বাউমকুখেন তৈরির কৌশল শিখছে রোবট
কোবে শহরে থিও নামের একটি রোবটকে বাউমকুখেন তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এটি জার্মানির রিং-আকৃতির কেক, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জাপানের মিষ্টান্ন সংস্কৃতির অংশ। দক্ষ মিষ্টান্নশিল্পীদের কাজের ধরন ও সিদ্ধান্ত অনুকরণ করার জন্য যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, পরের স্তরটি দেওয়ার আগে মিশ্রণের প্রতিটি পাতলা স্তর কতক্ষণ সেঁকতে হবে, তা নির্ধারণ করা।
সূচিপত্র
- বাউমকুখেন তৈরির কৌশল শিখছে রোবট
- মিষ্টান্নশিল্পীর বিচারবুদ্ধি কীভাবে অনুকরণ করে থিও?
- জাপান কেন রান্নার রোবটের দিকে ঝুঁকছে?
- অব্যক্ত জ্ঞান কী, আর তা কি ডিজিটাল করা সম্ভব?
- বাউমকুখেন থেকে ফ্রায়েড রাইস ও ইয়াকিসোবা
- ফিজিক্যাল এআই রোবটকে বাস্তব জগতের সঙ্গে যুক্ত করে
- খাদ্য অটোমেশন কারখানার অটোমেশনের চেয়ে কঠিন কেন?
- রোবট কি দক্ষ মিষ্টান্নশিল্পীদের জায়গা নেবে?
- জাপানের এই পরীক্ষার তাৎপর্য আরও বিস্তৃত
- মূল বিষয়গুলো
এই প্রকল্প দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে অফিসের সফটওয়্যার ও কারখানার উৎপাদনসারির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। জাপানে ক্যামেরা, ইমেজ সেন্সর, রান্নার সরঞ্জাম এবং খাদ্য উৎপাদনের নথির সঙ্গে এআই যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে এমন সব দক্ষতা সংরক্ষণ করা যায়, যা একসময় বহু বছর ধরে গুরু থেকে শিক্ষানবিশের কাছে হস্তান্তরিত হতো।
থিওর নির্মাতা কোবেভিত্তিক মিষ্টান্ন কোম্পানি জুখেইম কোং ২৫ মার্চ তাদের সদর দপ্তরে রোবটটির প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও প্রদর্শনীকক্ষ চালু করেছে। কোম্পানিটি ২০২৫ সালের ওসাকা-কানসাই এক্সপোতে এই ব্যবস্থা প্রদর্শন করে। এখন জাপানের প্রায় ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এটি ব্যবহারের জন্য দিচ্ছে। অর্থবছরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করার লক্ষ্য জুখেইমের।
জার্মান মিষ্টান্নশিল্পী কার্ল জুখেইম ১৯১৯ সালে জাপানে বাউমকুখেন নিয়ে আসেন এবং পরে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই কেক তৈরি করা বেশ কঠিন। ঘূর্ণায়মান শিকে মিশ্রণ লাগিয়ে ওভেনে সেঁকা হয়, এরপর বারবার নতুন স্তর দেওয়া হয়, যতক্ষণ না কেকে স্বতন্ত্র গাছের বলয়ের মতো নকশা তৈরি হয়। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সেঁকার সময়ের সামান্য তারতম্যও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে প্রক্রিয়াটি আয়ত্ত করতে কর্মীদের কয়েক বছর অনুশীলন করতে হতে পারে।
মিষ্টান্নশিল্পীর বিচারবুদ্ধি কীভাবে অনুকরণ করে থিও?
জুখেইমের অভিজ্ঞ কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে থিও ক্যামেরা ও ইমেজ সেন্সর ব্যবহার করে। প্রতিটি স্তরের রং, পুরুত্ব ও গঠনের মতো দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য নথিবদ্ধ করে সিস্টেমটি। পরে এসব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ওভেনের ভেতরের অবস্থা এবং ঘূর্ণায়মান শিকের নড়াচড়ার তথ্য মিলিয়ে দেখে।
এই তথ্যের সাহায্যে রোবটটি বুঝতে পারে, একটি স্তর কখন প্রস্তুত হয়েছে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী প্রক্রিয়ায় সমন্বয় আনে। একজন মিষ্টান্নশিল্পী মিশ্রণের স্পর্শ, পৃষ্ঠের চেহারা কিংবা রান্নাঘরের পরিবেশ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। থিও সেই বিচারবুদ্ধিকে এমন উপাত্তে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে, যা যন্ত্র বিশ্লেষণ করতে পারে।
এই প্রযুক্তি নির্ভর করে ডিপ লার্নিংয়ের ওপর। এটি একধরনের এআই প্রশিক্ষণ, যা ঢিলেঢালাভাবে মানবমস্তিষ্কের নেটওয়ার্কের আদলে তৈরি। সম্ভাব্য প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ নির্দেশনার তালিকা দেওয়ার বদলে এআই সিস্টেম বিপুলসংখ্যক উদাহরণ বিশ্লেষণ করে এবং সেগুলোর মধ্যে ধরন শনাক্ত করে। প্রশিক্ষণ শেষে নতুন ছবি বা সেন্সরের পাঠের সঙ্গে সেই ধরনগুলো মিলিয়ে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া বেছে নিতে পারে।
জুখেইমের ভাষ্য, থিও কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন কৌশল শিখতে পারে। একই অভিজ্ঞতা অর্জনে একজন মানুষের সাধারণত যে সময় লাগে, তার চেয়ে এটি অনেক কম। যন্ত্রটি কেবল একটি নির্দিষ্ট নড়াচড়া বারবার করে না। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা উপকরণে তারতম্য হলে প্রক্রিয়ায় সমন্বয় আনতে পারাই এর মূল সুবিধা।
জাপান কেন রান্নার রোবটের দিকে ঝুঁকছে?
অর্থনীতির অন্যান্য অনেক খাতের তুলনায় খাদ্যশিল্পে শ্রমিকের ঘাটতি আরও তীব্র হচ্ছে। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যসেবা খাতে প্রতি চাকরিপ্রার্থীর বিপরীতে শূন্য পদের অনুপাত ছিল ২.৩১। সব শিল্পের গড় ছিল ১.১৩।
অনুপাত বেশি হলে সীমিতসংখ্যক কর্মীর জন্য নিয়োগদাতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাদ্য প্রস্তুতকারকদের একই সঙ্গে বয়স্ক কর্মীবাহিনী এবং দক্ষ পেশায় তরুণদের কম প্রবেশের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানের সমস্যা শুধু আজকের পালার জন্য কর্মী খুঁজে পাওয়া নয়। অভিজ্ঞ কর্মীরা অবসরে গেলে তাঁদের জায়গা নিতে পারে, এমন লোক খুঁজে পাওয়াও কঠিন।
জুখেইমের প্রেসিডেন্ট হিদেও কাওয়ামোতো বলেছেন, উত্তরসূরি খুঁজতে হিমশিম খাওয়া শিল্পকে এই রোবট সহায়তা করতে পারে। তাঁর বক্তব্যে রান্নাঘরে কোম্পানিগুলোর এআই পরীক্ষার মূল কারণটি উঠে এসেছে: সব পদে প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলেও উৎপাদন সচল রাখতে অটোমেশন সহায়তা করতে পারে।
জাপানের বৃহত্তর জনসংখ্যাগত পতনের কারণে এসব পরীক্ষা জাতীয় গুরুত্ব পেয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে ১৮টি খাতে প্রায় ১ কোটি এআই-সক্ষম রোবট মোতায়েনের বিষয়ে সরকার আলোচনা করেছে। ফিজিক্যাল এআইয়ের পরিকল্পনায় এমন যন্ত্রের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা শুধু লেখা বা ছবি তৈরি করে না, বরং চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে বাস্তব জগতে কাজ করতে পারে।
অব্যক্ত জ্ঞান কী, আর তা কি ডিজিটাল করা সম্ভব?
রান্নার অনেক দক্ষতাকে অব্যক্ত জ্ঞান বলা হয়। এর অর্থ, মানুষ কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারে, যদিও প্রতিটি সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকায় ব্যাখ্যা করতে পারে না। অভিজ্ঞ রাঁধুনি হয়তো জানেন, উপকরণ থেকে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বের হলে প্যান দ্রুত ঘোরাতে হবে; কিংবা রঙের সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারেন কেকের একটি স্তর প্রস্তুত।
প্রচলিত শিক্ষানবিশি ব্যবস্থায় বারবার পর্যবেক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে এই জ্ঞান হস্তান্তর করা হয়। জাপানের রন্ধনসংস্কৃতিতে বিশেষজ্ঞকে দেখে দক্ষতা শেখার ধারণাটি এখনো শক্তিশালী। এই পদ্ধতিতে চমৎকার ফল পাওয়া যায়, তবে শিক্ষানবিশের সংখ্যা কমে গেলে এবং শেখানোর মতো জ্যেষ্ঠ কর্মী কম থাকলে তা নাজুক হয়ে পড়ে।
এআই উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ কিয়োতো তাচিবানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিতোশি মাতসুবারা বলেন, আগের এআই সিস্টেমগুলো এ ধরনের জ্ঞানের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন এমন সব নড়াচড়া নথিবদ্ধ ও পুনরুৎপাদন করা সম্ভব, যা আগে ব্যাখ্যা করা কঠিন ছিল।
ডিপ লার্নিংয়ের আগের যুগে এআই অব্যক্ত জ্ঞান শেখাতে পারত না। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অব্যক্ত জ্ঞান জড়িত দক্ষ কর্মীদের নড়াচড়া ডিজিটাল করা সম্ভব হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে কারুশিল্পের প্রতিটি দিক ধারণ করা গেছে। এআই নির্ভর করে প্রশিক্ষণের উপাত্তের মান, পর্যবেক্ষণ করা পরিস্থিতির পরিধি এবং সেন্সরের নির্ভুলতার ওপর। একটি রান্নাঘরে প্রশিক্ষিত রোবটকে অন্য জায়গায় নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার আগে আরও প্রশিক্ষণ দিতে হতে পারে, কারণ সেখানে ওভেন, উপকরণ বা উৎপাদনের লক্ষ্য ভিন্ন হতে পারে।
বাউমকুখেন থেকে ফ্রায়েড রাইস ও ইয়াকিসোবা
খাদ্য প্রস্তুতিতে এআই প্রয়োগের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ জুখেইম। টোকিওভিত্তিক টেকম্যাজিক ফ্রায়েড রাইস ও ইয়াকিসোবার মতো ভাজা খাবার রান্নার রোবট তৈরি করে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি এমন একটি অ্যাপ চালু করে, যা ব্যবহারকারীর বেছে নেওয়া রেসিপি অনুযায়ী প্যান ঘোরানোর গতি এবং অন্যান্য সেটিং নির্ধারণ করে।
প্রতিটি উপকরণের রান্নার সময় ও আঁচের মাত্রা শেখার জন্য রোবটগুলো এই সিস্টেম ব্যবহার করে। টেকম্যাজিকের ভাষ্য, এতে তাদের যন্ত্রের কাজের ধারাবাহিকতা উন্নত হয়েছে। এই কাজের উদ্দেশ্য পুরো শেফকে প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং এমন ধারাবাহিক শারীরিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করা, যা প্রতিটি পালায় একই নির্ভুলতায় করা কঠিন।
জাপানের অন্য কোম্পানিগুলো রান্নাঘরের বাইরেও এআই ব্যবহার করে দক্ষতা সংরক্ষণ করছে। ২০১৯ সালে ডেনৎসু টুনা স্কোপ তৈরি করে। এই প্রযুক্তি টুনার লেজের অংশের স্মার্টফোনে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে এবং মাছের মান নির্ধারণ করে। টুনা বিচারের জন্য বিশেষজ্ঞের চোখ বা মেকিকি অনুকরণের উদ্দেশ্যে সিস্টেমটি তৈরি করা হয়েছে। এই দক্ষতা অর্জনে মানব বিশেষজ্ঞদের এক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
পরে কুরা সুসি তাদের কনভেয়ার বেল্টের সুশি রেস্তোরাঁগুলোতে এই সিস্টেমের মাধ্যমে যাচাই করা টুনা ‘এআই টুনা’ নামে পরিবেশন করে। হিরোশিমায় ওতাফুকু সস ২০২৩ সালে তাদের সসের ফর্মুলার সংগ্রহশালার জন্য একটি এআই অনুসন্ধান সরঞ্জাম তৈরি করে। ১৫ হাজারেরও বেশি পণ্য ও প্রোটোটাইপ দিয়ে সিস্টেমটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আগে যে ফর্মুলা খুঁজতে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লাগত, এখন তা প্রায় পাঁচ মিনিটে করা যায়।
ফিজিক্যাল এআই রোবটকে বাস্তব জগতের সঙ্গে যুক্ত করে
যন্ত্রকে চারপাশ সম্পর্কে আরও সচেতন করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ থিওর কাজ। প্রচলিত শিল্প রোবট সাধারণত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত নড়াচড়া করে। ফিজিক্যাল এআইয়ের মাধ্যমে ক্যামেরা, সেন্সর ও এআই মডেল যুক্ত করা হয়, যাতে বস্তু, তাপ, সময় ও জায়গার তারতম্যে রোবট সাড়া দিতে পারে।
এই ক্ষেত্রে জাপানের রোবট নির্মাতা কোম্পানিগুলো এনভিডিয়া, ফুজিৎসু, ফানুক, ইয়াসকাওয়া ইলেকট্রিক ও কাওয়াসাকি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে কাজ করছে। এসব অংশীদারত্বে জাপানের সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি তৈরির অভিজ্ঞতার সঙ্গে উন্নত কম্পিউটিং ও এআই মডেল একত্র হচ্ছে। রোবটকে ভৌত পরিবেশ বুঝতে এবং বদলে যাওয়া কাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এনভিডিয়া বিভিন্ন সরঞ্জাম উপস্থাপন করেছে।
দেশের ভেতরের কম্পিউটিং সক্ষমতা কোম্পানিগুলোকে সংবেদনশীল উৎপাদন-উপাত্ত বিদেশে না পাঠিয়েই এআই সিস্টেম প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে পারে। খাদ্য প্রস্তুতকারকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা রেসিপি, প্রক্রিয়ার নথি ও গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে চাইতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা সাধারণভাবে ব্যবহারের আগে নিরাপদ নেটওয়ার্ক, নির্ভরযোগ্য সেন্সর এবং প্রশিক্ষিত কারিগরের প্রয়োজন হবে।
জাপানের খাদ্যযন্ত্র শিল্প বহু বছর ধরে এ ধরনের সহায়ক কাঠামো গড়ে তুলছে। নিক্কোর মতো কোম্পানি সামুদ্রিক খাবার, মাংস ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার অটোমেশন ব্যবস্থা সরবরাহ করে। নিক্কো হোক্কাইডো রোবট ল্যাবরেটরিও পরিচালনা করে। সেখানে শিক্ষার্থী ও কর্মীরা রোবট চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, আর কোম্পানিগুলো কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদনকেন্দ্রে অটোমেশন উপযোগী কি না, তা পরীক্ষা করতে পারে।
এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো অটোমেশনের সম্ভাব্য একটি বাধা মোকাবিলা করে: ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যন্ত্র থাকলেও সেগুলো স্থাপন, তদারক, মেরামত ও হালনাগাদ করার মতো লোক নাও থাকতে পারে। রোবট কোনো কাজে প্রয়োজনীয় কর্মীর সংখ্যা কমাতে পারে, তবে একই সঙ্গে প্রকৌশলী, অপারেটর ও রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষজ্ঞের চাহিদাও তৈরি করে।
খাদ্য অটোমেশন কারখানার অটোমেশনের চেয়ে কঠিন কেন?
অনেক শিল্পকারখানার তুলনায় রেস্তোরাঁ ও মিষ্টান্ন তৈরির রান্নাঘরের পরিস্থিতি কম অনুমানযোগ্য। একেক দফায় উপকরণের বৈশিষ্ট্য বদলায়, মেনুতে তারতম্য থাকে, জায়গা প্রায়ই সংকীর্ণ হয় এবং ক্রেতারা খাবারের যত্নসহকারে তৈরি চেহারা আশা করেন। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ময়দার মিশ্রণ, সস এবং রান্নার সময়কেও প্রভাবিত করতে পারে।
খরচও আরেকটি বাধা। রোবট, সেন্সর, সফটওয়্যার, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য কোম্পানিকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। ছোট রেস্তোরাঁয় বড় যন্ত্র রাখার মতো জায়গা নাও থাকতে পারে, কিংবা খরচ পুষিয়ে নেওয়ার মতো দৈনিক উৎপাদনও নাও হতে পারে। পুরোনো যন্ত্রপাতিকে আধুনিক এআই সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করাও কঠিন হতে পারে।
জাপানের সেবাদানের সংস্কৃতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে। আপ্যায়ন অনেক সময় ব্যক্তিগত মনোযোগ, পরিবেশনের ধরন এবং অস্বাভাবিক অনুরোধে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ওপর নির্ভর করে। রোবট বারবার করতে হয় এমন রান্না বা খাবার পৌঁছানোর কাজ করতে পারে, কিন্তু মানবসেবাকর্মীদের কাছে যে পূর্ণ মানের প্রত্যাশা থাকে, তা এখনো অর্জন করতে পারেনি। নির্দিষ্ট একটি কাজে রোবট খুব কার্যকর হতে পারে, অথচ একই সময়ে অনেক কাজ চলা ব্যস্ত রান্নাঘরে তা অনুপযুক্তও হতে পারে।
অন্যান্য সেবাখাতের উদাহরণ দেখায়, প্রযুক্তিটি ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে। নারিতা বিমানবন্দরের একটি কর্মীহীন স্যুভেনির দোকানে কর্মীর প্রয়োজন কমানোর লক্ষ্যে প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে বিড়ালের মতো দেখতে একটি রোবট ব্যবহার করা হয়েছে। রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতেও খাবার পৌঁছানো, প্যানকেক তৈরি, সুশি প্যাঁচানো এবং ওকোনোমিয়াকি রান্নার জন্য রোবট পরীক্ষা করা হয়েছে।
রোবট কি দক্ষ মিষ্টান্নশিল্পীদের জায়গা নেবে?
থিওর মতো সিস্টেমগুলোর তাৎক্ষণিক ভূমিকা পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের চেয়ে সহায়তারই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রোবট কোনো প্রক্রিয়া বারবার করতে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং রেসিপি সংরক্ষণ করতে পারে। অন্যদিকে মানবকর্মীরা উপকরণ প্রস্তুত, ফলাফল যাচাই, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং নতুন পণ্য তৈরির কাজ চালিয়ে যাবেন।
এই কাজের বিভাজন কোম্পানিগুলোকে ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপ্রযুক্তি সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে এবং দক্ষ উৎপাদনকে অল্প কয়েকজনের ওপর নির্ভরশীল হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। অভিজ্ঞ মিষ্টান্নশিল্পীরা নিজেরা প্রতিটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধাপ করার বদলে শেখানো, রেসিপি পরীক্ষা করা এবং একাধিক যন্ত্রের তদারকিতে বেশি সময় দিতে পারবেন।
কোনো কারুশিল্পের ডিজিটাল নথির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ আছে। একজন কর্মীর নড়াচড়া ও সিদ্ধান্ত প্রশিক্ষণের উপাত্তে রূপান্তরিত হলে, তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি মূল্যবান উৎপাদন ব্যবস্থা কোম্পানির মালিকানায় যেতে পারে। সম্মতি, স্বীকৃতি, পারিশ্রমিক এবং ওই উপাত্ত ব্যবহারের বিষয়ে কর্মী ও নিয়োগদাতাদের স্পষ্ট সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে।
যন্ত্রে তৈরি খাবারকে ক্রেতারাও ভিন্ন মানদণ্ডে বিচার করতে পারেন। ধারাবাহিক মান একটি সুবিধা, বিশেষত এমন পণ্যের ক্ষেত্রে, যা বিভিন্ন জায়গায় দেখতে ও খেতে একই রকম হতে হয়। তবে কোনো কোনো ক্রেতা ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির পেছনের মানবিক গল্পকে গুরুত্ব দিতে পারেন। এআই কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্রক্রিয়ার কোন কোন অংশে মানুষের বিচারবুদ্ধি থাকছে, তা কোম্পানিগুলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে।
জাপানের এই পরীক্ষার তাৎপর্য আরও বিস্তৃত
জনসংখ্যাগত চাপ মোকাবিলায় জাপান খাদ্য অটোমেশনকে বাস্তবসম্মত উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে। সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি, খুচরা বিক্রি, স্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদন খাতেও একই পদ্ধতি দেখা যায়। জনসংখ্যার প্রবণতা উল্টে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে কম কর্মী দিয়ে জরুরি সেবা সচল রাখাই এর লক্ষ্য।
রোবটশিল্পে জাপানের শক্তিশালী অবস্থান এই উদ্যোগের জন্য কার্যকর ভিত্তি দিচ্ছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ নির্ভুলতার শিল্পযন্ত্র তৈরি করছে, আর জাপানি উৎপাদনকারীদের কাছে বিপুল পরিমাণ কার্যক্রম-সংক্রান্ত জ্ঞান রয়েছে। ফিজিক্যাল এআইয়ের লক্ষ্য হলো এই হার্ডওয়্যার ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে ছবি এবং সেন্সরের উপাত্ত থেকে শিখতে সক্ষম সিস্টেমকে যুক্ত করা।
সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিমাপ করতে পারে এমন ফলাফলের ওপর। রোবটকে শ্রমিকের চাপ কমাতে, খাবারের মান বজায় রাখতে, মানুষের পাশে নিরাপদে কাজ করতে এবং খরচের তুলনায় যুক্তিসংগত ফল দিতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষা, নির্ভরযোগ্য উপাত্তের অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি পরিচালনায় সক্ষম কর্মীর সহায়তাও প্রয়োজন।
থিও ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা যাচাই করে দেখাবে, এআই দিয়ে শেখানো মিষ্টান্ন তৈরির দক্ষতা কোম্পানির প্রদর্শনীকক্ষের বাইরেও কার্যকর কি না। বিভিন্ন রান্নাঘরে সিস্টেমটি ভালোভাবে কাজ করলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা অন্য রন্ধনদক্ষতা সংরক্ষণের মডেল হয়ে উঠতে পারে এটি।
মূল বিষয়গুলো
- জুখেইমের থিও রোবট দক্ষ কর্মীদের বাউমকুখেন তৈরির কৌশল শিখতে ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে।
- বাউমকুখেন তৈরিতে বারবার স্তর দেওয়া এবং তাপ, সময়, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
- ফেব্রুয়ারিতে জাপানের খাদ্যসেবা খাতে প্রতি চাকরিপ্রার্থীর বিপরীতে শূন্য পদের অনুপাত ছিল ২.৩১; সব শিল্পে এই অনুপাত ছিল ১.১৩।
- টেকম্যাজিক, ডেনৎসু ও ওতাফুকু সস রান্না, সামুদ্রিক খাবারের মান যাচাই এবং রেসিপি অনুসন্ধানে এআই প্রয়োগ করছে।
- জাপান ফিজিক্যাল এআই সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ১৮টি খাতে প্রায় ১ কোটি এআই-সক্ষম রোবট মোতায়েনের লক্ষ্য নিয়েছে।
- রোবট দক্ষ কৌশল সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে, তবে তদারকি, সৃজনশীলতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রাহকসেবায় মানবকর্মীর প্রয়োজন থাকবে।






