কম্পিউটিং অবকাঠামো বদলে দিতে কক্ষপথের ডেটা সেন্টারে ৮৪০ কোটি ডলারের বাজি চীনের

পড়তে 8 মিনিট
কম্পিউটিং অবকাঠামো বদলে দিতে কক্ষপথের ডেটা সেন্টারে ৮৪০ কোটি ডলারের বাজি চীনের

কক্ষপথের কম্পিউটিংয়ে ঐতিহাসিক বাজি

মহাকাশভিত্তিক অবকাঠামোর ভবিষ্যতে এখন পর্যন্ত অন্যতম বড় আর্থিক বাজি ধরেছে চীন। বেইজিং অরবিটাল টুইলাইট টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড, যা অরবিটাল চেনগুয়াং নামে পরিচিত, কৌশলগত ঋণসুবিধা হিসেবে ৫৭.৭ বিলিয়ন ইউয়ান পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ এই অঙ্কটি কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনানো এক পরিকল্পনায় দেশটির বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল আস্থার প্রতিফলন: কক্ষপথে ডেটা সেন্টার নির্মাণ।

সূচিপত্র
  1. কক্ষপথের কম্পিউটিংয়ে ঐতিহাসিক বাজি
  2. কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকা স্টার্টআপ
  3. কক্ষপথের ডেটা সেন্টার কীভাবে কাজ করবে
  4. জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয়
  5. কক্ষপথে কম্পিউটিং সক্ষমতার বৃহত্তর প্রতিযোগিতা
  6. প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বাধা
  7. বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় প্রভাব
  8. মূল বিষয়গুলো

এপ্রিলের শেষ দিকে দেওয়া ঘোষণায় বলা হয়, ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না ও সিআইটিআইসি ব্যাংকসহ চীনের ১২টি বড় ব্যাংক স্টার্টআপটিকে সম্ভাব্য অর্থায়নের সুযোগ দিয়েছে। ঋণসীমা তাৎক্ষণিক নগদ বিনিয়োগের মতো নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায় এমন মূলধনের সুযোগ এটি। তবে এর ব্যাপ্তি এবং ঋণদাতাদের মর্যাদা এমন এক প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়, যার লক্ষ্য পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান একটি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার সমাধান করা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ—আধুনিক ডিজিটাল জীবনের প্রায় সবকিছুর মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে ডেটা সেন্টার। এসব স্থাপনা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জায়গা ব্যবহার করে, পাশাপাশি প্রচুর তাপও তৈরি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল আরও জটিল হওয়ায় কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদা বাড়ছে দ্রুত, যা স্থলভিত্তিক অবকাঠামোর ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে। অরবিটাল চেনগুয়াং একটি বিকল্প প্রস্তাব করছে: কম্পিউটিংয়ের কাজ মহাকাশে সরিয়ে নেওয়া, যেখানে সৌরশক্তি প্রচুর এবং মহাশূন্যের শূন্যতাই শীতলীকরণে সহায়তা করবে।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকা স্টার্টআপ

২০ এপ্রিল প্রি-এ১ অর্থায়ন পর্ব সম্পন্ন করেছে অরবিটাল চেনগুয়াং। এতে হাইসং ক্যাপিটাল, ক্যাথে ক্যাপিটাল ও ইনোঅ্যাঞ্জেল ফান্ডসহ বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের বিনিয়োগকারীরা অংশ নেয়। শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগের মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে অতিরিক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পরিমাণ ১০ লাখ ডলারের কম। এই সামান্য শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগের বিপরীতে রয়েছে ঋণ হিসেবে পাওয়া কয়েক শ কোটি ডলারের সমর্থন। এতে এমন এক অর্থায়ন মডেল দেখা যায়, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণসুবিধার পরিমাণ তাৎক্ষণিক বেসরকারি বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি।

বেইজিং অ্যাস্ট্রো ফিউচার ইনস্টিটিউট অব স্পেস টেকনোলজির উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে কোম্পানিটি। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছ থেকে জোরালো সমর্থন পায়। বেইজিংয়ের পৌর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমিশনের পাশাপাশি ঝোংগুয়ানছুন সায়েন্স পার্ক প্রশাসনও এতে সহায়তা দেয়। ঝাং শানছোং একই সঙ্গে ইনস্টিটিউটটির পরিচালক এবং অরবিটাল চেনগুয়াংয়ের প্রধান বিজ্ঞানী। ফলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক বাস্তবায়নের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।

এই কাঠামো অরবিটাল চেনগুয়াংকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্টার্টআপের বদলে বৃহত্তর একটি ব্যবস্থার অংশ করে তুলেছে। বেইজিং অ্যাস্ট্রো ফিউচার ইনস্টিটিউট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যার পরিধি যন্ত্রাংশ তৈরি থেকে উৎক্ষেপণসেবা পর্যন্ত পুরো শিল্পশৃঙ্খলজুড়ে। এ সমন্বিত পদ্ধতি ইঙ্গিত দেয়, প্রকল্পটিকে একক কোম্পানির পরীক্ষা হিসেবে নয়, বরং শিল্পখাতের একটি সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কক্ষপথের ডেটা সেন্টার কীভাবে কাজ করবে

প্রযুক্তিগত পরিকল্পনায় ভোর-সন্ধ্যা কক্ষপথে উপগ্রহের একটি নক্ষত্রমণ্ডল গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এটি সূর্য-সমলয় কক্ষপথের একটি বিশেষ ধরন, যেখানে উপগ্রহগুলো পৃথিবী থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায় থাকবে। এই কক্ষপথ বেছে নেওয়া হয়েছে সুচিন্তিত কৌশলে। এতে থাকা উপগ্রহগুলো সূর্যের তুলনায় একটি স্থির কোণ বজায় রাখে। ফলে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন সূর্যালোক পায়, আবার অন্য কক্ষপথে থাকা বস্তুর মতো চরম তাপমাত্রার ওঠানামাও এড়ায়।

চায়না ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নভেম্বরে এক ব্রিফিংয়ে ঝাং শানছোং এ পরিকল্পনার যুক্তি তুলে ধরেন। স্থলভিত্তিক ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণে তিনটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা বলেন তিনি: বিপুল জমির প্রয়োজন, দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানি খরচ এবং বায়ুমণ্ডলের মাধ্যমে শীতলীকরণের ভৌত সীমা। তত্ত্বগতভাবে মহাকাশভিত্তিক স্থাপনা এসব সীমাবদ্ধতা এড়াতে পারে। মহাশূন্যের শূন্যতা নিষ্ক্রিয়ভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে; আর কক্ষপথের সৌর প্যানেল আবহাওয়ার বাধা বা বায়ুমণ্ডলীয় শোষণ ছাড়াই শক্তি সংগ্রহ করতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বড় আকারের ডেটা সেন্টার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এর আরও বৃদ্ধিতে বড় বাধা রয়েছে, যার মধ্যে আছে বিপুল জমির প্রয়োজন, দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানি খরচ এবং বায়ুমণ্ডলীয় শীতলীকরণের সীমাবদ্ধতা।

লক্ষ্যমাত্রা বেশ উচ্চাভিলাষী। পরিকল্পিত অবকাঠামোর লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে এক গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অর্জন করা। তুলনা করলে, এক গিগাওয়াট হলো একটি বড় পারমাণবিক চুল্লির উৎপাদনক্ষমতার সমান। কক্ষপথে তা অর্জনের অর্থ হতে পারে কয়েক হাজার উপগ্রহের একটি নক্ষত্রমণ্ডল, যা নির্ভর করবে প্রতিটি মহাকাশযানের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ওপর। এমন ব্যবস্থা ছোট কোনো পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক হবে না, বরং সত্যিকারের শিল্পমাত্রার কম্পিউটিং কমপ্লেক্স হয়ে উঠবে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয়

প্রকল্পটি চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০৩০ সাল পর্যন্ত শিল্প উন্নয়ন পরিচালনার জন্য এ জাতীয় অর্থনৈতিক রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। জানুয়ারিতে চীনের প্রধান মহাকাশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি করপোরেশন (সিএএসসি) কক্ষপথে সমন্বিত ক্লাউড-এজ টার্মিনাল স্থাপত্যসহ গিগাওয়াট-পর্যায়ের মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়। এই সামঞ্জস্য থেকে ধারণা করা যায়, সিএএসসি একক বৃহৎ কর্মসূচি পরিচালনার বদলে একাধিক বাণিজ্যিক ও রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়কের ভূমিকা নিতে পারে।

বাস্তবায়নের সময়সূচি তিন ধাপে ভাগ করা হয়েছে। ২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে মূল প্রযুক্তিগত বাধা দূর করা এবং প্রাথমিক কম্পিউটিং নক্ষত্রমণ্ডল স্থাপনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ২০২৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীভিত্তিক ডেটা প্রক্রিয়াকরণকে মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং সম্পদের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর জোর থাকবে। চূড়ান্ত লক্ষ্য, ২০৩৫ সালের মধ্যে, পুরোপুরি কার্যকর বড় আকারের কক্ষপথের ডেটা সেন্টার চালু করা।

চেনগুয়াং ১ নামে একটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ প্রথমে ২০২৫ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে উৎক্ষেপণের কথা ছিল। এর বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট নয়; উৎক্ষেপণের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো খবর পাওয়া যায়নি। চীনের বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ খাতের সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কারণে সময়সূচির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ বছর সেরেস ২ ও থিয়ানলং ৩ রকেটের প্রথম উড্ডয়নের সময় উপগ্রহ হারানোর ঘটনাও এর মধ্যে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কক্ষপথে কম্পিউটিং সক্ষমতার বৃহত্তর প্রতিযোগিতা

অরবিটাল চেনগুয়াং একা কাজ করছে না। চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান একই ধরনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, ফলে দেশের ভেতরে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে এডিএ স্পেস ও ঝেজিয়াং ল্যাব ‘থ্রি বডি’ নক্ষত্রমণ্ডলের জন্য ১২টি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান সিরিজের নাম নেওয়া এ প্রকল্পটি এজ কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করছে। সাংহাই বাইলিং অ্যারোস্পেস টেকনোলজি কোম্পানি প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক কোটি ইউয়ান অর্থায়ন পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর একটি প্রদর্শনী উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে এবং ১০০ কিলোওয়াট-শ্রেণির কম্পিউটিং উপগ্রহ তৈরি করছে। ঝোংকে থিয়ানসুয়ান, যা কোমোস্পেস নামেও পরিচিত, ইতিমধ্যে জিলিন ১ উপগ্রহে অরোরা ১০০০ কম্পিউটিং প্রযুক্তি স্থাপন করেছে।

আন্তর্জাতিক আগ্রহও এই তৎপরতারই প্রতিফলন। মহাকাশে সৌরশক্তি ও কম্পিউটিং প্রয়োগের জন্য গুগল ‘সানক্যাচার’-এর মতো ধারণা নিয়ে কাজ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেসএক্স এমন নক্ষত্রমণ্ডল স্থাপত্যের পরিকল্পনা করেছে, যাতে শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ উপগ্রহ থাকতে পারে; তবে এ ধরনের সংখ্যা এখনো আকাঙ্ক্ষামূলক। এসব বৈশ্বিক উদ্যোগে একটি ক্রমবর্ধমান ঐকমত্যের প্রতিফলন ঘটছে: চাহিদা মেটাতে ভবিষ্যতের কম্পিউটিং অবকাঠামোয় কক্ষপথের উপাদান প্রয়োজন হতে পারে।

চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বর্তমান প্রকল্পগুলোর গণ্ডি ছাড়িয়েছে। ডিসেম্বরে দেশটির কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে দুটি প্রস্তাবিত নক্ষত্রমণ্ডলের নথি জমা দেয়, যার প্রতিটিতে ৯৬,৭১৪টি উপগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নথির সঙ্গে ডেটা সেন্টার উদ্যোগের সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। তবে বিশাল ভবিষ্যৎ স্থাপনার জন্য কক্ষপথে জায়গা ও বর্ণালিসম্পদ নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে আবেদনগুলোতে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বাধা

অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন থাকলেও কক্ষপথের ডেটা সেন্টারকে বড় ধরনের প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক ধরনের বৈপরীত্য: মহাকাশ শীতল হলেও সেখানে শূন্যতা বিরাজ করে। ফলে পৃথিবীর মতো পরিচলনের মাধ্যমে তাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে না। তাপ বিকিরণকারী যন্ত্রকে সতর্কভাবে তাপের চাপ সামলাতে হবে। গিগাওয়াট-পর্যায়ের কম্পিউটিং থেকে উৎপন্ন বর্জ্য তাপ নিয়ন্ত্রণে বিশাল রেডিয়েটর অ্যারে প্রয়োজন হবে, যা ওজন ও জটিলতা বাড়াবে।

তথ্য আদান-প্রদানও আরেকটি বড় বাধা। কক্ষপথ ও পৃথিবীর মধ্যে তথ্য পাঠাতে যথেষ্ট ব্যান্ডউইডথসহ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা অপটিক্যাল সংযোগ প্রয়োজন, যাতে ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হয়। লেজার যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, তবে তা এখনো ব্যয়বহুল এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। যাওয়া-আসার বিলম্বকাল অনেক কাজে সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও, মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সাড়া প্রয়োজন এমন সময়-সংবেদনশীল কাজে কক্ষপথের কম্পিউটিং ব্যবহার করা যাবে না।

অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও বাস্তবসম্ভাব্যতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। উৎক্ষেপণ ব্যয় কমছে, কিন্তু হাজারো উপগ্রহের নক্ষত্রমণ্ডলের জন্য তা এখনো অনেক বেশি। নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের উপগ্রহগুলো ধীরে ধীরে কক্ষপথ হারায় এবং প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর পর প্রতিস্থাপন করতে হয়। এতে উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের ধারাবাহিক ব্যয় তৈরি হয়। অধিকাংশ কক্ষপথের সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ করা অসম্ভব। ফলে ব্যবস্থাগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে হবে, নইলে স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে পড়বে।

সমালোচকদের মতে, উন্নত শীতলীকরণ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোজন ও উন্নত চিপ নকশার মাধ্যমে স্থলভিত্তিক ডেটা সেন্টারও আরও দক্ষ হয়ে উঠছে। কক্ষপথের স্থাপনাগুলো চালু হওয়ার আগেই এসব উন্নতির ফলে তাদের সুবিধা কমে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় প্রভাব

৮৪০ কোটি ডলারের ঋণসুবিধা কেবল একটি কোম্পানির অর্থায়ন পর্বের চেয়েও বেশি কিছু। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা যখন অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতায় ক্রমেই নির্ধারক হয়ে উঠছে, তখন পরবর্তী প্রজন্মের কম্পিউটিং অবকাঠামোয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় চীনের দৃঢ় সংকল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই অর্থায়ন। জাতীয় পরিকল্পনা কাঠামোর মধ্যে বাণিজ্যিক মহাকাশ উদ্যোগকে জায়গা দিয়ে বেইজিং এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলছে বলে মনে হয়, যেখানে বেসরকারি উদ্ভাবন সরকারি কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে কাজ করবে।

রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক বাস্তবায়ন ও ব্যাংক অর্থায়নের সমন্বয়ে গড়া এই মিশ্র মডেল পশ্চিমা মহাকাশশিল্পে দেখা প্রধানত বেসরকারি উদ্যোগের পদ্ধতি থেকে আলাদা। প্রাতিষ্ঠানিক সীমা পেরিয়ে দ্রুত সম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ চীনকে দিতে পারে এই কাঠামো। তবে এতে বাজারের দক্ষতা এবং ভর্তুকিনির্ভর কৌশলগত সক্ষমতার বিপরীতে প্রকৃত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পের জন্য এ ঘোষণা মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিংকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার সময়সীমা এগিয়ে এনেছে। অরবিটাল চেনগুয়াং ২০৩৫ সালের এক গিগাওয়াট লক্ষ্যে পৌঁছাক বা ব্যয়বহুল শিক্ষা হয়ে থাকুক, এই প্রচেষ্টা থেকে তথ্য পাওয়া যাবে, উৎক্ষেপণ সক্ষমতার চাহিদা বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার সীমা আরও প্রসারিত হবে। সফল হলে কক্ষপথে শিল্পায়নের একটি মডেল তৈরি হবে, যা অন্য দেশ ও করপোরেশনগুলোও সম্ভবত অনুসরণ করবে।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • বেইজিংভিত্তিক অরবিটাল চেনগুয়াং ব্যাংক অব চায়না ও এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়নাসহ চীনের ১২টি বড় ব্যাংক থেকে ৫৭.৭ বিলিয়ন ইউয়ান (৮৪০ কোটি ডলার) ঋণসুবিধা পেয়েছে।
  • স্টার্টআপটির লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ৭০০-৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ভোর-সন্ধ্যা কক্ষপথে গিগাওয়াট-পর্যায়ের ডেটা সেন্টার নক্ষত্রমণ্ডল গড়ে তোলা।
  • প্রকল্পটি বেইজিং অ্যাস্ট্রো ফিউচার ইনস্টিটিউট অব স্পেস টেকনোলজির উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। বেইজিংয়ের পৌর কর্তৃপক্ষের সমর্থনপুষ্ট এ প্রতিষ্ঠান ২৪টি সংস্থার একটি কনসোর্টিয়ামের সমন্বয় করছে।
  • বাস্তবায়নে তিন ধাপের সময়সূচি রয়েছে: ২০২৫-২০২৭ সালে প্রাথমিক প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎক্ষেপণ, ২০২৮-২০৩০ সালে পৃথিবী ও মহাকাশের সমন্বয়, এবং ২০৩৫ সালে পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম।
  • এডিএ স্পেস, সাংহাই বাইলিং অ্যারোস্পেস ও ঝোংকে থিয়ানসুয়ানসহ চীনের একাধিক প্রতিযোগীও কক্ষপথের কম্পিউটিং উপগ্রহ তৈরি করছে।
  • শূন্যতায় তাপ নিয়ন্ত্রণ, তথ্য আদান-প্রদানের ব্যান্ডউইডথ, উৎক্ষেপণ ব্যয় এবং বড় কক্ষপথের নক্ষত্রমণ্ডল সচল রাখার অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতাসহ উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
  • এই উদ্যোগ চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাণিজ্যিক মহাকাশ উদ্যোগকে রাষ্ট্র-সমর্থিত গবেষণা অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার জাতীয় কৌশলের প্রতিফলন।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে