পুঞ্জীভূত বর্জ্য মোকাবিলায় অভিনব সমাধান
হিমালয়ের শহর পোখারায় ফেলে দেওয়া নুডলসের প্যাকেট ও বিস্কুটের মোড়ক চলন্ত গাড়ির টায়ারের নিচে অপ্রত্যাশিতভাবে নতুন জীবন পাচ্ছে। নেপালে পরীক্ষামূলকভাবে এমন একটি পদ্ধতি চালু হয়েছে, যেখানে কম মূল্যমানের প্লাস্টিক বর্জ্য কুচি করে অ্যাসফল্টের সঙ্গে মেশানো হয়। এতে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের সংকর সড়ক, যা রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার পাশাপাশি নির্মাণব্যয় কমাবে বলে আশা করছেন সমর্থকেরা। গ্রিন রোড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের নেতৃত্বে নেওয়া এই উদ্যোগ একই সঙ্গে দুটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা মোকাবিলার ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা: ভাগাড় ও নদী বন্ধ করে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য এবং ভারী বর্ষায় ভেঙে পড়া সড়ক। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পোখারায় প্রতিদিন প্রায় ২০১ টন বর্জ্য তৈরি হয়। শহরটিতে ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক এই সড়ক দিয়ে গাড়ি চলাচল করছে। খাবারের প্যাকেট সড়কের উপকরণে পরিণত হওয়ার দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কারণ ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে খুবই সহজ। বিশ্বে প্রতিবছর ৪৪ কোটিরও বেশি টন প্লাস্টিক তৈরি হয়, আর সব শহরেই দরকার আরও মসৃণ সড়ক। এই দুই চ্যালেঞ্জকে এক সূত্রে বাঁধা যৌক্তিক মনে হয়। গ্রিন রোড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা বিমল বাস্তোলা বলেছেন, এই পদ্ধতিতে এমন প্লাস্টিকও কাজে লাগানো সম্ভব, যা প্রচলিত পুনর্ব্যবহারকারীরা উপেক্ষা করেন; এতে পুনর্ব্যবহার করা কঠিন উপকরণও ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাথমিক পরীক্ষায় প্লাস্টিক মেশানো প্রায় ৮ হাজার ২০০ ফুট সড়ক তৈরি করা হয় এবং ৬ হাজার ৬০০ পাউন্ডের বেশি কম মূল্যমানের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। পরিমাণগুলো সীমিত হলেও, আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার বাজার যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তবে বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক করছেন, পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে জাতীয় নীতিতে সম্প্রসারণের আগে এই সমাধান নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে গবেষণা করা দরকার।
সূচিপত্র
উপচে পড়া ভাগাড়, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এবং প্লাস্টিকে আটকে যাওয়া নালা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। নেপালে দ্রুত বর্ধনশীল শহরাঞ্চলে চাপ বিশেষভাবে তীব্র, কারণ পৌরসভার বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা ভোগের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউএনডিপি জানিয়েছে, পোখারার দ্রুত সম্প্রসারণ হ্রদ, জলাভূমি ও আবাসিক এলাকায় চাপ বাড়িয়েছে। পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রিন রোড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইউএনডিপির সহায়তায় সড়ক নির্মাণে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাস্তোলা ইউএনডিপিকে বলেছেন, বর্জ্য সমাধানে জনগোষ্ঠী, কোম্পানি ও প্রযুক্তিকে যুক্ত করে একটি পরিচ্ছন্ন দেশ গড়াই তাঁর লক্ষ্য। এই ধারণা শুধু নেপালের নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার আওতায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে ইতিমধ্যে প্রায় ২৪ হাজার ৮৫৫ মাইল গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের আগের মাত্র দুই বছরেই এর প্রায় ৮ হাজার ৭৮ মাইল তৈরি হয়। এই ব্যাপকতা প্রমাণ করে, ধারণাটি অভিনবত্বের পর্যায় ছাড়িয়ে সরকারি কর্মসূচিতে যেতে পারে। তবে নেপালের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা আলাদা, তাই সেখানে উপযোগী করে নেওয়া পদ্ধতি দরকার।
বর্জ্য থেকে কীভাবে সড়ক তৈরি হয়
বর্জ্যকে সড়কের পৃষ্ঠে রূপান্তরের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়। কর্মীরা নুডলস, বিস্কুট ও অন্যান্য খাবারের ফেলে দেওয়া প্যাকেট সংগ্রহ করেন, তারপর বাছাই করে সেগুলো সূক্ষ্ম টুকরোয় কুচি করেন। গরম অ্যাগ্রিগেটের ওপর এই কুচি প্লাস্টিকের প্রলেপ দেওয়া হয়, এরপর যোগ করা হয় প্রচলিত অ্যাসফল্টের বাঁধাই উপাদান বিটুমিন। প্লাস্টিক পুরোপুরি বিটুমিনের বিকল্প নয়। বরং এর ফলে নতুন কাঁচামালের প্রয়োজনীয় পরিমাণ কমে, আর বাণিজ্যিক মূল্যহীন বর্জ্যও মিশ্রণে যুক্ত হয়। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চে প্রকাশিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮ শতাংশ হারে কয়েক ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য মেশালে নতুন বিটুমিনের চাহিদা কমে এবং পরীক্ষাগারে আর্দ্রতা প্রতিরোধ, মার্শাল স্থিতিশীলতা ও ঘনত্বের মতো বৈশিষ্ট্যের উন্নতি হয়। মার্শাল স্থিতিশীলতা দিয়ে ভার বহনের সময় অ্যাসফল্ট মিশ্রণের শক্তি পরিমাপ করা হয়। ভারী যানবাহন ও তাপমাত্রার তীব্র ওঠানামায় সড়কপৃষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন অঞ্চলে এটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারিকভাবে, মার্শাল স্থিতিশীলতা বেশি হলে চাপের মুখে সড়কপৃষ্ঠের বিকৃত বা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।
নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত, মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করা আরেকটি গবেষণায় প্লাস্টিক-পরিবর্তিত অ্যাসফল্টের ২১০টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে প্লাস্টিক কণার আকার ২.৫ থেকে ৪ মিলিমিটার, বিটুমিনের পরিমাণ প্রায় ৫.৩ থেকে ৫.৫ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে রাখাকে সর্বোত্তম সীমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয়, মিশ্রণের পরামিতি সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক পলিমারভিত্তিক শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে, যা বাঁধাই উপাদানের সংহতি ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়। একই সঙ্গে গবেষণাপত্রগুলোতে বিচ্ছুরণ ও বিটুমিনের সঙ্গে প্লাস্টিকের সামঞ্জস্য, সংরক্ষণকালীন স্থিতিশীলতা এবং নিম্ন তাপমাত্রায় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়ন-চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। এগুলো যথাযথভাবে সামলানো না হলে সম্ভাব্য সুবিধা নষ্ট হতে পারে। তাই পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিককে শর্তসাপেক্ষে উপকারী সংযোজক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত; কারিগরি সমস্যাগুলো ঠিকভাবে সামলানো গেলেই এর কার্যকারিতার সুবিধা পাওয়া যায়।
স্থায়িত্ব ও ব্যয় সাশ্রয়ের প্রত্যাশা
সমর্থকদের দাবি, বর্জ্য সরিয়ে নেওয়ার বাইরেও প্লাস্টিকের সড়কে পরিমাপযোগ্য প্রকৌশলগত সুবিধা রয়েছে। বিমল বাস্তোলা এজেন্স ফ্রান্স-প্রেসকে বলেছেন, এই পদ্ধতিতে ব্যয় কমে, পানি চুঁইয়ে প্রবেশ ঠেকানো যায় এবং সড়কের আয়ু বাড়ে। নেপালে এ দাবির গুরুত্ব রয়েছে, কারণ বর্ষার প্রবল বৃষ্টিতে নিয়মিতই ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা সড়ক গর্তে ভরা জালে পরিণত হয়। পরীক্ষাগারের প্রমাণ এসব দাবির কয়েকটিকে সমর্থন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্জ্য পলিথিন মেশালে উচ্চ তাপমাত্রায় মিশ্রণের দৃঢ়তা বাড়তে পারে, ফলে ভারের চাপে সড়কপৃষ্ঠের স্থায়ী বিকৃতি প্রতিরোধ করা সহজ হয়। গবেষণায় সড়কে চাকা চলার ফলে তৈরি খাঁজ এবং ক্লান্তিজনিত ক্ষতির বিরুদ্ধেও উন্নত প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। ব্যস্ত মহাসড়কে এগুলো সাধারণ ক্ষয়ক্ষতির ধরন। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চলছে, যার প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক। গাজীপুরের একটি পরীক্ষামূলক সড়ক বন্যার ক্ষতি সহ্য করেছে, প্রচণ্ড গ্রীষ্মের তাপেও বিটুমিন গলে ওপরে উঠে আসা প্রতিরোধ করেছে এবং প্রচলিত শুধু-বিটুমিনের সড়কের চেয়ে কম খরচে নির্মিত হয়েছে।
টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় গবেষক সাহাদাত হোসেন টেক্সাস ও বাংলাদেশে প্লাস্টিকের সড়ক নির্মাণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ১০ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক মেশালে ফাটল ও গর্তের ক্ষতি সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ কমতে পারে। তাঁর দল দেখেছে, বাংলাদেশে গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গরম গ্রীষ্মে প্রচলিত অ্যাসফল্ট নরম হয়ে গলে গেলেও পাশের প্লাস্টিক-পরিবর্তিত অংশে দৃশ্যমান কোনো ক্ষতি হয়নি। চরম আবহাওয়া রয়েছে এমন যেকোনো দেশের জন্য তাপীয় স্থিতিশীলতা ও আর্দ্রতা প্রতিরোধ আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। হোসেন ব্যাখ্যা করেছেন, অ্যাসফল্ট মিশ্রণে এলডিপিই, এইচডিপিই ও পিপির মতো প্লাস্টিক যোগ করলে নতুন পেট্রোলিয়ামভিত্তিক উপকরণের চাহিদা কমে, ফলে সড়ক নির্মাণের কার্বন নিঃসরণও কমে। এতে সড়কের স্থায়িত্ব ও আয়ুও বাড়ে; সময়ের সঙ্গে মেরামতের প্রয়োজন এবং রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত সম্পদের পরিমাণ কমে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে প্রশ্ন
প্রকৌশলগত সম্ভাবনা নিয়ে উৎসাহ থাকলেও, সড়ক নির্মাণের পর কী ঘটে তা নিয়ে পরিবেশবিজ্ঞানীরা গুরুতর উদ্বেগ জানাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, পরিবেশের ওপর প্রভাব বুঝতে যে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দরকার, প্লাস্টিকের সড়ক এখনো তা পায়নি। প্রধান উদ্বেগের একটি মাইক্রোপ্লাস্টিক: বছরের পর বছর ব্যবহারে টায়ারের ঘর্ষণে সড়কপৃষ্ঠ থেকে ক্ষুদ্র টুকরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্লাস্টিক-পরিবর্তিত অ্যাসফল্টের নমুনায় যান চলাচলের অনুকরণ করে প্রথমবারের মতো মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমনের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। গবেষকেরা দেখেছেন, পুনর্ব্যবহৃত এলডিপিই, এলএলডিপিই ও এবিএস মেশানো অ্যাসফল্ট থেকে ২ থেকে ৪০ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হয়েছে। ঠান্ডা তাপমাত্রা ও অম্লীয় পরিবেশে নির্গমনের হার বেশি ছিল। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিককে সিনথেটিক অ্যাগ্রিগেটের বিকল্প হিসেবে যোগ করার তুলনায় বিটুমিনের ম্যাট্রিক্সে পলিমার-পরিবর্তক হিসেবে মেশালে মাইক্রোপ্লাস্টিক আগে নির্গত হয়।
এই অবকাঠামো পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
সড়ক নির্মাণে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিবেশগত বিষয়গুলো মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এখনো যায়নি, আর আয়ুষ্কাল শেষে প্লাস্টিকের সড়ক পুনর্ব্যবহার করা যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, পরিবেশগত পরিস্থিতি আশপাশের মাটি ও পানিতে কতটা প্লাস্টিক ছড়াবে তা প্রভাবিত করে। আরেকটি বড় অজানা বিষয় হলো ব্যবহার শেষে ব্যবস্থাপনা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তুলে ফেলা হলে প্লাস্টিকের সড়ক পুনর্ব্যবহার করা যাবে কি না, নাকি বর্তমান সমাধানই দূষিত বর্জ্যের নতুন ধারা তৈরি করবে। প্রচলিত অ্যাসফল্ট অনেকটাই পুনর্ব্যবহারযোগ্য; প্রায়ই তা মিলিং করে নতুন প্রকল্পে পুনরুদ্ধারকৃত অ্যাসফল্ট পেভমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্লাস্টিক যোগ করলে এই পুনর্ব্যবহার-চক্র জটিল হতে পারে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন বিল্ট এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত পৃথক এক পর্যালোচনায় সতর্ক করা হয়েছে, প্লাস্টিক বর্জ্যের এমন ব্যবহার চলমান গ্রিনওয়াশিংয়ের প্রচেষ্টা হতে পারে, যা প্লাস্টিক দূষণ সংকটের প্রকৃত সমাধান খোঁজার কাজ বিলম্বিত ও ব্যাহত করে। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এসব চর্চা পরিবেশগত ক্ষতি বাড়াতে পারে এবং বর্জ্য উপকরণের নতুন বাজার তৈরি করে নতুন প্লাস্টিকের ধারাবাহিক উৎপাদনের চাহিদা বাড়াতে পারে।
স্বাস্থ্য, মানদণ্ড ও গ্রিনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি
সড়কের ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও বিশেষজ্ঞেরা রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফ্রন্টিয়ার্স ইন বিল্ট এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় নির্মাণ খাতে প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবহার পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অনেক গবেষণায় সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। প্লাস্টিকে হাজার হাজার রাসায়নিক সংযোজক থাকে, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা আছে। সড়ক নির্মাণের সময় প্লাস্টিক বর্জ্য গরম করা হলে কর্মীরা কণা বা ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেন; অথচ শ্রমিকদের সুরক্ষার নির্দেশিকা এখনো অপর্যাপ্ত। প্লাস্টিক পলিউশন কোয়ালিশনের যোগাযোগবিষয়ক ব্যবস্থাপক এবং পর্যালোচনাটির প্রধান লেখক এরিকা সিরিনো গ্রিস্টকে বলেছেন, তাঁর পর্যালোচনা করা কয়েকটি গবেষণায় স্বাধীন গবেষকদের বদলে রাসায়নিক ও প্লাস্টিক প্রস্তুতকারীরা অর্থায়ন করেছেন। এতে ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার পক্ষপাত তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, প্লাস্টিকের সড়কের সুবিধা নিয়ে শিল্পখাতের দাবির সমর্থনে দেশটিতে কার্যত উল্লেখযোগ্য গবেষণা নেই। প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি উপকরণ ও স্থাপনের উচ্চ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন প্রণয়নকারী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডেভিড জোমবাক ব্যাখ্যা করেছেন, প্লাস্টিকের সড়ক কার্যকর প্রমাণিত হলেও প্লাস্টিক বর্জ্যের বিশাল পরিমাণ শোষণের মাধ্যম হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিসের গবেষণা-পর্যালোচনা অনুযায়ী, অ্যাসফল্ট পেভমেন্টে শুকনো ওজনের হিসাবে সর্বোচ্চ প্রায় ০.৫ শতাংশ বর্জ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করা যায়। আশাবাদী পরিস্থিতিতেও অ্যাসফল্টের বাঁধাই উপাদানে সব নতুন প্লাস্টিকের বদলে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার করলে দেশের মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের সামান্য অংশই কাজে লাগবে। জোমবাক জোর দিয়ে বলেছেন, অবকাঠামো মিশ্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার জায়গা নয়। আর পরিচ্ছন্ন, উন্নত মানের পলিথিনের চাহিদা ভাগাড় থেকে বর্জ্য সরানোর বদলে অন্য পুনর্ব্যবহারধারা থেকে উপকরণ সরিয়ে নিতে পারে।
নেপালের জন্য কর্মপরিকল্পনা
নিজস্ব ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার সঙ্গে এসব সুবিধা ও ঝুঁকি মিলিয়ে নেপালকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, মৌসুমি ভূমিধস এবং পৌরসভার সীমিত বাজেট সড়ক রক্ষণাবেক্ষণকে ব্যয়বহুল ও লজিস্টিক দিক থেকে কঠিন করে তোলে। হাজার হাজার মাইল প্লাস্টিকের সড়ক নির্মাণ করা ভারতের গ্রামীণ সড়ক কর্মসূচি সরাসরি অনুসরণ করা, উপযোগী সরবরাহব্যবস্থা ও মাননিয়ন্ত্রণ ছাড়া সম্ভব নাও হতে পারে। গ্রিন রোড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ও এর অংশীদারেরা বিষয়টি বোঝেন। প্রচলিত পুনর্ব্যবহারকারীরা যে কম মূল্যমানের প্লাস্টিক প্রত্যাখ্যান করেন, সেগুলো ব্যবহারে বাস্তোলা মনোযোগ দিয়েছেন; লক্ষ্য এমন স্থানীয় বাজার তৈরি করা, যেখানে আগে কিছুই ছিল না। তবে কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্লাস্টিকের পরিমাণ, মিশ্রণের তাপমাত্রা ও কার্যকারিতার মানদণ্ডের জন্য প্রমিত নির্দেশিকা দরকার। জাতীয় মানদণ্ড না থাকলে উপকরণের মানে ভিন্নতার কারণে সড়ক সময়ের আগেই নষ্ট হতে পারে, যা জনসাধারণের আস্থাকে দুর্বল করবে।
সাহাদাত হোসেন বলেছেন, নতুন যেকোনো প্রযুক্তি সফল করতে অ্যাসফল্ট প্ল্যান্টের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। বিভিন্ন প্লাস্টিকের গলনাঙ্ক ও বিটুমিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য ভিন্ন হওয়ায় প্লাস্টিক মেশাতে তাপমাত্রা ও সময়ে পরিবর্তন আনতে হয়। তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ডাইঅক্সিন ও অন্যান্য ক্ষতিকর যৌগ নির্গত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই নিরাপদ পরিচালনসীমা বজায় রাখা অপরিহার্য। টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিড ওয়েস্ট ইনস্টিটিউট ফর সাসটেইনেবিলিটি বর্তমানে পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে, যাতে জাতীয় এমনকি বৈশ্বিক পর্যায়েও ব্যবহারযোগ্য নকশা নির্দেশিকা তৈরি করা যায়। নেপাল এ ধরনের প্রটোকল গ্রহণ করলে আশাব্যঞ্জক পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নীতিতে যাওয়ার ব্যবধান কমতে পারে। স্পষ্ট পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থাকলে প্রকৌশলীরা বিভিন্ন ঋতুতে সড়কের কার্যকারিতা অনুসরণ করতে পারবেন এবং সমস্যা ব্যাপক হওয়ার আগেই নির্দিষ্টকরণ সমন্বয় করতে পারবেন।
আঞ্চলিক গতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সামগ্রিকভাবে প্লাস্টিকের সড়ক পরীক্ষার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতায় গবেষণা করছে, প্লাস্টিকের সড়ক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভালোভাবে সহ্য করতে পারে কি না; পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের পানিপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়া পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভারতের ওড়িশা রাজ্য সম্প্রতি ঘণ্টায় ১৭০ থেকে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কুচি করা প্লাস্টিক ও বিটুমিন মিশিয়ে শহুরে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করতে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়ার কাছে কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেসের অর্থায়নে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্লাস্টিকের যৌগিক নির্মাণ প্যানেল ও পেভমেন্টসহ আরও বিস্তৃত প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা উন্নত বর্জ্য বাছাই ও কার্যকারিতার তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের কাজ ইঙ্গিত দেয়, পলিমার কম্পোজিট দিয়ে তৈরি পুরো ভবন পুনর্ব্যবহার করলে বর্জ্যের ধারা আরও একরকম হতে পারে, ফলে পরবর্তী পর্যায়ে পুনর্ব্যবহারের পূর্বানুমান করা সহজ হবে।
এদিকে, কম মূল্যমানের বর্জ্যকে নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তর করার বৃহত্তর ধারণা, অর্থাৎ ডাউনসাইক্লিং, বস্তু ব্যবহারে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বৃত্তাকার অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সমালোচকদের যুক্তি, ডাউনসাইক্লিং নতুন প্লাস্টিক উৎপাদনের ওপর অব্যাহত নির্ভরতা আড়াল করতে পারে। প্লাস্টিক পলিউশন কোয়ালিশন ও অন্যান্য অধিকারকর্মী গোষ্ঠীর মতে, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক উৎপাদন সীমিত করার মতো উৎপাদন-পূর্ব পর্যায়ের কৌশলই ব্যবহার শেষে ব্যবস্থাপনার এমন পরিকল্পনার চেয়ে ভালো, যা প্লাস্টিক অর্থনীতির আয়ু বাড়াতে পারে। নেপাল এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হিমালয় অঞ্চলের উপযোগী নীতি তৈরির পাশাপাশি দেশটি ভারতের ব্যাপক কর্মসূচি, বাংলাদেশের বন্যা-সহনশীলতা পরীক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা থেকে শিখতে পারে। চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু মসৃণ মহাসড়ক তৈরি নয়; এমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যা পরিবেশগত ক্ষতি কমাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অদৃশ্য খরচ তৈরি করবে না।
মূল কথা
- প্লাস্টিক বর্জ্য ও সড়কের স্থায়িত্বের সমস্যা একসঙ্গে মোকাবিলায় নেপাল পোখারা ও অন্যান্য পরীক্ষামূলক এলাকায় প্লাস্টিক মেশানো অ্যাসফল্টের সড়ক পরীক্ষা করছে।
- গ্রিন রোড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাথমিক পরীক্ষায় ৬ হাজার ৬০০ পাউন্ডের বেশি কম মূল্যমানের প্লাস্টিক ব্যবহার করেছে। এ পদ্ধতিতে বর্জ্য কুচি করে অ্যাগ্রিগেটের গায়ে লাগানোর পর বিটুমিন যোগ করা হয়।
- বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলো বড় পরিসরে প্লাস্টিকের সড়ক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।
- পরীক্ষাগারের গবেষণায় মার্শাল স্থিতিশীলতা, আর্দ্রতা প্রতিরোধ ও তাপীয় কার্যকারিতার উন্নতি দেখা গেছে; তবে কয়েক দশক ধরে মাঠপর্যায়ের তথ্য এখনো সীমিত।
- বিশ্বব্যাংক ও স্বাধীন বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমন, রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ এবং ব্যবহার শেষে পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কঠোর গবেষণা দরকার।
- বিশেষজ্ঞেরা জোর দিয়ে বলেছেন, প্লাস্টিকের সড়ক প্লাস্টিক দূষণের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়, কারণ নির্মাণে মোট বর্জ্যের সামান্য অংশই ব্যবহার করা সম্ভব।
- পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে নীতিতে নিরাপদে সম্প্রসারণের আগে নেপালের জন্য স্পষ্ট জাতীয় মানদণ্ড, শ্রমিকের নিরাপত্তা প্রটোকল ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা অপরিহার্য।






