বিরল মুদ্রা হস্তক্ষেপে ইয়েনকে সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ উদ্যোগ

পড়তে 9 মিনিট
Japanese yen rises on BoJ stance and intervention speculation

বিরল জোটের উদ্যোগে ইয়েনের উত্থান

ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর ইয়েনকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান একযোগে কাজ করেছে। এই উদ্যোগ ১৯৯৮ সালের পর প্রথম যৌথভাবে ইয়েন কেনার পদক্ষেপ এবং ২০১১ সালে জাপানে ভূমিকম্পের পর জি৭-এর পদক্ষেপের পর ওয়াশিংটন ও টোকিওর মধ্যে প্রথম সমন্বিত মুদ্রা হস্তক্ষেপ।

সূচিপত্র
  1. বিরল জোটের উদ্যোগে ইয়েনের উত্থান
  2. ইয়েনের দর এতটা কমল কেন?
  3. এই পদক্ষেপের পার্থক্য কোথায়?
  4. ওয়াশিংটনের লাভ কী?
  5. হস্তক্ষেপে কি দীর্ঘস্থায়ী পুনরুদ্ধার হবে?
  6. ক্যারি ট্রেড নিয়ে নতুন করে ভাবনা কেন
  7. বন্ডের বাজারেও কি চাপ পড়তে পারে?
  8. মুদ্রার দর নির্ধারণে যুক্ত হচ্ছে ভূরাজনীতি
  9. সারকথা

জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েনের অতিরিক্ত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল ওঠানামা ঠেকাতে এই হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মার্কিন অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পদক্ষেপকে মিত্রকে সহায়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সমর্থনের উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ঘোষণার পর ইয়েনের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ডলারে প্রায় ১৫৫.২০-তে পৌঁছায়। এর আগের মাসে ইয়েনের দর ছিল প্রায় ১৬৪। বাজারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সমন্বিত ঘোষণার প্রভাব কতটা শক্তিশালী হতে পারে। ইয়েনের দর আবার কমতে শুরু করলে ওয়াশিংটন ও টোকিও ফের একসঙ্গে পদক্ষেপ নিতে পারে, এখন বিনিয়োগকারীদের সেই সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

যৌথ পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার আগে নিউইয়র্কের বাজারে এক হস্তক্ষেপের সময় জাপান ইয়েন কিনতে প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন মুদ্রা বিক্রি করে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অবদানের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বেসেন্টের কাছে থাকা একটি নোটের ছবি থেকে জানা গেছে, তাতে জাপানি মুদ্রা কেনার জন্য সম্ভাব্য ৫ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের কথা উল্লেখ ছিল।

বিজ্ঞাপন

ইয়েনের দর এতটা কমল কেন?

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারের বিস্তর ব্যবধানই ইয়েন দুর্বল হওয়ার প্রধান কারণ। জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ বাড়িয়ে ১ শতাংশে তুলেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। তা সত্ত্বেও ঋণ নেওয়ার খরচ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ৩.৫০ থেকে ৩.৭৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।

এই ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের ইয়েনে ঋণ নিয়ে—যেখানে অর্থায়নের খরচ তুলনামূলক কম—বেশি মুনাফা দেয় এমন মুদ্রায় মূল্যায়িত সম্পদে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। এই কৌশলকে ‘ক্যারি ট্রেড’ বলা হয়। ইয়েনের দর কমলে জাপানি মুদ্রায় ঋণ নেওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য এই লেনদেন আরও লাভজনক হতে পারে।

জাপান এমন কিছু অভ্যন্তরীণ চাপের মুখেও রয়েছে, যার কারণে দুর্বল মুদ্রা রাজনৈতিকভাবে সামলানো কঠিন। ইয়েনের দর কমলে আমদানি করা জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্প উপকরণের দাম বাড়ে। ডলারে মূল্য নির্ধারিত জ্বালানির আমদানির ওপর জাপান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই ইয়েনের দর প্রতিবার কমলে পরিবারের ব্যয় বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

জাপানের কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যা কমে যাওয়া, উৎপাদনশীলতার ধীর প্রবৃদ্ধি এবং রাজস্বনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তাও ইয়েনের ওপর চাপ তৈরি করছে। বহু বছর ধরে অত্যন্ত কম সুদের হার বজায় রাখার পর সেখান থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে ব্যাংক অব জাপান। তবে নীতিনির্ধারকেরা উদ্বিগ্ন, দ্রুত সুদের হার বাড়ালে ভোক্তা চাহিদা দুর্বল হতে পারে।

এই পদক্ষেপের পার্থক্য কোথায়?

জাপান এর আগেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করেছে, সাধারণত ডলার বিক্রি করে ইয়েন কিনে। এ ধরনের একক পদক্ষেপ সাময়িকভাবে মুদ্রার দাম বদলাতে পারে। তবে সুদের হারের মূল ব্যবধান একই থাকলে লেনদেনকারীরা প্রায়ই আবার আগের অবস্থানে ফিরে যান।

এবারের ঘটনা আলাদা, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে জাপানকে সমর্থন করেছে এবং পদক্ষেপে অংশ নিয়েছে। বিশ্লেষকেরা আরও বলেছেন, কর্তৃপক্ষ সরাসরি ডলার-ইয়েন লেনদেনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ইউরো-ইয়েন ক্রস ব্যবহার করেছে। এর ফলে মার্কিন ট্রেজারি বাজারের ওপর চাপ কমতে পারে, যেখানে বিপুল পরিমাণ ডলারের সম্পদ বিক্রি করলে বন্ডের সুদ বেড়ে যেতে পারে।

ফেডারেল রিজার্ভের রিপারচেজ সুবিধার মাধ্যমে জাপান ডলার পেতে পারে। এই ঋণব্যবস্থা সাময়িকভাবে ডলারের তারল্য জোগায়। এ সুবিধা ব্যবহার করলে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সরকারি বন্ড বিক্রি না করেই টোকিও অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বেসেন্ট এ সুবিধাকে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আগামী কয়েক মাসে এর পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে।

মনেক্স গ্রুপের বিশেষজ্ঞ পরিচালক ইয়েসপার কোল এই পদক্ষেপকে ইয়েনের বিপরীতে বাজি ধরা লেনদেনকারীদের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় বাজারের আচরণে প্রভাব ফেলতে তাদের সরকারি ব্যালান্সশিট একসঙ্গে কাজে লাগিয়েছে।

“যখন ক্রমেই দুর্লভ হয়ে ওঠা জাতীয় সম্পদ দুই বড় সার্বভৌম রাষ্ট্র একই লক্ষ্য অর্জনে একযোগে ব্যয় করে, তখন বাজারকে তা আমলে নিতেই হবে,” কোল বলেন।

ওয়াশিংটনের লাভ কী?

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ এশীয় মিত্রকে সমর্থনের চেয়েও বেশি কিছু। ইয়েনের দর অত্যন্ত কম থাকলে ডলারের হিসাবে জাপানি পণ্যের দাম কমে যায়, ফলে মার্কিন শুল্কের প্রভাবও কমে যেতে পারে। জাপানের সরকারি বন্ডের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে পৌঁছাক, সেটিও ঠেকাতে চায় ওয়াশিংটন।

বিশ্বে মার্কিন সরকারি ঋণের সবচেয়ে বড় ধারকদের একটি জাপান। প্রচলিত পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করতে হলে ইয়েন কেনার আগে ডলার সংগ্রহের জন্য টোকিও ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করতে পারে। বিপুল পরিমাণ বন্ড বিক্রি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের দাম কমে এবং সুদ বাড়তে পারে। এতে মার্কিন সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়।

যৌথ পদক্ষেপে এ ঝুঁকি কমতে পারে এবং মুদ্রা ও বন্ডের বাজারে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হতে পারেন। পাশাপাশি, জাপানকে সুদের হার বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেও বিনিময় হারের পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ পায় ওয়াশিংটন।

কিছু বিশ্লেষক এর পেছনে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক হিসাব দেখছেন। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ট্রেজারির এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের মাধ্যমে ২০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় চুক্তি এবং খোলা বাজারে পেসো কেনার উদ্যোগ নিয়ে আর্জেন্টিনার পেসোকে সমর্থন করেছিল। ট্যাকটিক্যাল রোটেশন ম্যানেজমেন্টের মাইকেল গেইড বলেন, একই অর্থ মন্ত্রণালয় ও একই স্থিতিশীলতা তহবিল দেখিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পদক্ষেপ কীভাবে রাষ্ট্রীয় কৌশলের হাতিয়ার হতে পারে।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এসওয়ার প্রসাদ ইয়েনের এই পদক্ষেপকে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি বলেন, এতে বোঝা যায় মুদ্রানীতি ভূরাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ছে।

“মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপে স্পষ্টতই ভূরাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে,” প্রসাদ বলেন।

বিজ্ঞাপন

হস্তক্ষেপে কি দীর্ঘস্থায়ী পুনরুদ্ধার হবে?

