শহরকে খাবার জোগাতে ভোররাতের পরিশ্রম
ভোর ৩টায়, কুয়ালালামপুরের বেশির ভাগ মানুষ যখনও ঘুমিয়ে, তখনই কামপুং দাতুক কেরামাতের একটি সাধারণ রান্নাঘরে খাবার তৈরিতে ব্যস্ত জাইনাব দালি। সকাল ৫টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ৫৫ বছর বয়সী সাবেক হোটেল শেফ ভাজা ভাত, স্প্যাগেটি আগলিও এ অলিও, ম্যাকারনি ও কুইহের ট্রে নিয়ে যান আমপাং পার্ক এমআরটি স্টেশনের একটি ভেন্ডিং মেশিনে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার থেকে স্টেশনটি অল্প হাঁটার পথ। প্রতিটি খাবারের দাম ৩ থেকে ৫ রিঙ্গিত। নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে সস্তা খাবার রাখতে লড়াই করে যাওয়া হাতে গোনা বিক্রেতাদের একজন তিনি।
সূচিপত্র
জাইনাব অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের ‘পিপল ইনকাম ইনিশিয়েটিভ’ নামের একটি কর্মসূচির অংশ। এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারীরা সর্বোচ্চ ৫ রিঙ্গিত দামের খাবার ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারেন। ন্যাশনাল ইনকাম ডিস্ট্রিবিউশনের সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলোর—যাদের বি৪০ গোষ্ঠী বলা হয়—আয় বাড়ানো এই কর্মসূচির লক্ষ্য। তবে তিন বছর পর জাইনাব বলছেন, মুনাফার মার্জিন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। দাম কম রাখতে তিনি আস্ত মুরগির টুকরোর বদলে সস্তা ফিলে ব্যবহার করছেন এবং সুপারমার্কেটের ছাড়ের পণ্যের খোঁজ করছেন।
"আগে আস্ত মুরগির টুকরো দিতে পারতাম। এখন সস্তা বলে ফিলে ব্যবহার করি। বুদ্ধি খাটাতে হয়। আমি সাধারণত সুপারমার্কেটের অফার খুঁজি," তিনি বলেন।
মাসে তাঁর বিক্রি হয় প্রায় ১০ হাজার রিঙ্গিত। লাভ থাকে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার রিঙ্গিত, যার বড় অংশ আসে বোতলজাত পানির বিক্রি থেকে; এতে খাবারের কম মার্জিন পুষিয়ে যায়। বর্তমানে সরকারি সহায়তায় তাঁর মেশিন ও ভাড়ার জায়গার খরচ মেটে, কিন্তু দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ মে মাসের শেষে শেষ হবে। এই সহায়তা না থাকলে ব্যবসাটি টিকবে কি না, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।
"ভাড়া আর মেশিনের খরচ বেড়ে গেলে আমি চালিয়ে যেতে পারব কি না জানি না। আমার কাছে এটা অনেকটা দাতব্য কাজের মতো। বেশি লাভ হয় না, শুধু বেঁচে থাকার মতো আয় হয়। মানুষ এখনো এর ওপর নির্ভর করে, তাই যত দিন পারি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব," তিনি বলেন।
সংকুচিত হচ্ছে রাহমাহ মেনু
জাইনাবের ভেন্ডিং ব্যবসা বৃহত্তর এক সরকারি উদ্যোগের অংশ, যেখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দ্রুত কমছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চালু হয় ‘রাহমাহ মেনু’—যার অর্থ সহমর্মিতার মেনু। চালুর সময় স্থানীয় ভারতীয় মুসলিম রেস্তোরাঁ—জনপ্রিয়ভাবে মামাক খাবারের দোকান নামে পরিচিত—থেকে শুরু করে বড় চেইন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার খাবারের দোকান সাশ্রয়ী মূল্যের খাবার দিতে এতে যুক্ত হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ মাত্র ৩,১৪১টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় ছিল বলে জানান দেশীয় বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়বিষয়ক উপমন্ত্রী ফুজিয়াহ সালেহ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচ বিক্রেতার চারজনই সরে গেছেন।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আইয়ুবের মৃত্যুর পর উদ্যোগটি তার প্রথম দিকের প্রধান সমর্থককেও হারায়। কর্মসূচি শুরুর ছয় মাসও তখন পেরোয়নি। এর প্রধান পরিকল্পনাকারী না থাকায়, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মধ্যে উদ্যোগটি গতি ধরে রাখতে হিমশিম খায়।
কিছু বড় খুচরা বিক্রেতা অবশ্য উদ্যোগের সঙ্গে আছে। মাইদিন মোহাম্মদ হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির আলী মাইদিন বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান ৫ রিঙ্গিতে ভাত, মুরগি বা মাছ, সবজি ও ঠান্ডা চা দিয়ে রাহমাহ খাবার পরিবেশনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফাস্টফুড চেইন কেএফসিও ৫ রিঙ্গিতের সেট বিক্রি অব্যাহত রেখেছে, যাতে থাকে এক টুকরো মুরগি, একটি বান ও বোতলজাত পানি।
