রেকর্ড বোনাসে স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য
দক্ষিণ কোরিয়ার ঝকঝকে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কারখানাগুলোতে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব চলছে। এর ফলে দুই বছরের মধ্যে কোনো কোনো কর্মী প্রায় ৯ লাখ ডলার পর্যন্ত বোনাস পেতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থানে এসকে হাইনিক্সের অভূতপূর্ব মুনাফা হওয়ায় এই বিশাল বোনাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটি এমন এক উদ্বেগজনক অর্থনৈতিক বিভাজনও তুলে ধরছে, যা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকার ও সমাজবিজ্ঞানীরা বিপজ্জনক নতুন স্বাভাবিকতার বিষয়ে সতর্ক করছেন। কোরিয়া ব্যাংকের ভাষায় এই ঘটনাটি কে-আকৃতির পুনরুদ্ধার হিসেবে পরিচিত। এটি দেশকে দুটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ধারায় বিভক্ত করার হুমকি তৈরি করছে: একদিকে ভাগ্যবান অল্প কয়েকজন প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ঢেউয়ে চড়ে বিপুল সম্পদের অধিকারী হচ্ছেন, অন্যদিকে লাখো মানুষ সামান্য প্রকৃত আয়বৃদ্ধি সত্ত্বেও নিজেদের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক অবস্থানের অবনতি দেখছেন।
সূচিপত্র
এসকে হাইনিক্সের সর্বশেষ আয় প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিসংখ্যান প্রায় ৩৪ হাজার দেশীয় কর্মীর হাতে কেন্দ্রীভূত সমৃদ্ধির এক বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরেছে। এআই ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত উচ্চ-ব্যান্ডউইডথ মেমরির বিপুল বৈশ্বিক চাহিদার জেরে মেমরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি প্রথম প্রান্তিকে রেকর্ড ৩৭.৬১ ট্রিলিয়ন ওন (২৫.৪ বিলিয়ন ডলার) পরিচালন মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় পাঁচ গুণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে হওয়া যুগান্তকারী চুক্তি অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ের বোনাসের কোনো ঊর্ধ্বসীমা ছাড়াই বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ সরাসরি কর্মীদের বোনাস হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোম্পানিটি। ব্লুমবার্গের সংকলিত বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সূত্রে চলতি বছর প্রত্যেক কর্মী গড়ে প্রায় ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার বোনাস পেতে পারেন। ম্যাকুয়ারি গ্রুপের আশাবাদী মুনাফার পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে অবিশ্বাস্য ৮ লাখ ৭৮ হাজার ডলারে।
এই অঙ্ক দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত করপোরেট সংস্কৃতি থেকে এক আমূল বিচ্যুতি। দেশটির বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক কঠোর বেতনকাঠামো ও সামান্য বোনাস চালু ছিল। এসকে হাইনিক্স কার্যত প্রচলিত সেই বিধিনিষেধ তুলে দিয়েছে, যেখানে বোনাস সাধারণত বার্ষিক মূল বেতনের ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকত। এর বদলে কোম্পানির অসাধারণ বাজার সাফল্যের সঙ্গে কর্মীদের পারিশ্রমিক সরাসরি যুক্ত করে মুনাফা ভাগাভাগির পদ্ধতি চালু করেছে তারা। এই বোনাসের অঙ্ক ঐতিহ্যগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ পেশাগুলোর আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
কর্মক্ষেত্রবিষয়ক ফোরাম ব্লাইন্ডে নাম প্রকাশ না করে এক পশুচিকিৎসক লিখেছেন, বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ নিতে, বিপুল ঋণ জমাতে এবং ক্লান্তিকর সময় কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। অথচ চিপশিল্পের কর্মীরা শুধু বোনাসেই যা পান, তার তুলনায় তিনি পান সামান্য অংশ।
এই বোনাসের কারণে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে ন্যায্যতা নিয়ে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে।
একই প্ল্যাটফর্মে হুন্দাই মোটরের এক কর্মী লিখেছেন, এআই বিপ্লবে পিছিয়ে পড়া শিল্পের কর্মীদের জন্য এ ধরনের বিপুল বোনাস অসম্ভব তুলনা তৈরি করছে।
পারিশ্রমিকের ব্যবধান ঘিরে স্যামসাং কর্মীদের আন্দোলন
এসকে হাইনিক্সের কর্মীরা জীবন বদলে দেওয়ার মতো বোনাসের অপেক্ষায় থাকলেও, প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের কয়েক হাজার কর্মী তাঁদের রেকর্ড মুনাফা অর্জনে অবদানের জন্য সমান স্বীকৃতির দাবিতে নজিরবিহীন বিক্ষোভে নেমেছেন। ২৩ এপ্রিল কালো ভেস্ট পরা প্রায় ৪০ হাজার কর্মী সিউলের দক্ষিণে স্যামসাংয়ের পিয়ংটেক সেমিকন্ডাক্টর কমপ্লেক্সে জড়ো হন। কোম্পানিটির ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি ছিল বৃহত্তম শ্রমিক বিক্ষোভ। ২০২৪ সালে স্যামসাংয়ে প্রথমবারের মতো ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে যে উত্তেজনা শুরু হয়েছিল, এই সমাবেশ তার বড় ধরনের বিস্তার। দাবি না মানলে ২১ মে থেকে ১৮ দিনের কর্মবিরতির হুমকি দিয়েছে ইউনিয়ন সংগঠকেরা।
এই আন্দোলনের মূল কারণ হলো পারিশ্রমিকের প্রকট বৈষম্য। একই রকম মূল বেতন পাওয়া এসকে হাইনিক্সের কর্মীদের তুলনায় স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের কর্মীরা এক-তৃতীয়াংশেরও কম বোনাস পাচ্ছেন। স্যামসাংয়ের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, ৭ কোটি ৬০ লাখ ওন (৫১ হাজার ২৮০ ডলার) মূল বেতনের চিপ বিভাগের কর্মী ২০২৫ সালের জন্য প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ওন বোনাস পাবেন। এসকে হাইনিক্সে একই পদে থাকা কর্মী এর তিন গুণেরও বেশি অর্থ পাবেন। এ ব্যবধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর্মী চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
স্যামসাংয়ের চিপ বিভাগে উৎপাদন লাইনের কার্যক্রম দেখভাল করা ৩৯ বছর বয়সী লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ সং ইয়ং-গি কর্মীদের চলে যাওয়ার পেছনের হতাশার কথা তুলে ধরেন।
বাস্তবে, অনেক কর্মী এসকে হাইনিক্সে চলে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী বেতনের জন্য কাজ করেন, আর পারিশ্রমিকের ব্যবধান এতটাই বেড়েছে যে মানুষ এ কারণে চাকরি বদলাচ্ছেন।
গণ-অবস্থান কর্মসূচিতে জড়ো হওয়া অন্য কর্মীরাও নিশ্চিত করেছেন, বিপুলসংখ্যক সহকর্মী ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানে চলে গেছেন। ইউনিয়ন সভাপতি চোই সেউং-হো জানান, গত চার মাসেই প্রায় ২০০ কর্মী এসকে হাইনিক্সে চলে গেছেন।
স্যামসাং ইলেকট্রনিকস লেবার ইউনিয়নের দাবি, তাদের সদস্যসংখ্যা এখন ৯০ হাজারের বেশি এবং তাঁরা দক্ষিণ কোরিয়ায় কোম্পানিটির মোট কর্মীর ৭০ শতাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করেন। ব্যবস্থাপনার কাছে ইউনিয়নটি তিনটি প্রধান দাবি জানিয়েছে: বার্ষিক মূল বেতনের তুলনায় বোনাসের বর্তমান ৫০ শতাংশের সীমা তুলে নেওয়া; পরিচালন মুনাফার ১৫ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করা; এবং মূল বেতন ৭ শতাংশ বাড়ানো। জবাবে ব্যবস্থাপনা কর্মদক্ষতাভিত্তিক পারিশ্রমিকের জন্য পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি এ বছর মেমরি বিভাগের কর্মীদের প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের চেয়ে বেশি আয় নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে ইউনিয়ন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধ এতটাই তীব্র হয়েছে যে ধর্মঘটের সময় বেআইনি কার্যকলাপ ঠেকানোর দাবিতে স্যামসাং আদালতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছে। কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সতর্ক করে বলেছেন, একবারের কর্মবিরতিতেও উৎপাদন ব্যাহত হলে গ্রাহকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যাবে।
কে-আকৃতির প্রবৃদ্ধিকে টেকসই নয় বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
সেমিকন্ডাক্টর খাতের কর্মীদের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনীতির ভাগ্যের চরম বৈপরীত্যের কারণে কে-আকৃতির পুনরুদ্ধারের স্থায়িত্ব নিয়ে কোরিয়া ব্যাংক কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। ২৩ এপ্রিল এসকে হাইনিক্স যখন রেকর্ড ত্রৈমাসিক ফল ঘোষণা করে, একই সময়ে কোরিয়া ব্যাংক জানায়, প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানির ওপর নির্ভর করে প্রথম প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১.৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাত বাদ দিলে প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কম হতো। এতে স্পষ্ট হয়, অন্য খাতগুলো স্থবির থাকায় জাতীয় অর্থনীতি একটি শিল্পের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
এই কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করছে। কারণ, চিপ খাত আমদানি করা সরঞ্জামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং এর স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থায় প্রচুর পুঁজি লাগে। ফলে বৃহত্তর শ্রমবাজার বা দেশীয় বিনিয়োগে এ খাতের ইতিবাচক প্রভাব সীমিত।
নোমুরা হোল্ডিংসের অর্থনীতিবিদ জিয়ং-উ পার্ক বলেন, সরাসরি ভারসাম্যহীনতার দিকে মনোযোগ দিলেই কার্যকর সমাধান হয় না।
সরাসরি ভারসাম্যহীনতার দিকে মনোযোগ দিলেই এর সমাধান হয় না। এতে এমন চুলকানি হয়, যা চুলকালে আরও বাড়ে। অর্জিত সুফল আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পরোক্ষ মাধ্যমগুলোকে শক্তিশালী করার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
কোরিয়া ব্যাংক নিজেও সতর্ক করেছে, শিল্পখাতগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান এবং সাধারণ নাগরিকদের বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বিপজ্জনক ব্যবধান তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান প্রবণতা টেকসই নয়।
সরকারি পরিসংখ্যান ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে ধারণাগত ব্যবধান নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া আরও জটিল করে তুলেছে। কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, জাতীয় জিনি সূচক ২০১১ সালের ০.৪১৮ থেকে ২০২৩ সালে ০.৩৯২-এ উন্নীত হলেও বৈষম্য সম্পর্কে জনধারণা উল্টো দিকে গেছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মনে করে ব্যবধান বাড়ছে। কারণ, বাজেটের সীমাবদ্ধতা যা-ই হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম ব্যয় করতেই হয়। এতে আয়ের তুলনায় তাঁদের বেশি অর্থ খরচ হয় এবং বৈষম্য আরও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। সম্পত্তি নেই এমন মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে আবাসনের দামই বৈষম্য সম্পর্কে ধারণা তৈরির প্রধান কারণ। এতে আপেক্ষিক বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়, যা সরকারি আয়ের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
প্রকৌশলী প্রতিভার জন্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে
দক্ষিণ কোরিয়ায় পারিশ্রমিকের এই বিস্ফোরণ এশিয়াজুড়ে বৃহত্তর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। বিশ্বজুড়ে চিপ নির্মাতারা ক্রমেই কমে আসা বিশেষায়িত প্রকৌশলীদের নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। গত পাঁচ বছরে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ও মিডিয়াটেক কর্মীদের গড় পারিশ্রমিক প্যাকেজ প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের ভর্তুকি পাওয়া চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী টানতে দুই অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি, দ্রুত পদোন্নতি এবং উদার আবাসন ভাতা দিচ্ছে। ম্যাককিনসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে চিপ নির্মাতারা নতুন কারখানায় প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করায় প্রতিভার জন্য এই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে।
প্রকৌশলীর ঘাটতি শুধু মেমরি চিপ নির্মাণেই সীমিত নয়। গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কারখানা পরিচালনার মতো ক্ষেত্রেও বিশেষায়িত দক্ষতা ও দিনরাত পালাক্রমে কাজ করার সক্ষমতা দরকার। এসব কঠিন কাজ তরুণ কর্মীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে, আর একই সময়ে শিল্পের জনমিতিক ভিত্তি সংকুচিত হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজনন হার ০.৭৫, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। তাইওয়ানের হারও ০.৯-এর সামান্য নিচে। ফলে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক হওয়ার সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে ছোট হচ্ছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পূর্বাভাস, আগামী দশকে দুই দেশের কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যা বছরে প্রায় ১ শতাংশ করে কমবে। এতে এমন এক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা কোনো বোনাস দিয়েই পুরোপুরি কাটানো সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক জরিপে কোরিয়ার কলেজ স্নাতকদের কাছে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত কর্মস্থল হিসেবে স্যামসাংকে ছাড়িয়ে গেছে এসকে হাইনিক্স। জরিপে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশই বলেছে, কোম্পানিটির পারিশ্রমিক ব্যবস্থা তাদের প্রধান আকর্ষণ। নিয়োগকর্তা সম্পর্কে পছন্দের এই পরিবর্তন দেখায়, পারিশ্রমিকের বিপ্লব দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের পেশাগত সিদ্ধান্তকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নিয়োগকর্তার অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া স্যামসাং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কর্মদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত নতুন শেয়ার অপশন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে: এআই বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানসহ নতুন দেশগুলোতে চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে। এসব দেশের কারখানায় কর্মী নিয়োগের জন্য নির্মাতারা ক্রমেই সীমিতসংখ্যক কোরীয় ও তাইওয়ানি প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর করছে, ফলে নিজ দেশেই ঘাটতি আরও বাড়ছে।
জনঅসন্তোষ ও নীতিগত দ্বিধা
কারখানার বাইরে, কোরীয় গণমাধ্যমের ভাষায় চিপশিল্পের কর্মীদের পাওয়া লটারি বোনাস এআই থেকে তৈরি সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা নিয়ে বিরল জনঅসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। কর্মক্ষেত্রবিষয়ক ফোরাম ব্লাইন্ডে নাম প্রকাশ না করে লেখা পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সরকারি অবকাঠামো খাতে ব্যয় এবং কে-চিপস অ্যাক্টের ২০ শতাংশ কর রেয়াত থেকে সুবিধা পাওয়া কোম্পানিগুলোর মুনাফা সমাজের আরও বৃহত্তর অংশের সঙ্গে ভাগ করা উচিত কি না। গত দুই বছরে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের পাওয়া সম্মিলিত কর সুবিধার পরিমাণ আনুমানিক ২০ ট্রিলিয়ন ওন (১৩.৬ বিলিয়ন ডলার)। করদাতারা কোম্পানিগুলোর এই বিপুল মুনাফায় তাঁদের পরোক্ষ বিনিয়োগের যথাযথ প্রতিদান পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্যামসাং ইউনিয়নের হুমকি দেওয়া ১৮ দিনের ধর্মঘটের অর্থনৈতিক প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে। দীর্ঘ কর্মবিরতিতে স্যামসাংয়ের দৈনিক ক্ষতি ১ ট্রিলিয়ন ওন (৭২০ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ইউনিয়ন নেতারা ধারণা করছেন। বিশ্লেষকদের সতর্কতা, এআই চিপ উৎপাদন ব্যাহত হলে বড় গ্রাহকদের কাছে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে, মেমরির দাম বাড়তে পারে এবং এর সুবিধা পেতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মাতারা। তা সত্ত্বেও, বড় বিক্ষোভের দিন স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এতে ইঙ্গিত মেলে, বিনিয়োগকারীরা এখনো আস্থাশীল যে ব্যবস্থাপনা শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছাবে।
করপোরেট বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান লিডার্স ইনডেক্সের প্রধান পার্ক জু-গুনের পূর্বাভাস, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়াতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
স্যামসাংয়ের শ্রমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি সন্ধিক্ষণ।
নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে সহায়তা এবং চরম মজুরি বৈষম্য থেকে তৈরি সামাজিক সংহতির ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রাখা। কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স আয়ের স্তর অনুযায়ী লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করেছে: নিম্ন আয়ের মানুষের ঋণ জমে যাওয়া ঠেকাতে খাদ্য ভাউচার ও জরুরি কল্যাণ সহায়তা বাড়ানো, আর মধ্যবিত্তের সম্পদবৈষম্য মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে আবাসনের সরবরাহ এবং প্রথমবারের মতো বাড়ি কেনা ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো। তবে এসব পদক্ষেপ সমস্যার কারণের বদলে উপসর্গের সমাধান করে। এআইয়ের সুপারসাইকেলে মেমরি নির্মাতাদের রেকর্ড মুনাফা চলতে থাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো, অল্পসংখ্যক কর্মী নিয়োগ করা একটি খাতে এত বেশি সমৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত রেখে দেশটির অর্থনৈতিক মডেল সমৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে কি না, নাকি কে-আকৃতির প্রবণতা একসময় দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি সামাজিক চুক্তিকেই ভেঙে দেবে।
মূল বিষয়গুলো
- মুনাফা ভাগাভাগির ঊর্ধ্বসীমাহীন চুক্তি অনুযায়ী পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ কর্মীদের দেওয়ায় ২০২৭ সালের মধ্যে এসকে হাইনিক্সের কর্মীদের গড় বোনাস ৮ লাখ ৭৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে
- ২৩ এপ্রিল স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের প্রায় ৪০ হাজার কর্মী কোম্পানির ইতিহাসে বৃহত্তম বিক্ষোভ করেন; এসকে হাইনিক্সের সমান বোনাস দাবি করে ২১ মে থেকে ১৮ দিনের ধর্মঘটের হুমকি দেন
- কোরিয়া ব্যাংকের সতর্কতা, চিপ খাতনির্ভর কে-আকৃতির প্রবৃদ্ধি টেকসই নয়; তথ্যপ্রযুক্তি খাত বাদ দিলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কম হতো
- স্যামসাংয়ের কর্মীরা এসকে হাইনিক্সের সমপদে থাকা কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম বোনাস পান; সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় ২০০ কর্মী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানে চলে গেছেন
- দক্ষিণ কোরিয়ায় ০.৭৫ এবং তাইওয়ানে ০.৯-এর নিচে প্রজনন হারের কারণে এশিয়ায় ২ লাখের বেশি চিপ প্রকৌশলীর কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে পারিশ্রমিক বাড়াচ্ছে
- জিনি সূচকের সরকারি উন্নতির বিপরীতে বৈষম্য নিয়ে জনধারণা বদলাচ্ছে; আবাসন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আয়ের অসমানুপাতিক অংশ গ্রাস করছে
- কোরিয়ার দুই বৃহত্তম চিপ নির্মাতা দুই বছরে আনুমানিক ১৩.৬ বিলিয়ন ডলারের সম্মিলিত কর সুবিধা পেয়েছে, যা মুনাফা বণ্টন ও সামাজিক ন্যায্যতা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে






