যুদ্ধক্ষেত্র নয়, মহাকাশ সবার অভিন্ন সীমান্ত
চীনের মহাকাশ কর্মসূচির ৭০তম বার্ষিকী এবং দেশটির ১১তম মহাকাশ দিবসে বেইজিং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: মহাকাশ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র না হয়ে মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দিয়ে বলেন, মহাকাশ অনুসন্ধান এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ, যেখানে কারিগরি সক্ষমতা বা রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, সব দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
সূচিপত্র
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রায় শূন্য থেকে শুরু হওয়া চীনের সাত দশকের মহাকাশ উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে গুও এসব কথা বলেন। কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের কর্মসূচি থেকে শুরু করে মানববাহী মহাকাশযাত্রা এবং বর্তমানে গভীর মহাকাশ অনুসন্ধান উদ্যোগ—এই ধারাবাহিকতায় চীন প্রযুক্তির অনুসারী থেকে সক্ষম মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষায়, নিরন্তর প্রচেষ্টা ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে অর্জিত এই অগ্রগতি বেইজিংকে এমন দেশগুলোর কাছে সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে, যাদের নিজস্ব উৎক্ষেপণ অবকাঠামো বা কক্ষপথে স্থাপনা নেই।
মহাকাশে নিয়ম প্রণয়ন ও একচেটিয়া জোট গঠনের প্রাধান্য নিয়ে একে তথাকথিত ‘প্রতিযোগিতা ২.০’ পর্যায় বলার ধারণা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন মুখপাত্র। এর বদলে তিনি কক্ষপথে একটি উন্মুক্ত ‘বন্ধুমহল’ গড়ে তোলার বিষয়ে চীনের অঙ্গীকার তুলে ধরেন, যেখানে উন্নত মহাকাশ অভিযানে ঐতিহ্যগতভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোও স্বাগত হবে। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন বাস্তব কর্মসূচিতে এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে আফ্রিকান কিশোর-কিশোরীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন এবং আসন্ন অভিযানের জন্য পাকিস্তানি মহাকাশচারী বাছাই।
মানববাহী মহাকাশযাত্রায় পাকিস্তানের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রা
চীনের অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট উদাহরণগুলোর একটি হলো পাকিস্তান। দেশটির মহাকাশ উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বেইজিং উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের মানববাহী মহাকাশ সংস্থা এবং পাকিস্তানের মহাকাশ ও উচ্চ বায়ুমণ্ডল গবেষণা কমিশন একটি ঐতিহাসিক মহাকাশচারী সহযোগিতা চুক্তি সই করে, যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রথম মানববাহী মহাকাশ অভিযানের পথ তৈরি হয়।
কঠোর চিকিৎসা ও মনস্তাত্ত্বিক যাচাইয়ের পর দুই প্রার্থী খুররম দাউদ ও মুহাম্মদ জিশান আলী চীনের মহাকাশচারী কেন্দ্রে উন্নত প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। ইসলামাবাদের ঘোষণামতে, ২০২৬ সালের শেষ দিকে একজন পাকিস্তানি মহাকাশচারী চীনের তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে পেলোড বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি উপকরণবিজ্ঞান, তরল পদার্থবিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন, যার সম্ভাব্য প্রয়োগ রয়েছে জলবায়ু সহনশীলতা ও খাদ্যনিরাপত্তায়।
ঐতিহাসিক নথিতে প্রতিবেশী দুই দক্ষিণ এশীয় দেশের মহাকাশ কর্মসূচির ভাগ্যের নাটকীয় উলটপালটের চিত্র উঠে আসে। ১৯৬১ সালে নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে সুপারকো (SUPARCO) প্রতিষ্ঠায় রাজি করান। নাসার সহায়তায় ১৯৬২ সালের মধ্যে পাকিস্তান এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে রকেট উৎক্ষেপণ করে। ওই শুরুর বছরগুলোতে পাকিস্তানের চারজন শীর্ষ বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেন। তবে পরবর্তী দশকগুলোতে সম্পদ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ও প্রচলিত সামরিক অগ্রাধিকারে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আমলে বড় উপগ্রহ উদ্যোগের অর্থায়ন বন্ধ করা হয়। নেতৃত্বের পদে বিজ্ঞানীদের বদলে সামরিক কর্মকর্তারা আসেন, আর একসময় উপমহাদেশের মহাকাশ উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া সংস্থাটি ভারতের ইসরোর (ISRO) তুলনায় কয়েক দশক পিছিয়ে পড়ে।
চীনের হস্তক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে এই ঘাটতিগুলো পূরণে ভূমিকা রেখেছে। আসন্ন মানববাহী অভিযান ছাড়াও বেইজিং পাকিস্তানের জন্য একাধিক দূর অনুধাবন উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে এবং ২০১৮ সালে পাকিস্তান দূর অনুধাবন উপগ্রহ (PRSS-1) উৎক্ষেপণে সহায়তা দিয়েছে। দেশীয়ভাবে তৈরি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ PRSC-EO2-এর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির উৎক্ষেপণ আরেকটি মাইলফলক। এটি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রতিরোধে উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি দেবে। বাংলাদেশ, ইরান, মঙ্গোলিয়া, পেরু, থাইল্যান্ড ও তুরস্কের সঙ্গে দুই দেশ এশিয়া-প্যাসিফিক মহাকাশ সহযোগিতা সংস্থাতেও অংশ নেয়, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময়ের বহুপক্ষীয় কাঠামো তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই অগ্রগতিকে দুই দেশের সর্বাবহাওয়ার কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বের প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আসন্ন মানববাহী অভিযান পাকিস্তানকে সক্রিয় মানববাহী মহাকাশ কর্মসূচি থাকা নির্বাচিত দেশগুলোর কাতারে স্থান দেবে।
ব্রাজিল ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার বিস্তার
মানববাহী মহাকাশযাত্রার উপাদান থাকায় পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা শিরোনাম হলেও, কোনো উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে চীনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মহাকাশ অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে ব্রাজিলের সঙ্গে। ১৯৮৮ সালে শুরু হওয়া চীন-ব্রাজিল পৃথিবী সম্পদ উপগ্রহ কর্মসূচি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার মডেল হিসেবে কাজ করেছে। আমাজন বন পর্যবেক্ষণ এবং দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে কৃষি ও বনজ খাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জোগাতে এ কর্মসূচি সহায়তা করেছে।
এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সম্প্রতি নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বেড়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান স্পেসসেইল জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ থেকে কিয়ানফান নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের উপগ্রহমালা ব্যবহার করে ব্রাজিলের প্রত্যন্ত এলাকার স্কুল ও হাসপাতালে উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া চীন ও ব্রাজিলের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রযুক্তির জন্য একটি যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের সঙ্গে ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্পিনা গ্রান্দে ও ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পারাইবা যুক্ত হয়েছে। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানের বৈজ্ঞানিক চাহিদা পূরণ করবে এই গবেষণাগার।
ব্রাজিলের মহাকাশ সংস্থার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং চীনা সরকারের ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত হোসে রাইমুন্দো কোয়েলহো বলেছেন, সিবিইআরএস (CBERS) কর্মসূচি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করেছে এবং পরবর্তী প্রযুক্তি বিনিময়ের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা তৈরি করেছে। অংশীদারত্বটি দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি সহযোগিতা কীভাবে প্রাথমিক তথ্য বিনিময় থেকে নৌচালনা, যোগাযোগ ও মৌলিক গবেষণাসহ বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড মহাকাশ তথ্য করিডর
এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বগুলোর বাইরেও চীন ৩০টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মহাকাশ সহযোগিতার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোডভুক্ত ১১টি দেশের সঙ্গে সই হয়েছে ২৩টি সুনির্দিষ্ট চুক্তি। এই মহাকাশ তথ্য করিডর পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, টেলিযোগাযোগ ও নৌচালনা সেবার মাধ্যমে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকে বাস্তব সুবিধা দিচ্ছে।
এই সহযোগিতার বাস্তব কাঠামোর মধ্যে রয়েছে চালু থাকা ১৭টি যোগাযোগ উপগ্রহ, যেগুলো দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে বেসামরিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য প্রায় ৩০০টি ট্রান্সপন্ডার সরবরাহ করছে। জাতীয় অবকাঠামো নির্দেশিকার আওতায় আরও ২০টি বা তার বেশি যোগাযোগ উপগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সেবা সক্ষমতা বাড়াতে চীনের জাতীয় মহাকাশ প্রশাসন সমন্বিত মহাকাশ-ভূভিত্তিক নেটওয়ার্ক নিয়েও কাজ করছে। ফেংইউন আবহাওয়া উপগ্রহ সিরিজ ইন্দোনেশিয়া, লাওস ও থাইল্যান্ডসহ ১৯টি দেশে আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য সরবরাহ করছে, যা দুর্যোগ প্রতিরোধ ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে।
চীনের বেইদৌ নৌচালনা ব্যবস্থা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে নির্ভুল অবস্থান নির্ণয়ের সক্ষমতা দেয়; নিম্ন অক্ষাংশের অঞ্চলগুলোতেও এর নির্ভুলতা প্রায় ৫ মিটার। কম্বোডিয়ার সরবরাহব্যবস্থা ব্যবস্থাপনা, লাওসে নির্ভুল কৃষি এবং সিঙ্গাপুরের বন্দর পরিচালনাসহ নানা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এ সেবা কাজে লাগছে। এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক ট্রেড লিমিটেডের সদর দপ্তর সমিতির তথ্য প্রয়োগ কেন্দ্রের পরিচালক হুয়াং শাওবিনের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কৃষি পর্যবেক্ষণ ও দুর্যোগ প্রতিরোধে দূরবর্তী উপগ্রহের তথ্য অপরিহার্য প্রমাণিত হয়েছে।
কারিগরি সহযোগিতার পাশাপাশি রয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময়। সাম্প্রতিক অভিযানে তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে আফ্রিকান কিশোর-কিশোরীদের তৈরি শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। চলমান প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কর্মকর্তাদের ভাষায়, এসব উদ্যোগ সাম্য, পারস্পরিক কল্যাণ, শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দর্শনকে তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মোকাবিলা
অন্তর্ভুক্তির পক্ষে বেইজিংয়ের বক্তব্য থাকলেও, মহাকাশ অনুসন্ধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তিগত শক্তিগুলোর সঙ্গে জটিল সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। ২০১১ সাল থেকে তথাকথিত উলফ সংশোধনী নাসা ও চীনা সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কার্যত যৌথ কর্মকাণ্ডের পথে নিয়ন্ত্রক বাধা তৈরি করেছে।
২০১১ সাল থেকে প্রতিবছরের বরাদ্দ বিলগুলোতে যুক্ত হওয়া উলফ সংশোধনীতে কংগ্রেসের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া নাসাকে চীনা সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতায় সরকারি তহবিল ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সুবিধা রক্ষা এবং গুপ্তচরবৃত্তির উদ্বেগ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও, এই বিধিনিষেধ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ২০২১ সালে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে মহাকাশযানের সংঘর্ষ এড়ানোর মতো নিরাপত্তার প্রয়োজনে সীমিত সমন্বয় হয়েছে; কিন্তু বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা থমকে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই বিধিনিষেধ চীনের চন্দ্র ও মঙ্গল অনুসন্ধানে দ্রুত অগ্রগতি ঠেকাতে পারেনি। এতে ইঙ্গিত মেলে, নীতিটি চীনের সক্ষমতার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকেই বেশি সীমিত করতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, সংলাপের সুযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটনে ‘বিয়ন্ড আর্থ’ সিম্পোজিয়ামে চীনা দূতাবাসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী-পরামর্শক ঝৌ গুওলিন স্পষ্টভাবে বলেন, চীন মার্কিন মহাকাশ সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়। তিনি তিয়ানওয়েন-১ মঙ্গল অভিযানের সময় সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেন। তখন মহাকাশযানের সংঘর্ষ এড়াতে নাসা ও চীনা প্রশাসকেরা কক্ষপথের তথ্য বিনিময় করেছিলেন।
ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বিচ্ছিন্নতা কোনো সমাধান নয়; সামনে এগোনোর একমাত্র পথ সহযোগিতা।
ঝৌ বর্তমান বাধাগুলোকে দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেন। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দুই দেশের প্রজ্ঞা ও যৌথ প্রচেষ্টায় চীন-যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ সহযোগিতা সব বাধা পেরিয়ে এগোতে পারবে। তবে নাসার প্রশাসক বিল নেলসনসহ মার্কিন কর্মকর্তারা উলফ সংশোধনীর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। এর পেছনে কৌশলগত প্রতিযোগিতার উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষ করে চাঁদ অনুসন্ধানের সময়সীমা নিয়ে; দুই দেশই ২০৩০ সালের আগে মানুষসহ চাঁদে অবতরণের লক্ষ্য নিয়েছে।
বৈশ্বিক বিজ্ঞানের মঞ্চ
চীনের মহাকাশ কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশন শুধু জাতীয় সম্পদ নয়, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আন্তর্জাতিক মঞ্চও। চীনের মানববাহী মহাকাশ সংস্থার সাধারণ প্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক লি ইংলিয়াং জানিয়েছেন, স্টেশনটি প্রাণের উৎপত্তি, মহাবিশ্বের বিবর্তন ও পদার্থের গঠনসংক্রান্ত মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। এসব গবেষণার ফল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে।
শেনঝৌ-৬ ও শেনঝৌ-১৫—দুটি অভিযানেরই নেতৃত্ব দেওয়া এবং স্টেশন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মহাকাশযানের বাইরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী মহাকাশচারী ফেই জুনলং প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের স্টেশনটি পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কক্ষপথ থেকে পৃথিবী দেখলে সব মহাকাশযাত্রীই একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুভব করেন: এই গ্রহ মানবজাতির সবার অভিন্ন আবাস। মহাকাশ অনুসন্ধানকে সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন স্বপ্ন এবং চীনা মহাকাশ অভিযাত্রীদের নিরন্তর সাধনা হিসেবে তুলে ধরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের সঙ্গে এ অনুভূতির মিল রয়েছে।
২০৩০ সালের আগে পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ মানববাহী চন্দ্র অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। এখন প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মহাকাশে একটি উন্মুক্ত বন্ধুমহল গড়ার বেইজিংয়ের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে, নাকি পৃথিবীর রাজনৈতিক বিভাজন শেষ সীমান্তেও ছড়িয়ে পড়বে। পাকিস্তানি মহাকাশচারী বাছাই এবং ব্রাজিলের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে মহাকাশ অনুসন্ধানে অংশ নেওয়ার সুযোগ বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যা জানা জরুরি
- জাতীয় মহাকাশ কর্মসূচির ৭০তম বার্ষিকীতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহাকাশকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করা প্রত্যাখ্যান করে অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছে।
- ২০২৫ সালের সহযোগিতা চুক্তি এবং চীনের মহাকাশচারী কেন্দ্রে চলমান প্রশিক্ষণের পর পাকিস্তান ২০২৬ সালের শেষ দিকে তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে তার প্রথম মহাকাশচারী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
- ১৯৮৮ সাল থেকে চালু চীন-ব্রাজিল পৃথিবী সম্পদ উপগ্রহ কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়ে উপগ্রহ ইন্টারনেট সেবা ও যৌথ রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাগার পর্যন্ত গড়িয়েছে।
- বেল্ট অ্যান্ড রোড মহাকাশ তথ্য করিডরের মাধ্যমে চীন ৩০টি দেশের সঙ্গে মহাকাশ সহযোগিতা চুক্তি বজায় রেখেছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আবহাওয়ার তথ্য, নৌচালনা সেবা ও যোগাযোগের সক্ষমতা দিচ্ছে।
- ২০১১ সাল থেকে উলফ সংশোধনী নাসা-চীন সহযোগিতায় বিধিনিষেধ আরোপ করলেও, চীনা কর্মকর্তারা মার্কিন মহাকাশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সীমিত সমন্বয়ের আগ্রহ জানিয়ে আসছেন।
- তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কর্মকর্তারা ক্ষুদ্র মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ অভিযানে বৈশ্বিক অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।






