওপর এক বছরের সুদের এক-দ্বাদশাংশ প্রায় ১৭.৫৯ কোটি টাকা। এটি মাসিক সুদের একটি ধারণামূলক হিসাব, নিশ্চিত সাশ্রয়ের অঙ্ক নয়। প্রকৃত বাকি সুদ নির্ভর করবে নিষ্পত্তির সময় এবং বন্ডের চুক্তিতে নির্ধারিত হিসাব পদ্ধতির ওপর।
সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ে দেওয়া মূল্য, নিষ্পত্তি পর্যন্ত জমা হওয়া সুদ এবং ক্রয়ের অর্থ জোগাড়ের খরচও সরকারকে হিসাব করতে হবে। ধারকদের প্রিমিয়াম দিলে ভবিষ্যতে এড়ানো সুদের কিছু অংশ পুষিয়ে যেতে পারে। নতুন ঋণ নিয়ে ক্রয়ের অর্থ জোগাড় করা হলে সেই ঋণেরও খরচ থাকবে।
নতুন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কমায় ব্যয়বহুল ঋণের বদলে কম খরচের অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৮.৮৬৮৫% থেকে ৮.২৪৯৯%-এ ইল্ড কমা নতুন ঋণের সুদের হার হ্রাসের প্রমাণ। তবে এ থেকে প্রমাণ হয় না যে নির্দিষ্ট এই পুনঃক্রয়ের অর্থ ওই দুই হারের কোনো একটিতে নতুন ইস্যুর মাধ্যমে জোগাড় করা হয়েছে।
নিলামের তথ্য থেকে সবচেয়ে জোরালোভাবে বলা যায়, সরকার তার পরিশোধের বাধ্যবাধকতার একটি অংশ আগেই মিটিয়েছে এবং কেনা বন্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবিষ্যৎ অর্থপ্রদানের দায় সরিয়েছে। গৃহীত ক্রয়মূল্য ও অর্থায়নের বিস্তারিত ছাড়া সুদের নিট সাশ্রয় নির্ভুলভাবে হিসাব করা যায় না।
আগে নগদ অর্থ পেয়ে ব্যাংকগুলোর লাভ
অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য পুনঃক্রয়ের অর্থ হলো, নির্ধারিত পরিশোধের তারিখের আগেই সরকারি সিকিউরিটিজ নগদে রূপান্তর করা। এতে হাতে থাকা বন্ড বিক্রির আরেকটি পথ তৈরি হয় এবং ব্যাংকগুলো সেই অর্থ নতুন সরকারি সিকিউরিটিজ, ঋণ বিতরণ বা অন্য বিনিয়োগে কাজে লাগাতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ঋণ গ্রহণের খরচ ও বাজারের তারল্য নিয়ে প্রত্যাশিত সুবিধার কথা বলেছেন:
মেয়াদপূর্তির এক মাস আগে পুনঃক্রয়ের নিলাম আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সুদ ব্যয় কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি, এতে বাজারে তারল্য বাড়বে এবং সুদের হার কম রাখতে সহায়তা করবে।
প্রাইম ব্যাংকের কনজ্যুমার ব্যাংকিং বিভাগের ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মাহমুদুর রহমান সরকার ও বিনিয়োগকারী উভয়ের অবস্থান ব্যবস্থাপনার একটি উপায় হিসেবে এ কার্যক্রমের কথা বলেছেন:
বাংলাদেশের সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের জন্য পুনঃক্রয় পদ্ধতি একটি স্বাগত অগ্রগতি। এতে সরকার আরও দক্ষতার সঙ্গে ঋণ গ্রহণের খরচ ও মেয়াদপূর্তির কাঠামো সামলাতে পারবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বন্ডের অবস্থান পুনর্বিন্যাস বা বিক্রি করার জন্য বাড়তি তারল্য সুবিধা পাবেন।
এগুলো এ পদ্ধতি কীভাবে কাজ করতে পারে সে বিষয়ে প্রত্যাশা, এ নিলামের পরিমাপ করা ফলাফল নয়। আগে নগদ অর্থ পেলে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য বাড়তে পারে, কিন্তু পুনঃক্রয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন অর্থ সৃষ্টি হয় না। এর বৃহত্তর প্রভাব নির্ভর করে সরকার কীভাবে অর্থের জোগান দেয় এবং পরে ব্যাংকগুলো ওই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করে তার ওপর।
ভবিষ্যৎ নিলাম নির্ভর করবে নগদ অর্থ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর
ঋণ গ্রহণের খরচ ও ঝুঁকির ভারসাম্য, টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা এবং সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া সংস্কারের অংশ হিসেবে অর্থ বিভাগ এ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। বিভাগটি জানিয়েছে, মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এ পদ্ধতি অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা যোগ করে এবং সরকারি দায় ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি নিয়ে যায়। দায় ব্যবস্থাপনা বলতে বিদ্যমান ঋণের বাধ্যবাধকতা সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করাকে বোঝায়, যেখানে শুধু নতুন ইস্যু ও মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা করা হয় না।
কর্মকর্তারা এ নিলামকে বাজারের প্রতিক্রিয়া বোঝার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, সরকারের নগদ অর্থের অবস্থান, বাজারের তারল্য, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা এবং বকেয়া ঋণের কাঠামোর ওপর। এ কার্যক্রমের প্রতিবেদনগুলোতে আরেকটি নিলামের তারিখ বা পরিমাণ ঘোষণা করা হয়নি।
এর সরাসরি অর্জন হলো লক্ষ্যবস্তু মেয়াদপূর্তির দিনে পরিশোধের অঙ্ক কমে যাওয়া। তবে এতে প্রমাণ হয় না যে সরকারের মোট ঋণও একই পরিমাণ কমেছে; পুনঃক্রয়ের অর্থ বিদ্যমান নগদ থেকে এসেছে নাকি নতুন ঋণ থেকে, তার ওপর মোট ঋণের প্রভাব নির্ভর করে। পরবর্তী মূল্যায়নের জন্য নিষ্পত্তির বিস্তারিত, ক্রয়মূল্য এবং পরবর্তী ঋণ পরিশোধ ও ঋণ গ্রহণের খরচে কী পরিবর্তন আসে, তার প্রমাণ প্রয়োজন।
মূল বিষয়গুলো
- ৮ অক্টোবরের নিলামে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেজারি বন্ড পুনঃক্রয়ের ১,৭১৬.১৪ কোটি টাকার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।
- গৃহীত অঙ্ক ৬,৬৬৬.৫৮ কোটি টাকার বকেয়া স্থিতির প্রায় ২৫.৭%; মেয়াদপূর্তিতে প্রায় ৪,৯৫০ কোটি টাকা বাকি থাকবে।
- লক্ষ্যবস্তু বন্ডের বার্ষিক কুপন হার ছিল ১২.৩০%; নিষ্পত্তির তারিখ ১২ অক্টোবর এবং মেয়াদপূর্তির তারিখ ৬ নভেম্বর নির্ধারিত ছিল।
- প্রতিবেদনে দরপত্রের মোট অঙ্কে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। মূল ইস্যুর তারিখ ও এটি প্রথম পুনঃক্রয় কি না, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
- ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে আগের একটি সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ে ৫০৩ কোটি টাকার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল।
- নিলামের প্রতিবেদনগুলোতে গৃহীত ক্রয়মূল্য ও অর্থায়নের বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়ায় নিট সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি।
- আরও নিলাম হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের নগদ অর্থ, বাজারমূল্য, তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ওপর।