বিশেষ করে দুই বড় সরকার আবার পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে হস্তক্ষেপ দ্রুত বাজারের প্রত্যাশা বদলে দিতে পারে। এ হুমকি নিজেই হেজ ফান্ড ও অন্যান্য বিনিয়োগকারীকে ইয়েনের বিপরীতে বড় অঙ্কের শর্ট পজিশন গড়া থেকে বিরত রাখতে পারে। শর্ট সেলিং হলো, কোনো সম্পদের দাম কমবে—এই প্রত্যাশায় তা ধার নেওয়া বা বিক্রি করা। দাম উল্টো বাড়লে লোকসানে সেই সম্পদ ফের কিনতে হয়।

জাপানের মুদ্রা কর্মকর্তারা বলেছেন, সমন্বিত হস্তক্ষেপের আরও পদক্ষেপ নিতে তারা দ্বিধা করবেন না। এই পদক্ষেপের আগে দুই সরকার কয়েক মাস ধরে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা ও বেসেন্টের মধ্যে বারবার কথাবার্তাও ছিল। জাপানের শীর্ষ মুদ্রা কূটনীতিক আতসুশি মিমুরা বলেন, যৌথ পদক্ষেপটি দুই দেশের জোটের চূড়ান্ত পরিণতি।

তবে বাজার কৌশলবিদেরা এখনো সন্দেহ করেন, শুধু হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েনের দীর্ঘ পতন ঠেকানো যাবে কি না। এনএলআই রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সুযোশি উয়েনো বলেন, যৌথ ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রভাব একক জাপানি পদক্ষেপের চেয়ে বেশি হবে। তবে ইয়েন দুর্বল হওয়ার পেছনের কারণগুলো বদলায়নি।

দীর্ঘস্থায়ী সমর্থন আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি সুদের হারের ব্যবধান কমলে। সেপ্টেম্বরে সম্ভাব্য বৈঠকসহ পরবর্তী সুদ বৃদ্ধির কোনো ইঙ্গিত আছে কি না, সে জন্য বাজার ব্যাংক অব জাপানের দিকে নজর রাখছে। বেসেন্ট বারবার জাপানে দ্রুত সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এর ফলে মুদ্রার দুর্বলতা ও আমদানি করা মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর প্রকাশ্য চাপ তৈরি হয়েছে।

জাপানে সুদের হার বাড়লে ইয়েন আরও আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে কম ঋণ খরচে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত অর্থনীতির ওপর চাপও পড়তে পারে। এই দ্বন্দ্বের কারণে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষতি না ঘটিয়ে ব্যাংক অব জাপান কতটা সুদের হার বাড়াতে পারবে, তা সীমিত হয়ে যায়।

ক্যারি ট্রেড নিয়ে নতুন করে ভাবনা কেন

এই হস্তক্ষেপ বৈশ্বিক ক্যারি ট্রেডের ঝুঁকির হিসাব বদলে দিয়েছে। গ্লোবাল এক্স ইটিএফসের বিনিয়োগ কৌশলবিদ বিলি লিউং বলেন, সমন্বিত হস্তক্ষেপকে বাস্তব হুমকি হিসেবে দেখা হলে বিনিয়োগকারীরা বড় অঙ্কের শর্ট ইয়েন পজিশন ধরে রাখতে আরও সতর্ক হতে পারেন।

“বিশেষ করে অর্থায়নভিত্তিক লেনদেনের হিসাব এতে বদলে যায়,” লিউং বলেন।

লেনদেনকারীরা অর্থায়নের মুদ্রা হিসেবে ইয়েনের ব্যবহার কমালে তারা ইউরো বা অন্য মুদ্রার দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে জাপানের বাইরেও বিনিময় হার প্রভাবিত হতে পারে। ধার করা ইয়েন দিয়ে কেনা শেয়ার, বন্ড ও উদীয়মান বাজারের মুদ্রাসহ অন্যান্য সম্পদও বিনিয়োগকারীদের বিক্রি করতে হতে পারে।

ইয়েন দুর্বল থাকলে ক্যারি ট্রেডকে স্থিতিশীল মনে হতে পারে। তবে ইয়েনের দর হঠাৎ বেড়ে গেলে ইয়েনের ঋণ শোধের খরচ বাড়ে। তখন লেনদেনকারীরা একসঙ্গে তাদের অবস্থান বন্ধ করতে পারেন। এতে জাপানের সস্তা অর্থায়ন থেকে লাভবান হওয়া বাজারগুলোতে বড় দরপতন ঘটতে পারে।

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্টের জ্যেষ্ঠ স্থির আয় কৌশলবিদ মাসাহিকো লু বলেন, এখন থেকে লেনদেনকারীদের মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি ও সুদের হারের তথ্যের পাশাপাশি সরকারের প্রতিক্রিয়াও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

“সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এখন লেনদেনকারীদের মূল্য নির্ধারণের জন্য নতুন একটি বিষয় রয়েছে: শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক উপাদান নয়, নীতিগত প্রতিক্রিয়ার ধরনও,” লু বলেন।

বিজ্ঞাপন

বন্ডের বাজারেও কি চাপ পড়তে পারে?

জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজার যখন নিজ নিজ চাপে রয়েছে, তখনই এই মুদ্রা অভিযান চালানো হয়েছে। ব্যাংক অব জাপান নীতি স্বাভাবিক করার পথে এগোনোর পর জাপানি সরকারি বন্ডের সুদ অত্যন্ত নিচু স্তর থেকে বেড়েছে। সুদ বাড়লে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বিদেশি বন্ড কেনার বদলে দেশে আরও বেশি অর্থ রাখতে উৎসাহিত হতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ট্রেজারি সিকিউরিটির বড় ক্রেতা। তারা কেনা কমালে বা হাতে থাকা বন্ড বিক্রি করলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়তে পারে। ট্রেজারি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে এ উদ্বেগ আরও বেশি, কারণ সেগুলোর সুদ বন্ধকি ঋণ, করপোরেট ঋণ ও সরকারি অর্থায়নের ওপর প্রভাব ফেলে।

ইউরো-ইয়েন লেনদেন এবং ফেডারেল রিজার্ভের তারল্য সুবিধা ব্যবহার করলে বিপুল পরিমাণ ট্রেজারি বন্ড বিক্রির প্রয়োজন কমতে পারে। তাই এই পদক্ষেপের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো শুধু মুদ্রা নয়, বৈশ্বিক বন্ডবাজারের পরিস্থিতি সম্পর্কেও বার্তা দিয়েছে।

কিছু বাজার বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ দেখিয়েছে, জাপান নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়েও ওয়াশিংটন চিন্তিত। ট্রেজারি বন্ডের সুদ দ্রুত বেড়ে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন খরচ বাড়তে পারে এবং শেয়ারবাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল ডেটা সেন্টার শিল্পও রয়েছে, যেখানে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি।

মুদ্রার দর নির্ধারণে যুক্ত হচ্ছে ভূরাজনীতি

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সাধারণত সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর রাখা হয়। ইয়েনের গতিপথ এখনো এসব বিষয়েই নির্ধারিত হচ্ছে। তবে এই হস্তক্ষেপ নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: বাজারের ওঠানামা অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠলে সরকারগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে এই বার্তা লেনদেনকারীদের উপেক্ষা করা কঠিন। ওয়াশিংটন ও টোকিও দেখিয়েছে, বিনিময় হার তাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের অংশ; বিষয়টি পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া নয়।

এ ব্যবস্থায় ব্যাংক অব জাপানের ওপর নজরদারিও বাড়ছে। হস্তক্ষেপে যদি শুধু ইয়েন বিক্রি ধীর হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আরও স্পষ্ট মুদ্রানীতির পদক্ষেপ চাইতে পারেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত সুদের হার বাড়ালে বাজার মূল্যায়ন করবে, এই পদক্ষেপের কারণ অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, নাকি মুদ্রা নিয়ে চাপ।

জাপানের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য আমদানি করা মূল্যস্ফীতি কমানো এবং পরিবারের ওপর চাপ হ্রাস করা। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো বন্ডবাজারে অস্থিরতা সীমিত করা, বাণিজ্যনীতির উদ্দেশ্য রক্ষা করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। আপাতত এই স্বার্থগুলো এক বিন্দুতে মিলেছে, যা মুদ্রা লেনদেনকারীদের জন্য শক্তিশালী বার্তা তৈরি করেছে।

সারকথা

  • ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে ইয়েন কেনার অভিযান চালিয়েছে।
  • এই পদক্ষেপের আগে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ৪০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে প্রায় ১৬৪-তে পৌঁছেছিল।
  • সংশ্লিষ্ট এক হস্তক্ষেপে জাপান প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে থাকতে পারে; যুক্তরাষ্ট্রের অবদানের পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
  • বাজারে বিশৃঙ্খল ওঠানামা ফিরে এলে আবার হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছে দুই সরকারই।
  • এই পদক্ষেপ শর্ট ইয়েন লেনদেন নিরুৎসাহিত করতে এবং বৈশ্বিক ক্যারি ট্রেডে পরিবর্তন আনতে পারে।
  • ইয়েনের দর দীর্ঘস্থায়ীভাবে শক্তিশালী হতে হলে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সুদের হারের ব্যবধান কমাতে হবে এবং ব্যাংক অব জাপানকে আরও পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে