পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভ
কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা জনবিক্ষোভে রূপ নেওয়ায় বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ঘিরে ভারতে চাপ বাড়ছে। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, যার মধ্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তির ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টও রয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে এই পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটায়। এসব কেলেঙ্কারির কারণে পুনরায় পরীক্ষা নিতে হয় এবং কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে দিল্লি ও অন্যান্য শহরের রাস্তায় নামেন হাজারো মানুষ।
সূচিপত্র
বিক্ষোভকারীরা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ব্যানারে সংগঠিত হন। বেকার তরুণদের সঙ্গে তেলাপোকার তুলনা করে এক বিচারিক মন্তব্যের পর অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক প্রচার হিসেবে এই আন্দোলনের শুরু। দলটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী পায় এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহির দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি শুরু করে।
তরুণ অংশগ্রহণকারীরা বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস আরও গভীর পদ্ধতিগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। মুম্বাইয়ের মিছিলে যোগ দেওয়া ২৭ বছর বয়সী এক পেশাজীবী জানান, ছাত্রজীবনে অতি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ তিনি নিজেও অনুভব করেছেন; পরে স্থায়ী কাজ পাওয়াও ছিল কঠিন।
স্নাতকদের বেকারত্বের ব্যাপ্তি
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে ভারতে; ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩৬ কোটির বেশি। ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। মোট বেকার জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশই স্নাতক। ২০০৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ স্নাতক কর্মজগতে প্রবেশ করেছেন, অথচ কাজ পেয়েছেন মাত্র ২৮ লাখ; বেতনভুক্ত পদ পেয়েছেন আরও কমসংখ্যক।
অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা বলেন, গত এক দশকে শ্রমবাজার ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। কৃষিবহির্ভূত খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে আছে, আর প্রকৃত মজুরি রয়েছে স্থির। শ্রমের কাঠামোগত চাহিদা দুর্বল হওয়ায় অর্থনীতি সংকটে পড়েছে; পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মোপযোগী স্নাতক তৈরি করতে পারছে না।
শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে উত্তরণের সমস্যা
উচ্চশিক্ষায় ভর্তি দ্রুত বেড়েছে। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ডিগ্রিধারীর হার ১৯৮৩ সালের ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২৮ শতাংশ হয়েছে। তবে চাকরির সুযোগ সেই হারে বাড়েনি। স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব ২৫ বছর ধরে একগুঁয়েভাবে উচ্চ রয়েছে; জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার সুযোগ বাড়ায় সমস্যাটি এখন আরও প্রকট।
শিক্ষার মানসংক্রান্ত সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক স্নাতকের নিয়োগদাতাদের চাহিদামতো দক্ষতা নেই, ফলে চাকরি খুঁজতে দীর্ঘ সময় লাগে। কয়েকটি রাজ্যে নারীদের বেকারত্বের হার বিশেষভাবে বেশি; জম্মু ও কাশ্মীরে তা ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কৃষি থেকে উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থানের স্থানান্তর ধীরগতির; এখনও শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ কম উৎপাদনশীল কৃষিকাজে নিয়োজিত।
প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব
সফটওয়্যার পরিষেবার চাকরির মতো মধ্যবিত্তের স্থিতিশীলতার প্রচলিত পথগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ব্যাহত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, কৃষিবহির্ভূত পদের ৮ থেকে ১২ শতাংশ এতে প্রভাবিত হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নিয়োগ এক অঙ্কের হারে নেমে এসেছে, চুক্তিভিত্তিক কাজ বেড়েছে এবং মজুরি স্থবির হয়ে আছে। জনবল নিয়োগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, তরুণ স্নাতকদের শুধু জ্ঞানভিত্তিক ডিগ্রির বদলে কারিগরি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের কর্মপথ বদলাতে হবে।
মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উৎপাদন খাতের অবদান ২০১৫ সালের ১৭ শতাংশ থেকে কমে এখন ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের পর কয়েক বছর এ খাতে কর্মসংস্থান কমেছে, পরে সামান্য পুনরুদ্ধার হয়েছে। এদিকে ২০২০ সালের পর কৃষিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৮ কোটি। এটি ছদ্মবেকারত্বের ইঙ্গিত দেয়: শ্রমিকেরা বেশি উৎপাদনশীল কাজে যেতে পারছেন না।
তরুণদের প্রতিবাদ আন্দোলনের উত্থান
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম থেকে সংগঠিত অবস্থান কর্মসূচি ও মিছিলে রূপ নিয়েছে। সোনম ওয়াংচুকসহ আন্দোলনকারীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে অনশন করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা; এতে পেশাজীবী, পরিবার ও বিরোধী নেতাদের সমর্থন মেলে। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য কঠোর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ।
সংসদের দিকে মিছিলের চেষ্টার সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। বিক্ষোভস্থলের আশপাশে ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখে এবং দেশজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের আকৃষ্ট করতে থাকে।
সরকারি পদক্ষেপ ও বাকি ঘাটতি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত গঠনের ঘোষণা দেন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের নেতৃত্ব দিতে নন্দন নিলেকানিকে নিয়োগ করেন। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং নতুন একজন এ দায়িত্ব নেন। সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের শাস্তি কঠোর করার সংশোধনী পাস হয়; এতে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক ক্ষোভের কারণগুলো মোকাবিলা করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, আরও গভীর সংস্কার দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করা, উৎপাদন খাতকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের উন্নতি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। নগদ সহায়তা কর্মসূচির পরিধি বাড়লেও কাঠামোগত সংস্কার পিছিয়ে রয়েছে।
সরকারের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি
২৫ বছরের কম বয়সীরা দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হওয়ায় তরুণ ভোটাররা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটারগোষ্ঠী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিক্ষোভগুলো সরকারের জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিবেশী দেশগুলোতে একই ধরনের ক্ষোভ থেকে সহিংসতা ও নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, ভারতের বিক্ষোভকারীরা অহিংস কৌশল ও জবাবদিহির ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, চাকরির সংকট এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর আন্দোলনটির বিকেন্দ্রীভূত চরিত্র প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের সঙ্গে আলোচনায় অভ্যস্ত কর্তৃপক্ষের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মূল বিষয়গুলো
- পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ তরুণদের বেকারত্বের বৃহত্তর সংকট সামনে এনেছে।
- স্নাতকদের বেকারত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ; প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ কর্মজগতে এলেও তাদের তুলনায় অনেক কমসংখ্যক স্থায়ী কাজ পান।
- উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে এবং কৃষিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক রূপান্তরের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
- ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বিভিন্ন শহরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হাজারো মানুষকে সংগঠিত করেছে।
- সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে মন্ত্রী পরিবর্তন, টাস্কফোর্স এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসবিরোধী কঠোর আইন; তবে কাঠামোগত সংস্কার এখনও বাকি।
- ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে তরুণদের ক্ষোভ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে।






