অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পরিবহন বিপ্লব
চীনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক দুই দশকেরও কম সময়ে কয়েক দশকের অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন করে এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা এখন বিশ্ব রেল ভ্রমণে আধিপত্য বিস্তার করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ শানসি প্রদেশে সিআন-ইয়ানআন লাইন চালুর পর নেটওয়ার্কটি ৫০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত হয়েছে, যা বিশ্বের মোট উচ্চগতির রেলপথের প্রায় ৭০ শতাংশ। নতুন ট্রেনগুলো নিয়মিত ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে চলে। এর বিপরীতে, ১৯৯৩ সালে পুরোনো অবকাঠামোর কারণে দেশজুড়ে চলাচল সীমিত থাকায় গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ৪৮ কিলোমিটার। ২০২৬ সালের বসন্ত উৎসবের যাতায়াত মৌসুমে নেটওয়ার্কটি রেকর্ড ৫৩ কোটি ৮০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে; সর্বোচ্চ ব্যস্ত সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার ট্রেন চলেছে।
সূচিপত্র
এই রূপান্তরের শুরু ২০০৮ সালের আগস্টে, অলিম্পিক গেমসের ঠিক আগে বেইজিং ও তিয়ানজিনকে যুক্ত করা প্রথম উচ্চগতির লাইন চালুর মাধ্যমে। এই মাইলফলক জাপানের শিনকানসেন বা জার্মানির আইসিইর মতো পুরোনো ব্যবস্থার পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়; সেগুলো কয়েক দশক ধরে ধাপে ধাপে উন্নয়নের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছিল। বেইজিং-সাংহাই উচ্চগতির রেললাইন ২০১১ সালের জুনে চালু হয়, ফলে ১,৩০০ কিলোমিটারের যাত্রায় সময় ১০ ঘণ্টার বেশি থেকে কমে চার ঘণ্টার কিছু বেশি হয়। গুয়াংঝৌ-ঝানজিয়াং ও বাওতোউ-ইনছুয়ান করিডরের মতো নতুন লাইনগুলো পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে নেটওয়ার্কের বিস্তার অব্যাহত রেখেছে। ফলে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫ লাখের বেশি জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ চীনা শহরে এই নেটওয়ার্কের সেবা পৌঁছায় এবং ক্রমে ২২৯ কোটিরও বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয়।
সময় ও দূরত্বের সংকোচন
গবেষকেরা এই ঘটনাকে সময়-স্থান সংকোচন হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে উচ্চগতির রেল দূরত্ব ও যাত্রাসময়ের সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। প্রেক্ষাপট-উপযোগী ভারযুক্ত গড় পদ্ধতি ব্যবহার করে করা গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চগতির রেল স্টেশনের অবস্থান স্থানিক যাতায়াত-সুবিধার ধরনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। গুয়াংশি প্রদেশে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পর আগে বিচ্ছিন্ন ইকোট্যুরিজম গন্তব্যগুলোতে যাতায়াত-সুবিধা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে; প্রধান দর্শনীয় স্থানে যেতে সময় ৯-১০ ঘণ্টা থেকে কমে ৩.৭-৬ ঘণ্টা হয়েছে। ছয় ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় এমন আকর্ষণীয় স্থানের হার ৩১.৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮.৯৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে কেন্দ্রীয়তা ও বিস্তারের ধরন স্পষ্ট হয়: পরিবহনকেন্দ্রগুলো কৌশলগত নোড হিসেবে গড়ে উঠে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
হুবেই প্রদেশে উহান-গুয়াংঝৌ লাইনও একই ধরনের প্রভাব ফেলেছে। মধ্য চীনের নতুন করিডরগুলো ইছাংয়ের মতো গন্তব্যকে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে নিয়ে এসেছে। ইছাং ইয়াংজি নদীর বিভিন্ন অংশে যাওয়ার প্রবেশদ্বার। এটি উহান ও ছংছিংয়ের মতো বড় কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই সংকোচনের ফলে দুর্গম অঞ্চলগুলো শহুরে বাসিন্দাদের জন্য সাপ্তাহিক ছুটিতে বেড়ানোর উপযোগী হয়ে উঠেছে। বাওতোউ-ইনছুয়ান লাইন উত্তরাঞ্চলের মরুভূমি ও তৃণভূমি পেরোনোর সময় ছয় ঘণ্টার বেশি থেকে কমিয়ে মাত্র আড়াই ঘণ্টা করেছে। সাংহাই বা হাংজৌ থেকে আগে যারা উত্তর-পশ্চিমের নিংশিয়ায় পৌঁছাতে সড়কপথে দুই বা তিন দিন কাটাতেন, তারা এখন সকালে রওনা হয়ে শুঝৌ ও সিআনের মতো কেন্দ্র হয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা ভ্রমণের পর রাতের খাবারের সময় পৌঁছাতে পারেন।
প্রাদেশিক সরকারগুলো এখন দুই ঘণ্টার পর্যটন বলয় তুলে ধরছে, যেখানে বাসিন্দাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে যে বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা একটি উচ্চগতির ট্রেনযাত্রার দূরত্বেই রয়েছে। এই সংযোগ প্রচলিত রেল বা সড়ক ব্যবস্থায় অসম্ভব স্বল্প দূরত্বের, ঘনঘন যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে আগে বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলো আকস্মিক ভ্রমণ ও একই দিনে আন্তশহর যাতায়াতের জন্য সহজলভ্য গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
নতুন সম্ভাবনায় জেগে উঠছে দ্বিতীয় সারির শহর
পর্যটন প্রবাহের পুনর্বণ্টন উচ্চগতির রেল সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোর একটি। উপকূলীয় মহানগরগুলোর আড়ালে থাকা দ্বিতীয় সারির ও অভ্যন্তরীণ শহরগুলোতে এখন দর্শনার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চগতির রেলে যুক্ত শহরগুলোতে পর্যটকের আগমন ৯ শতাংশ বেড়েছে, পাশাপাশি পর্যটন-সংশ্লিষ্ট আয়ও বেড়েছে। ট্যুর অপারেটররা দীর্ঘ বাসভ্রমণভিত্তিক ভ্রমণসূচি থেকে সরে রেলভিত্তিক আয়োজন করছে; প্রায়ই উচ্চগতির ট্রেনের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন যুক্ত করে নির্বিঘ্নে একাধিক শহর ঘোরার ব্যবস্থা করছে।
শিনজিয়াংয়ের আলতাই প্রিফেকচারের রূপান্তর এই সম্ভাবনাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার মুখে খনননির্ভর অর্থনীতি এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দ্বিতীয় খাতের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অঞ্চলটি একসময় চাপে ছিল। চীনের পরিবেশগত সভ্যতা উদ্যোগের অধীনে পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার পর অঞ্চলটি বরফ ও তুষারভিত্তিক পর্যটনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে সংরক্ষণ ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রেখে তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়ে এই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর ঘটেছে। পর্যটকের সংখ্যা ২০০৭ সালের ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ২ কোটি ৬০ লাখ ছাড়ায়, পরে ২০২৩ সালে ৩ কোটিতে পৌঁছায়। তৃতীয় খাতের অংশ ২০০৭ সালে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়ায়। স্কি রিসোর্ট, শীতকালীন ক্রীড়া অবকাঠামো ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনন্য অভিজ্ঞতা খুঁজতে আসা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছে।
একই ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হাইনান প্রদেশকেও বদলে দিয়েছে। সিঙ্গাপুর ও ম্যাকাওয়ের অভিজ্ঞ ভ্রমণ এজেন্টরা গত ১৫ বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখেছেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক জুন-এয়ার ট্রাভেলের প্রেসিডেন্ট জিয়াং হুইজুন দ্বীপটির বিলাসবহুল পর্যটন প্রচারের ১৫ বছরে সুযোগ-সুবিধার বিবর্তন লক্ষ করেছেন।
আরও অনেক সৈকত পর্যটকবান্ধব রিসোর্টে রূপান্তরিত হয়েছে। আমি উচ্চমানের ও দীর্ঘমেয়াদি ছুটির প্যাকেজ প্রচারের পরিকল্পনা করছি এবং বড় প্রদর্শনীর গন্তব্য হিসেবে হাইনানকে সুপারিশ করছি।
ম্যাকাওভিত্তিক ভ্রমণ এজেন্ট প্যাকো ঙ বিভিন্ন বয়সী মানুষের কাছে দ্বীপটির আকর্ষণের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি হেলিকপ্টার ভ্রমণ, ডাইভিং, বৈচিত্র্যময় খাবার এবং গুয়াংডং-হংকং-ম্যাকাও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ঘণ্টার সুবিধাজনক ফ্লাইটের কথা উল্লেখ করেন।
নেটওয়ার্কজুড়ে স্থানীয় অর্থনীতি যাত্রী ও পর্যটকের বাড়তি আনাগাটায় লাভবান হচ্ছে। ঝেংঝৌ ও নানছাংয়ের মতো শহরের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণগুলোতে উল্লেখযোগ্য ব্যবসা বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে, কারণ পর্যটকেরা চিরাচরিত জনপ্রিয় গন্তব্যের বাইরে ঘুরছেন। এর জবাবে পৌর কর্তৃপক্ষ স্টেশন এলাকা উন্নত করছে, ঐতিহাসিক পাড়ার সঙ্গে শাটল সংযোগ গড়ে তুলছে এবং প্ল্যাটফর্ম থেকে হাঁটা দূরত্বে গণপরিবহনকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য জায়গা নির্ধারণ করছে।
চীন ভ্রমণের জোয়ারে নির্বিঘ্ন যোগাযোগ
সহজ প্রবেশনীতি ও অর্থ পরিশোধব্যবস্থার সঙ্গে উচ্চগতির রেলের সংযোগ আন্তর্জাতিক পর্যটনকে ত্বরান্বিত করেছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চীন ৪৭টি দেশের নাগরিকদের একতরফাভাবে ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে এবং ভিসা ছাড়াই ২৪০ ঘণ্টা ট্রানজিটের নীতি ৫৫টি দেশে সম্প্রসারণ করেছে। কর্মকর্তারা একে ভ্রমণসেবার জন্য বহুস্তরীয়, সহজতর ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার বিদেশি পর্যটক ভিসা ছাড়াই চীনে প্রবেশ করেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৫৩.৯ শতাংশ বেশি এবং মোট বিদেশি আগমনের ৭১.২ শতাংশ।
ব্রিটিশ ভ্রমণ ভিডিও নির্মাতা রিয়ান ও বেন ৪০টিরও বেশি ভিডিওতে চীনের রেল নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল অর্থ পরিশোধব্যবস্থার দক্ষতা তুলে ধরেছেন। ভিডিওগুলোর শিরোনামে দক্ষতার বর্ণনায় “বিস্ময়কর” ও “অবিশ্বাস্য”-এর মতো শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। শুধু ইউটিউবেই “চায়না ট্রাভেল” ট্যাগযুক্ত ভিডিওগুলো ৮ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে। তাদের কনটেন্টে তুলে ধরা হয়েছে, উচ্চগতির রেলের কারণে আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীরা প্রবেশদ্বার শহর পেরিয়ে দেশের অভ্যন্তরে দক্ষতার সঙ্গে যাতায়াত করতে পারেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে চীনের রাষ্ট্রীয় কর প্রশাসন কেনাকাটার সময় তাৎক্ষণিক কর ফেরত চালু করে। আগস্টের মধ্যে কর ফেরত দেওয়া দোকানের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়ায় এবং ফেরত দাবি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪৭.৮ শতাংশ বেড়ে যায়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর হিসাবে, ২০২৫ সালে বিমান ও রেলযাত্রা একত্রে থাকা বুকিং ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। বেইজিং ও সাংহাইয়ের প্রধান বিমানবন্দর এবং উচ্চগতির রেলস্টেশনের মধ্যে নির্বিঘ্ন সংযোগ এই বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। শুধু শেনজেনেই ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি নাগরিকেরা নগদবিহীন ৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার লেনদেন করেছেন, যার মূল্য ১,১৮১ কোটি ইউয়ান। প্রতি লেনদেনে মোবাইল পেমেন্টের সীমা ৫,০০০ ডলারে উন্নীত করার পর এই লেনদেন হয়। এই সমন্বয়ের ফলে দর্শনার্থীরা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পৌঁছানোর পর খুব সহজেই সিআন বা ছেংদুর মতো অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে যেতে পারছেন; বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল “চায়না ট্রাভেল” প্রবণতাও এতে জোরদার হচ্ছে।
সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তার
বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় আঞ্চলিক প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের রেল উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২১ সালে চালু হওয়া লাওস-চীন রেলপথ ১,০০০ কিলোমিটার জুড়ে কুনমিংকে ভিয়েনতিয়েনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। চীনা সীমান্তের বোতেনে থেকে ভিয়েনতিয়েনে রেলে যেতে এখন তিন থেকে চার ঘণ্টা লাগে; আগে সড়কপথে সময় লাগত এক দিনেরও বেশি। ২০২৫ সালের মধ্যে এই লাইনে বছরে ৩ কোটিরও বেশি যাত্রী পরিবহনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্য সহজ করা এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করার জন্য যথাযথ নীতিগত সংস্কার হলে দীর্ঘ মেয়াদে রেলপথটি লাওসের মোট আয় ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কৃষি ও পর্যটনে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ নতুন রপ্তানির সুযোগ তৈরি করলে লাওস একটি সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
লাও সরকারের যথাযথ সংস্কার হলে, লাও পিডিআরকে বিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা রেলপথটি দীর্ঘ মেয়াদে দেশটির মোট আয় ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
সাফল্য নির্ভর করছে শুল্ক ও সীমান্ত সংস্থার কার্যপদ্ধতি আধুনিক করার ওপর। এর মধ্যে রয়েছে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু, শুল্ক ঘোষণাপত্র ইলেকট্রনিকভাবে জমা দেওয়া এবং ট্রানজিট নথি হিসেবে রেলওয়ে কনসাইনমেন্ট নোট গ্রহণ। পর্যটকদের কাছে রেলপথের আকর্ষণ বজায় রাখতে দীর্ঘ বিলম্ব এড়ানো জরুরি; সে জন্য যাত্রীদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সহজ করাও অপরিহার্য।
রেল করিডর ধরে লাওসের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে আনুমানিক ৩৯ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এতে আনুমানিক ১৫ লাখ টন পণ্য সামুদ্রিক পরিবহন থেকে রেলে স্থানান্তরিত হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ট্রেন চলাচলের বড় অংশজুড়ে থাকবে যাত্রী পরিবহন। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পর্যন্ত নেটওয়ার্ক বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে যুক্ত করা যায়। এর ফলে স্থলবেষ্টিত অর্থনীতি স্থলসংযুক্ত কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে এবং ভিয়েনতিয়েন ও কুনমিংয়ের মধ্যে স্থলপথে পরিবহন ব্যয় ৪০-৫০ শতাংশ কমতে পারে।
সম্প্রসারণ ও টেকসই উন্নয়নের ভারসাম্য
সাফল্য সত্ত্বেও আর্থিক স্থায়িত্ব এবং ব্যস্ত সময়ে সক্ষমতা ব্যবস্থাপনা নিয়ে এই ব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শুধু লাওস-চীন রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫৯০ কোটি ডলার, যা ২০১৭ সালে লাওসের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশের সমান। লাও ও চীনা অংশীদারদের মধ্যে ৩০-৭০ মালিকানা অনুপাতে প্রকল্পটির অর্থায়ন করা হয়। দেশের ভেতরে শহরের প্রান্তে নির্মিত কিছু স্টেশনে পর্যাপ্ত যাত্রী আকৃষ্ট করা কঠিন হয়েছে; এতে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও সংযোগকারী পরিবহনের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চীনের পরিবেশগত সভ্যতা কাঠামোর মধ্যে ভবিষ্যৎ উন্নয়নে পরিবেশগত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০১৮ সালে এই ধারণা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরিবেশগত সীমারেখা এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ সুরক্ষা পরিদর্শনের চাপে আলতাইয়ের মতো সম্পদনির্ভর শহরগুলো রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় সরকারগুলোকে উন্নয়নের ধারা বদলে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। গুয়াংশির মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে—যেখানে কার্স্ট ভূদৃশ্য ও জীববৈচিত্র্যের করিডর সুরক্ষার প্রয়োজন—পরিকল্পনাবিদদের যাতায়াত-সুবিধার সঙ্গে নাজুক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কম-কার্বন পরিবহন সমাধানের ভারসাম্য রাখতে হবে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রেল নেটওয়ার্ক ৬০ হাজার কিলোমিটারে সম্প্রসারণ, গুয়াংডংয়ে মাঝারি গতির ম্যাগলেভ প্রকল্প পরীক্ষা এবং ৫জি-ভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী রেলগাড়ি চালু করা। চীনা নববর্ষের মতো বড় ছুটিতে ভিড় সামাল দিতে রেল কর্তৃপক্ষ সেবা উন্নত করে চলেছে; এ সময় দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যায়। এসব বিনিয়োগ নির্গমন কমানো ও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির জাতীয় লক্ষ্যকে সমর্থন করে এবং কম-কার্বন পরিবহনের মেরুদণ্ড হিসেবে উচ্চগতির রেলের ভূমিকা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
মূল তথ্য
- চীনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক ৫০ হাজার কিলোমিটার ছাড়িয়েছে, যা বিশ্বের মোট নেটওয়ার্কের প্রায় ৭০ শতাংশ। ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার।
- ২০২৬ সালের বসন্ত উৎসবের সময়ে নেটওয়ার্কটি ৫৩ কোটি ৮০ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছে; ব্যস্ততম সময়ে প্রতিদিন ১৩ হাজারের বেশি ট্রেন চলেছে।
- গুয়াংশির ইকোট্যুরিজম গন্তব্যে যাতায়াতের সময় ৯-১০ ঘণ্টা থেকে কমে ৩.৭-৬ ঘণ্টা হয়েছে। ছয় ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় এমন স্থানের হার ৩১.৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮.৯৫ শতাংশ হয়েছে।
- উচ্চগতির রেলে যুক্ত শহরগুলোতে পর্যটকের আগমন ৯ শতাংশ বেড়েছে। এতে উপকূলীয় মহানগর থেকে দ্বিতীয় সারির অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে পর্যটন প্রবাহ পুনর্বণ্টিত হয়েছে।
- আলতাই প্রিফেকচার খনিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বরফ ও তুষারভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। সেখানে পর্যটকের সংখ্যা ২০০৭ সালের ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৩ কোটিতে পৌঁছেছে।
- লাওস-চীন রেলপথে সীমান্ত পেরিয়ে যাত্রার সময় সড়কপথে ২৪ ঘণ্টার বেশি থেকে কমে ৩-৪ ঘণ্টা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে লাওসের মোট আয় ২১ শতাংশ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
- ভিসামুক্ত নীতির সঙ্গে রেল যোগাযোগের সমন্বয়ে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ভিসা ছাড়াই বিদেশিদের প্রবেশ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৩.৯ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।






