৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার পুনরুদ্ধার প্রকল্প চললেও কালো হচ্ছে হাড়িদোয়া নদী

পড়তে 9 মিনিট
Haridhoa River Turns Black Despite Tk 6.5 Crore Restoration Project

পরিদর্শন করা আট কারখানার কোনো শোধনাগারই চালু ছিল না

নরসিংদীর হাড়িদোয়া নদী পুনরুদ্ধারে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প এগিয়ে চলেছে। অথচ অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নদীর পানিতে পড়া অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি নদীটি যে তিনটি উপজেলা দিয়ে বয়ে গেছে, সেগুলোতে প্রতিবেদন তৈরির সফরে বর্জ্য পরিশোধনাগার থাকা আটটি কারখানা পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনের সময় একটিও চালু ছিল না। কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছিল।

সূচিপত্র
  1. পরিদর্শন করা আট কারখানার কোনো শোধনাগারই চালু ছিল না
  2. সরঞ্জাম বসানো মানেই বর্জ্য শোধন নয়
  3. হাজীপুর ড্রাইংয়ের বিরুদ্ধে মামলা
  4. বাসিন্দারা অসুস্থতার কথা বলছেন, তবে পানির পরীক্ষার তথ্য নেই
  5. শিল্পবর্জ্যের সঙ্গে গৃহস্থালির আবর্জনাও দূষণ বাড়াচ্ছে
  6. পুনরুদ্ধারে সময়সীমা আছে, মৌসুমের জন্য কাজেও বিরতি
  7. উচ্ছেদ অভিযানেও দুই তীর দখলমুক্ত হয়নি
  8. তিন উপজেলা পেরিয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথ
  9. পর্যবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর
  10. মূল বিষয়গুলো

দূষণ নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম স্থাপন আর সেগুলো বাস্তবে ব্যবহারের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা উঠে এসেছে এই পর্যবেক্ষণে। নরসিংদীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. বদরুল হুদা বলেন, নদীর পাশের ১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার রয়েছে। তারপরও নদীর পানি কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত। বর্ষার বৃষ্টিতে নদীখাতে পানি ফিরে আসার পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৫ সালের আগস্টে পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাজ শুরু করে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে। ভারপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীরের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজের প্রায় ১৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পে খনন, তীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ রয়েছে। তবে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত থাকলে এসব কাজের মাধ্যমে যে পরিবেশগত সুফল পাওয়ার কথা, তা হুমকির মুখে পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ক্ষতিটা ইতিমধ্যেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। পানিতে নামলে চুলকানি ও ত্বকের নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ফরিদা গুলশানা কবীর বলেন, নদীদূষণের কারণে হওয়া অসুস্থতা নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৬ জন রোগী চিকিৎসা নেন। বড় বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে নদীর অবক্ষয়ের অর্থ, একসময় পণ্য ও ক্রেতাদের বাজারে নিয়ে আসা জলপথটি হারিয়ে যাওয়া।

বিজ্ঞাপন

সরঞ্জাম বসানো মানেই বর্জ্য শোধন নয়

বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি শিল্প উৎপাদন থেকে আসা বর্জ্যপানি পুনর্ব্যবহার বা নির্গমনের আগে শোধন করে। কোনো কারখানায় ইটিপি থাকা মানেই বর্জ্যপানি সেটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটি ঠিকমতো চলছে কিংবা নির্গত পানি নির্ধারিত মান পূরণ করছে—এমন প্রমাণ নয়।

সরকারি বিধিমালায় সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিশোধনাগার থাকা বাধ্যতামূলক। বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, কিছু কারখানা নিয়ম মানার প্রমাণ দেখাতে বা শাস্তি এড়াতে মূলত ইটিপি স্থাপন করেছে, কিন্তু অপরিশোধিত বর্জ্য ছাড়া অব্যাহত রেখেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, বর্জ্যপানি শোধনের জন্য প্রয়োজনের সময় চালু না রেখে সরকারি পরিদর্শনের সময় ইটিপি চালু করা হয়।

পরিদর্শন করা আটটি কারখানার সব কটিতেই ইটিপি বন্ধ ছিল—সফর থেকে পাওয়া সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ এটাই। তবে প্রতিটি ইটিপি কত দিন ধরে বন্ধ ছিল, সব কারখানায় উৎপাদন চলছিল কি না কিংবা কারখানাগুলো কত ঘন ঘন সরঞ্জাম ব্যবহার করে, তা জানা যায়নি। তবু সরাসরি নদীতে বর্জ্য পড়তে দেখার আলাদা পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, সরঞ্জাম থাকা নয়, বাস্তবে বর্জ্য শোধন হচ্ছে কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন।

পরিদর্শন করা আটটি কারখানা হুদার হিসাবে ইটিপি থাকা ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৭ শতাংশ। ইটিপি থাকা কারখানার উল্লেখযোগ্য অংশ এগুলো। তবে পরিদর্শনটি প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। কোনো চালু-বন্ধের নথি, নির্গত বর্জ্যের পরিমাপ বা পরীক্ষাগারের ফলাফল দেওয়া হয়নি, যা থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কতটা দূষণ ঘটায় তা নির্ধারণ করা যায়।

হাজীপুর ড্রাইংয়ের বিরুদ্ধে মামলা

হুদা বলেন, বারবার সতর্ক করার পরও ইটিপি স্থাপন না করায় হাজীপুর ড্রাইংয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরঞ্জাম নেই—এমন একমাত্র কারখানাটির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইটিপি থাকা সত্ত্বেও যেসব কারখানা তা চালায় না, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নটি আলাদা রয়ে গেছে।

কতগুলো কারখানায় ইটিপি নেই, সে বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, নদীর পাশের অনেক কারখানায় ইটিপি নেই। অন্যদিকে, হুদার দেওয়া সুনির্দিষ্ট হিসাবে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সব কটিতে ইটিপি রয়েছে। কোন হিসাবটি সঠিক, কিংবা বর্ণনাগুলোতে একই প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা হয়েছে কি না, তা যাচাই করার মতো আলাদা কোনো কারখানা-তালিকা নেই।

হুদার বক্তব্যের বিস্তারিত বিবরণগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে, ইটিপি স্থাপন না করার কারণেই হাজীপুর ড্রাইংয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার তারিখ, নম্বর, শুনানির দিন বা রায়ের তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই এই মামলাকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা কিংবা অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার বৃহত্তর সমস্যার সমাধানের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

বিজ্ঞাপন

বাসিন্দারা অসুস্থতার কথা বলছেন, তবে পানির পরীক্ষার তথ্য নেই

বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ও সাইফুল রহমান নদীর অবস্থার জন্য শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালির আবর্জনা—দুটোকেই দায়ী করেন। তাঁদের কথায়, পানিতে নামলে মানুষের চুলকানি ও খোসপাঁচড়ার মতো ত্বকের সমস্যা হয়। এসব বর্ণনায় উপসর্গ ও সম্ভাব্য সংস্পর্শের কথা বলা হয়েছে; প্রত্যেক আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিশ্চিত রোগনির্ণয়ের কথা নয়।

পুটিয়া বাজার এলাকায় নদীর পাশে বসবাসকারী আলমাস মিয়া হাড়িদোয়ার আগের দিনের কথা স্মরণ করেন। তখন পরিবারগুলো নদীতে গোসল করত, রান্নায় নদীর পানি ব্যবহার করত এবং সেখানে ধরা মাছ খেত। বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেন:

এখন দুর্গন্ধের কারণে এই নদীর পাশে দাঁড়ানোও অসম্ভব।

নরসিংদী সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৬ জন রোগী আসেন বলে ফরিদা গুলশানা কবীরের দেওয়া হিসাব থেকে হাসপাতালটিতে দেখা রোগীর চাপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এই গড় কোন সময়ের, রোগনির্ণয়ের ধরন কী কিংবা রোগীদের অসুস্থতার সঙ্গে নদীর পানির সংস্পর্শের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—তা বলা হয়নি। এ হিসাবকে বার্ষিক মোটে রূপান্তর করা বা জেলাজুড়ে আক্রান্ত সবার সংখ্যা হিসেবে ধরা উচিত নয়।

কালো পানি ও তীব্র দুর্গন্ধ অবনতির দৃশ্যমান লক্ষণ, কিন্তু এগুলো থেকে নির্দিষ্ট রাসায়নিক বা সেগুলোর ঘনত্ব শনাক্ত করা যায় না। দূষিত অংশগুলোর পানির পরীক্ষার কোনো ফলাফলও দেওয়া হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট দূষক সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত। তবে বাসিন্দাদের বক্তব্য ও হাসপাতালের চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুতর জনস্বাস্থ্য-উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

শিল্পবর্জ্যের সঙ্গে গৃহস্থালির আবর্জনাও দূষণ বাড়াচ্ছে

নদীর দূষণের একমাত্র উৎস শিল্পবর্জ্য নয়। গৃহস্থালির আবর্জনা, আশপাশের বসতিগুলোর নোংরা পানি এবং বাজারের বর্জ্যও হাড়িদোয়ায় পড়ে। নদীর তীর ও খাতে প্লাস্টিক জমে আছে; এর সঙ্গে রয়েছে কচুরিপানা ও পচা কাদার স্তর।

হুদা বলেন, মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের বর্জ্যও দূষণ বাড়াচ্ছে। বড় বাজারের ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলামও রং কারখানা, বস্ত্র কারখানা ও অন্যান্য কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যের পাশাপাশি বাড়িঘর ও বাজারের বর্জ্যপানির কথা বলেছেন।

নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এই দূষণের নানা উৎস গুরুত্বপূর্ণ। কারখানার বর্জ্য নির্গমন বন্ধ করলে দূষণের একটি বড় কথিত উৎস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কিন্তু তাতে বাড়িঘর ও বাজারের বর্জ্য ফেলা বন্ধ হবে না। খনন করে জমে থাকা বর্জ্য সরানো এবং নদীখাত উন্নত করা সম্ভব। তবে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস না বদলালে একই অংশে নতুন আবর্জনা জমতে পারে।

বাসিন্দাদের আরও দাবি, নদীতে আর মাছ নেই। এটি স্থানীয় পর্যবেক্ষণ, প্রকাশিত কোনো মাছ জরিপের ফল নয়। মাছের প্রজাতির সংখ্যা বা নদীর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয় কতটা—তা নির্ধারণের মূল্যায়ন নেই। তবে একসময় খাবার ও পরিবহন—দুই কাজেই ব্যবহৃত নদীটির অবক্ষয়ের আরেকটি দিক তুলে ধরে এই দাবি।

বিজ্ঞাপন

পুনরুদ্ধারে সময়সীমা আছে, মৌসুমের জন্য কাজেও বিরতি

৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বাজেটের সমান ৬৫ মিলিয়ন টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছে, নতুন করে খনন, নদীতীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে পরিবেশের উন্নতি করাই প্রকল্পের লক্ষ্য। কবীর একে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রচেষ্টার অংশ বলে বর্ণনা করেছেন।

কাজের প্রায় ১৫ শতাংশ শেষ হওয়ায় বাকি রয়েছে আনুমানিক ৮৫ শতাংশ। কবীর বলেন, নদীর পানি কমতে শুরু করলে বাকি কাজ শুরু হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কাজ আবার কবে শুরু হবে, তার সুনির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হয়নি।

প্রধান তারিখ ও অগ্রগতির তথ্য:

  • ২০২৪ থেকে ২০২৬: পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, উচ্ছেদের ১০টি অভিযানে প্রায় ৬০টি স্থাপনা সরানো হয়েছে।
  • আগস্ট ২০২৫: ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাজ শুরু।
  • সর্বশেষ জানানো অগ্রগতি: প্রকল্পের প্রায় ১৫ শতাংশ কাজ শেষ; পানি কমলে বাকি কাজ শুরু হবে।
  • জুন ২০২৭: প্রকল্প শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা।

শুধু অগ্রগতির হার দেখে প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে—এ কথা প্রমাণ হয় না। খননের কাজ নদীর অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে, আর বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা বা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে সময়সীমার আগে কাজের কতটা বাকি আছে, তা এই হার থেকে বোঝা যায়।

প্রকল্পের বর্ণিত পরিধিতে নদীখাত ও তীরের কাজই মূল। কারখানার ইটিপি চালানোর খরচ, গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহ কিংবা নিয়মিত পানির পরীক্ষা করার কর্মসূচিও এই বাজেট থেকে দেওয়া হবে—এমন তথ্য নেই। এগুলো সমস্যার পৃথক দিক, যদিও নদী পুনরুদ্ধার হবে কি না, তাতে প্রতিটিরই প্রভাব রয়েছে।

উচ্ছেদ অভিযানেও দুই তীর দখলমুক্ত হয়নি

কবীর বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উচ্ছেদের ১০টি অভিযানে প্রায় ৬০টি স্থাপনা সরানো হয়েছে। এসব অভিযানের পরও দুই তীরেই অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। অবশিষ্ট স্থাপনার মোট সংখ্যা বা পরবর্তী উচ্ছেদের সময়সূচি জানানো হয়নি।

উচ্ছেদ থেকে বোঝা যায় যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে স্থাপনার সংখ্যা দিয়ে কতটা নদীতীরের জমি উদ্ধার হয়েছে তা নির্ধারণ করা যায় না। অভিযানের আগে ও পরে দখলমুক্ত এলাকার পরিমাণ, অবশিষ্ট দখল কিংবা নদীখাতের প্রস্থের কোনো পরিমাপ নেই।

নরসিংদীতে সুশাসনের জন্য নাগরিকের সাধারণ সম্পাদক হালধর দাস ইটিপি কার্যকরভাবে চালানো এবং দখলদারদের উচ্ছেদের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে দুটি পৃথক চাপের যোগসূত্র উঠে এসেছে: পানিতে দূষণ ঢোকা এবং নদীর জন্য নির্ধারিত জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে ওঠা।

বিজ্ঞাপন

তিন উপজেলা পেরিয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথ

হাড়িদোয়া শিবপুরের আলিপুরা বাজার থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার বয়ে পলাশ ও নরসিংদী সদর পেরিয়ে বড় বাজারের পুরোনো থানা ঘাটের কাছে মেঘনায় মিশেছে। একসময় নদীটির পথ বসতি ও ব্যবসায়ীদের জেলার ব্যস্ততম বাজারগুলোর একটির সঙ্গে যুক্ত করত।

পালতোলা নৌকা ও বড় নৌযানে বাজারে পণ্য আসত, আবার ক্রেতারাও নদীপথে যাতায়াত করতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বড় বাজারে কাজ করছেন বলে জানান তৌসিফ আহমেদ। তাঁর স্মৃতিচারণায়, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ পণ্য নিয়ে আসতেন এবং কেনাকাটা শেষে নৌকায় ফিরে যেতেন।

বর্ণনা অনুযায়ী, নদীপথে যাতায়াত এখন বন্ধ, না হয় প্রায় বন্ধ। কিছু বর্ণনায় বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি দিয়ে বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে সবাই একমত যে দূষণ ও নাব্যতা হারানোর কারণে নদীটি আগের সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক পরিবহনপথের ভূমিকা হারিয়েছে।

নাব্যতা বলতে কোনো জলপথ নৌযান চলাচলের মতো যথেষ্ট গভীর ও চলাচলযোগ্য কি না, তা বোঝায়। হাড়িদোয়ার শুষ্ক মৌসুমে কোথাও নদীর তলদেশের বালু জেগে ওঠে, আবার অন্য অংশে থাকে দুর্গন্ধযুক্ত কাদা ও প্লাস্টিক। বর্ষার বৃষ্টিতে পানি ফিরে এলেই চলাচলের উপযোগী পথ ফিরে আসে না, নদীও পরিষ্কার হয় না।

পণ্য পরিবহনের পরিমাণ, পরিবহন খরচের তুলনা বা বাজারের আয়ের কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। ফলে অর্থের অঙ্কে নির্ভরযোগ্যভাবে এই ক্ষতি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে স্থানীয় বাণিজ্যের বিকাশে একসময় যে সেবার ভূমিকা ছিল, তার বিলুপ্তির তথ্য উঠে এসেছে।

পর্যবেক্ষণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর

নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, জেলার নদীগুলো রক্ষায় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করছে। তিনি জানান, কর্মকর্তারা নিয়মিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, বর্জ্য নির্গমনের আগে শোধনের অনুরোধ জানান এবং ইটিপিগুলো চালু আছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করেন।

হুদাও বলেন, নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য পড়া ঠেকাতে পরিবেশ অধিদপ্তর নজর রাখছে। তবে পাশাপাশি এ তথ্যও রয়েছে যে পরিদর্শন করা আটটি কারখানার কোনো ইটিপিই চালু ছিল না। সরকারি পরিদর্শন কত ঘন ঘন হয় এবং তার ফলাফল কী, তা জানানো হয়নি।

কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনও বাকি: হাজীপুর ড্রাইংয়ের মামলার ফল, পরবর্তী উচ্ছেদ অভিযানের সময় এবং খননকাজ আবার শুরুর তারিখ। পুনরুদ্ধার প্রকল্প শেষ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা ২০২৭ সালের জুন। অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা বন্ধের জন্য আলাদা কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়নি।

মূল পার্থক্যটি হলো নদীর ভৌত খাত পুনরুদ্ধার করা এবং নতুন করে দূষণ ঢোকা ঠেকানো। খনন, তীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ অবক্ষয়ের কয়েকটি দিক মোকাবিলা করে। হাড়িদোয়ায় আবার ব্যবহারযোগ্য পানি ফিরবে এবং পরিবহনপথ চালু হবে কি না, তা কারখানাগুলো বর্জ্যপানি শোধন করছে কি না এবং আশপাশের বাসিন্দারা বর্জ্য ফেলা বন্ধ করছেন কি না—তার ওপরও নির্ভর করে।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • ইটিপি থাকা আটটি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে; পরিদর্শনের সময় একটিও চালু ছিল না।
  • পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, নদীর পাশের ১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার রয়েছে।
  • বারবার সতর্ক করার পরও ইটিপি স্থাপন না করায় হাজীপুর ড্রাইংয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
  • ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রায় ১৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে; ২০২৭ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা।
  • ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উচ্ছেদের ১০টি অভিযানে প্রায় ৬০টি স্থাপনা সরানো হয়েছে, তবে দখল অব্যাহত রয়েছে।
  • এক চিকিৎসকের হিসাবে, দূষণজনিত অসুস্থতা নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৬ জন রোগী চিকিৎসা নেন।
  • শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, প্লাস্টিক ও নাব্যতা হারানো নদীটির পুনরুদ্ধারকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে