নজিরবিহীন দুর্বলতায় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি
২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়া দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক বাধা ভেঙে প্রতি মার্কিন ডলারে ১৭,৫১৩-তে নেমে আসে, যা মুদ্রাটির নথিভুক্ত ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বছরের শুরু থেকে প্রায় ৫ শতাংশ দরপতন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বহিঃস্থ ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সম্মিলিত চাপে প্রচলিত স্থিতিশীলতা রক্ষার উপায়গুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এশীয় আর্থিক সংকটের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশের জন্য ১৭,৫০০-এর সীমা ভাঙা কেবল পরিসংখ্যানের রেকর্ড নয়। এটি ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া এবং প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসনের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার অগ্নিপরীক্ষা।
সূচিপত্র
বছরের শুরুতেই পুঁজি দেশ ছেড়ে যেতে শুরু করে। শুধু জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে দেশ থেকে ১.৬ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যায়। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় বৈশ্বিক ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বহিঃপ্রবাহ আরও বাড়বে, তারই পূর্বাভাস ছিল এটি। নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদায় মার্কিন ডলার সূচক ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, আর উদীয়মান বাজারের সম্পদের আকর্ষণ কমেছে। তবে অবনতিশীল পরিস্থিতিকে খাটো করে দেখিয়ে স্থিতিশীলতার বয়ান ধরে রাখার জন্য সমালোচকেরা আর্থিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘উটপাখির নীতি’ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। বাস্তবে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার সম্মিলিত প্রভাবে রুপিয়ার দরপতন ঘটছে, যা শুধু মুদ্রানীতির হস্তক্ষেপে সহজে উল্টে দেওয়া সম্ভব নয়।
মুদ্রা ও পণ্যবাজার পর্যবেক্ষক ইব্রাহিম আসুয়াবি বলেন, কর্মকর্তারা সংঘাত শেষ হয়েছে বললেও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা রয়ে গেছে। ইরানের একটি তেল শোধনাগারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামলা এবং তেল পরিবহনে অব্যাহত অবরোধ ডলারে নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়িয়েছে, ফলে ইন্দোনেশিয়া ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক শক্তিশালী ৫.৬১ শতাংশ হলেও তা বাজারের আস্থা ফেরাতে পারেনি। এর বড় কারণ, প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি ছিল সরকারি ব্যয় ও মৌসুমি ভোগ; উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নয়।
মুদ্রার এত দরপতন হলো কেন?
মুদ্রাবাজার আস্থার ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে; সীমান্ত পেরিয়ে অর্থের নিট প্রবাহের প্রতিক্রিয়ায় ওঠানামা করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন স্থানীয় শেয়ার ও বন্ড কেনেন, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করে, তখন স্থানীয় মুদ্রার চাহিদা বাড়ে। প্রবাহ উল্টো দিকে গেলে মুদ্রার দর দুর্বল হয়। ইন্দোনেশিয়া একই সঙ্গে এই দুই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। পণ্যবাজারের স্বল্পস্থায়ী উত্থানের সময় বাদে, পণ্য, সেবা ও আয়ের নিট প্রবাহের হিসাব রাখা চলতি হিসাবে বছরের পর বছর ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালে ঘাটতি তুলনামূলক কম, ১.৫ বিলিয়ন ডলার হলেও তা রুপিয়াকে বহিঃস্থ ধাক্কার ঝুঁকিতে রেখেছে।
তাৎক্ষণিক কারণ হলো ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে সংশ্লিষ্ট অবরোধ। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সেখানে বিঘ্নের কারণে প্রতি সপ্তাহে বৈশ্বিক বাজার থেকে ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমেছে। এতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং জ্বালানি আমদানিতে ইন্দোনেশিয়ার ডলার ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ৩.৭৫ শতাংশে রেখেছে এবং ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড রয়েছে ৪.৪৭ শতাংশে। ডলারভিত্তিক সম্পদে এই উচ্চ মুনাফা ইন্দোনেশিয়ার বিনিয়োগপণ্যের সঙ্গে সুদের হারের ব্যবধান কমিয়েছে, ফলে উদীয়মান বাজারগুলোর উচ্চ ইল্ডের সুবিধা কমে পুঁজি নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে দ্রুত সরে যাচ্ছে।
মৌসুমি কারণগুলোও চাপ বাড়িয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে লভ্যাংশ বিতরণ ও বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্য করপোরেট খাতে ডলারের চাহিদা সর্বোচ্চ হয়। এর সঙ্গে হজের মৌসুম ও আমদানির চক্র দেশের বাজার থেকে আরও বৈদেশিক মুদ্রা টেনে নেয়। আর্থিক সেবা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, শুধু ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৯৯০ মিলিয়ন ডলারের পুঁজি বেরিয়ে গেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বোচ্চ। রুপিয়া এখন আর শুধু বৈশ্বিক মনোভাবের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না; ডলারের চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় কাঠামোগতভাবে দরপতনের চাপে পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ দুর্বলতায় আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত
বহিঃস্থ ধাক্কা স্ফুলিঙ্গ জোগালেও আগুন জ্বালানোর উপাদান এসেছে দেশের ভেতর থেকে। প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসনের অধীনে ২০২৫ সালের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ২.৯২ শতাংশে পৌঁছায়, যা মহামারির সময় বাদ দিলে দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইন্দোনেশিয়ার আইনে বার্ষিক বাজেট ঘাটতির সীমা ৩ শতাংশ এবং সরকারি ঋণের সীমা জিডিপির ৬০ শতাংশ। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে এই সীমাগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনা মূল্যে স্কুলে খাবার দেওয়ার কর্মসূচির মতো ব্যয়বহুল জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের জন্য নিয়ম শিথিল করা হতে পারে—এমন জল্পনা বন্ডবাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। গত বছর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ার সরকারি বন্ড থেকে প্রায় ৬.৪ বিলিয়ন ডলার তুলে নেন। সবচেয়ে বড় বিক্রির ধাক্কাটি আসে সেপ্টেম্বরে, যখন দীর্ঘদিনের অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থনীতিবিদ পুরবায়া ইউধি সাদেওয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও ঘিরে রয়েছে। প্রেসিডেন্টের এক ভাতিজাকে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ এবং সাশ্রয়ী আবাসনের মতো সরকারি কর্মসূচিতে অর্থায়নে সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মতিসহ ব্যয় ভাগাভাগির ব্যবস্থা—এসব কারণে মুদ্রানীতির স্বাধীনতা ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা আবার জোরালো হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা জোরদার করতে পারে—এমন একটি বিল নিয়েও পার্লামেন্টে আলোচনা চলছে। এই দায়িত্বের সঙ্গে মূল্য ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচলিত লক্ষ্য সাংঘর্ষিক হতে পারে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বারবার মুদ্রানীতির রাজনীতিকরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু বাজার প্রায়ই ধারণাকেই বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২৬ সালের মে মাসে বৈশ্বিক সূচক সরবরাহকারী এমএসসিআই তাদের সূচক থেকে ইন্দোনেশিয়ার ১৮টি শেয়ার বাদ দেয়, যা কর্তৃপক্ষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। বড় তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শেয়ার মালিকানার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এবং বাজারে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সীমিত অংশ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এর জেরে বিদেশি তহবিলের পুনর্বিন্যাসে বাজারে রুপিয়ার সরবরাহ আরও বেড়ে যায়।
রেটিং সংস্থাগুলোও একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ফিচ ও আরেকটি বড় সংস্থা নীতিগত অনিশ্চয়তা ও রাজস্ব পরিস্থিতির গতিপথের কথা উল্লেখ করে ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করে। এই অবনমনে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার চক্র আরও জোরালো হয়, যা মুদ্রার ভঙ্গুরতা বাড়ায়।
নিট আমদানিকারক হওয়ার ফাঁদ আরও শক্ত হচ্ছে
নিট তেল আমদানিকারক হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানির দামের প্রতিটি উল্লম্ফন ইন্দোনেশিয়ার জন্য রাজস্ব ও মুদ্রাবাজারে ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি মালিকানাধীন পেরতামিনার মাধ্যমে সরকার জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করে। জাতীয় তেল উৎপাদনের ৬৯ শতাংশ এই প্রতিষ্ঠানের আওতায়। ভর্তুকি সমন্বয় ব্যবস্থায় পেরতালাইটের প্রতি লিটারে ১০,০০০ রুপিয়ার ভর্তুকিযুক্ত খুচরা দাম এবং ডলারে পরিশোধ করা প্রকৃত ক্রয়মূল্যের ব্যবধান পেরতামিনাকে দেওয়া হয়। দাম নির্ধারণের সূত্রে সিঙ্গাপুরের মিডিয়ান অব প্ল্যাটস সূচক এবং আগের মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার হার ব্যবহৃত হয়। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও রুপিয়ার দর দুর্বল হলে ভর্তুকির বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়।
হিসাবগুলো উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের বাজেটে জ্বালানি ভর্তুকির জন্য শুরুতে ৩৮১.৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বরাদ্দ করা হয়েছিল। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার এবং বিনিময় হার ডলারে ১৬,৫০০ রুপিয়া ধরে হিসাব করা হয়। তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি এবং রুপিয়া ১৭,৫০০-এর দিকে যাওয়ায় সম্মিলিত প্রভাবে ভর্তুকির মোট ব্যয় ২০০ ট্রিলিয়ন রুপিয়ারও বেশি বাড়তে পারে। অর্থমন্ত্রী পুরবায়া স্বীকার করেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ৯২ ডলার থাকলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আইনি সীমা ছাড়িয়ে যাবে। তা ঠেকাতে সরকার ব্যক্তিগত গাড়িতে ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানি কেনা মাসে ৫০ লিটারে সীমিত করেছে এবং বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কর্মসূচি সপ্তাহে ছয় দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন করেছে। এতে প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন রুপিয়া সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ।
ভর্তুকির বোঝা শুধু পেট্রোলিয়ামেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি পেরুসাহান লিস্ট্রিক নেগারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক বা না হোক, স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদকদের নির্ধারিত সক্ষমতার জন্য অর্থ দেয়। এই কাঠামোগত ব্যবধানের বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ৩৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া। ২০২৪ সালে পিএলএনকে সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় ১১ বিলিয়ন ডলার, যা জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্বের চাপ আরও বাড়ছে। ফলে উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য সম্পদ কমে যাচ্ছে এবং পুঁজি গঠনের বদলে ভোগের ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
অর্থনীতিতে কারা লাভবান, কারা ক্ষতিগ্রস্ত
বিনিময় হারের ওঠানামার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সমানভাবে পড়ে না। অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান চিহ্নিত ব্যালান্স শিট চ্যানেল অনুযায়ী, ডলারে আয় কিন্তু রুপিয়ায় ব্যয় করে—এমন ব্যবসার মুনাফা বাড়ে। বিপরীতে, ডলারে ঋণ নিয়ে রুপিয়ায় আয় করা প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হতে দেখে। কয়লা, অপরিশোধিত পাম তেল, নিকেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পণ্য রপ্তানিকারকেরা ডলারে আয় এবং দেশে রুপিয়ায় পরিচালন ব্যয়ের কারণে লাভবান হয়েছে। দুর্বল রুপিয়ায় বিদেশি পর্যটকদের কাছে ইন্দোনেশিয়া তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় পর্যটন ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতে পারেন।
তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপরই বড় বোঝা পড়ছে। ওষুধ, প্রসাধনী, ইস্পাত ও ইলেকট্রনিকসসহ আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল উৎপাদনশিল্পগুলোকে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে, এমন সময়ে যখন ভোক্তা চাহিদা ইতোমধ্যেই কমছে। ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার খুচরা বিক্রয় জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৯১ শতাংশ কমবে। উত্তরদাতারা আগামী তিন থেকে ছয় মাসেও আরও দুর্বলতার আশঙ্কা করেছেন। উৎপাদকেরা আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপ পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপালে বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিবারের আয় স্থবির থাকায় ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় হয়। এতে সামগ্রিক অর্থনীতি টিকে থাকার মানসিকতায় চলে যায়, যেখানে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেমে যায় এবং কর্মী ছাঁটাইসহ দক্ষতা বাড়ানোর পদক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বাণিজ্য উদ্বৃত্তে থাকলেও তা থেকে তেমন স্বস্তি মিলছে না। ২০২৬ সালে আমদানি বেড়েছে ৭.১৮ শতাংশ, যেখানে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ০.৯০ শতাংশ। অর্থাৎ বাস্তব অর্থনীতির খাতগুলো করপোরেট ও সরকারি ডলারের চাহিদা সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারছে না। এদিকে জাকার্তা কম্পোজিট সূচক বছরের শুরু থেকে ২০ শতাংশের বেশি পড়েছে। এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ ফল করা সূচকগুলোর একটিতে পরিণত হওয়ায় সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব আরও বেড়েছে।
অসম্ভব এক বেছে নেওয়ার মুখে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া
আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং তত্ত্বে ‘অসম্ভব ত্রয়ী’ বা মুদ্রানীতির ত্রিধা সংকটের কথা বলা হয়। কোনো দেশ একই সঙ্গে স্থির বিনিময় হার, স্বাধীন মুদ্রানীতি এবং অবাধ পুঁজি চলাচল বজায় রাখতে পারে না। ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রেখেছে, কিন্তু বর্তমান সংকট সেই ভারসাম্যের সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে। মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে কম, ২.৪২ শতাংশে এবং লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকলেও ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া নীতিসুদ ৪.৭৫ শতাংশে রেখেছে। সুদ দ্রুত বাড়ালে ডলারভিত্তিক সম্পদের তুলনায় মুনাফা বাড়িয়ে রুপিয়াকে রক্ষা করা যেতে পারে। তবে তাতে ভোগের ওপর নির্ভরশীল এবং ইতোমধ্যে দুর্বল প্রবৃদ্ধির লক্ষণ দেখানো অর্থনীতি আরও সংকুচিত হতে পারে।
নীতিসুদ না বাড়িয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থিতিশীলতা রক্ষার সাতটি ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পট বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ জোরদার করা, দ্বিতীয়িক বাজারে সরকারি সিকিউরিটিজ কেনা এবং এনডিএফ বাজারে কার্যক্রম বাড়ানো। আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রানীতি কঠোর না করেই পুঁজি আকৃষ্ট করতে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া রুপিয়া সিকিউরিটিজে (এসআরবিআই) দেওয়া সুদের হারও বাড়ানো হয়েছে। জ্যেষ্ঠ ডেপুটি গভর্নর দেশ্ত্রি দামায়ান্তি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মুদ্রা রক্ষায় ব্যাংক সর্বশক্তি নিয়োগ করবে এবং বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে দিনরাত হস্তক্ষেপ করবে। স্পট বাজারের চাপ কমাতে অভ্যন্তরীণ এনডিএফ ও সোয়াপ লেনদেনের ন্যূনতম সীমা ৫ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ১০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে।
তবে রিজার্ভ কমছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আগের মাসের ১৪৮.২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৪৬.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যা টানা চতুর্থ মাসের পতন। এই মজুত দিয়ে এখনও প্রায় ৫.৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও প্রবণতাটি দেখাচ্ছে যে ব্যবহারের মতো সঞ্চয় সীমিত। পারমাতা ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জশুয়া পারদেদে সতর্ক করেছেন, শুধু সার্বক্ষণিক সতর্কতা আরও দরপতন ঠেকাতে পারবে না।
ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া দিনরাত প্রস্তুত থাকলেও রুপিয়ার তীব্র দরপতনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবু আমদানিকারক ও ঝুঁকি কমাতে থাকা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ডলারের নতুন চাহিদার ঢেউ এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বৈঠকেই পুরোপুরি উল্টে দেওয়ার চেয়ে দরপতনের গতি কমাতে অনেক সহজে পারবে।
দেশ্ত্রি আরও বলেন, নীতিসুদ না বদলে সুদের হারের কাঠামো শক্তিশালী করতে স্বল্পমেয়াদি রুপিয়া নোটের সুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের সতর্কতা, মুদ্রা রক্ষার পদক্ষেপ কিছুটা সময় দিতে পারে। কিন্তু দরপতন আরও গভীর হলে এবং রিজার্ভ কমতে থাকলে প্রকৃতপক্ষে সুদ বাড়াতে হতে পারে, বিশেষ করে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে চলে গেলে।
১৯৯৭ সালের সংকটের চেয়ে ভিন্ন
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে থাকা ঐতিহাসিক ক্ষতের কারণে ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সঙ্গে তুলনা অনিবার্য, তবে তা বিভ্রান্তিকরও। ১৯৯০-এর দশকে ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে উচ্চ পর্যায়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সরকার যখন মুদ্রাকে ভাসমান বিনিময় হারে ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন এর দর ৫০০ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। আজ রুপিয়ার বিনিময় হার বাজারনির্ভর, ফলে আকস্মিক অবমূল্যায়নের বদলে ধীরে ধীরে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। বৈদেশিক ঋণের কাঠামোও বদলেছে। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে মোট বৈদেশিক ঋণ এখন জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ; এর বেশির ভাগই দীর্ঘমেয়াদি, যা তিন দশক আগে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে বিপর্যস্ত করা ডলার ঋণের তুলনায় অনেক বেশি সামাল দেওয়ার মতো। বর্তমানে ব্যাংক খাতের মূলধনভিত্তি শক্তিশালী এবং নিয়ন্ত্রক নজরদারি কঠোর, ফলে ব্যাপক ধসের ঝুঁকি কমেছে।
তবে আস্থার অবনতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ধীরে ধীরে দরপতনও গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। ২০১৩ সালে চলতি হিসাবের ঘাটতি ও বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরতার কারণে মরগান স্ট্যানলি ইন্দোনেশিয়াকে উদীয়মান বাজারের ‘ভঙ্গুর পাঁচ’ দেশের দলে রেখেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রার মান বেড়েছে, আর ইন্দোনেশিয়া ও ভারত চাপে রয়েছে। এই বৈপরীত্য নিশ্চিত করে, বৈশ্বিক তারল্য কমলে চলতি হিসাবের ঘাটতি থাকা নির্দিষ্ট উদীয়মান বাজারগুলো এখনও শাস্তির মুখে পড়ে। ফলে ওয়াশিংটন ও মধ্যপ্রাচ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর ইন্দোনেশিয়ার নির্ভরতা রয়ে গেছে। আজকের বিপদ আকস্মিক ব্যাংকিং ধস নয়; বরং রাজস্বের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ, আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ধীর সংকট। এতে সরকার সংকট ঠেকানোর বদলে বারবার তার প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়।
রুপিয়ার সম্ভাব্য গতিপথ
সামনের মাসগুলোর জন্য বিশ্লেষকেরা দুটি বিস্তৃত পরিস্থিতির কথা বলেছেন। প্রাথমিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা চলতে থাকলেও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার মতো অবনতি ঘটবে না। সে ক্ষেত্রে ডলারে রুপিয়ার দর ১৭,৫৫০ থেকে ১৭,৭০০-এর মধ্যে থাকতে পারে। এই সীমায় হস্তক্ষেপ ও নীতিতে সামান্য সমন্বয় নিয়ন্ত্রণহীন পতন ঠেকাতে পারে, যদিও অস্থিরতা বেশি থাকবে। প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে মুদ্রার দর ১৮,০০০ থেকে ১৮,৩০০-তে নামতে পারে। এতে ভর্তুকি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং করপোরেট ব্যালান্স শিটের ওপর আরও বড় চাপ পড়বে।
যে পরিস্থিতিই হোক, শুধু স্পট বাজারে হস্তক্ষেপ যথেষ্ট নয়। বাজারের জন্য দরকার বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব শৃঙ্খলা, পুঁজিবাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রতি স্পষ্ট অঙ্গীকার। আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট প্রবোও সম্প্রতি ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রকে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ তহবিল দানান্তারার মাধ্যমে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ৩০টি স্থানে ১০০ গিগাওয়াট নতুন উৎপাদনক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ভর্তুকি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরিয়ে দিলে সময়ের সঙ্গে আমদানি ব্যয় কমতে পারে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট হতে পারে। এমন জোরালো পদক্ষেপ না নিলে হরমুজ প্রণালি নিয়ে খবর আর ওয়াশিংটনে ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্তের ওপর রুপিয়ার ভাগ্য নির্ভর করতেই থাকবে।
মূল কথা
- পুঁজি বহিঃপ্রবাহ ও তেলের বাজারে ধাক্কায় স্থিতিশীলতা রক্ষার উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৬ সালের মে মাসে রুপিয়া ডলারে ১৭,৫১৩-তে নেমে ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। বছরের শুরু থেকে মুদ্রাটির দর কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ।
- ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে প্রতি সপ্তাহে ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমেছে। নিট তেল আমদানিকারক হওয়ায় অতিরিক্ত জ্বালানি ভর্তুকিতে ইন্দোনেশিয়ার কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে।
- ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া নীতিসুদ ৪.৭৫ শতাংশে রেখেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে এবং স্পট, এনডিএফ ও এসআরবিআই বাজারে হস্তক্ষেপ চলছে। তবু মুদ্রা রক্ষা, প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা এবং অবাধ পুঁজি প্রবাহ বজায় রাখা একসঙ্গে সম্ভব নয়।
- বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ, এমএসসিআই সূচক থেকে শেয়ার বাদ পড়া এবং ফিচ ও আরেকটি বড় সংস্থার ঋণমানের পূর্বাভাস অবনমনের মতো অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বহিঃস্থ চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
- বৈদেশিক ঋণের তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর মাত্রা এবং ভাসমান বিনিময় হারের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৭ সালের ধাঁচের ব্যাংকিং ধসের আশঙ্কা নেই। তবে দীর্ঘস্থায়ী দরপতনে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশিল্পের মুনাফার মার্জিন কমে যাওয়া, কর্মী ছাঁটাই এবং বাজেট ঘাটতি আইনি ৩ শতাংশ সীমা ছাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।
- বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ডলারে রুপিয়ার দর ১৭,৫৫০ থেকে ১৭,৭০০-এর মধ্যে থাকতে পারে। তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা তীব্রভাবে বাড়লে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তা ১৮,০০০ থেকে ১৮,৩০০-তে পৌঁছাতে পারে।
- আস্থা ফেরাতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে যাওয়া, বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব সংযম এবং পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা বাড়ানোর কাঠামোগত সংস্কার দরকার।