"ব্যয়ের চাপ থাকলেও ৫ রিঙ্গিতে খাবার পরিবেশনের লক্ষ্য থেকে আমরা সরে আসিনি। এটি কমিউনিটিকে, বিশেষ করে বি৪০ গোষ্ঠীকে সহায়তা করার বিষয়," বলেন দাতুক আমির।
তবে ছোট ব্যবসার মধ্যে এমন দৃঢ়তা খুঁজে পাওয়া কঠিন। সাবেক অর্থনীতিমন্ত্রী রাফিজি রামলির প্রতিষ্ঠিত সামাজিক উদ্যোগ কেসুম এখন মসলাদার ভাজা মুরগিসহ নাসি লেমাক বিক্রি করছে ৪.৯০ রিঙ্গিতে, আর ভাজা নুডলসের দাম মাত্র ৩.৯০ রিঙ্গিত থেকে শুরু। সুপারভাইজার ও রাঁধুনি ইজ্জান ইলহাম বলেন, দোকানটিতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ জন ক্রেতা আসেন। মার্চে হারি রায়া আইদিলফিতর থেকে চাহিদা বেড়েছে, যা ইঙ্গিত দেয়, পরিবারের বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
"খাবার সুস্বাদু কি না, সেটা মূল কথা নয়; দামটাই আসল। ক্রেতারা বলেন খাবার ভালো। লাভ খুব কম, তবে এখনো টিকে আছি," তিনি বলেন।
পরিবার ও বিক্রেতাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ
খাবার বিক্রেতাদের এই সংগ্রাম মালয়েশিয়ার পরিবারগুলোর ওপর বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপের প্রতিফলন। নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খাজানাহ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, মহামারি থেকে যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন—বৈশ্বিক সংকটগুলো জাতীয় অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি প্রতিষ্ঠান ও পরিবার উভয়কেই চাপে ফেলছে। আর নিম্ন আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি চাপে, কারণ বছরের পর বছর ধরে মজুরি স্থবির।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সর্বনিম্ন ৫০ শতাংশ পরিবারের প্রকৃত মজুরি বছরে গড়ে মাত্র ৫৬ রিঙ্গিত বেড়েছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৭০ শতাংশ পরিবারের পক্ষে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন। বাইরে সাধারণ একটি খাবার খেতে সহজেই ২০ রিঙ্গিত বা তার বেশি খরচ হয়, রাস্তার পাশের বার্গারের দাম শুরু হয় ৫ রিঙ্গিত থেকে, আর খাবারের দোকানে মিশ্র ভাতের এক প্লেটের দাম ১০ থেকে ১৫ রিঙ্গিত পর্যন্ত হতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সরবরাহ শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ায় চাপ আরও বেড়েছে। জ্বালানি ভর্তুকি বজায় রাখতে এবং পেট্রলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার প্রতি মাসে এখনো কয়েক শ কোটি রিঙ্গিত ব্যয় করছে, কিন্তু সেই ভর্তুকিও চাপে রয়েছে। বরাদ্দ কমানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বানের মধ্যে খামার থেকে রান্নাঘরে উপকরণ পৌঁছানোর খরচ বাড়ছেই। প্রতিদিন পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল বিক্রেতারা প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা তীব্রভাবে টের পান।
৩৪ বছর বয়সী গৃহিণী নরলিসা আইয়ুব মে মাসের শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে কেসুমের কথা জানতে পারেন এবং দাম দেখে সঙ্গে সঙ্গেই আকৃষ্ট হন। তিনি বাড়িতে বেকারির ব্যবসা করেন এবং উপকরণের দাম দ্বিগুণ হতে দেখেছেন।
"খাবার ভালো এবং সাশ্রয়ী। এখন এ রকম দাম খুঁজে পাওয়া কঠিন। আগে কোকো পাউডারের দাম প্রতি কেজি ২০ রিঙ্গিতের কিছু বেশি ছিল, এখন ৪০ রিঙ্গিত। মাখনের দাম প্রায় ১০ থেকে বেড়ে ১৬.৯০ রিঙ্গিত হয়েছে," তিনি বলেন।
৪০ বছর বয়সী ট্রাকচালক দিন আলী সস্তা খাবারের ওপর নির্ভরশীল অনেক শ্রমজীবী মানুষের হতাশার কথা তুলে ধরেন।
"মানুষ সস্তা ও সুস্বাদু খাবার চায়। এখনকার অর্থনীতি ভালো নয়, আমাদের নিয়ন্ত্রণেও নেই। রাস্তার পাশে বিক্রি করা নাসি লেমাকের দামও এখন ৭ রিঙ্গিত," তিনি বলেন।
সরকারি আবাসনে আড়ালে থাকা কর্মজীবী মানুষ
এই ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসাগুলোর অনেকগুলোর পেছনে রয়েছেন বি৪০ গোষ্ঠীর নারী, যাঁরা পিপিআর নামে পরিচিত সরকারি আবাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাটে থাকেন। দেশটির ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) ৭০.১ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোগের বড় অংশই তাঁদের। ৬০০ থেকে ৭০০ বর্গফুটের গাদাগাদি ফ্ল্যাটে কাজ করেন তাঁরা; একই জায়গা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অবদান অনেকটাই উপেক্ষিত থাকলেও এই নারীরা নিম্ন আয়ের গোটা এলাকাগুলোর জীবনধারণে সহায়তা করেন।
মালয়েশিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য বলছে, একটি পরিবারে গড়ে মাত্র ১.৮ জন আয় করেন। বি৪০ পরিবারের জন্য স্বনিয়োজন থেকে পাওয়া দ্বিতীয় আয় এখন আর ঐচ্ছিক নয়; মূল্যস্ফীতির বিপরীতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই নারীরা অল্প অল্প করে উপকরণ কেনেন, ফলে এককপ্রতি দাম বেশি পড়ে এবং প্রতি পণ্যে লাভ থাকে মাত্র ৫০ সেন পর্যন্ত। বড় খুচরা বিক্রেতাদের মতো ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা সামাল দেওয়া বা পাইকারি ছাড়ে দরকষাকষি করার সুযোগ তাঁদের নেই।
অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এখনো বড় বাধা। ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়ার আর্থিক স্থিতিশীলতা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নথিপত্রের ঘাটতি, অনিয়মিত নগদ প্রবাহ এবং জামানতের অভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো ঋণ পেতে হিমশিম খায়। অনেক পিপিআর-এ বসবাসকারী নারী পরিবারের ও ব্যবসার অর্থ একসঙ্গে মেশান এবং নতুন পণ্য কেনার জন্য প্রতিদিনের বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভর করেন। ফলে টেকুন, দানানিতা মারা বা বিএসএন মাইক্রো আইয়ের মতো কর্মসূচির জন্য তাঁরা যোগ্য বিবেচিত হন না।
কাজের পরিবেশও চাপ বাড়ায়। রান্নাঘর একই সঙ্গে প্রায়ই শিশুদের পড়ার জায়গা ও কাপড় ধোয়ার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়; এতে কাজের দক্ষতা কমে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়। কয়েকটি আবাসন ব্লকে যৌথ রান্নাঘর চালু হলেও এর আওতা এখনো সীমিত। কমিউনিটি নেতারা বলছেন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকলেও সেগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি খুব কমই আসে। ডিজিটাল বিক্রি বা হিসাবরক্ষণের এককালীন কর্মশালা এই বাস্তবতা বদলাতে পারে না যে অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের একটি স্মার্টফোনই সবার ভরসা এবং ইন্টারনেট সংযোগও অনির্ভরযোগ্য। পিইডিআই ও এমডিইসি ই-উসাহাওয়ানের মতো কর্মসূচি ভিত্তি গড়ে দিলেও অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, আনুষ্ঠানিক এসএমই নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসার উপযোগী সহজ সরঞ্জাম ও ধারাবাহিক পরামর্শ তাঁদের দরকার।
প্রায়ই টানা ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়; নেই বেতনসহ ছুটি বা শিশুর যত্নের সহায়তা। ফলে অনেকেই ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে যান। মহামারির পর একই ছোট এলাকায় একই ধরনের পণ্য—যেমন নাসি লেমাক, কুইহ ও হিমায়িত নাশতা—বিক্রি শুরু করা পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। এতে এমন বাজারে দাম পড়ে যাচ্ছে, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা আগে থেকেই দুর্বল। প্রতিদিনের বিক্রির হিসাব বা খরচের স্পষ্ট নথি না থাকায় অনেক নারী কয়েক মাস কাজ করার পর বুঝতে পারেন, অদৃশ্য ব্যয়ে তাঁদের প্রায় সব আয়ই শেষ হয়ে গেছে। এসব উদ্যোক্তার প্রেরণার অভাব নেই; অভাব তাঁদের বাস্তবতার উপযোগী সহায়ক ব্যবস্থার।
অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা
সস্তা খাবারের কর্মসূচি নিয়ে হিমশিম খাওয়া মালয়েশিয়াই একমাত্র দেশ নয়। প্রতিবেশী দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে, প্রতিটিরই আলাদা সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। সিঙ্গাপুরে হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এখন সব ইজারাভুক্ত কফিশপকে ২০২৬ সালের মধ্যে সাশ্রয়ী খাবার দিতে বলছে। এসব খাবারের দাম সাধারণত ৩ থেকে ৩.৫০ সিঙ্গাপুর ডলারের মধ্যে এবং পরিবর্তনের চাপ কমাতে ভাড়ায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ার খুচরা বিক্রেতা নির্বাহীদের মতে, স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করলে সদিচ্ছা বজায় থাকে; বাধ্যতামূলক করা হলে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে বা মান কমানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ ভাড়া নবায়নের শর্তের সঙ্গে সাশ্রয়ী খাবার দেওয়াকে যুক্ত করেছে এবং ধাক্কা সামলাতে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের এক বছরের ভাড়ায় ছাড় দিয়েছে। উভয় মডেলই দোকানিদের বাধার মুখে পড়ছে। তাঁদের বক্তব্য, বাইরের সহায়তা ছাড়া শ্রমিক ও উপকরণের বাড়তি খরচের কারণে কম দামে খাবার দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।
ইন্দোনেশিয়ায় চিত্রটি আরও ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের একটি বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচি চালু করেছেন, যার লক্ষ্য প্রধানত স্কুলশিশুসহ ৮ কোটির বেশি মানুষকে খাবার দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ এই উদ্যোগে যায়। নাগরিক সংগঠনগুলোর যুক্তি, বাজেট আইনে স্বচ্ছতা ও পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা নেই—এ দাবি তুলে তারা সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে। আর্থিক অগ্রাধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধান ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।
থাইল্যান্ডে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল। রপ্তানি ও পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনীতিবিদেরা প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছেন। এ অঞ্চলের চাপ দেখায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে চাপে ফেলছে।
পুষ্টির ভারসাম্য
অর্থনীতির পাশাপাশি সাশ্রয়ী খাবারের স্বাস্থ্যগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাহমাহ মেনুর অনেক খাবারেই ডুবো তেলে ভাজা মুরগি বা মাছ থাকে। এর একটি কারণ, ভাজা খাবার বেশি দিন রাখা যায় এবং অবিক্রীত খাবার পরদিন আবার ব্যবহার করা সম্ভব। প্লেটে তাজা সবজি ও পূর্ণশস্য প্রায়ই কম থাকে। এতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে খরচ কমাতে গিয়ে সুষম পুষ্টির ক্ষতি হতে পারে।
খাবারগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবিষয়ক নির্দেশনা মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর কাঠামোর দাবি জানিয়েছেন সমালোচকেরা। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য মান, পরিমাণ, স্বাস্থ্যবিধি ও পুষ্টির ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব। অংশগ্রহণকারী খাবারের দোকানগুলোর জন্য মেনু নির্দেশিকা এবং স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে মিলে আকস্মিক পরিদর্শনের প্রস্তাবও এসেছে। ক্রেতাদের নিজেদের খাবারের বাক্স আনতে উৎসাহিত করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পাত্র কমালে বিক্রেতাদের কাঁচামালের খরচ কমবে এবং বর্জ্যও হ্রাস পাবে। পরিবেশবান্ধব চর্চা গ্রহণকারী ক্ষুদ্র উদ্যোগকে করছাড় দিলে আর্থিক চাপ কমতে পারে এবং কর্মসূচি জাতীয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
বিরোধী আইনপ্রণেতা হালিমা আলীর এক বিতর্কিত সংসদীয় বক্তব্যে বলা হয়েছিল, নিম্নমানের সস্তা খাবার দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পরে এ বক্তব্যের জন্য তিনি ক্ষমা চান। মালয়েশিয়ান পাবলিক হেলথ অর্গানাইজেশনের উপদেষ্টা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. জাইনুল আরিফিন ওমর বলেন, মাইদিনের মতো প্রতিষ্ঠিত খুচরা বিক্রেতাদের খাবার যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ। তবে ফাস্টফুড চেইনগুলো কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে কম স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রচারে এটি ব্যবহার করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
"ক্রেতাদের বুঝতে হবে, দাম কম দিলেই নিম্নমানের খাবার মেনে নিতে হবে, এমন নয়," তিনি বলেন।
কেসুমে রান্নাঘরের দল কম দামেও স্বাদের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করে। কিন্তু বৃহত্তর শিল্পের বাস্তবতা হলো, কোনো বিক্রেতার আয় যখন উপকরণের খরচ মেটানোর মতো সামান্যই হয়, তখন তাজা শাকসবজি যোগ করা মানদণ্ড নয়, বরং বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।
সাশ্রয়ী খাবার ধরে রাখতে কী দরকার
‘পায়ুং রাহমাহ’ উদ্যোগের আওতায় নগদ সহায়তা, ছাড়ের ব্রডব্যান্ড প্যাকেজ, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দান এবং পিপল ইনকাম ইনিশিয়েটিভসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঘোষণা করেন, রাহমাহ মেনুর বিক্রেতারা নির্দিষ্ট সুপারমার্কেট অংশীদারদের কাছ থেকে মুরগি, পেঁয়াজ ও চালের মতো কাঁচামাল বিশেষ ছাড়ে কিনতে পারবেন। ২০২৩ সালের রাহমাহ নগদ অনুদান কর্মসূচিতে প্রায় ৮ বিলিয়ন রিঙ্গিত বিতরণ করা হয় ৮৭ লাখ উপকারভোগীর মধ্যে, যা প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ। পিপল ইনকাম ইনিশিয়েটিভে এ পর্যন্ত ৪,১০০টি পরিবার সহায়তা পেয়েছে। তবে জাইনাবের মতো অংশগ্রহণকারীদের চুক্তির নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, ভর্তুকি শেষ হলে বাজারদরের ভাড়া তাঁদের সামান্য মুনাফাও শেষ করে দেবে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপ এখনো খণ্ডিত বলে মনে করেন উদ্যোগের সমর্থকেরা। বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তাদের সুরক্ষা ও বিক্রেতাদের কল্যাণের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য আনতে হবে নীতিনির্ধারকদের। পরিবেশবান্ধব চর্চা গ্রহণকারী ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য করছাড়, প্রান্তিক কমিউনিটিতে পৌঁছাতে এনজিও অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাবারের মান নজরদারির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। সাশ্রয়ী খাবার কর্মসূচির পরীক্ষামূলক উদ্যোগগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়, নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংযোগ জরুরি। এতে সস্তা খাবার একই সঙ্গে নিরাপদ ও পুষ্টিকর কি না, তা নিশ্চিত করা যাবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
জাইনাবের কাছে নীতিগত বিতর্কের চেয়ে চুক্তির মেয়াদ শেষে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক আশঙ্কাই বড়। ভোর হওয়ার আগেই তিনি ভেন্ডিং মেশিনে খাবারের ট্রে সাজিয়ে রাখেন। জানেন, যাত্রীরা, অফিসকর্মী ও আশপাশের বাসিন্দারা তাঁর সরবরাহ করা খাবারের ওপর নির্ভর করেন। হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মতো তাঁর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে, স্বল্পমেয়াদি দাতব্য সহায়তাকে সরকার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সহায়তায় রূপ দিতে পারে কি না, তার ওপর।
"আমার মনে হয়, কেসুমের অন্য এলাকাতেও শাখা খোলা উচিত। খাবার ভালো। জায়গাটাও দেখতে সুন্দর, আবার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত," বলেন দিন আলী। তাঁর কথায় এমন চাহিদার প্রতিফলন রয়েছে, যা বর্তমান সরবরাহের চেয়ে অনেক বেশি।
মূল কথা
- রাহমাহ মেনুতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা চালুর সময়ের প্রায় ১৫ হাজার প্রতিষ্ঠান থেকে কমে ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রায় ৩,১৪১টিতে দাঁড়িয়েছে।
- খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে। বড় চেইনগুলো কমিউনিটির সেবার অংশ হিসেবে লোকসান মেনে নিচ্ছে।
- সরকারি আবাসন প্রকল্পে ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনাকারী বি৪০ নারীরা পুঁজির অভাব, গাদাগাদি রান্নাঘর, সীমিত অর্থায়ন এবং দিনে ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজের চাপে রয়েছেন।
- খাবারের পুষ্টিমান ব্যাপকভাবে ভিন্ন। অনেক সাশ্রয়ী খাবারে সুষম খাদ্যের বদলে ভাজা প্রোটিন ও অল্প সবজি থাকে।
- সরকারি নগদ সহায়তা ও ছাড়ে কাঁচামাল কেনার ব্যবস্থা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। তবে সাশ্রয়ী খাবারের ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, সহজলভ্য ক্ষুদ্রঋণ এবং কমিউনিটি অংশীদারত্ব জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।






