সুযোগ হারানোর হিসাবেই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ
শ্রেণিকক্ষ, কর্মক্ষেত্র, রাজনৈতিক দল, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পারিবারিক সম্পত্তির নথিতে পাকিস্তানের লিঙ্গবৈষম্য স্পষ্ট। শিক্ষা ও আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বে নারীরা অগ্রগতি অর্জন করেছেন, তবু অনেকেই সেই অগ্রগতিকে নিরাপদ কর্মসংস্থান, সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা জনসিদ্ধান্তে কর্তৃত্বে রূপ দিতে পারেন না। এর ফলে ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও সীমিত হয়।
সূচিপত্র
পাকিস্তানের ২০২৪–২৫ সালের হাউসহোল্ড ইন্টিগ্রেটেড ইকোনমিক সার্ভে অনুযায়ী, ১০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ছিল ৬৩ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৭৩ শতাংশ, নারীদের ৫৪ শতাংশ। গ্রামীণ ও শহুরে নারীদের মধ্যে ব্যবধান আরও বেশি: গ্রামীণ নারীদের ৪৪ শতাংশ সাক্ষর, যেখানে শহুরে নারীদের ক্ষেত্রে তা ৬৮ শতাংশ। সাক্ষরতা শুধু পড়তে পারার বিষয় নয়। কেউ চুক্তি বুঝতে পারবেন কি না, ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করতে পারবেন কি না, কোনো সুবিধা দাবি করতে পারবেন কি না, কিংবা দুর্যোগের সতর্কবার্তা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারবেন কি না, তা সাক্ষরতার ওপর নির্ভর করতে পারে।
নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের হার আরও কম। বিশ্বব্যাংকের লিঙ্গবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ২৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের হার ৮০.১ শতাংশ। এ পরিমাপে কর্মরত বা সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন—এমন ব্যক্তিদের গণনা করা হয়। বিনা পারিশ্রমিকে গৃহস্থালির কাজের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য এতে ধরা পড়ে না, আর জরিপে কিছু অনানুষ্ঠানিক কাজও বাদ পড়তে পারে। তবে পাকিস্তানের সময় ব্যবহারের তথ্য নিয়ে গবেষণা বলছে, শুধু গণনার ঘাটতি দিয়ে বাড়ির বাইরে কাজ করা নারীর কম হার ব্যাখ্যা করা যায় না; অথচ তুলনামূলক বেশি বেতনের অনেক কাজই সেখানে পাওয়া যায়।
এই বৈষম্য শুধু নারীদের দক্ষতা আছে কি না, সেই প্রশ্ন নয়। দক্ষতা কাজে লাগানোর পরিবেশও এর পেছনে রয়েছে: পরিচর্যার দায়িত্ব, চলাচল ও নিরাপত্তা, কম মজুরি, অর্থায়ন ও সম্পত্তিতে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং কোন কাজ গ্রহণযোগ্য—তা নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা। এসব পরিস্থিতি এও ব্যাখ্যা করে, কেন বেশি শিক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা প্রভাব নিশ্চিত করে না।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফারাক কেন?
পাকিস্তানে শিক্ষার সূচক, উচ্চশিক্ষাসহ, উন্নত হয়েছে; কিন্তু কর্মসংস্থান সেই গতিতে বাড়েনি। গবেষণাসামগ্রীতে উদ্ধৃত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ সূচকে ১৪৫টি অর্থনীতির মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৪৩তম এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগে ১৪৪তম বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে শিক্ষাগত অর্জনে লিঙ্গসমতার উল্লেখযোগ্য উন্নতির কথা রয়েছে। এই বৈপরীত্য এক কঠিন উত্তরণের দিকেই ইঙ্গিত করে: পড়াশোনা শেষ করলেই এমন চাকরি নিশ্চিত হয় না, যেখানে যাওয়া সম্ভব, বেতন যথেষ্ট কিংবা কাজটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
নারী ও পরিবারের অভিজ্ঞতার বিবরণ দেখায়, কর্মপরিবেশ খারাপ হলে শ্রমবাজারে প্রবেশের আগ্রহ কমে যেতে পারে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গণিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী দুই বোন একটি স্কুলে মাসে ১৫ হাজার রুপি করে বেতনে শিক্ষকতা করতেন। শিক্ষা খাতের এক বিশেষজ্ঞ জানান, পাঞ্জাবের আরেক শহরে নারী শিক্ষকেরা মাসে মাত্র ৪,৫০০ রুপি পেতেন, কখনো কখনো দুই মাস দেরিতে। এমন মজুরিতে যাতায়াত, শিশুযত্ন এবং বাড়ির বাইরে কাজ করার সামাজিক চাপ সামলানোকে ন্যায্য মনে করা কঠিন হতে পারে।
এই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রয়েছে মজুরিবৈষম্যের বিস্তৃত প্রমাণ। সরবরাহ করা শ্রমবাজার বিশ্লেষণে উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, একই ধরনের শিক্ষা ও তুলনীয় পেশায় কাজ করা কর্মীদের মধ্যেও নারীরা পুরুষদের মজুরির প্রায় ৭২ শতাংশ পান। কর্মক্ষেত্র ও যাতায়াতের পথে হয়রানি, সীমিত গণপরিবহন এবং নিয়োগদাতাদের দুর্বল চর্চা পছন্দের সুযোগ আরও কমিয়ে দিতে পারে। প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে: কিছু বেসরকারি স্কুল শিক্ষকদের মূল শিক্ষাগত সনদ রেখে দেয়, ফলে ভালো চাকরিতে যাওয়া তাঁদের জন্য কঠিন হয়।
সামাজিক রীতিনীতি নারীদের শ্রমের চাহিদা এবং তাঁদের পক্ষে বিদ্যমান কাজ গ্রহণের সক্ষমতা—দুটিকেই প্রভাবিত করে। ফোন ব্যবহার, একা চলাচল বা পুরুষদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে এমন কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য নারীদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে স্নাতক নারীদের জন্যও গ্রহণযোগ্য পেশার পরিসর সংকুচিত হয়। মজুরি কম এবং চাকরির নিরাপত্তা দুর্বল হলে পরিবারগুলো এসব চাপের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে তেমন লাভ দেখবে না।
বিনা পারিশ্রমিকের পরিচর্যায় সময় ও পছন্দ সীমিত
নারীদের বেতনের কাজের পাশাপাশি বিনা পারিশ্রমিকে গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজের বড় এবং অসম অংশ সামলাতে হয়। মূল লেখায় উদ্ধৃত জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার তথ্য বলছে, ১০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী ও মেয়েরা তাঁদের সময়ের ১৯.৯ শতাংশ বিনা পারিশ্রমিকের গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন; পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ১.৮ শতাংশ। আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নারীরা দৈনিক পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ঘরের কাজ ও পরিচর্যায় দেন, যেখানে পুরুষেরা দেন প্রায় আধঘণ্টা। এতে আরও বলা হয়েছে, বেতনের কাজে যোগ দিলেও গৃহস্থালির কাজ থেকে নারীদের অবসর বাড়ে মাত্র ৩৭ মিনিট।
পরিচর্যা অপরিহার্য কাজ। কিন্তু পরিবার ও সরকারি সেবায় এর বেশির ভাগ দায়িত্ব নারীদের ওপর পড়লে শিক্ষা, বেতনের কাজ, উদ্যোক্তা হওয়া এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সময় সীমিত হয়। ডে-কেয়ার কেন্দ্র দায়িত্বের একটি অংশ সামলাতে পারে, কিন্তু শুধু এর মাধ্যমে রান্না, সংসার পরিকল্পনা বা শিশুদের দায়িত্ব ভাগাভাগি হয় না। নারীরা তখনও পদোন্নতির সুযোগ ছেড়ে দিতে, কম চাপের কাজে যেতে বা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন।
পাকিস্তানের ২০২৩ সালের ডে-কেয়ার সেন্টারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, অন্তত ৭০ জন কর্মী আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা করতে হবে। পাঞ্জাব কেন্দ্র স্থাপনকারী সংস্থাগুলোকে সহায়তাও দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ একটি বাস্তব বাধা দূর করে, তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে সেবায় প্রবেশাধিকার, মান এবং নিয়োগদাতা ও পরিবার পরিচর্যার দায়িত্ব আরও ন্যায্যভাবে ভাগ করে নিচ্ছে কি না, তার ওপর। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিরও বাস্তব চাকরি, ন্যায্য মজুরি ও পেশাগত উন্নতির সঙ্গে সংযোগ থাকা দরকার। শুধু প্রশিক্ষণ অনিরাপদ যাতায়াতকে নিরাপদ করতে পারে না বা নারীদের বাদ দেওয়া নিয়োগব্যবস্থা বদলাতে পারে না।
অর্থনীতির কম নিরাপদ অংশগুলোতেও নারীদের কাজ বেশি কেন্দ্রীভূত। মূল উপকরণে বলা হয়েছে, কর্মরত নারীদের ৬৮ শতাংশ কৃষিতে কাজ করেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানের হার ৭৩.২ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৫০.৪ শতাংশ। শ্রমশক্তি বিশ্লেষণে উদ্ধৃত গবেষণার হিসাব, কর্মরত নারীদের ৭৮ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছেন। কৃষিতে ৭৬ শতাংশ নারীকে বিনা পারিশ্রমিকে পরিবারের কর্মী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সব খাত মিলিয়ে বেতনের কাজে থাকা নারীদের ৬০ শতাংশেরই চুক্তি অস্থায়ী এবং চাকরিসংশ্লিষ্ট সুবিধা নেই।
অংশগ্রহণের হার বাড়লেই নারীর ক্ষমতা বাড়ে না—এই পরিসংখ্যান তা বুঝতে সাহায্য করে। কাজ থেকে আয় এবং পরিবারের সিদ্ধান্তে বেশি ভূমিকা আসতে পারে, কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকের পারিবারিক শ্রম ও অনিরাপদ চাকরিতে নারীরা উপার্জন, সুবিধা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর নিয়ন্ত্রণ নাও পেতে পারেন।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কি কর্তৃত্ব আনে?
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের প্রায় ২১.৭ শতাংশ আসনে নারী রয়েছেন। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা জানায়, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত ২৩,৮৫২ জন নারী দায়িত্ব পালন করছেন; স্থানীয় আলোচনাভিত্তিক সংস্থাগুলোর সদস্যদের প্রায় ১৬ শতাংশ তাঁরা। সংরক্ষিত আসন আইনসভায় নারীদের উপস্থিতি ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। তবে এর ইতিহাসে এও দেখা যায়, প্রতিনিধিত্ব নিজে থেকে ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি।
শুরুতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভায় নারীদের জন্য ১০ বছরের জন্য ১০টি আসন সংরক্ষিত ছিল। ধারণা ছিল, এ সময়ে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বিধানটির মেয়াদ শেষ হলে নারীদের প্রতিনিধিত্ব দ্রুত কমে যায়। ২০০২ সালের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারে জাতীয় পরিষদে ৬০টি সংরক্ষিত আসন পুনর্বহাল করা হয়, যা এখনো কার্যকর। সাধারণ আসনে নির্বাচিত নারী এখনো তুলনামূলকভাবে কম; ফলে নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক রাজনীতিতে সমান সুযোগের বদলে প্রতিনিধিত্ব আংশিকভাবে সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভরশীল।
দলীয় নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি আরও কম। ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন নেটওয়ার্ক (ফাফেন) পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে থাকা দলীয় অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের সনদ বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৩৮টি দলের নির্বাচিত ৩,১০০-এর বেশি পদধারীর মাত্র ৭ শতাংশ নারী। ৭৩টি দলের কোনো নারী পদধারী ছিলেন না। তালিকাভুক্ত ১৬৭টি দলের মধ্যে ১৩৮টির সনদ পাওয়া গিয়েছিল। তাই এই হিসাব পর্যালোচনাযোগ্য নথিগুলোর চিত্র তুলে ধরে, সব দলের বর্তমান কাঠামোকে আবশ্যিকভাবে নয়।
নির্বাচন আইন, ২০১৭ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কেন্দ্রীয় পদধারী ও নির্বাহী কমিটির তথ্য প্রকাশ ও জমা দিতে হয়। নারীদের অংশগ্রহণে সহায়তার ব্যবস্থাও এতে রয়েছে; যেমন, সাধারণ আসনের প্রার্থীদের অন্তত ৫ শতাংশ নারী হতে হবে। আইনি ন্যূনতম সীমা প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রার্থী বাছাই, অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও সম্পদের ওপর দলের নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করে, নিয়ম মানার বাইরেও নারীরা প্রভাব গড়ে তুলতে পারবেন কি না।
জ্যেষ্ঠ সরকারি প্রতিষ্ঠানেও নারী এখনো বিরল। জাতীয় পরিষদের জেন্ডার মূলধারায়ন কমিটি ২০২৫ সালে জানায়, আইন বিভাগ, বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র বিভাগে কর্মীদের ০.৯৩ শতাংশ নারী; সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যের ৫ শতাংশ নারী। এস্টাবলিশমেন্ট ডিভিশনের এক জরিপে ফেডারেল সরকারি কর্মচারীদের ৫.২৩ শতাংশ নারী পাওয়া যায়; নারী সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ২৬.০৬ শতাংশ ছিলেন ১৭ থেকে ২২ গ্রেডে। জরিপটি পুরোনো, তাই একে বর্তমান কর্মীসংখ্যা নয়, একটি মানদণ্ড হিসেবে দেখা উচিত। তবে উচ্চপর্যায়ের পদে নারী নিয়োগ ও তাঁদের উন্নতির চ্যালেঞ্জ কতটা গভীর, তা এটি তুলে ধরে।
আইনি মালিকানা থাকলেই নিয়ন্ত্রণ আসে না
নারীর অর্থনৈতিক অবস্থান নির্ভর করে তাঁরা সম্পদের মালিক হতে ও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কি না, তার ওপরও। সরবরাহ করা প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী কখনো বিবাহিত নারীদের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ এককভাবে বা যৌথভাবে জমির মালিক ছিলেন; অন্যদিকে কর্মরত নারীদের ৬৭ শতাংশ কৃষিতে কাজ করতেন। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের প্রায় ৯৭.২ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা কখনো জমি বা বাড়ি উত্তরাধিকারসূত্রে পাননি। বৈপরীত্যটি স্পষ্ট: অনেক নারী জমিতে কাজ করেন, অথচ জমির অংশীদার নন।
মিয়ানওয়ালি জেলার নারী ফরহিন বিবির নাম তাঁর বাবার মৃত্যুর তিন বছর পর বাবার সম্পত্তির নামমাত্র মালিক হিসেবে নথিভুক্ত হয়। কিন্তু তিনি কখনো জমির দখল বা সেখান থেকে আয় পাননি। ভাইয়েরা তাঁকে অংশ দিতে অস্বীকার করার পর তিনি আর বিষয়টি তোলেননি, আদালতেরও দ্বারস্থ হননি। আরেক নারী আমব্রিন ফাতিমা বলেন, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করার অভিযোগ উঠতে পারে—এই ভয়ে তিনি ভাইদের কাছে উত্তরাধিকার নিয়ে জানতে চাননি।
এই অভিজ্ঞতাগুলো আইনি অধিকার ও বাস্তব নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার ফারাক তুলে ধরে। পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার চাপ, দাবি আদায়ে নিজের আয়ের অভাব কিংবা জমির নথি ও আদালতের প্রক্রিয়া সামলানোর অসুবিধার মুখে পড়তে পারেন নারীরা। পাঞ্জাবের জমির মালিকানাসম্পন্ন ১২টি পরিবার নিয়ে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের জমির আনুষ্ঠানিক মালিকানা বা জমিতে প্রবেশাধিকার থাকলেও চাষাবাদ, ফসল বিক্রি ও আয়ের ওপর তাঁদের প্রভাব সীমিত হতে পারে। আইনি স্বীকৃতি প্রথম ধাপ; সম্পত্তির দখল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আয়ের অংশই নির্ধারণ করে, তা বস্তুগত স্বাধীনতা এনে দেবে কি না।
কৃষিতে কর্মরত নারী ও তাঁদের পরিবারের জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে নিরাপদ অধিকার না থাকলে ঋণের জামানত, পারিবারিক সম্পদের ওপর দর-কষাকষির ক্ষমতা এবং বিয়ে বা পারিবারিক সম্পর্ক বদলে গেলে বিকল্প—সবই নারীদের কম থাকতে পারে। তাই উত্তরাধিকার অধিকার কার্যকর করতে আনুষ্ঠানিক আইনের পাশাপাশি সহজলভ্য আইনি সহায়তা ও কার্যকর ভূমি রাজস্ব প্রশাসন দরকার।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে?
পাকিস্তানের রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবায় প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে; তবু প্রযুক্তি খাতের কর্মীবাহিনীতে নারীরা কম। হিসাব একেক রকম: পাকিস্তান সফটওয়্যার হাউসেস অ্যাসোসিয়েশনের আগের এক গবেষণায় আইটি কর্মীবাহিনীর প্রায় ১৪ শতাংশ এবং আইটি ব্যবস্থাপকদের ১৩ শতাংশ নারী বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক খাতভিত্তিক এক বিশ্লেষণে নারীদের অংশ প্রায় ১৭ শতাংশ বলা হয়েছে। এগুলো বর্তমান সময়ের পূর্ণাঙ্গ কর্মীসংখ্যা নয়, তবে দুটিই বড় ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়, বিশেষ করে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে।
বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে পরামর্শদাতা ও পেশাগত নেটওয়ার্কের অভাব, পরিচর্যার দায়িত্ব, কর্মজীবনে বিরতির পর কাজে ফেরার অসুবিধা এবং নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ও গ্রাহকপ্রাপ্তিতে অসম সুযোগ। ডিজিটাল ব্যবধান শুধু ইন্টারনেট সংযোগ আছে কি না, তাতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তিবিষয়ক বিশ্লেষণে উদ্ধৃত জিএসএমএ-র তথ্য অনুযায়ী, নারীদের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার ২০২৩ সালের ৩৩ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৪৫ শতাংশে উঠেছে; এতে প্রায় ৮০ লাখ নারী অনলাইনে এসেছেন। তবু মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের ৩৫ শতাংশ কেবল অন্য কারও ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৬ শতাংশ। ফোন ভাগাভাগি করে ব্যবহারে গোপনীয়তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং পড়াশোনা বা কাজের সময় সীমিত হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতিতে এই পার্থক্যের প্রভাব রয়েছে। নারীদের শুধু অন্যদের তৈরি পণ্য ব্যবহার নয়, বরং ডেভেলপার, গবেষক, ডিজাইনার, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রযুক্তি গড়া ও এর রূপ নির্ধারণের সুযোগও দরকার। কর্মীবাহিনী থেকে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ বাদ পড়লে দেশ দক্ষতা হারায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমিত প্রতিভার পরিসর থেকে লোক নিতে হয়। ২০১৭ সালে ১০পার্লসের চালু করা উইমেন টেক কোয়েস্টের মতো উদ্যোগ নারীদের প্রতিযোগিতা ও পেশাগত নেটওয়ার্কে যুক্ত করেছে; প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পরে ৭০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী সেখানে যোগ দিয়েছেন। এসব কর্মসূচি সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে এর পাশাপাশি নিয়োগ, পদোন্নতি, কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা ও মূলধনে প্রবেশাধিকারেও পরিবর্তন দরকার।
জলবায়ু সহনশীলতার জন্য অন্তর্ভুক্তি জরুরি
জলবায়ুচাপের মুখে থাকা একটি দেশের জন্য নারীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব, জলবায়ুঝুঁকি, পরিবেশের অবক্ষয় ও বায়ুদূষণের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের জিডিপি অন্তত ১৮ থেকে ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে। পরিবারের পানি, খাদ্য ও জ্বালানির চাহিদা প্রায়ই নারীরা সামলান, অথচ জমি, অর্থায়ন, পরিবহন এবং দুর্যোগ পরিকল্পনা বা অভিযোজন বাজেট বরাদ্দকারী প্রতিষ্ঠানে তাঁদের প্রবেশাধিকার কম থাকতে পারে।
এই ভারসাম্যহীনতায় বন্যা, প্রচণ্ড গরম, পানির সংকট, খাদ্য অনিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির জন্য পরিবারগুলো কম প্রস্তুত থাকতে পারে। পরিবারের ও সমাজের চাহিদা সম্পর্কে নারীদের জ্ঞান পরিকল্পনা উন্নত করতে পারে, আর বাজেট ও সম্পদের ওপর তাঁদের কর্তৃত্ব সহায়তা প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। আলোচনায় নারীদের আমন্ত্রণ জানানো আর সিদ্ধান্তে তাঁদের প্রভাব দেওয়া এক বিষয় নয়।
পাকিস্তানের উন্নয়ন উদ্যোগের সাফল্য শুধু ভর্তির হার, প্রশিক্ষণ সনদ বা দখলে থাকা আসন দিয়ে বিচার করা যায় না। নারীরা আয় করছেন ও তা নিয়ন্ত্রণ করছেন কি না, নিরাপদ চাকরি করছেন কি না, সম্পত্তির মালিক হয়ে তা পরিচালনা করছেন কি না, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কি না, রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গড়ছেন কি না এবং জলবায়ু অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন কি না—এসব দিয়েও তা মাপা যায়। লিঙ্গভিত্তিক আরও ভালো তথ্য থাকলে নারীরা কোথায় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করছেন এবং নেতৃত্বের পথে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছেন, তা বোঝা সহজ হবে।
মূল কথা
- ২০২৫ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ২৪ শতাংশ, যা পুরুষদের হারের চেয়ে অনেক কম।
- বিনা পারিশ্রমিকের পরিচর্যার কাজের বড় অংশ নারীরা করেন এবং তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি ও কৃষিতে বেশি কেন্দ্রীভূত।
- জাতীয় পরিষদের প্রায় ২১.৭ শতাংশ আসনে নারী রয়েছেন, তবে পর্যালোচিত নির্বাচনী নথিতে দলীয় পদধারীদের মাত্র ৭ শতাংশ নারী ছিলেন।
- উত্তরাধিকারের আইনি অধিকার থাকলেই সম্পত্তির দখল, নিয়ন্ত্রণ বা তা থেকে আয় নিশ্চিত হয় না।
- ডিজিটাল সরঞ্জাম, নিরাপদ কাজ ও জ্যেষ্ঠ পদে নারীদের প্রবেশাধিকার পাকিস্তানের প্রযুক্তি অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলবে।






