ঐতিহাসিক পতন
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মনস্তাত্ত্বিক সীমা ভেঙে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইন্দোনেশীয় রুপিয়ার দর নেমে যায় ১৭ হাজার ৬০০ রুপিয়ার নিচে, যা মুদ্রাটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন। দিনের লেনদেনে বিনিময় হার একপর্যায়ে ১৭ হাজার ৬৭০ রুপিয়ায় পৌঁছানোর পর স্থির হয় প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৮ রুপিয়ায়। এতে বছরের শুরু থেকে দরপতনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ শতাংশ। ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের স্মৃতি এখনো বহন করা একটি দেশের জন্য, যে সংকটের চরম পর্যায়ে ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার দর নেমেছিল ১৬ হাজার ৮০০-তে, এই নতুন রেকর্ড কেবল পরিসংখ্যানগত মাইলফলক নয়। এটি সরকারি আশ্বাস ও বাজারের বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, অর্থনৈতিক মৌলিক অবস্থার তুলনায় মুদ্রাটির দর কম। কিন্তু দ্রুত অবনতিতে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়েছেন এবং অর্থনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। ১৭ হাজার ৫০০ রুপিয়ার সীমা ভেঙে পড়া ইন্দোনেশিয়ার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, এমন সময়ে যখন বৈশ্বিক অস্থিরতা সারা বিশ্বের উদীয়মান বাজারগুলোকে চাপে ফেলছে।
সংকটের রাজস্বগত শিকড়
ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের (LPEM FEB UI) অর্থনীতিবিদ তেউকু রিফকির মতে, রুপিয়ার দরপতনের পেছনে মুদ্রানীতির কার্যপ্রণালির চেয়ে রাজস্বগত চাপের গভীরতর ভূমিকা রয়েছে। তাঁর যুক্তি, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় জ্বালানি ভর্তুকির ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর কর রাজস্ব দুর্বল থাকায় সরকারের রাজস্ব পরিচালনার অবকাশ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ, যার মধ্যে বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচি (MBG) এবং রেড অ্যান্ড হোয়াইট ভিলেজ কো-অপারেটিভস (KDMP) রয়েছে, সেগুলোর ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করেন রিফকি। রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও এসব কর্মসূচি এমন সময়ে বাজেটের সম্পদ খরচ করছে, যখন রাষ্ট্রের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সবচেয়ে কঠিন। তিনি সরকারকে কম উৎপাদনশীল বলে বর্ণনা করা বাজেটের খাতগুলো থেকে ব্যয় সরিয়ে সামাজিক সহায়তা ও উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানান, যা সরাসরি কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দুর্বল কর রাজস্বের মধ্যে জ্বালানি ভর্তুকির বোঝা বাড়ায় রাজস্ব পরিচালনার অবকাশ সংকুচিত হচ্ছে; রাজস্ব সংকটের মূল বিষয় এটিই।
হিসাবটি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের রাষ্ট্রীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল ডলারের বিপরীতে ১৬ হাজার ৫০০ রুপি বিনিময় হার ধরে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবেদনশীলতা-সংক্রান্ত হিসাব অনুযায়ী, ওই অনুমান থেকে প্রতি ১০০ রুপির বিচ্যুতিতে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৮০০ বিলিয়ন রুপি বাড়ে। বর্তমান বিনিময় হারে রাজস্বের ওপর সম্ভাব্য চাপ ইতিমধ্যে ট্রিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। ফলে আরও ঋণ নেওয়া বা ক্ষতিকর ব্যয়ছাঁটাই ছাড়া টেকসই সরকারি অর্থব্যবস্থা বজায় রাখার প্রচেষ্টা জটিল হয়ে পড়ছে।
কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতায় আস্থার ক্ষয়
তাৎক্ষণিক বাজেটের চাপের বাইরে, রুপিয়ার দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন, যা অর্থনীতিকে বহিঃস্থ ধাক্কার মুখে অরক্ষিত করে রেখেছে। গত তিন দশকের অধিকাংশ সময় ইন্দোনেশিয়ার চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল। স্থিতিশীল অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের বদলে অস্থির পোর্টফোলিও বিনিয়োগের প্রবাহের ওপর নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির অর্থায়ন হয়েছে। দেশটির রপ্তানি ভিত্তি এখনো পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে দেশটি দামের ওঠানামার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ এবং উৎপাদিত পণ্য বা সেবার মাধ্যমে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে অক্ষম।
সাম্প্রতিক ডলারের দরবৃদ্ধির সময় থাই বাত ও ফিলিপাইনের পেসোর মতো আঞ্চলিক মুদ্রার তুলনায় রুপিয়া কেন পিছিয়ে পড়েছে, তা এই দুর্বলতাগুলো ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখার অবস্থান এবং নিরাপদ বিনিয়োগে অর্থপ্রবাহের মতো বহিঃস্থ কারণগুলো এশিয়ার সব উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাকেই প্রভাবিত করেছে। তবে ইন্দোনেশিয়ার কাঠামোগত ঘাটতি প্রতিটি ধাক্কার প্রভাব বাড়িয়ে দেয়।
ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন ঝুঁকির আরেকটি স্তর যোগ করেছে। আকস্মিক নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন এবং স্পষ্ট আয়ের মডেলবিহীন উচ্চাভিলাষী রাষ্ট্রীয় প্রকল্প নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ একীভূত করার লক্ষ্যে গঠিত রাষ্ট্রীয় তহবিল দায়া আনাগাতা নুসান্তারা ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (দানান্তারা) প্রতিষ্ঠা সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার ডেপুটি গভর্নর হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর এক ভাতিজাকে নিয়োগ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এতে মুদ্রানীতিতে রাজনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা দুর্বল হতে পারে, এমন যেকোনো ধারণার প্রতি বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। নীতির সততা নিয়ে আস্থা টলে গেলে পুঁজি দ্রুত বেরিয়ে যায়। শুধু মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই ইন্দোনেশিয়ায় নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণ ছিল ১.৪৭ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই ছিল শেয়ারবাজারে। বৈশ্বিক ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমে যাওয়ায় এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বহিঃস্থ চাপ
দেশীয় দুর্বলতা সংকটের ক্ষেত্র তৈরি করলেও তাৎক্ষণিক আঘাত এসেছে বহিঃস্থ শক্তি থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরান-সংশ্লিষ্ট সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারে উঠেছে। দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি ও অপরিশোধিত তেল আমদানি করা নিট তেল আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়ার জন্য জ্বালানি আমদানি ব্যয় বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তেলের দাম প্রতি ডলার বাড়লেই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে এবং চালানের মূল্য পরিশোধে মার্কিন ডলারের চাহিদা তীব্র হয়।
বর্তমান ৩.৭৫ শতাংশ সুদের হার থেকে কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের অনীহায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের আয় ৪.৪৭ শতাংশে ওঠায় ইন্দোনেশীয় সম্পদ ও ডলারভিত্তিক বিনিয়োগের সুদের হারের ব্যবধান কমেছে। উদীয়মান বাজারের ঝুঁকির জন্য পর্যাপ্ত প্রতিদান না পেয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা পুঁজি আবার নিরাপদ বিনিয়োগে সরিয়ে নিয়েছেন। জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহেই ইন্দোনেশিয়ায় নিট পুঁজি প্রত্যাহারের পরিমাণ ছিল ১.৬ বিলিয়ন ডলার; ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এই গতি আরও বেড়েছে।
সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান MSCI-ও আরেকটি বহিঃস্থ ধাক্কা দিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসের পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানটি ইন্দোনেশিয়ার ১৮টি শেয়ারকে তাদের সূচক থেকে বাদ দিয়েছে, যা জাকার্তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। বড় তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শেয়ার মালিকানা কেন্দ্রীভূত এবং বাজারে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের পরিমাণ সীমিত থাকার উদ্বেগ থেকে এই বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। পুনঃভারসাম্যের আগে এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক বিক্রি শুরু হয় এবং স্থানীয় বাজারে ডলারের প্রবাহ আরও কমে যায়।
অসম্ভব ত্রিভুজের ফাঁদে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া
ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার গভর্নর পেরি ওয়ারজিও জোর দিয়ে বলেছেন, মুদ্রা রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। স্পট বাজার, নন-ডেলিভারেবল ফরোয়ার্ডস এবং বন্ড বাজারে হস্তক্ষেপ জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া রুপিয়া সিকিউরিটিজ (SRBI) ব্যবহার করে পরিচালিত কার্যক্রমসহ স্থিতিশীলতার সাতটি পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ টানা চার মাস কমেছে; মার্চের ১৪৮.২ বিলিয়ন ডলার থেকে এপ্রিলে নেমে এসেছে ১৪৬.২ বিলিয়ন ডলারে। এই রিজার্ভ দিয়ে এখনো প্রায় ৫.৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো গেলেও, নিম্নমুখী প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়, নিজের আস্থার সংকটের ঝুঁকি না নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনির্দিষ্টকাল হস্তক্ষেপ চালাতে পারবে না।
স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টায় অর্থনীতিতে ‘অসম্ভব ত্রিভুজ’ নামে পরিচিত একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সঙ্গে স্থিতিশীল বিনিময় হার বজায় রাখতে, স্বাধীন মুদ্রানীতি পরিচালনা করতে এবং পুঁজির অবাধ চলাচলের সুযোগ দিতে পারে না। প্রবৃদ্ধির সহায়ক সুদের হার বজায় রেখেই রুপিয়ার ওঠানামা কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া অসহনীয় গতিতে রিজার্ভ খরচ করছে।
বাজারে এখন মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকে নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। DBS ও OCBC-র অর্থনীতিবিদেরা ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রত্যাশা করছেন। এতে প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা দেওয়ার বদলে মুদ্রা রক্ষার দিকে মনোযোগ সরে যাবে। তা সত্ত্বেও কিছু বিশ্লেষকের সতর্কবার্তা, সঙ্গে রাজস্ব সংহতি না এলে উচ্চ সুদের হার আস্থা ফিরিয়ে আনার বদলে কেবল সময় কিনে দেবে। রিফকির মতে, বিনিয়োগকারীরা সামগ্রিক রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে সন্দিহান থাকলে অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়ার বন্ড স্থিতিশীলতা তহবিল (BSF) প্রকল্প উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না।
মাঠের বাস্তবতা রাজনৈতিক আশ্বাসের বিপরীতে
বাজারে উদ্বেগের মধ্যে সরকার শান্ত থাকার বার্তা দিতে চেয়েছে। পূর্ব জাভায় দুটি অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও বলেছেন, গ্রামবাসীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই, কারণ তাঁরা মার্কিন ডলারে লেনদেন করেন না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ নিরাপদ এবং অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী।
সাধারণ নাগরিকদের আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া এসব মন্তব্যের বদলে ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্রূপাত্মক মিম ও প্যারোডির ঢেউ ওঠে। গ্রামীণ জীবন বিশ্ববাজারের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে, এমন ইঙ্গিতকে কনটেন্ট নির্মাতারা উপহাস করেন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে ব্যঙ্গ করে বলা হয়, গ্রামবাসীরা এখনো যাতায়াতে ঘোড়া ব্যবহার করেন এবং খাবারের জন্য শিকার করতে হয়।
পরে অর্থমন্ত্রী পুরবায়া মন্তব্যগুলো থেকে সরে এসে ব্যাখ্যা দেন, প্রেসিডেন্ট আসলে গ্রামের লোকজনের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই মনোভাব থেকে বোঝা যায় মুদ্রার অবমূল্যায়ন কীভাবে অর্থনীতিতে প্রভাব ছড়ায়, তা নিয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণা রয়েছে। সেন্টার অব ইকোনমিক অ্যান্ড ল স্টাডিজের (Celios) নির্বাহী পরিচালক ভিমা ইউধিস্তিরা বলেন, প্রত্যন্ত জনপদের মানুষও আমদানি করা জ্বালানি, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, সার, মোটরসাইকেল ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। রুপিয়ার দর কমলে এসবের দাম বেড়ে যায়।
সাধারণ ইন্দোনেশীয়রা এর প্রভাব ইতিমধ্যে টের পাচ্ছেন। পূর্ব জাভার ব্লিতারে ৫৭ বছর বয়সী গৃহিণী নিনিক সুকারমি লক্ষ করেন, মার্চে ঈদের ছুটির আগের তুলনায় তাঁর স্থানীয় বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা তোফু ও তেম্পের পরিমাণ কমে গেছে। কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা প্লাস্টিকের মোড়ক ও আমদানি করা সয়াবিনের বাড়তি খরচের কথা বলেন। এই ঘটনা কঠিন বাস্তবতাটি তুলে ধরে: স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারেও উপকরণ ও মোড়কের জন্য বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল রয়েছে।
টেকসই স্থিতিশীলতার খোঁজ
রুপিয়ার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে স্বল্পমেয়াদি বাজার হস্তক্ষেপের চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন। গজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এডি জুনারসিন সতর্ক করে বলেন, বর্তমান চাপ সতর্কতার সঙ্গে সামাল না দিলে অস্থিতিশীল জল্পনা-কল্পনার সূত্রপাত হতে পারে, যেখানে আতঙ্ক আরও বিক্রি বাড়াবে। তিনি বলেন, ব্যাংক ইন্দোনেশিয়াকে কঠিন নীতিগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। সুদের হার কমালে প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে, তবে মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি মন্থর ও বেকারত্ব বাড়তে পারে। তাঁর মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ জরুরি, তবে রিজার্ভ নিঃশেষ হওয়া বা দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়া এড়াতে তা সীমিত রাখতে হবে এবং এর প্রভাব নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
জুনারসিন আরও জোর দিয়ে বলেন, মুদ্রানীতি একা কাজ করতে পারে না। বিশেষ করে বাজেটের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় ঋণ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব সহায়তা অপরিহার্য। অনুমাননির্ভর স্বল্পমেয়াদি পুঁজির বদলে টেকসই বিনিয়োগ আকর্ষণে স্পষ্ট নীতিবিষয়ক যোগাযোগ, আইনের নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারের কারিগরি বিশ্লেষণে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, ১৭ হাজার ৫০০ রুপিয়ার স্তর দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিকরণ পর্বের কেবল শুরু হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বড় ধরনের বৃদ্ধি ছাড়া অব্যাহত থাকবে, এমন মূল পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক মাসে ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার দর ১৭ হাজার ৫৫০ থেকে ১৭ হাজার ৭০০-এর মধ্যে থাকতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে পূর্বাভাস অনুযায়ী মুদ্রাটির দর নেমে যেতে পারে ১৮ হাজার, এমনকি ১৮ হাজার ৩০০ রুপিতে। তাতে আমদানি-জনিত মূল্যস্ফীতি বাড়বে, করপোরেট মুনাফার মার্জিন কমবে এবং উৎপাদকেরা খরচ কমাতে গিয়ে কর্মী ছাঁটাই করায় সেই আশঙ্কাও বাড়বে।
এতে কোনো ইতিবাচক দিক থাকলে তা হলো, দুর্বল রুপিয়া ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় উৎপাদন খরচ কমিয়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। অনুকূল বিনিময় হারের সুবিধা নিতে সিঙ্গাপুরের পর্যটকেরা বাতাম ও বিনতানে ভিড় করায় পর্যটন খাতেও ইতিমধ্যে কিছুটা উত্থান দেখা গেছে। তবে দরপতন অব্যাহত থাকলে এই সুবিধাগুলো বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
মূল কথা
- মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার দর রেকর্ড সর্বনিম্ন, প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৮-তে নেমেছে; ১৯৯৮ সালের সংকটের সময়কার স্তরকেও ছাড়িয়ে গেছে।
- অর্থনীতিবিদেরা এই দুর্বলতার প্রধান কারণ হিসেবে রাজস্বগত চাপের কথা বলছেন, যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি, দুর্বল কর রাজস্ব এবং বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচি (MBG) ও গ্রাম সমবায় (KDMP)-এর মতো ব্যয়বহুল অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ।
- দীর্ঘস্থায়ী চলতি হিসাবের ঘাটতি, পণ্যনির্ভর রপ্তানি এবং অস্থির পুঁজি প্রবাহসহ কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা মুদ্রার দুর্বলতা বাড়িয়েছে, যা কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
- ইরান সংঘাত, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ফেডারেল রিজার্ভের নীতিসহ বহিঃস্থ ধাক্কা পুঁজি প্রত্যাহার ত্বরান্বিত করেছে এবং ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে।
- ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ জোরদার করেছে এবং বাজারে সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া ও নীতিগত ত্রিভুজের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা সীমিত।
- গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাবকে খাটো করে দেখা সরকারি মন্তব্যে জনসাধারণের আস্থা নড়বড়ে হয়েছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, আমদানি-জনিত মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে খাদ্যের দাম ও পরিবারের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
- বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব সংহতি, কাঠামোগত সংস্কার ও স্পষ্ট নীতিবিষয়ক যোগাযোগ না থাকলে রুপিয়ার দর আরও কমে ১৮ হাজার বা তার নিচের দিকে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন।






