লাওস ও ফিলিস্তিনকে যুক্ত করা সুতো
ভিয়েনতিয়েনের একটি তাঁতঘরে রেশমের সুতো ধৈর্য ও অধ্যবসায়ে গড়ে ওঠা দুটি ঐতিহ্যকে একত্র করছে। একদল লাও তাঁতি হাতে তৈরি করছেন ফিলিস্তিনি কেফিয়েহ, যেখানে পরিচিত জালিকা নকশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাও সংস্কৃতিতে শিকড় গেড়ে থাকা সর্পপ্রতীক নাগা। প্রতিটি কেফিয়েহ তৈরি করতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
সূচিপত্র
‘দ্য সিল্ক কেফিয়েহ’ নামের প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। এর প্রতিষ্ঠাতা সৌভিক্সাদা সোমসাকসি এবং তাঁর ধর্মমা, ওস্তাদ তাঁতি বুয়াখাম ফেংমিক্সাই, যিনি ‘মে’ নামে পরিচিত, ফিলিস্তিনিদের সহায়তার পাশাপাশি লাও বস্ত্রশিল্পীদের জন্য শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন জীবিকার সুযোগ গড়ে তুলতে চান। এই কাজ তরুণদের এমন একটি কারুশিল্প শেখার সুযোগও করে দেয়, যা কারখানার চাকরির কারণে তাঁতিরা ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন ছেড়ে যাওয়ায় ক্রমেই কম প্রচলিত হয়ে উঠেছে।
কেফিয়েহ হলো ফিলিস্তিনি পরিচয় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি চৌকো স্কার্ফ। এর জালিকা নকশাকে সাধারণত সমুদ্র ও উপকূলীয় জীবনের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। লাও রেশমের সংস্করণে এই নকশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগা—এক পৌরাণিক সর্প, যা লাও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
সোমসাকসির বর্ণনায়, ঐতিহ্যবাহী গল্পে নাগা রক্ষকের ভূমিকা পালন করে। একটি কাহিনি অনুযায়ী, অতীতে সিয়ামের বিজয়াভিযানের সময় এটি লাও জনগণকে পেঁচিয়ে রেখেছিল এবং তাদের সঙ্গে বয়নশিল্পের জ্ঞান ভাগ করে নিয়েছিল। এই দুই প্রতীকের মেলবন্ধনে স্কার্ফটি নিছক অনুকৃতি থাকে না: এতে দুটি সংস্কৃতির প্রতীক একই বস্ত্রে স্থান পায়, আবার প্রতিটি ঐতিহ্যও নিজস্ব পরিচয়ে দৃশ্যমান থাকে।
প্রতিটি স্কার্ফ কীভাবে তৈরি হয়?
কেফিয়েহগুলো ঐতিহ্যবাহী লাও রেশম দিয়ে বোনা হয়; এ কাজে সময় ও অনুশীলনে অর্জিত দক্ষতা লাগে। দলটি হাতে এগুলো তৈরি করে, আর একটি স্কার্ফ শেষ করতে প্রায়ই এক মাসেরও বেশি সময় লাগে। কাজের জটিলতার প্রতিফলন এই ধীর গতিতে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতারা বয়নশিল্পকে কারখানায় তৈরি পণ্যে নামিয়ে না এনে একটি দক্ষতাভিত্তিক পেশা হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চান।
মে এই প্রকল্পে নিয়ে এসেছেন কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা। রেসিডেন্সিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি একটি বস্ত্র কারখানায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছেন। এখন তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজের জ্ঞান পৌঁছে দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ণকালীন রেসিডেন্সি, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহ্যবাহী লাও বস্ত্র বোনা শিখতে পারেন।
অভিজ্ঞ তাঁতিদের জন্য টেকসই পেশাজীবন গড়ে তোলার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ এই রেসিডেন্সি। সোমসাকসি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো মের জন্য বয়ন শেখানোকে পারিশ্রমিকযুক্ত, নিয়মিত কাজে পরিণত করা এবং আজীবন তাঁতিদেরও একই ধরনের সুযোগ দেওয়া। প্রকল্পটি আর্থিক সংকটে পড়েছে, তবে সম্প্রতি আরেকজন পূর্ণকালীন তাঁতিকে নিয়োগ দিয়েছে—মাইফোন ভিভংজাই, যিনি ‘পা মাই’ নামে পরিচিত এবং তিনিও একটি বস্ত্র কারখানায় কাজ করেছেন।
রেসিডেন্সির পাশাপাশি দলটি সাপ্তাহিক নানা কার্যক্রম আয়োজন করে, যার মধ্যে রয়েছে তাত্রিজ সূচিকর্মের আসর। তাত্রিজ হলো ফিলিস্তিনের একটি সূচিকর্মের ঐতিহ্য, যেখানে নকশা ও মোটিফ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করতে পারে এবং আঞ্চলিক রীতির পরিচয় তুলে ধরে। এসব আসরে লাও ও ফিলিস্তিনি নকশা একত্র করে প্রকল্পটি সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের পাশাপাশি বস্ত্রশিল্প শেখারও একটি পরিসর তৈরি করেছে।
লাও তাঁতিদের জন্য এই প্রকল্পের তাৎপর্য কী?
মে ও পা মাইয়ের জন্য এই উদ্যোগ কারখানার কাজ থেকে ছোট পরিসরের স্বাধীন কর্মধারায় যাওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। কারখানার চাকরিতে নিয়মিত মজুরি মিলতে পারে, তবে ব্যক্তিগত কৌশল পরবর্তী প্রজন্মকে শেখানো বা ধীরগতির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি বজায় রাখার সুযোগ কম থাকতে পারে। শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন প্রকল্পে তাঁতিরা কাজটি কীভাবে শেখানো ও করা হবে, সে বিষয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারেন। তবে বিক্রি ও অনুদানের ওপর নির্ভর করায় আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনও কঠিন।
পা মাইয়ের নিজের অভিজ্ঞতা প্রকল্পটিকে লাওসের ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করে। তিনি লাওসে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় বেড়ে উঠেছেন এবং বিমান হামলার মধ্যেই ঐতিহ্যবাহী রেশম বয়ন শিখেছেন। তাঁর গল্পে কারুশিল্প শেখার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংঘাতের পরিণতির যোগসূত্র রয়েছে, যা দেশজুড়ে নানা জনগোষ্ঠীকে এখনও প্রভাবিত করে।
১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র লাওসের ওপর ৫ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বোমাবর্ষণ অভিযান চালায় এবং ২০ লাখ টনেরও বেশি বিস্ফোরক ফেলে। এই ব্যাপক বোমাবর্ষণের ফলে দেশটিতে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের বিপুল অবশেষ রয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্লাস্টার মিউনিশন। এসব অস্ত্র একটি এলাকাজুড়ে ছোট ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়; কিছু বোমা আঘাতের পর বিস্ফোরিত হয় না এবং যুদ্ধ থেমে যাওয়ার বহু পরও বিপজ্জনক অবস্থায় থেকে যায়।
লাওসে ফেলা ক্লাস্টার মিউনিশনের ৩০ শতাংশেরও বেশি অবিস্ফোরিত রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশক পরও এসব অস্ত্রে মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে; সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এই বিপদ দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে—একটি মাঠ, পথ কিংবা ধাতুর টুকরোর আড়ালে প্রাণঘাতী বিস্ফোরক লুকিয়ে থাকতে পারে।
ফিলিস্তিনের সঙ্গে যোগসূত্রটি কেন মানুষের মনে সাড়া জাগিয়েছে?
কেফিয়েহ প্রকল্পটি লাও দর্শকদের মধ্যে ফিলিস্তিন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি লাওসের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সোমসাকসি মনে করেন, এই বস্ত্র দুই জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে আরও পরিচিত করে তোলার একটি উপায়—বিশেষ করে যাঁরা লাওসের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা বা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামের কথা জানেন না, তাঁদের কাছে।
বহু বছরের বোমাবর্ষণের পর লাও জনগণের ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার মধ্যেও ফিলিস্তিনিদের অবিচল থাকার একটি তুলনা টেনেছেন তিনি। এই তুলনা সংহতির প্রকাশ, দুই ইতিহাস অভিন্ন—এমন দাবি নয়। প্রতিটি ইতিহাসের কারণ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক মূল্য আলাদা। সুরক্ষা ও টিকে থাকার অভিন্ন ভাষা প্রকল্পটিকে সেই পার্থক্য মুছে না দিয়েই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে যোগসূত্র গড়তে সাহায্য করে।
গাজায় শিশুদের ওপর মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা বিশেষভাবে ভয়াবহ। প্রকল্পের বিবরণে উদ্ধৃত ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সেখানে ৬৪ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান একটি জনগোষ্ঠীর ওপর সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে; আর স্কার্ফটি এটি তৈরি ও পরা মানুষের জন্য ব্যক্তিগত ও বাস্তব এক সংযোগের ভিত্তি তৈরি করে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকল্পের কথা মুখে মুখে শুনে লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত সাদি সালামা রেসিডেন্সি পরিদর্শন করেন। সোমসাকসি বলেন, রাষ্ট্রদূত গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন এবং দলটিকে কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। উদ্যোগটিকে আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখা যখন চ্যালেঞ্জ ছিল, তখন রাষ্ট্রদূতের প্রতিক্রিয়া তাঁকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল বলে তিনি স্মরণ করেন।
জীবিকা ও জনস্মৃতির বাহন হিসেবে কারুশিল্প
‘দ্য সিল্ক কেফিয়েহ’ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দুটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে: ঐতিহ্যবাহী লাও বয়নশিল্প টিকিয়ে রাখা এবং ফিলিস্তিনের জন্য সহায়তা জোগানো। প্রথমটির জন্য দক্ষ কারিগরদের পারিশ্রমিক দেওয়া এবং নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে কৌশল পৌঁছে দেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়টির জন্য প্রকল্পটিকে দৃশ্যমান রাখা এবং কর্মশালার বাইরেও মানুষের বোঝাপড়া বাড়ানো দরকার।
এই সমন্বয় স্কার্ফটিকে পোশাকের চেয়ে বেশি কিছু করে তুলেছে। প্রতিটি স্কার্ফে রয়েছে নির্দিষ্ট তাঁতির শ্রমের ছাপ, পাশাপাশি লাও ও ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত মোটিফ। এই কাজের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা বুননের সময় সেই ইতিহাস নিয়ে আলোচনার সুযোগ পান; সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে নিছক বিমূর্ত ধারণা হিসেবে দেখার বদলে তা বাস্তবে অনুভব করতে পারেন।
সংঘাত ও অমানবিকীকরণের কারণে যাঁদের জীবন বিপর্যস্ত, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে মানবিকভাবে তুলে ধরার একটি উপায় হিসেবে প্রকল্পটির বর্ণনা দিয়েছেন সোমসাকসি। তাঁর কাছে, বছরের পর বছর বোমাবর্ষণের মধ্যেও লাওসের টিকে থাকা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির বার্তা বহন করে। এই কাজ তাঁতিদের আর্থিক চাপের সমাধান করে না, কিংবা লাওসে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের চলমান বিপদও দূর করে না। তবে এটি এমন একটি বাস্তব পরিসর তৈরি করে, যেখানে কারুশিল্প, আয়, শিক্ষা ও রাজনৈতিক উদ্বেগ একত্র হয়।
জেনে রাখুন
- ‘দ্য সিল্ক কেফিয়েহ’ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভিয়েনতিয়েনে শুরু হয়।
- হাতে বোনা লাও রেশমের প্রতিটি কেফিয়েহ তৈরি করতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
- নকশায় ফিলিস্তিনি জালিকা নকশার সঙ্গে লাও নাগা প্রতীক যুক্ত করা হয়েছে।
- প্রতিষ্ঠাতা সৌভিক্সাদা সোমসাকসি ও বুয়াখাম ফেংমিক্সাই ফিলিস্তিনকে সহায়তা এবং লাও তাঁতিদের জন্য টেকসই কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়েছেন।
- প্রকল্পটি বয়ন রেসিডেন্সি এবং সাপ্তাহিক তাত্রিজ সূচিকর্মের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
- ১৯৬৪-১৯৭৩ সালের বোমাবর্ষণ অভিযানে ফেলে যাওয়া অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থেকে লাওস এখনও গুরুতর ঝুঁকির মুখে।






