বেশি মূলধন, প্রত্যাশিত চাকরি কম
২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের ১৪.২ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যার মধ্যে উৎপাদন প্রকল্প থেকে এসেছে ১২.১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার। তবে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান বেড়েছে ২০০৫ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডিবি) জানিয়েছে, এসব প্রতিশ্রুতির ফলে আগামী পাঁচ বছরে ১৫,৭০০টি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার কথা, যা ২০২৪ সালে পাওয়া বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৮,৭০০টি চাকরির চেয়ে কম।
সূচিপত্র
- বেশি মূলধন, প্রত্যাশিত চাকরি কম
- বিনিয়োগের পরিসংখ্যান আসলে কী মাপে
- কোন খাতে হবে চাকরি
- উৎপাদন খাত এগিয়ে, তবে খাতের পরিসর বিস্তৃত
- যুক্তরাষ্ট্রের অংশ কমেছে, চীনের বেড়েছে
- এআই চাহিদা তৈরি করছে, বদলাচ্ছে নিয়োগও
- চিকিৎসা ও কার্বন সেবায় নতুন প্রবৃদ্ধি
- প্রতিষ্ঠাতা, স্থানীয় অংশীদারত্ব ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণ
- কঠিনতর বিনিয়োগ বাজারের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ
- মূল তথ্য
ইডিবির ২০২৫ সালের বার্ষিক পর্যালোচনা ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যেও বিনিয়োগ স্থিতিশীল রয়েছে। স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ২০২৪ সালের ১৩.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার থেকে বেড়েছে। একই সময়ে বার্ষিক ব্যবসায়িক ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি ৮.৪ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৮.৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কর্মসংস্থানের নিম্নমুখী পূর্বাভাস মূলধনি ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। চাহিদা, আয় ও মুনাফা নিয়ে কোম্পানিগুলো আরও সতর্ক পূর্বাভাস দিচ্ছে, পাশাপাশি বাড়াচ্ছে স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। প্রত্যাশিত বার্ষিক মূল্য সংযোজন—অর্থাৎ এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে সরাসরি যে অবদান যুক্ত হবে—২৩.৫ বিলিয়ন থেকে কমে ১৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার হয়েছে।
নতুন স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির উৎস হিসেবে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে চীন। চীনের অংশ বেড়ে হয়েছে ২০.৬ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১৭.৩ শতাংশ। বছরটিতে পাওয়া বিনিয়োগের উৎসে এটি বড় পরিবর্তন।
এগুলো প্রতিশ্রুতি ও পূর্বাভাস, সম্পন্ন বিনিয়োগ বা ইতোমধ্যে পূরণ হওয়া চাকরির সংখ্যা নয়। আগামী পাঁচ বছরে কোম্পানিগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই কেবল অর্থনৈতিক অবদান আসবে। ইডিবি সতর্ক করেছে, বিনিয়োগ আকর্ষণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আরও কঠিন হবে।
বিনিয়োগের পরিসংখ্যান আসলে কী মাপে
স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ বলতে অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতিতে মূলধনি ব্যয় বোঝায়। মোট ব্যবসায়িক ব্যয়ে মজুরি ও ভাড়াসহ অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। ইডিবি এই দ্বিতীয় পরিসংখ্যানটি বার্ষিক হিসাবে প্রকাশ করে। তাই ৮.৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারকে পাঁচ বছরের পুরো বাস্তবায়নকালজুড়ে মোট ব্যয় হিসেবে ধরা উচিত নয়।
মূল্য সংযোজন একটি কোম্পানির মোট দেশজ উৎপাদনে সরাসরি অবদান মাপে; সরবরাহকারী ও অন্যান্য ব্যবসার ওপর বৃহত্তর প্রভাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের পূর্বাভাসটিও বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যাশিত বার্ষিক হিসাব, অর্থনৈতিক উৎপাদনে তাৎক্ষণিক সংযোজন নয়।
প্রকাশিত মোট হিসাব অনুযায়ী, স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ৭০০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার এবং বার্ষিক ব্যবসায়িক ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি ৫০০ মিলিয়ন বেড়েছে। প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান ৩,০০০ বা প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে, আর প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য সংযোজন ৫.৫ বিলিয়ন বা প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মূলধনি ব্যয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অবদান ভিন্ন ভিন্ন দিকে এগিয়েছে।
প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণার ধারাবাহিকতা থেকে বিনিয়োগের বছর এবং সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশিত সময়কাল আলাদা করে বোঝা যায়:
- ২০২৪: ইডিবি স্থায়ী সম্পদে ১৩.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পায়, যার সঙ্গে ১৮,৭০০টি সম্ভাব্য চাকরি যুক্ত ছিল।
- এপ্রিল ২০২৫: সিঙ্গাপুরে বৈশ্বিক উদ্যোগ গড়তে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠাতাদের আকৃষ্ট করার জন্য ইডিবি গ্লোবাল ফাউন্ডার প্রোগ্রাম চালু করে।
- ২০২৫: স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ১৪.২ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছায়; সম্ভাব্য চাকরির সংখ্যা ধরা হয় ১৫,৭০০।
- ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ইডিবি বার্ষিক পর্যালোচনা প্রকাশ করে। এতে ২০২৫ সালের প্রতিশ্রুতিগুলো আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়িত হলে যে ফল প্রত্যাশিত, তা তুলে ধরা হয়।
কোন খাতে হবে চাকরি
প্রত্যাশিত চাকরির ৪০ শতাংশ সেবা খাতে, ৩৭ শতাংশ উৎপাদন খাতে এবং ২৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উদ্ভাবন খাতে। ১৫,৭০০টির মোট সংখ্যার ওপর এই আনুমানিক হার প্রয়োগ করলে সেবা খাতে প্রায় ৬,২৮০টি, উৎপাদনে ৫,৮১০টি এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে ৩,৬১০টি চাকরি হতে পারে।
বেশির ভাগ চাকরিই পেশাজীবী, ব্যবস্থাপক, নির্বাহী ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেবা খাতের পদগুলোর মধ্যে রয়েছে পণ্য ব্যবস্থাপক, তথ্যবিজ্ঞানী, টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক বিশ্লেষক। উৎপাদন খাতে থাকবে প্রযুক্তিবিদ, পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া প্রকৌশলী, উৎপাদন তত্ত্বাবধায়ক এবং মাননিশ্চয়তা ব্যবস্থাপক।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের পদে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক ও রোবোটিকস প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ইন্টারফেস নকশাবিদ এবং প্রক্রিয়া উদ্ভাবন পরামর্শক। এসব উদাহরণ দেখায়, মূলধনি বিনিয়োগে উৎপাদন খাত এগিয়ে থাকলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ কেবল কারখানার কাজেই সীমাবদ্ধ নয়।
বেতনের সীমা অতিক্রমকারী চাকরির অংশটি বর্ণনায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে। ইডিবির প্রকাশিত পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রতিশ্রুত চাকরির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাসে ৫,০০০ সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি মোট বেতন দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ব্রিফিংয়ে চেয়ারম্যান পং চিয়ং বুন বলেন, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি চাকরির বেতন ওই সীমা ছাড়াবে। উভয় বর্ণনাতেই বোঝা যায়, পূর্বাভাসে থাকা চাকরির বড় অংশের মাসিক বেতন ৫,০০০ সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি হবে; তবে কোনোটি থেকেই প্রতিটি পদের জন্য নিশ্চয়তা মেলে না।
ইডিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জারমেইন লয় বলেন, শিল্প খাতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীদের ডিজিটাল দক্ষতা এবং কিছু ক্ষেত্রে নতুন বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কর্মসংস্থানের নিম্নমুখী পূর্বাভাস ব্যাখ্যা করতে তিনি কোম্পানিগুলোর সতর্ক প্রাক্কলনের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়তা ও ডিজিটালায়নের কথা উল্লেখ করেন।
লয় বলেন, “অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে কোম্পানিগুলো স্বাভাবিকভাবেই তাদের পূর্বাভাসে আরও সতর্ক ছিল।”
উৎপাদন খাত এগিয়ে, তবে খাতের পরিসর বিস্তৃত
স্থায়ী সম্পদে ১৪.২ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির মধ্যে উৎপাদন প্রকল্প থেকে এসেছে প্রায় ১২.১ বিলিয়ন, অর্থাৎ মোটের প্রায় ৮৫ শতাংশ। একক খাতগুলোর মধ্যে ইলেকট্রনিকস ছিল বৃহত্তম, যার অংশ ৩৩ শতাংশ। এর কাছাকাছি ছিল বায়োমেডিক্যাল উৎপাদন, ৩০.৮ শতাংশ। রাসায়নিক খাতের অংশ ছিল আরও ৯.১ শতাংশ।
২০২৪ সালের তুলনায় ইলেকট্রনিকস খাতের ওপর নির্ভরতা কম ছিল। সে বছর স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির ৫৭ শতাংশ এসেছিল এই খাত থেকে। ২০২৫ সালে ইলেকট্রনিকস ও বায়োমেডিক্যাল উৎপাদন মিলিয়ে মোটের ৬৩.৮ শতাংশ ছিল। এতে বোঝা যায়, উন্নত উৎপাদন শিল্পের ওপর বিনিয়োগের ধারাটি কতটা নির্ভরশীল।
সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল এআই চিপ, সার্ভার ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা মেটাতে নতুন কারখানা এবং বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ। ইডিবি জানিয়েছে, এসব বিনিয়োগে সূক্ষ্ম প্রকৌশল কর্মকাণ্ডও উপকৃত হয়েছে। অন্য প্রকল্পগুলো সেসব চাহিদা মেটাতে নেওয়া হয়েছে, যা এসেছে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার থেকে এবং সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টা থেকে।
বায়োমেডিক্যাল উৎপাদনকারীরা জৈব ওষুধ এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। রাসায়নিক খাতের বিনিয়োগে গুরুত্ব পেয়েছে বিশেষায়িত রাসায়নিক ও টেকসই উপকরণ। অন্যদিকে, বিমানযাত্রার চাহিদা শক্তিশালী থাকায় মহাকাশ শিল্পের কোম্পানিগুলো আরও উন্নত রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার সক্ষমতায় বিনিয়োগ করেছে।
লয় বলেন, এআই ও ডিজিটালায়নের সমর্থনে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এটি শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস, সিঙ্গাপুরের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ আয়ের পূর্বাভাস নয়। তবে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও সহায়ক সরঞ্জাম কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বুঝতে এটি সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অংশ কমেছে, চীনের বেড়েছে
স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিতে চীনের অংশ ২০২৪ সালের ২.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২০.৬ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ৫৫.৫ শতাংশ থেকে কমে ১৭.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে প্রতিশ্রুতির বড় অংশ, যদিও এই পরিসংখ্যানে ইউরোপের সুনির্দিষ্ট অংশ উল্লেখ করা হয়নি।
পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আরও বড়। বার্ষিক ব্যবসায়িক ব্যয়ের প্রতিশ্রুতির ৫০.৭ শতাংশ এসেছে চীন থেকে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১৫ শতাংশ। চীনা বিনিয়োগ থেকে প্রাক্কলিত মূল্য সংযোজনের ৫৭.১ শতাংশ আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। আগের বছরের প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১২.৬ শতাংশ।
এই শতাংশগুলো প্রতি বছর পাওয়া নতুন প্রতিশ্রুতির হিসাব। এগুলো থেকে বোঝা যায় না যে সিঙ্গাপুরে জমা হওয়া মোট বিনিয়োগের পরিমাণে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। আবার বিদ্যমান মার্কিন ব্যবসাগুলো সিঙ্গাপুর ছেড়ে যাচ্ছে, এমনটিও এতে প্রমাণিত হয় না।
পং বলেন, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের গতি কমে আসায় দেশটির কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিঙ্গাপুরে উপস্থিতি বাড়িয়েছে, এমন কোম্পানির উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন বাইটড্যান্স, মিহোয়ো, এনভিশন এনার্জি, উক্সি ও হাই রোবোটিকসকে। এসব উদাহরণ বৃহত্তর প্রবণতার চিত্র তুলে ধরে; ২০২৫ সালের মোট বিনিয়োগের নির্দিষ্ট বরাদ্দ নয়।
ইডিবির চেয়ারম্যান পং চিয়ং বুন বলেন, আইন ও বিধিবিধান মেনে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে, এমন বিদেশি ব্যবসাকে সিঙ্গাপুর স্বাগত জানাতে থাকবে। তিনি প্রতিষ্ঠিত বিনিয়োগ অংশীদারদের গুরুত্বও তুলে ধরেন।
পং বলেন, “বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির মজুত ও প্রবাহ—উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করে যাব।”
এআই চাহিদা তৈরি করছে, বদলাচ্ছে নিয়োগও
বিনিয়োগের চিত্রে দুইভাবেই রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একদিকে এটি সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, সার্ভার ও বিশেষায়িত গবেষণার চাহিদা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, কাজ স্বয়ংক্রিয় করে এবং আগের ব্যবসায়িক মডেলে যত লোক প্রয়োজন হতো তার চেয়ে কম কর্মী দিয়ে কাজ চালাতে কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করছে।
ইডিবি, এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুর এবং ইনফোকম মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির যৌথ কার্যালয় ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রি সিঙ্গাপুর ২০২৪ সাল থেকে ৬০টির বেশি এআই সেন্টারস অব এক্সেলেন্স প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। এসব কেন্দ্রে গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা একত্র করে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব জেনারেটিভ এআই সমাধান তৈরি করা হয়।
কার্যালয়টি গুগল, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, মাইক্রোসফট ও ওরাকলের সঙ্গে এন্টারপ্রাইজ কম্পিউট ইনিশিয়েটিভও চালু করেছে। এর লক্ষ্য এআই গ্রহণে ১,২০০টি পর্যন্ত কোম্পানিকে সহায়তা করা। এই সংখ্যা কর্মসূচির সম্ভাব্য আওতা বোঝায়, ইতোমধ্যে এআই গ্রহণ সম্পন্ন করা কোম্পানির সংখ্যা নয়।
কর্মসংস্থানের এই চ্যালেঞ্জটি আগে প্রকাশিত মাঝারি স্তরের চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে অভিজ্ঞ কর্মীদের জন্য স্থিতিশীল পদ কমে যাওয়া এবং পেশাজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পথ সংকুচিত হওয়া। নতুন বিনিয়োগের পরিসংখ্যানে চাকরি বিলুপ্তির হিসাব নেই, তবে এতে দেখা যায়, বেশি মূলধনি বিনিয়োগ হলেই চাকরির শূন্যপদ বাড়ে না।
তথ্যকেন্দ্রের হার্ডওয়্যার ও অবকাঠামো, কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার পরীক্ষা, স্বচালিত যানবাহন এবং বিদ্যুতায়ন খাতেও প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে ইডিবি। এসব কর্মকাণ্ডে স্বয়ংক্রিয়তা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়। তবে পর্যালোচনায় এসব খাতের বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানের পৃথক হিসাব দেওয়া হয়নি।
চিকিৎসা ও কার্বন সেবায় নতুন প্রবৃদ্ধি
নতুন বিনিয়োগের আরেকটি ক্ষেত্র ছিল নির্ভুল চিকিৎসা। এতে আণবিক ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে কোনো রোগী বা রোগীগোষ্ঠীর জন্য রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা আরও সুনির্দিষ্ট করা হয়। বিভিন্ন ধরনের জৈবিক তথ্য, রোবোটিকস ও এআই নিয়ে কাজ করা উৎপাদন ও গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ পেয়েছে ইডিবি।
ন্যাশনাল প্রিসিশন মেডিসিন ফার্মা প্রি-কম্পিটিটিভ কনসোর্টিয়ামে যোগ দিয়েছে চারটি কোম্পানি। এই জোট সিঙ্গাপুরের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে এশীয় জনগোষ্ঠীর উপযোগী রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় সহায়তা করবে। ইডিবি জানিয়েছে, এসব অংশীদারত্ব গবেষণা, জ্ঞান বিনিময়, কর্মসংস্থান এবং বায়োমেডিক্যাল তথ্য অবকাঠামোতেও সহায়তা করবে।
সবুজ অর্থনীতিতে এখন সিঙ্গাপুরে কার্বন সেবা ও বাণিজ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬০টির বেশি, যা ২০২০ সালের দ্বিগুণেরও বেশি। কার্বন উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তার জন্য ২০২৫ সালে ইডিবি ও টিটি ফাউন্ডেশন অ্যাডভাইজরস ২০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের একটি তহবিল চালু করেছে।
অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে ছিল ব্লু কার্বন সাপোর্ট প্রোগ্রাম এবং কার্বন সেবা ও বাণিজ্যের দক্ষতা কাঠামো। উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে সঞ্চিত কার্বনকে ব্লু কার্বন বলা হয়। জৈব জ্বালানি, বিশেষায়িত রাসায়নিক ও টেকসই উপকরণে বিনিয়োগের পাশাপাশি এসব কর্মসূচি ইলেকট্রনিকস ও বায়োমেডিক্যাল উৎপাদনের প্রতিষ্ঠিত খাতের বাইরেও বিনিয়োগ কৌশলকে বিস্তৃত করছে।
প্রতিষ্ঠাতা, স্থানীয় অংশীদারত্ব ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণ
গ্লোবাল ফাউন্ডার প্রোগ্রাম ৪০টির বেশি উদ্যোগকে সহায়তা করছে, বিশেষ করে এআই, সবুজ অর্থনীতি ও উন্নত প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার খাতে। এসব উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে ১.৭ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার সংগ্রহ করেছে। এই অর্থের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সিঙ্গাপুরে তাদের কার্যক্রম ও অংশীদারত্বে ব্যয় হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪২৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার।
এই সম্ভাব্য স্থানীয় ব্যয়কে স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের ১৪.২ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের হিসাব থেকে আলাদা রাখতে হবে। এসব উদ্যোগের তহবিল ইডিবির বিনিয়োগ সূচকের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তার কোনো সমন্বিত হিসাব ইডিবি দেয়নি। তাই পরিসংখ্যানগুলো যোগ করলে একই কার্যক্রম দুবার গণনার ঝুঁকি রয়েছে।
ইডিবি ও এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুর ২০২৫ সালে বহুজাতিক করপোরেশন ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টি অংশীদারত্ব প্রকল্পও গড়ে তুলেছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল যৌথ উদ্ভাবনে সহায়তা, সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যবসাগুলোকে সাহায্য করা।
আঞ্চলিক সহযোগিতাও এই কৌশলের অংশ। ইডিবি জানিয়েছে, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং সিঙ্গাপুর ও জোহরের পরিপূরক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জোহর-সিঙ্গাপুর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নতুন বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার বাতাম, বিনতান ও করিমুনের সঙ্গে আরও গভীর অংশীদারত্বের কথাও বলেছে সংস্থাটি।
এই আঞ্চলিক ব্যবস্থাগুলোর জন্য পর্যালোচনায় বিনিয়োগের পরিমাণ বা চাকরির সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। এর ঘোষিত লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রকল্প আকর্ষণে সিঙ্গাপুরকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম রাখা।
কঠিনতর বিনিয়োগ বাজারের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ
ইডিবির কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নেতৃত্বের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ অংশীদারত্বে রয়েছে এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ, সাইবার নিরাপত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিং। আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম গবেষণা খাতে স্থানীয় প্রতিভা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর লিডার্স নেটওয়ার্ক ফেলোশিপের দ্বিতীয় দলে ছিলেন ৬৫ জন। ২০২৪ সালে প্রথম দলে ছিলেন ৬০ জন। নতুন সহায়তা কর্মসূচিতে বিদেশে কাজের দায়িত্ব এবং শিল্প খাতভিত্তিক নেতৃত্বের চাহিদা অন্তর্ভুক্ত ছিল। গ্লোবাল বিজনেস লিডার্স প্রোগ্রামের অংশগ্রহণকারীরা চীন, ইন্দোনেশিয়া, লাটভিয়া, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে কাজের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
ভবিষ্যতে বিনিয়োগ আকর্ষণে ইডিবি চারটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছে: বিদ্যমান প্রবৃদ্ধিশীল খাতকে শক্তিশালী করা, নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি গড়ে তোলা, বৈশ্বিক নেতৃত্বে পৌঁছাতে সক্ষম কোম্পানিকে আকৃষ্ট করা এবং পরিবর্তনশীল কর্মজগতের জন্য সিঙ্গাপুরবাসীকে প্রস্তুত করা। সম্প্রসারণের প্রস্তাবিত ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি সামলানো করপোরেট কার্যক্রম, এন্টারপ্রাইজ এআই সেন্টার এবং আস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন সেবা।
পং বলেন, ব্যবসায়ী নেতারা ২০২৬ সালেও অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন, তবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর নিয়ে হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তারা আরও প্রস্তুত। মূল অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো, কতগুলো প্রতিশ্রুতি চালু প্রকল্পে রূপ নেবে, কখন নিয়োগ হবে এবং বাস্তবায়িত চাকরি ও মূল্য সংযোজন পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলবে কি না। ইডিবির পর্যালোচনায় পাঁচ বছরের বাস্তবায়নকাল উল্লেখ করা হলেও নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পে নিয়োগের সময়সূচি দেওয়া হয়নি।
মূল তথ্য
- সিঙ্গাপুর ২০২৫ সালে স্থায়ী সম্পদে ১৪.২ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যা ২০২৪ সালের ১৩.৫ বিলিয়নের চেয়ে বেশি।
- এসব প্রতিশ্রুতির ফলে পাঁচ বছরে ১৫,৭০০টি চাকরি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে; আগের বছরের পূর্বাভাসের চেয়ে তা প্রায় ১৬ শতাংশ কম।
- প্রত্যাশিত বার্ষিক মূল্য সংযোজন ২৩.৫ বিলিয়ন থেকে কমে ১৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে দাঁড়িয়েছে।
- স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির প্রায় ৮৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১২.১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার এসেছে উৎপাদন খাত থেকে।
- নতুন স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিতে চীনের অংশ প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অংশকে ছাড়িয়ে ২০.৬ শতাংশে পৌঁছেছে; যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১৭.৩ শতাংশ।
- ইডিবির প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী, পূর্বাভাসে থাকা চাকরির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে মাসিক মোট বেতন ৫,০০০ সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি হওয়ার কথা।
- বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলেও এআই, সতর্ক পূর্বাভাস ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হচ্ছে।






